অনেক তিতির কান্নার মাঠ পেরিয়ে — ভোরম দেও মন্দির/২

0
234
r

moitryমৈত্রী মজুমদার

সকাল সকাল রওনা হয়েছিলাম মান্দলা টাউন ছেড়ে। উদ্দেশ্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ভোরম দেও মন্দির পৌঁছনো।

ভোরম দেও মন্দিরকে মিনি খাজুরাহ বলা হয় স্থানীয় ভাবে। একথা শোনার পর থেকেই মনের মধ্যে এক ধরনের মিশ্র প্রতিক্রিয়া চলছিল। কিন্তু ১২এ জাতীয় সড়ক ধরে অল্প এগোনোর পর থেকেই সেই একই নেশার ঘোর লাগল চোখে। চারদিকে জঙ্গলের আবহ, সারি সারি পর্ণমোচী গাছের মাথায় লাল, হলুদ, সবুজ, কালো, নীল রঙের মেলা আর মাঝে মাঝে সবুজ গালচের মতো বিষণ্ণতার আচ্ছাদনে ঢাকা, তিতির কান্নার মাঠ। যার অতলস্পর্শী রহস্যময়তার মাঝে দাঁড়িয়ে ঠুঠাবাইগা আজও খুঁজে ফেরে তার ছেলেবেলায় হারানো বনময়ূরী গ্রামকে।

highway-2

মাঝে মাঝে গোন্দ-বাইগাদের দশবারো ঘরের গ্রাম, অদ্ভুত ভাবে পুরো জব্বলপুর, মান্দলা, কানহা, ছত্তীসগঢ় অঞ্চলের প্রতিটি গ্রামের, প্রত্যেকটি ঘরই কাঁচা কিন্তু বাইরেটা সাদা এবং তুঁতে রঙ করা। আস্তানা যতই ছোট হোক তার বাইরের আঙিনা কিন্তু খুবই সযত্নে  লেপা আর রঙ করা। এই রঙ রহস্যের সন্ধানে মনটা হাঁকপাঁক করছিল, শেষ পর্যন্ত চা খেতে খেতে শুধিয়েই ফেললাম দোকানিকে। জানা গেল যে এর রহস্য জানে না এরা নিজেরাও। এক এক সময় এক এক হাওয়া ওঠে, আর কখনও কখনও সেই হাওয়া গ্রাম, পাহাড়, জঙ্গল পেরিয়ে পৌঁছে যায় শহরাঞ্চলেও।

‘সত্য সেলুকাস, কি বিচিত্র এই দেশ!’……

maikal-hill-road

অনেক অনেক তিতির কান্নার মাঠ পেরিয়ে আমাদের গাড়ি বাঁক নিল হাইওয়ে ছেড়ে মহাকাল পর্বতের দিকে। নিমেষে পাল্টে পাল্টে যেতে থাকল চারপাশের দৃশ্যাবলি। ঘন জঙ্গলে ঢাকা পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে আমাদের গাড়ি চললো ভোরম দেও মন্দিরের দিকে। অনেক চড়াই উতরাই পেরিয়ে ভোরম দেও জলাশয়ের ধারে ধারে পৌঁছে গেলাম মন্দির চত্বরে।

দেখা মাত্রই মনে হল এ যেন এক প্রস্তরীভূত কবিতা। সপ্তম থেকে বারো শতাব্দীর মাঝামাঝি নাগবংশী রাজাদের রাজত্ব কালে নির্মিত এই মন্দির চত্বরে চারটি মন্দির আছে।

সবচেয়ে পুরনো মন্দিরটি পোড়া ইটের, এটি সম্ভবত খাজুরাহর মন্দিরের থেকেও আগে (দ্বিতীয় বা তৃতীয় শতকে) নির্মিত। বর্তমানে এটির অবস্থা খুব একটা ভাল নয়।

burnt-clay-temple

প্রধান মন্দিরটি প্রস্তর নির্মিত, খাজুরাহ এবং কোনারকের সূর্য মন্দিরের সমগোত্রীয় , ১১০০ শতকে নির্মিত মন্দিরটির সারা গায়ে খোদাই করা পাথরের মূর্তিগুলি ভারতীয় ভাস্কর্য শিল্পের অন্যতম নিদর্শন। ভিতরে পূজিত হন শিব, যিনি গোন্দদের কাছে ভোরম দেব/দেও নামে পরিচিত।

