অনেক তিতির কান্নার মাঠ পেরিয়ে …. ভোরম দেও মন্দির/১

2
224

moitryমৈত্রী মজুমদার

……“জঙ্গলের গভীরের যে কোনও গ্রাম পরিত্যক্ত হলেই, জঙ্গল তার পাইক- বরকন্দাজদের সঙ্গে সঙ্গেই পাঠিয়ে দিয়ে, পুরনো দিনের অত্যাচারী জমিদারদের মতো, গ্রামের জবর দখল নিয়ে মিশিয়ে দেয় তার জঙ্গলের খাসমহলের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গি ভাবে। তাই গ্রামটিকে পরে আর চেনা পর্যন্ত যায় না । প্রকৃতি তার সবুজ, হলুদ, লাল, কালো নানারঙা নিশান উড়িয়ে দেয় আকাশে আকাশে, বহুবর্ণ গালচে বিছিয়ে দেয় জমিতে, উজ্জ্বল অগণিত স্পন্দিত তারা আর জোনাকির ঝাড়লন্ঠন ঝুলিয়ে দেয় আকাশের চাঁদোয়ার নিচে; অন্ধকার রাতে। জঙ্গলের মধ্যে জঙ্গল, গাছের মধ্যে গাছ, পাতার মধ্যে পাতা, ফুলের মধ্যে ফুল, স্মৃতির মধ্যে স্মৃতি সেঁধিয়ে যায়। চেনবার জো-টি পর্যন্ত থাকে না আর”।……

highway-1

জঙ্গলের আবহ চারপাশে। মধ্যপ্রদেশের সাতপুরা, মহাকাল, বিন্ধ্য এই তিন পর্বতের পরিবেশটাই এরকম জঙ্গল আবৃত। আর মাঝে মাঝে ঘাসে ঢাকা মাঠ…সেই মাঠ আবার একটার সাথে আরেকটা জুড়তে জুড়তে চলে গেছে কোনও অরণ্যের গভীর গহীন রহস্যঘন অন্তরালে। মাঝে অন্তহীন বিছিয়ে থাকা মধ্যপ্রদেশ হাইওয়ে। সে পথে চলতে চলতে পিছে সরে যায় জনপদ, জনজাতির মানুষ আর তাদের জীবনে লেগে থাকা অনেক অনেক সুখদুঃখের আখ্যান। ঠিক এভাবেই বুঝি একদিন প্রকৃতি তাদের কাছ থেকে কেড়ে নিত তাদের প্রিয়জনদের, তাদের জমিজিরেত, গরুবাছুর। বাচ্চাকাচ্চা সমেত চলে যেত রোগমহামারির গর্ভে। যে ক’জন প্রাণটুকু ধরে রাখতে পারতো তারা সেটুকু সম্বল করেই পালাতো তাদের গ্রাম, ভিটেমাটির মায়াত্যাগ করে। পিছনে পড়ে থাকত শুধু মাঠ, ধু ধু মাঠ…… সকাল সাঁঝে সেখানে কালি তিতিরের বিষণ্ণ একটানা সুর কান্নার মতো মনে করিয়ে দেয় সেদিনের শান্ত সুন্দর প্রেমময় গ্রামগুলি থেকে চকিতে ভেসে আসা শিশুর কান্না, বাকুতলায় জল নিতে আসা মহিলাদের পায়ের মল আর কলহাস্যের কিঙ্কিনি। এই পথে চলতে চলতে তাই মনে পড়ে গেল মাধুকরী উপন্যাসের লাইনগুলো, যা রয়েছে এই লেখার শুরুতেই। কি সাবলীল ভাবে লেখক এই উপন্যাসের উচ্চবিত্ত নায়ক নায়িকাদের জীবননাট্যের ফাঁকফোকর দিয়ে আমাদের সুযোগ করে দিয়েছেন এই অঞ্চলের গোন্দ, বাইগাদের জীবনসংগ্রামের ইতিবৃত্তের ঝাঁকি দর্শনের। ঠুঠাবাইগা, যার গ্রাম নেই, কিন্তু সেই গ্রামের শব্দ,গন্ধ, বোধ যার স্মৃতিতে ঝুমঝুমির মতো বাজে। তার গল্প যেন এখন আমার চোখের সামনে দিয়ে প্যানোরামার মতো সরে সরে যাচ্ছে।

sahasradhara-3

 

