উত্তরবঙ্গের ডায়েরি ৫/ জল্পেশ থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা

0
297

জল্পেশ মন্দির প্রাঙ্গণ থেকে এক চিলতে কাঞ্চনজঙ্ঘা 

wrivuশ্রয়ণ সেন:

“এই থামো থামো থামো…”

আমার আকস্মিক নির্দেশে জোরে ব্রেক কষল সারথি। তড়িঘড়ি গাড়ি থেকে নেমে পড়লাম। আমাকে দেখে বাকিরাও নামল। কিন্তু তখনও জানে না কী ব্যাপার।

—“কী রে নামলি কেন?”

—“আরে ওই দিকে তাকাও। ওকে দেখা যাচ্ছে।”

দূরের পাহাড়ে হালকা মেঘের ওপর থেকে উঁকি মারছে কাঞ্চনজঙ্ঘা। উত্তরবঙ্গ সফরে এই প্রথম দেখা পেলাম তার।

লাটাগুড়ি থেকে জল্পেশ মন্দির যাচ্ছি। দক্ষিণমুখো রাস্তা। কিন্তু আমার নজর মাঝেমধ্যেই পড়ছে উত্তর দিকে। ও দিকেই তো পাহাড়। শুনেছি আকাশ পরিষ্কার থাকলে উত্তরবঙ্গের বিস্তীর্ণ সমতল এলাকা থেকেও কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায়। বর্ষা বিদায় নিয়েছে কিছু দিন হল। গত কয়েক দিন যে অল্প অল্প মেঘ ছিল আকাশে আজ সেটাও উধাও, তাই আমার বিশ্বাস, তার দেখা পাবই।

ময়নাগুড়িতে ঢোকার কিছু আগেই নজরে পড়ল শ্বেতশুভ্র শৃঙ্গের। এক কথায় যাকে বলা যেতে পারে উত্তরবঙ্গের রত্ন। উত্তরবঙ্গের প্রাণ।

যাই হোক মিনিট পাঁচেক রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে ছবি-টবি তুলে ফের রওনা হলাম জল্পেশের দিকে।

jalpesh-templeপৌঁছোলাম জল্পেশ মন্দিরে। ভালো নাম জল্পেশ্বর মন্দির। ময়নাগুড়ি থেকে ৮ কিমি। উত্তরবঙ্গের জাগ্রত মন্দিরগুলির একটা। অধিষ্ঠিত মহাদেব। এখানকার যে ব্যাপারটা ভীষণ টানে তা হল এই মন্দিরের শান্তিপূর্ণ, নির্ঝঞ্ঝাট পরিবেশ। পুণ্যার্থীরা নিজের মতো করে পুজো দিতে পারেন এখানে। তবে গর্ভগৃহে প্রবেশ করার আগে টিকিট কাটতে হয়।

দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিভিন্ন রকম মন্দিরশৈলী দেখতে পাওয়া যায়। ওড়িশায় গেলে এক রকম। দক্ষিণ ভারতে আর এক। উত্তর ভারতের সঙ্গে পশ্চিম ভারতের মন্দিরশৈলীতে কোনো মিল খুঁজে পাওয়াই যায় না। তফাৎ আছে আমাদের রাজ্যের মধ্যেও। বাঁকুড়া হোক কী দক্ষিণ ২৪ পরগণা, সব জায়গাতেই মন্দিরের গঠন আলাদা। জল্পেশেও তাই। মন্দিরের দিকে একবার তাকাতেই মনে হল এটা মন্দির নয়, বরং মিল রয়েছে মসজিদের সঙ্গে। মসজিদের যেমন গম্বুজ থাকে, এই মন্দিরেও সেই গম্বুজই। কিন্তু কী করে এমন হল। কিছুক্ষণ পর আমাদের এই কৌতূহলের জবাব দিলেন মন্দিরের পূজারি মশাই। তবে তার আগে মন্দিরের ইতিহাস সম্পর্কে একটু কিছু বলা যাক।  

jalpesh-boardনবম শতকে এই মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেন কামরূপের রাজা জল্পেশ্বর বর্মণ। দ্বাদশ শতকে কামরূপ আক্রমণের সময়ে মন্দিরটি ধ্বংস করেন বকতিয়ার খিলজি। বছর খানেক পর ভুটানরাজ মন্দিরটি পুনস্থাপন করলেও সেটি ক্রমে জঙ্গলের মধ্যে হারিয়ে যায়।

