তারাক্ষেত্র থেকে রবিক্ষেত্র ৫ / নামের মধ্যে অন্তত ‘শান্তি’ আছে

0
77
baul of shantiniketan
sudip kumar paul
সুদীপ কুমার পাল

জমজমাট হাট বসেছে খোয়াইয়ে। সবার প্রথমে মন টানবে বাউল গান। গাছের নীচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বাউলদের ছোটো ছোটো দল। এ গান বাংলার মাটির গান, বাংলার প্রাণের গান। তাই তো শনিবার খোয়াইয়ের হাটে বহু মানুষ ছুটে আসে দূরদুরান্ত থেকে।

বাউল শব্দটি এসেছে বাতুল শব্দ থেকে। যার অর্থ পাগল। যে গায় সে আকুল হয়ে পাগল হয়ে গেয়ে চলে, যে শোনে সে-ও পাগল হয়ে ওঠে। বাউল গেয়ে চলেছে “পাগল তো অনেক আছে, এমন পাগল কয়জনা”। পাগল আমিও হয়ে উঠেছি। পাগল হয়ে উঠেছে সমবেত শ্রোতা। অনেকে পাগলের মতো নেচে চলেছে গানের তালে তালে। বাকিরাও সেই ছন্দে অঙ্গ দোলাচ্ছে। বিকেলের দখিনা হাওয়ায় আমিও তাতে ভেসে যাচ্ছি।

আরও পড়ুন: তারাক্ষেত্র থেকে রবিক্ষেত্র ১ / আদি মূর্তি দর্শন হল না আজ

বাউল গানে নেশাতুর হয়ে এগিয়ে চললাম বিকিকিনি, পসরা দেখতে। এই হাটে বিশ্বভারতীর ছাত্র থেকে শুরু করে স্থানীয় গ্রামীণ শিল্পী, সবাই তাঁদের পসরা সাজিয়ে বসে। কেউ হাতের কাজ, কেউ বা পোশাক পরিচ্ছদ। কেউ খাবার বানিয়ে আনে তো কেউ বাদ্যযন্ত্র। আমি একটা একতারা কিনলাম এখান থেকে।

village market at khowaiঘুরতে ঘুরতে এক জায়গায় একটু অন্য স্বাদ পেলাম।  লম্বা রোল করা কাগজে ছোটো ছোটো পট আঁকা। বিষয়বস্তু পৌরাণিক ঘটনাবলি। একজন এক হাতে এক প্রান্তের রোল খুলছেন ও অন্য হাত দিয়ে গুটোচ্ছেন। মুখে পাঁচালির মতো সুর করে বিবরণ দিচ্ছেন। বাংলার প্রায় হারিয়ে যেতে বসা পটশিল্প চাক্ষুষ করলাম খোয়াইয়ের হাটে।

উদয় নিয়ে এল সোনাঝুরির জঙ্গলে। সুন্দর জায়গা। লাল মাটি জমে পাথরের মতো শক্ত হয়ে গিয়েছে। তার উপর দাঁড়িয়ে আছে অজস্র আকাশমণি ও ইউক্যালিপটাস গাছ। মাঝে মাঝে মাটি ক্ষয়ে গিরিখাতের মতো সৃষ্টি হয়েছে। কয়েক মাস আগে দেখা গনগনির কথা মনে পড়ে গেল। ।

আরও পড়ুন: তারাক্ষেত্র থেকে রবিক্ষেত্র ২ / অবশেষে তাঁর দর্শন হল

সামনে আর একটা হাট বসেছে। আগে এখানে একটা জায়গাতেই হাট বসত। এখন লোক বেড়ে যাওয়ায় তিন জায়গায় বসে। সব হাটের একই ছবি। সন্ধ্যা হয়ে আসছে। হাটে বিজলিবাতির ব্যবস্থা নেই। সূর্যের আলো যতক্ষণ হাটও ততক্ষণ। আমরা রওনা হলাম। পিছন থেকে দমকা হাওয়ায় দু’টো গানের লাইন ভেসে এল – “এমন মানবজনম আর পাবে না, বারে বারে আর আসা হবে না।”