গন্তব্য ছিল ভোরম দেব মন্দির,পথে সহস্র ধারা। মনের গভীরের পাকদণ্ডি বাইতে বাইতে কখন যে এসে পড়েছি মান্দলা টাউনে খেয়ালই ছিল না। মান্দলার সদর বাজার পেরিয়ে গ্রামের ভিতর অল্প যেতেই পৌঁছে গেলাম সহস্রধারার কাছে। মধ্যপ্রদেশের মান্দলা জেলার রামনগর আর সদর শহর মান্দলার মাঝখানের ১৫ মাইল রাস্তায় নর্মদা হাঁসুলি বাঁকের মতো আকারে পাথুরে পাহাড়ি রাস্তায় বয়ে, ম্যাগনেসিয়াম, লাইমস্টোন আর ব্যাসল্ট পাথরের খাঁজে খাঁজে নেমে এসে, এই ধারাগুলোর সৃষ্টি করেছে। চারপাশে অগণিত ছোট বড় শতসহস্র ধারা। এখানে নর্মদাই পূজিত হন দেবী রূপে। মন্দির আছে, আছে বেশ কয়েকটি ঘাটও। এখানে পাথরের ওপরে বসে নর্মদার বহমান জলে পা ডুবিয়ে আসলে মনের গহীনে একডুব দিয়ে আসার মজাই আলাদা।

পাথরের ওপর বসেবসে ভাবছিলাম এই মান্দলার ঐতিহাসিক গুরুত্ব কম নয়, এ যেন এক রূপকথার জগৎ। কোন প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে এই ঘন জঙ্গলাকীর্ণ এলাকা গোন্দ জনজাতির রাজধানী ছিল। তারপর কোনও এক দুঃসাহসী রাজপুত পঞ্চম বা ষষ্ঠ শতাব্দীর মাঝামাঝি কোনও সময়ে গোন্দ রাজার অধীনে কাজ করতে ঢুকে রাজার মেয়েকে বিয়ে করে গারহামান্দলার গোন্দ রাজপুত রাজবংশের সুচনা করেন। তারপর চতুর্দশ শতাব্দীতে ৪৭তম রাজা সংগ্রাম শাহের হাত ধরে ভোপাল, সাগর, দামহ,জাবালপুর, গারহা ইত্যাদি গোটা নর্মদা উপত্যকার বিস্তীর্ণ এলাকায় সাম্রাজ্য বিস্তার করে তারা। কিন্তু সে সুখ বেশিদিন টিকল না তাদের কপালে। ১৫৬৪ সালে মোগল সম্রাট আকবরের সেনাপতি আসাফ খানের আক্রমণের সামনে তৎকালীন সম্রাজ্ঞী রানি দুর্গাবতী অসম সাহসে রুখে দাঁড়ালেও, শেষ রক্ষা হল না। প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, হাতির পিঠে চড়ে, শুকনো নদীখাতে সেনা সমেত গেরিলা যুদ্ধ পরিচালনা করাকালীন একটি তির এসে চোখে বেঁধে তার। তবুও হার স্বীকার করেননি তিনি। কিন্তু এইসময়ই ঘটে এক বিস্ময়কর কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা। শুকনো নদীখাতে হঠাৎই জলপ্রবাহ শুরু হয়। ক্রমাগত বাড়তে থাকা জলের তোড়ের সামনে বিজয় অসম্ভব ভেবে মাহুতের কোমরের থেকে ছুরি খুলে নিয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন রানি দুর্গাবতী।

narmada-mondir

 

