sanjay-chakrabortyসঞ্জয় চক্রবর্তী

গ্রামের নাম তিংভং। কীসে যাব ? কেন ? এই তো ট্রেনে করে শিলিগুড়ি, সেখান থেকে যাত্রা শুরু। শাটল জিপ ধরে সিংথাম। ওখান থেকে আবার একটা শাটল। গন্তব্য মঙন (মোট পাঁচ ঘন্টা)। তার পর অপেক্ষা। ওখানে গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা ডুপডেন লেপচার। আমি, আপনি ওঁর বাড়ির অতিথি। আমরা যাচ্ছি জংগু। সিকিম তথা ভারতের একমাত্র সংরক্ষিত লেপচা অঞ্চল। ৪৫টা গ্রাম নিয়ে এই জংগু। যার একটায় আমরা থাকব। নাম তিংভং (আপার জংগু)। দুই জঙ্গু (আপার ও লোয়ার)। গাড়িতে ওঠার পর মিনিট চল্লিশের পথ। তার পর অপার বিস্ময়। গাড়ি এসে থামল এক বিশাল জলাশয়ের পাশে। কী ব্যাপার ? নদী ? হ্যাঁ…..

tingvong-3
ও পারে পাহাড়ে পৌঁছতে হবে মোটরচালিত র‍্যাফটিং বোটে। মিনিট তিনেক জল সফর। আমরা এখন অন্য পাহাড়ে, যদিও পুরোটাই জংগুর মধ্যে। হুম! এটাও আপার জংগু। তার ওপর দিকেই একটা গ্রাম। নাম তিংভং। তা কেন নদী পার ? উত্তাল কানাখা নদী বয়ে যেত দুই জংগুর মাঝ দিয়ে। ওপরে সাসপেনসন ব্রিজ। এই ছিল মাত্তর চার মাস আগের ভূগোল।

আরও পড়ুন: পুজোয় অদূর ভ্রমণ / ড্যাঞ্চিবাবুদের পশ্চিমে

১৩ অগস্ট ল্যান্ডস্লাইড, হ্যাঁ এই বছরেই। পাথর নয়, একটা গোটা পাহাড় নেমে এল নদীতে। ব্রিজ ধুলো হয়ে মিশে গেল (আরও জানতে গুগুল করুন: Dzongu Landslide)। হলিউড মুভি লজ্জা পাবে। চাইলে দিতে পারি। গ্রামের লোকের থেকে সংগ্রহ করেছি লাইভ ভিডিও। আরও বিস্ময় আছে। নিহতের সংখ্যা ০! গ্রামের লোকেরা সকাল থেকেই বুঝতে পারছিল। কিছু একটা ঘটবে। আর তাদের বিশ্বাসের কারণ, তাদের পাহাড় দেবতা!

tingvong-2
তো কী হল। দুই জংগু বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। ও পারের গাড়ি রয়ে গেল ও পারেই। নদী হয়ে গেল লেক। যদি পারেন লিখুন একটা স্ক্রিপ্ট। হোক একটা ফিল্ম। হাড় হিম করে দেখুক গোটা দুনিয়া! কিন্তু মানুষ থেমে থাকে না। ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট টিম নামিয়ে দিল র‍্যাফটিং বোট। প্রশিক্ষিত চালক। আমার আপনার জন্য লাইফ জ্যাকেট। বোটে করে আমরা এখন এ পারে। আবার গাড়ি সফর। মিনিট কুড়ির পথ।
ডুপডেনের বাড়ি। এখন সন্ধে ছ’টা। পথে আসতে আসতে দেখে নিয়েছি রামধনু আঁকা সূর্যাস্ত। আমরা এসে গেছি ডুপডেনের বাড়ি। ওর হোমস্টেতে থাকব পরের দু’দিন।