প্রধান মন্দিরের ১ কিমি দূরে আছে তিন নম্বর মন্দিরটি যাকে বলা হয় মাডওয়া মহল। স্থানীয় ভাষায় বিবাহ মণ্ডপকে ‘মাডওয়া’ বলা হয়। এই মন্দিরটি ১৩৪৯ সালে নাগবংশী রাজা রামচন্দ্র দেব এবং হাইহাবংশী রানি রাজকুমারী অম্বিকা দেবীর বিবাহ উপলক্ষ্যে নির্মাণ করা হয়েছিলো বলে জানা যায়। এখানে শিবলিঙ্গ কয়েকটি স্তম্ভের উপর অধিষ্ঠিত।

চত্বরের শেষ মন্দিরটি চেরকি মহল। প্রধান মন্দির চত্বর থেকে বেশ কিছুটা দূরে অল্প জঙ্গল আবৃত স্থানে এটি অবস্থিত, তাই খুঁজে পাওয়া একটু অসুবিধাজনক।

এ ছাড়াও মন্দির চত্বরে নতুন করে একটি লাল রঙের হনুমান মন্দিরও বানানো হয়েছে।

bhoromdeo-2

আরও আছে, আরকিওলজিকাল মিউজিয়াম। এই চত্বরের খনন কাজে উঠে আসা প্রস্তর শিল্পের নিদর্শন যত্ন সহকারে রাখা আছে। আছে সতী স্তম্ভ সহ নানা শিলা শিল্প।

এসব দেখে বেরিয়ে আসার পথে একটি কালভৈরব-এর মূর্তি আপনাদের জন্যে অপেক্ষারত।

bhoromdeo

ভোরমদেও দেখা শেষে এই পাহাড় জঙ্গলের দেশ থেকে বিদায় নিতে পারেন। কিন্তু যদি ফিরে যেতে মন না চায় তাহলে এখানে থেকে যাওয়ার আরও একটা অজুহাত আছে।

ভোরম দেও ওয়াইল্ড লাইফ স্যাংচুয়ারি। ছত্তীসগঢ়ের কবিরধাম জেলার সদর শহর কওয়ারধা টাউন থেকে ২০ কি মি দুরত্বে অবস্থিত। ১১শ শতকে কালাচুরি রাজাদের আমলেই এর গোড়াপত্তন হয়। পরে মধ্যপ্রদেশ সরকার এবং ইদানীং কালে ছত্তিসগড় সরকারের অধীনে এর রক্ষণাবেক্ষন চলছে।

এখানে থাকার জায়গা আছে রেস্টহাউস-এ। কিন্তু যদি আরও ভালোভাবে এবং আরও কিছু বেশি উপভোগ করতে চান তাহলে সোজা চলে যান কওয়ারধা প্যালেস। এটি কওয়ারধা অঙ্গরাজ্যের রাজার বাড়ি। ১৯৩০ সালে মহারাজ ধরমরাজ সিং দ্বারা নির্মিত প্যালেসটি আপাদমস্তক ইতালিয়ান মার্বেল আর দামি পাথরে মোড়া। রাজা রানি এখনও আছেন। তবে প্যালেসের একাংশ হেরিটেজ হোটেলে রূপান্তরিত করা হয়েছে। আর রাজা হয়েছেন বিধায়ক।

সে কথা আলাদা, তবে ছত্তীসগড়ের কবিরধাম জেলার এই রাজমহল আপনাকে আনন্দ দেবে, একথা ঠিক। এখানে বিভিন্ন রকম প্যাকেজ ট্যুর এর ব্যবস্থা আছে। আগে থেকে বুক করেও আসতে  পারেন। এখানে আসা যায় সারাবছরই। কিন্তু নভেম্বর থেকে মার্চ বেশি উপভোগ্য।

kawardha-palace

বিশেষ ভাবে উল্লেখ্য প্রতিবছর মার্চ মাসে আয়োজিত ভোরম দেও উৎসব। এই সময় এখানকার জনজাতির মানুষের জীবনযাত্রা, কলা, কৃষ্টি একসাথে উপভোগ করতে পারবেন।

tribal-haat

আমার ভোরম দেও যাত্রা এখানেই শেষ। এবার ফেরার পালা। মহাকাল পর্বতের ঢাল বেয়ে, শাল শিমুল, জারুল গাছের মাথার লাল হলুদ, সবুজ নিশান দেখতে দেখতে মধ্যপ্রদেশ-ছত্তীসগঢ় হাইওয়ে বেয়ে আমরা চললাম রায়পুর অভিমুখে…। পিছনে পড়ে রইল সাতপুরা, কানহার জঙ্গল, ঠুঠা বাইগাদের দেশ… আর অনেক অনেক স্মৃতির মায়াজাল………………………………………।।(শেষ)

ছবি: লেখক

বিজ্ঞাপন
loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here