কুকুছিনার কাহিনি : গাড়ি ছোটো, ‘দিল’ বড়ো

0
236

sumitraসুমিত্র বন্দ্যোপাধ্যায়

পাণ্ডবদের তখন অজ্ঞাতবাস চলছে, তাঁদের খুঁজে বার করতে চতুর্দিকে ছুটে বেড়াচ্ছে কৌরব সেনার দল। আজকের উত্তরাখণ্ডের যে গ্রামে পাণ্ডবদের অবস্থানের শেষ খবর পাওয়া গিয়েছিল সেখানেও ধাওয়া করেছিল কৌরবরা। কিন্তু ওই ধাওয়া করে যাওয়াই সার, কোথায় কী? পথ এসে শেষ এই গ্রামে, এর পর শুধু দুর্গম পাহাড় আর গভীর অরণ্য। রহস্যমাখা প্রকৃতির বুকে আত্মগোপন করল পাণ্ডবরা, ছাউনি বানিয়ে বসে তন্ন তন্ন করে পাহাড়-জঙ্গল চষেও তাদের অস্তিত্ব আবিষ্কার করতে পারল না কৌরবরা। কৌরবসেনা, কৌরব ছাউনি থেকে পরিবর্তিত হতে হতে গ্রামটির এখনকার নাম ‘কুকুছিনা’। এখানে শুধু এক বার এসে পৌঁছোনোর অপেক্ষা। তার পরেই মনে হবে হঠাৎ করে সময়যানে চেপে চলে গেছি মহাকাব্যের যুগে।

6

কুকুছিনার প্রকৃতির রূপ, দৃশ্যমান পাহাড়-জঙ্গল-ঝরনা-ফুল-পাখি এখনও ততটাই প্রাচীন ও অনাঘ্রাত যতটা ছিল আজ থেকে হাজার হাজার বছর আগে। সকল পথশ্রমের ক্লান্তি মুছে গেছে এই প্রকৃতির বুকে। কলকাতা থেকে কাঠগুদামের পথে হলদুয়ানি স্টেশনে নেমে রানিখেত। প্রচলিত জনপ্রিয় ভ্রমণের পাশাপাশি যদি কেউ অন্য রকম, শান্তির অবকাশ যাপন করতে চান, অনুভব করতে চান নৈঃশব্দের সঙ্গীত, দেখতে চান মহাকালের হাতে আঁকা নিপুণ চিত্ররেখার টানে গড়ে ওঠা চিরনবীন প্রকৃতিকে এবং অবশ্যই সান্নিধ্য পেতে চান সেই সব মানুষের, যাদের সঙ্গে মিশলে মনে হবে এই পৃথিবীর মলিনতা এখনও গ্রাস করেনি তাদের, তা হলে আপনাকে আসতে হবে এই কুকুছিনা।

16

হলদুয়ানি পর্যন্ত কলকাতা বা লখনউ থেকে ট্রেন আসছে নিয়মিত। তবে ভালো হয় দিল্লিতে রাতের ট্রেন চেপে ভোরবেলা হলদুয়ানি পৌঁছোলে। কাছাকাছি পন্থনগর বিমানবন্দরেও প্লেন ওঠা-নামা করে নিয়মিত। সেখান থেকেও হলদুয়ানি আসা যায়। এর পর শুরু হবে পাহাড়ে যাত্রা। হলদুয়ানি থেকে রানিখেত ৫৭ কিলোমিটার। রানিখেত থেকে দ্বারাহাট ৩২ কিলোমিটার। দ্বারাহাট থেকে কুকুছিনার দূরত্ব প্রায় ১৪ কিলোমিটার। সব মিলিয়ে মোটামুটি ১০৩ কিলোমিটার রাস্তা। সরাসরি বাস যায় দিনে একবার মাত্র, তবে ভাড়া নেওয়া যায় গাড়িও। কিন্তু অর্থের সাশ্রয় ও আকর্ষণীয় ভ্রমণের অভিজ্ঞতা পেতে চাইলে তিন খেপে তিন বার বদল করতে হবে জিপ। অথবা রানিখেত পর্যন্ত বাস তার পর দু’ খেপে জিপ বদল। এই ভাবে বদলে বদলে পথ চলার সময় কিছুটা বেশি লাগলেও মাঝে মাঝে বিশ্রাম ভালোই লাগবে। সেই সঙ্গে যত সমতল থেকে দূরে যাওয়া যাবে তত পৌঁছোনো যাবে মানুষের হৃদয়ের কাছাকাছি। পাওয়া যাবে আন্তরিকতার সুঘ্রাণ, যেমন দ্বারাহাট বা দোয়ারাহাট নামের ছোট্টো জনপদটি।