tingvong-7
তা কেন তিংভং ? নামটা পাওয়া মহামান্য ফেসবুক সূত্রে। তার পর কিছু খোঁজ ও বেরিয়ে পড়া। গ্রামটার একের তিন ভাগ ঘিরে রেখেছে পুরো কাঞ্চনজঙ্ঘা রেঞ্জ (কোকথাং থেকে সিনোলচু) । মাঝে মাউন্ট পান্ডিম দাঁড়িয়ে ঘাড় উঁচিয়ে। একের তিন ভাগ কাঞ্চনজঙ্ঘা রিজার্ভ ফরেস্ট। বাকিটা নাম-না-জানা পাহাড় ! তাতে অর্কিড, পাহাড়ি ফুল, প্রজাপতি ও অসংখ্য পাখি। গ্রামটাকে প্রকৃতি দিয়েছে ঢেলে। প্রধান আয় চাষবাস। সকাল থেকে রাত্তির অবধি যা খাবেন…ভাত, ডাল, আলু, পেয়াঁজ, লংকা, কপি, বেগুন, মুলো, পালং, লেবু, পেয়ারা, মাংস (শুয়োর, মুরগি), দুধ — সবই এই গ্রামেই চাষ ও ফার্মিং। আর রকমারি অর্গানিক ফুড। এমনকি দেশি পানীয় অবধি ভেষজ পদ্ধতিতে। প্রধান রোজগার এলাচ আর দারচিনি। অর্কিড ও প্রজাপতি বিশেষজ্ঞ যদি হন, তা হলে তো কথাই নেই। দু’দিন এমনি এমনি কেটে যাবে।

tingvong-6
পরের দিন অ্যালার্ম দেওয়া থাক ৫.১৫-য়। ৫ মিনিট গাড়িতে যেতে হবে। ৫.৩০ থেকে শুরু ম্যাজিক। শব্দ দিয়ে ধরা যায় না। তাই বাদ দিলাম। আর যদি এই কষ্টটা না সয়। তা হলে সরিয়ে দিন জানলার পর্দা। রাবড়ির স্বাদ দইয়ে মেটান। সেটাও জমাট, খারাপ না। দু-তিন দিন নিজের মতো ঘুরে বেড়ান। হাইকিং, ট্রেকিং…যা মন চায় করুন। ছোটোগুলো পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবে। হাঁটতে হাঁটতে দেখে আসুন, পাশের গ্রাম কুসং। গাড়ি করে, কয়েক কিলোমিটারের মধ্যে, লিংথেম, হেয়গ্যাথাং, পেনতং, থোলাং মনেস্ট্রি, লেপচা মিউজিয়াম, লিংজ্যা জলপ্রপাত। হাতে পায়ে ব্যথা। স্পা! চান করে নেবেন? আছে হটস্প্রিং।

tingvong-1

একটা লেপচা পরিবারের সঙ্গে দু-তিন দিন কাটালেন। ওদের রান্না শিখলেন, আপনি শেখালেন। ওদের স্কুল, উপাসনা দেখলেন, চি (দেশি পানীয়) খেলেন, ওদের সঙ্গীত শুনলেন। শাটার টিপতে-টিপতে আঙুলে ব্যথা করলেন…মুরগির ডাকে ঘুম থেকে উঠলেন। কম কী!! প্রকৃতির আগে কখন ভার্জিন শব্দটা জুড়ে যায়, জানবেন এই দু’দিনে। শুনে যেতে ইচ্ছে করছে বা স্ক্রিপ্টটা লিখতে। তা হলে লিখেই ফেলুন। শুরুটা আমি ধরিয়ে দিই! বাকিটা আপনার। ডুপডেন লেপচা। দুই পাহাড়ে দু’টো সংসার। চার ছেলে মেয়ে। মাঝে ভেঙে গেছে সেতু। নৌকা আসে যায়….গল্প এগোক…!!!

আরও পড়ুন: পশ্চিম সিকিম যখন লাল

খুব মন চাইলে আর চাপ না নিতে চাইলে যোগাযোগ করতে পারেন কলকাতার ‘ট্র্যাভেল অ্যান্ড বিয়ন্ড’-এর সঙ্গে। 9831030702।

বিজ্ঞাপন
loading...

1 মন্তব্য

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here