তারপর কত জল বয়ে গেছে নর্মদার বুক দিয়ে আর সেভাবেই হাত বদল হয়েছে মান্দলার শাসনতন্ত্রের। মোগল থেকে শুরু করে, পেশওয়া, ভোঁসলে, বুন্দেলা, মারাঠা থেকে ব্রিটিশ… সব ধরনের হাত বদলের সাক্ষী এই ছোট্ট শহর। কিন্তু ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের সময় ছাড়া, এলাকার শান্তি বিঘ্নিত হয়নি কোনও কিছুতেই। সামাজিক, অর্থনৈতিক শোষণ পেরিয়ে আজ প্রাকৃতিক শোষণের শিকার এখানকার শান্তিপ্রিয় মানুষগুলো। একসময় সবচেয়ে সবুজ শহরের পরিচয় বহনকারী এই শহর আজ দিনে প্রায় ২০,০০০ কিলো কাঠ সরবরাহ করে। ফলাফল ২০০৭ সালে তাপমাত্রা বেড়ে ৪৬ ডিগ্রিতে পৌঁছনো। একমাত্র মা নর্মদাকে ভরসা করেই কেটে যায় এখানকার মানুষের দিবানিশি।

এখানকার প্রাকৃতিক পরিবেশের আনন্দ নিতে থেকে যেতে পারেন একটা দিন। দেখে নিতে পারেন রাংরেজঘাট, রাপ্তাঘাট, নাওঘাট,সঙ্গমঘাটের মতো বিভিন্ন জায়গাগুলো। নৌকাবিহার করতে পারেন নর্মদার বুকে।

bishnu-mondir,-saharadhara

এ ছাড়াও, মান্দলার থেকে ১৮ কিমি গেলেই আপনি পৌঁছে যাবেন গরম পানি। এটি সালফার থাকা প্রাকৃতিক উষ্ণজলের কুণ্ড। স্থানীয় মানুষের বিশ্বাস এ কুণ্ড ভগবান বিষ্ণুর আশীর্বাদ। তাই বহুদিন থেকে, প্লেগে মহামারিতে এই কুণ্ডের গরম জলের শরণাপন্ন হয় তারা। তবে, ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ মেডিক্যাল রিসার্চ-এর মতে, এই জল চর্মরোগ সারাতে উপকারী। কুণ্ড ছাড়াও এখানকার চিরহরিৎ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আপনাকে মুগ্ধ করবেই। এই অঞ্চলের পর্ণমোচী জঙ্গলের পাশাপাশি এ যেন এক মরুদ্যান।

motimahal-mandla

আরও দেখে আসতে পারেন ২৪ কিমি দূরে, রামনগর বা মান্দলা ফোর্ট। ১৭শ শতাব্দীতে নির্মিত গোন্দ রাজাদের রাজপ্রাসাদ। এর আরেক নাম মতি-মহল। এর থেকে ৩ কিমি দূরে আছে কালো পাথরে নির্মিত মোগল স্থাপত্যের এক মাস্টার পিস, বেগম- মহল। যা কোনও এক চিমনি রানির জন্য বানানো হয়েছিলো। আর যে কালো পাথরে তা বানানো হয়েছিলো ৪ কিমি দুরের সেই কালাপাহাড়ও অবশ্যই আপনার ভ্রমণের তালিকায় থাকা উচিৎ।

এসব দেখে ফিরে আসুন মান্দলা শহরে, এখানে হোটেল, লজ সহ, থাকার জায়গার অভাব নেই। বিকেলে মান্দলা চকের কমল চাটের দোকানের চাট, বা শ্রীনাথ পাওভাজির দোকানের খাবার চেখে দেখুন। এছাড়া ঠেলাওয়ালার থেকে দোসা, কচুরি, ফুলকি, দাভেলি এসবও চেখে দেখতে পারেন। পেট ভরার পর মন ভরে সংগ্রহ করুন স্থানীয় হস্তশিল্প। মান্দলার সদর বাজার এসবের জন্য বিখ্যাত।

তারপর রাতটা হোটেলে থেকে পরের দিন সকাল সকাল রওনা দিন রায়পুর অভিমুখে। ভোরমদেও মন্দির দেখতে হবে না ????

(চলবে)

ছবি: লেখক

বিজ্ঞাপন
loading...

2 মন্তব্য

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here