3

দ্বারাহাট চার পাশের পাহড়ি গ্রামের কেন্দ্রস্থল। তাদের ভাষায় ‘বাজার’। সে বাজারে লোককে পাহাড় ডিঙিয়ে আসতে হয় প্রায় ১৮ থেকে ২০ কিলোমিটার পথ। নিজেদের প্রয়োজনীয় দৈনন্দিন জিনিসপত্র সংগ্রহ করতে। দ্বারাহাটে সরকারি ও বেসরকারি স্কুল আছে একাধিক। দূর-দূরান্তের গ্রামের ছেলেমেয়েরা পড়তে আসে। তাদের বেশির ভাগকে নির্ভর করতে হয় জিপগাড়ি বা সরকারি বাসের ওপর। আবার অনেক সময়েই হাঁটাই একমাত্র ভরসা হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু কারও মুখে বিরক্তি বা ক্ষোভ নেই। ইচ্ছে করলে এই পাহাড়ি গঞ্জে এক রাত্রি কাটিয়ে নেওয়া যায়। ‘হোটেল মায়াঙ্ক’-এ মন্দ লাগবে না। অথবা আগে থেকে যোগাযোগ থাকলে আশ্রয় পাওয়া যেতে পারে যোগানন্দ আশ্রমে। ‘অটোবায়োগ্রাফি অব যোগী’ বইটা যাঁরা পড়েছেন অথবা পরমহংস যোগানন্দ সম্পর্কে কিংবা ‘ক্রিয়াযোগ’ বিষয়ে যাঁরা অবগত, তাঁরা এই আশ্রম বিষয়ে অপরিচিত নন। যাঁরা জানেন না তাঁদের একটু পরে জানাচ্ছি ‘মহাবতার বাবা’-র কথা। আপাতত যাওয়া যাক কুকুছিনার পথে।

1

আগেই বলেছি এ পথে যতই এগোবেন অনুভব করবেন মানুষের হৃদয়ের উত্তাপ। দ্বারাহাটের জিপস্ট্যান্ডে কুকুছিনার জিপ পাবেন। জিপ ছাড়বে দশ জন সওয়ারি হলে। তবে কতক্ষণে দশ জন সওয়ারি হবে সে বিষয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করা কঠিন। সুমো জিপে চালকের পাশের আসন দু’টিতে আপনি আগেভাগে বসে পড়লে আপনার সঙ্গে গোল বেঁধে যেতে পারে প্রবীণ অথবা প্রবীণা সহযাত্রীর। ওই আসনগুলো তাঁদের জন্য সংরক্ষিত। লিখিত আইন নেই, কিন্তু এটাই পাহাড়ের দস্তুর। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে যখন ওই সব বয়স্ক মানুষ বুঝে যাবেন আপনি অতিথি, মুহূর্তে বদলে যাবে তাঁদের গলার স্বর। আপনাকে নিকট আত্মীয়ের মতোই স্বাগত জানাবেন তাঁরা, খবর নেবেন আপনার ঘর-গেরস্থালির আর বলে ফেলবেন প্রায় নিজেদের সম্পূর্ণ জীবন-ইতিহাস, শৈশব, যৌবন, প্রৌঢ়ত্বের বিস্তারিত বর্ণনা। এঁদের মধ্যে অনেককেই পেয়ে যাবেন যাঁরা এই পাহাড়ের বাইরে বিশাল মহাভুবনের বুকে কখনও পা রাখেননি।

8

যদি ঘটনাচক্রে আপনি বিনোদ নামক চালকের গাড়িতে সওয়ার হন তা হলে নিশ্চিত থাকুন, বহুবিধ মজার ঘটনা আপনার জন্য অপেক্ষা করে আছে। বিনোদ নিজে যদিও খুব কম কথা বলেন কিন্তু মৃদু হাসি সব সময় মাখানো তাঁর মুখে। বিনোদের গাড়ি ছোটো, মাত্র দশ সিটের। কিন্তু বিনোদের ‘দিল’ অনেক বড়ো। রাস্তায় কাউকেই বিনোদ ফেলে যান না। দশ যাত্রীর পর কত যে ওঠে আর কী ভাবে বসে, অথচ কারওরই কষ্ট হয় না সে ভাবে। পাহাড়ের রাস্তার কোনো এক বাঁকে হঠাৎ হয়তো দেখতে পাবেন এক ঝাঁক স্কুলপড়ুয়া বসে আছে জিপ অথবা বাসের অপেক্ষায়। কী আশ্চর্য! বিনোদ ড্রাইভার হাঁক পাড়তেই তারা সবাই উঠেও আসবে গাড়িতে। ছেলেরা জিপের মাথায়, মেয়েরা ভেতরে। অথচ আপনার বসতে একটুও কষ্ট হবে না। মনে হবে কোনো অলৌকিক স্বপ্নযানে চলেছেন দশ জনের গাড়িতে সাতাশ-আঠাশ জন। কখনও কুয়াশা আর মেঘের চাদরে ঢাকা পড়তে পড়তে, আবার কখনও সূর্যের চড়া আলোয় ঝিলমিল করতে করতে এগিয়ে চলবে বিনোদের জিপ। যখন বুঝতে পারবেন দ্বারাহাটের থেকে ঠান্ডাটা একটু বেশি অনুভব করছেন, তখনই জানবেন কুকুছিনা আর বেশি দূরে নেই। পথের দু’পাশে উঁচু উঁচু পাইনের বন। অচেনা পাখি, পতঙ্গ, ঝিঁঝির ডাক, কোনো পরিচর্যা বা প্রচেষ্টা ছাড়াই ফুটে থাকা নানা রঙের বাহারি ফুলেরা আপনাকে জানান দেবে যে অনাদিকাল থেকে তারা আপনারই প্রতীক্ষায়, আপনাকে স্বাগত জানাবে বলে।

ছবি: লেখক

(চলবে)

যোগাযোগ – শ্রী গিরিশ জোশি। কুকুছিনা, আলমোড়া, উত্তরাখণ্ড। (০)৯৪১১৩১৮৫৪০।

বিজ্ঞাপন
loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here