কিছু দূর যাওয়ার পর উদয় বলে উঠল, চলুন, এক জায়গায় নিয়ে যাই। তার পরেই দেখি সে পাকা রাস্তা ছেড়ে লাল মাটির রাস্তা ধরল। কিছুক্ষণ পরে আবার বলে উঠল, এই যে গ্রামটা দেখছেন, এর নাম বাহামনি গ্রাম। সাঁওতালদের গ্রাম। টিভি তে একটা সিরিয়াল হত, তাতে বাহামনি নামে একটা চরিত্র ছিল। সেই সিরিয়ালের শুটিং হয়েছিল এই গ্রামে।

baul at village marketসাঁওতাল গ্রাম! সবাই নড়েচড়ে বসলাম। ভালো করে দেখতে হয়। বড়ো বড়ো সুদৃশ্য মাটি বা ইটের বাড়ি। বাড়ির দেওয়ালে নানা শিল্পকর্ম। মাটির দেওয়ালে বিশেষ কায়দায় ন্যাতা দেওয়া হয়েছে। আলপনার মতো দেখতে লাগছে। থার্মকলের সিটে কুঁদে কুঁদে যে ভাবে আঁকা হয় সেই ভাবে মাটির দেওয়ালে তাদের জীবনযাত্রার ছবি আঁকা আছে। বড়ো সুন্দর লাগছে। এঁদের শিল্পচেতনা দেখে সত্যি অবাক হতে হয়।

গ্রামের মধ্যে দিয়ে চওড়া রাস্তা। প্রতি বাড়িতে বিদ্যুৎ। গ্রামে জলের কল। মানুষগুলো দরিদ্র। শিক্ষার আলো ধীরে ধীরে প্রবেশ করছে বোঝা যায়। গোধূলি পেরিয়ে অন্ধকার নেমে এসেছে সবে। রাস্তায় আলো জ্বলে উঠেছে। টোটো থেকে নেমে পড়েছি অনেক আগেই। রাস্তার আলোয় দু’টি সাঁওতাল বালিকা রাস্তায় ছক কেটে কিতকিত খেলছে। এগিয়ে গেলাম আলাপ জমাতে। কিন্তু ওরা খেলায় মশগুল।

কিছুক্ষণ পরে আবার পাকা রাস্তায় চলে এলাম। রাস্তায় এখন গাড়ির ভিড়। একটু জ্যাম লেগেছে। খোয়াইয়ের হাট-ফেরত গাড়িগুলো সব ফিরছে। উদয় অনেক কসরত করে সে সব কাটিয়ে এল। ব্যাটারির গাড়ি। ব্যাটারির চার্জ শেষ হয়ে এসেছে। গাড়ি আর জোরে ছুটতে পারছে না। এই ভাবেই এক সময় আমরা এসে পৌঁছোলাম।

শুতে যাওয়ার আগে আমি আর অপূর্বদা সঙ্কল্প করে নিলাম কাল ভোরে মর্নিং ওয়াকে দু’জনে বেরোবোই বেরোবো। সময় ভোর ৫টা।

ভোর ৫টায় উঠলেও বেরোতে বেরোতে সাড়ে পাঁচটা বেজে গেল। লজের কর্মীদের ঘুম থেকে তুলে দরজা খুলিয়ে আমি আর অপূর্বদা বেরিয়ে পড়লাম প্রাতঃভ্রমণে। শান্ত, স্নিগ্ধ সদ্য ফোটা ফুলের মতো তরতাজা সকাল। পাখিরা ঘুম থেকে উঠে গাছের ডালে বসে রূপচর্চা করতে করতে সারা দিনের পরিকল্পনা করছে। কোনো কোনো পাখি রেওয়াজ করছে। মানুষও পিছিয়ে নেই। শান্তিনিকেতন ধীরে ধীরে জেগে উঠছে।

sonajhuri jungleনরম সকালের নরম আলো গায়ে জড়িয়ে আমরা দু’জনে এগিয়ে চললাম ধীর পায়ে। চলেছি শান্তিনিকেতন রোড ধরে বিশ্বভারতীর দিকে। বেলায় ও সন্ধ্যায় যে জায়গা দামাল হয়ে থাকে, রাস্তা পারাপার মুশকিল হয়, হৈহৈ কাণ্ড চলে, সেই জায়গাই এখন শিশুর মতো ঘুমিয়ে আছে।

বাসে করে একদল ট্যুরিস্ট এসেছে। ভুবনডাঙার মাঠে বাস রেখে সবে ঘুরতে বেরিয়েছে। একজন গাইড করছে তাঁদের। বিশ্বভারতীর ভিতরে এখন ঢোকা যাবে না তাই রাস্তা থেকে যেটুকু দেখা যায় তাই দেখাচ্ছে। ওদের একজনকে জিজ্ঞাসা করে জানলাম ওরা মেদিনীপুরের গড়বেতা থেকে এসেছে। তিন দিনের প্যাকেজ। আজ শান্তিনিকেতন আর তারাপীঠ। কাল তারাপীঠ থেকে বক্রেশ্বর যাবে। এ ছাড়াও ম্যাসাঞ্জোর, নবদ্বীপ, মায়াপুর আছে। এমন খিচুড়ি মার্কা ট্যুর প্রোগ্রাম!