প্রায় চার শতক পর ১৬৬৫ সালে জঙ্গলের মধ্যে থেকে মন্দিরটি আবিষ্কার করেন কোচবিহারের রাজা প্রাণনারায়ণ। তিনি মন্দিরের কাজ শুরু করলেও তাঁর মৃত্যুর পর পুত্র মদননারায়ণ কাজ শেষ করেন। ১৮৯৭ সালে শিলং ভূমিকম্পের সময়ে প্রায় পুরো ধ্বংস হয়ে যায় মন্দিরটি। মন্দিরটি পুনর্গঠন করার জন্য তখন সরকারি সাহায্য পাওয়া যায়নি বলে নিজেদের মধ্যে টাকা তুলেই মন্দির নির্মাণ শুরু হয়। ১৯৪০ সালে এখনকার রূপ পায় জল্পেশ মন্দির।    

মন্দির যখন নির্মাণ হয়েছে তখন বেশির ভাগ কারিগরই ছিলেন মুসলমান সম্প্রদায়ের। সেই জন্যই জল্পেশ মন্দিরের এ রকম মসজিদশৈলী, জানালেন পূজারিমশাই। এখানকার শিব স্বয়ম্ভূ। বেশ কিছুটা হাত ভেতরে ঢুকিয়ে শিবলিঙ্গকে ছুঁতে পারলাম। পুজো দিয়ে বেরিয়ে এসে মন্দির প্রাঙ্গণটি ঘুরে দেখার পালা।

হাঁটতে হাঁটতে ফের চোখে পড়ল শ্বেতশুভ্র কাঞ্চনজঙ্ঘা। টুকরো মেঘের মাঝখানে এখনও উঁকি মারছে সে। সত্যি, এতটা আশা করিনি। আসলে উত্তরবঙ্গ এখানেই বাকি ভারতের থেকে আলাদা। আকাশ পরিষ্কার থাকলে দিগন্ত বিস্তৃত সমতলের মধ্যেও তাকে দেখা যাবেই।

কাঞ্চনজঙ্ঘাকে প্রণাম জানিয়ে মন্দির প্রাঙ্গণ থেকে রওনা হলাম।

আরও পড়ুন উত্তরবঙ্গের ডায়েরি ৪/ যাত্রাপ্রসাদে যাত্রাপালা

কী ভাবে যাবেন

জল্পেশের সব থেকে নিকটতম স্টেশন নিউ ময়নাগুড়ি। হাওড়া থেকে তিস্তা তোর্সা এক্সপ্রেস এবং কামরূপ এক্সপ্রেসে পৌঁছন নিউ ময়নাগুড়ি। এখান থেকে জল্পেশ মন্দির ৮ কিমি। এনজেপি থেকে জল্পেশ ৫৭ কিমি। জলপাইগুড়ি থেকে জল্পেশের দূরত্ব ২০ কিমি।

কোথায় থাকবেন

পর্যটকরা মূলত জলপাইগুড়ি, শিলিগুড়ি, লাটাগুড়ি থেকে এক দিনের সফরেই জল্পেশ ঘুরে যান। জল্পেশে রাত কাটানোর মতো তেমন ব্যবস্থা নেই। কাছের ময়নাগুড়িতে কিছু বেসরকারি হোটেল রয়েছে। জলপাইগুড়িতে রয়েছে অসংখ্য হোটেল। রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন উন্নয়ন নিগমের তিস্তা পর্যটক আবাস। অনলাইনে বুক করতে পারেন: www.wbtdc.gov.in।

বিজ্ঞাপন
loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here