আরও পড়ুন: তারাক্ষেত্র থেকে রবিক্ষেত্র ৩ / শান্তিনিকেতনের ভুবনে

শান্তিনিকেতন রোড থেকে বাঁ দিকের রাস্তা ধরলাম। কানে আসছে কেউ একজন সকালবেলা গলা সাধছে। কোনো একটা গাছ থেকে মিষ্টি ফুলের গন্ধ ভেসে আসছে। বেশ ভালো লাগছে শুনতে। হলুদ পাঞ্জাবি আর সাদা চোস্ত পরে বাচ্চারা অভিভাবকদের হাত ধরে বিশ্বভারতীর ভিতরে ঢুকছে। ওটাই ওঁদের স্কুল ড্রেস। মেয়েদের হলুদ ফ্রক আর সাদা প্যান্ট। বড়ো মেয়েদের হলুদ পাড় সাদা শাড়ি। সকালের স্কুল। গাছতলায় ক্লাস হবে।  সবার গাছতলায় ক্লাস হবে কিনা জানি না, তবে বাচ্চাদের হচ্ছে দেখতে পাচ্ছি।

পথ চলতে চলতে একটা স্থাপত্য দেখতে পেলাম। দু-জন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। গেটের দারোয়ানকে জিজ্ঞাসা করলাম এটা সম্পর্কে। কিছুই বলতে পারল না। আরও কিছুটা যাওয়ার পর একটা ভবন দেখে কিছু খটকা লাগল। কাছেই একটা গেটের দারোয়ানকে জিজ্ঞাসা করলাম। এ বারও বিফল হলাম। বিশ্বভারতীতে মানুষগুলো কি শুধু চাকরি করতে আসে? রবীন্দ্রনাথ বা বিশ্বভারতীর প্রতি তাঁদের কি বিন্দুমাত্র আবেগ বা ভালোবাসা নেই?

আরও পড়ুন : তারাক্ষেত্র থেকে রবিক্ষেত্র ৪ / কঙ্কালীতলা থেকে প্রকৃতি ভবন

হেঁটে হেঁটে প্রায় দু’ কিমি চলে এসেছি। এ বার ফিরে চললাম। এই দু’দিনে একটা জিনিস পরিষ্কার বুঝতে পেরেছি। সেটা হল বিশ্বভারতীর অন্দরে খারাপ-ভালো যা-ই হোক এখানকার জনজীবনে তার কোনো প্রভাব সে ভাবে পড়ে না। অথচ এখানকার মানুষকে লতার মতো জড়িয়ে আছে বিশ্বভারতী ও রবীন্দ্রনাথ। তাঁদের শিল্পকলা, পোশাক এমনকি বাড়িঘর, সবেতেই রবীন্দ্রঘরানা স্পষ্ট। প্রতি বাড়িতেই বড়ো বড়ো গাছ। হয়তো এটাও বিশ্বভারতী থেকে উদ্বুদ্ধ হয়েই।

শান্তিনিকেতনে শান্তি থাক বা না থাক নামটুকুর মধ্যে অন্তত শান্তি বেঁচে থাকবে। এটাই সান্ত্বনা। (শেষ)

কী ভাবে যাবেন

হাওড়া বা শিয়ালদহ থেকে ট্রেনে বোলপুর শান্তিনিকেতন। সেখান থেকে অটো, টোটো বা রিকশায় হোটেল বা লজে। ট্রেনের সময়ের জন্য দেখে নিন erail.in

সড়কপথে কলকাতা থেকে দূরত্ব ১৬২ কিমি, পথ জাতীয় সড়ক ১৯ (পূর্বতন জাতীয় সড়ক ২, দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে) হয়ে বর্ধমান, তার পর জাতীয় সড়ক ১১৪ বরাবর গুসকরা হয়ে।

কোথায় থাকবেন

শান্তিনিকেতনে থাকার জন্য রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ পর্যটনের টুরিস্ট লজ। অনলাইন বুকিং www.wbtdcl.com । রয়েছে যুব দফতরের যুব আবাস। অনলাইন বুকিং youthhostelbooking.wb.gov.in । এ ছাড়াও রয়েছে প্রচুর বেসরকারি হোটেল ও লজ আছে। খোঁজ পাবেন makemytrip, goibibo, trivago, cleartrip ইত্যাদি ওয়েবসাইট থেকে।

ছবি: লেখক

এক ক্লিকে মনের মানুষ,খবর অনলাইন পাত্রপাত্রীর খোঁজ

loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here