শীতকে থোড়াই কেয়ার, বাঙালি এখন ‘অল সিজন টুরিস্ট’

0
3842
bengali tourists
শ্রয়ণ সেন

“কিছু দিন আগে যখন এখানে ভারত-শ্রীলঙ্কার ম্যাচ হয়েছিল তখন ধৌলাধারে বরফই ছিল না।”

— বাবা-ছেলের কথোপকথন।

ধরমশালার স্টেডিয়ামে এই কথোপকথনে কিছুটা অবাকই হয়ে গিয়েছিলাম। আমরা ছাড়াও শীতে হিমাচলে বাঙালি বেড়াতে এসেছে। কিন্তু যত সময়ে এগোল বুঝলাম আমরা বা ওই পরিবার নয়, ধরমশালার স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে যত জন বসে রয়েছেন তার অন্তত পঞ্চাশ শতাংশই বাঙালি।

বিজ্ঞাপন

পনেরো দিন ধরে হিমাচলে ঘুরলাম। চণ্ডীগড় থেকে শুরু করে বিলাসপুর, পালমপুর ভ্রমণের পর ধরমশালাতে যখন পা রাখলাম, প্রথম বাঙালির দেখা পেলাম। তার পর যখন ধরমশালারও ওপরে নড্ডি এসে পৌঁছোলাম তখন নিজের চোখকেই বিশ্বাস করা যাচ্ছিল না। যে দিকে চোখ যাচ্ছে শুধু বাঙালিই বাঙালি।

ভ্রমণের জন্য পুজোর ছুটিটাই ছিল বাঙালির সেরা সময়ে। মুন্সিয়ারি হোক কী ধরমশালা, ডালহৌসি হোক কী শিমলা, রাস্তায় খালি বাঙালির শোরগোল ছাড়া আর কিছু শোনাই যেত না প্রায়। সেই ব্যাপারটাই এ বার ভরা শীতে।

অবশ্য এটাই প্রথম নয়। আমাদের সারথি মদনলাল শর্মা বলছিলেন, বছর দুয়েক হল শীতে বাঙালির ভ্রমণ বেড়ে গিয়েছে। বছর দুয়েক আগে পর্যন্ত শীতে কোনো বাঙালি পার্টি পেতেন না মদনলাল। ২০১৫-তে ডিসেম্বরে প্রথম বাঙালি পার্টি পেয়েছিলেন তিনি। এ বার তো পরপর বুকিং রয়েছে তাঁর। মদনলালের কথায়, “মার্চ পর্যন্ত কলকাতার পার্টি আমাকে বুক করে রেখেছে।”

কিন্তু এ রকম উলটপুরান হল কী ভাবে?

কথায় বলে বাঙালি নাকি শীতকাতুরে! সেই ‘শীতকাতুরে’ বাঙালি কী ভাবে দলে দলে হিমাচলমুখী, এই হাড় কাঁপানো ঠান্ডায়। এখানে বলে রাখা ভালো, হিমাচলের জনপ্রিয় টুরিস্ট স্পটগুলোয় এখনও বরফ না পড়লেও, তাপমাত্রা হিমাঙ্কের কাছাকাছি রয়েছে। তবুও বাঙালি ভ্রমণমুখী কী ভাবে?

macleodganj namgiyal monestry
ম্যাকলিয়ডগঞ্জের নামগিয়াল মনেস্ট্রিতে ভ্রমনার্থীর ঢল

এর একটা কারণ অবশ্য বলছিলেন রানাঘাটের দিবাকর সরকার। বৈষ্ণোদেবী, পাটনিটপ ঘুরে ডালহৌসি হয়ে তিনি পৌঁছেছিলেন ধরমশালায়। তাঁর কথায়, “আগে পুজোর ছুটিতে নিয়মিত বেরোতাম। কিন্তু এখন তো ছেলের স্কুলের ফাইনাল পরীক্ষা নভেম্বরের শেষে। তাই পুজোর ছুটিতে বেরোতে পারি না। সেই কারণেই ভ্রমণের সময় পালটে এখন শীতে বেরোচ্ছি।”

“শীতে কি কোনো কষ্ট হচ্ছে না?”

দিবাকরবাবুর জবাব, “ঠান্ডা তো বেশি বটেই, কিন্তু ঘরে বসে তো থাকতে পারব না। তাই ঠান্ডাকে জয় করতেই হবে।”

শুধু দিবাকরবাবুই নয়, বেহালার সৌমেন পাল হোক বা শিলিগুড়ির সোমনাথ ভট্টাচার্য, পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদের বদান্যতায় বেড়াতে চলে এসেছেন সকলেই।

তা হলে কী দাঁড়াল, স্কুলের শিক্ষাবর্ষ পালটে যাওয়াতেই বাঙালির ভ্রমণের চরিত্রে বদল?

না, শিক্ষাবর্ষ পালটে যাওয়া একটা কারণ হলেও, একমাত্র কারণ নয়। নড্ডিতে এসেই আলাপ হয়েছিল সঞ্চিতা চৌধুরীর সঙ্গে। তিনি এসেছেন সম্পূর্ণ প্রকৃতির টানে। ধরমশালা তথা সমগ্র কাংড়া উপত্যকার মূল আকর্ষণ ধৌলাধার। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এখন অক্টোবরে ধৌলাধারে কোনো বরফই দেখা যায় না। বরফ দেখতে হলে আসতে হবে ডিসেম্বর থেকে এপ্রিলের মধ্যে। ঠিক এই কারণেই এসেছেন সঞ্চিতাদেবী।

তাঁর কথায়, “এই যে তুষারধবল ধৌলাধারকে এখন দেখা যাচ্ছে, এটা কিন্তু পুজোর সময়ে দেখা যেত না।” সঞ্চিতাদেবীর কথার সুরই কিন্তু ফুটে উঠেছিল ধরমশালা স্টেডিয়ামে বাবা ছেলের কথোপকথনের মধ্যে দিয়ে। যেখানে ছেলে তার বাবাকে বলছিল ম্যাচের দিন পাহাড়ে বরফই ছিল না।

যুবক-যুবতী, তরুণ-তরুণী, প্রৌঢ়-প্রৌঢ়া, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা — বাঙালি ভ্রমণার্থীদের দলে কিন্তু সব বয়সের মানুষই রয়েছে। সুতরাং শীতকে কেউই বিশেষ পাত্তা দিচ্ছে না।

অগত্যা কী দাঁড়াল? এখান থেকে একটা জিনিসই প্রমাণিত হয়, বাঙালি এখন এক কথায় ‘অল সিজন টুরিস্ট’। গ্রীষ্ম হোক বা বর্ষা বা শীত, ভ্রমণপিপাসু বাঙালিকে এখন আর ঘরের চার দেওয়ালে বেঁধে রাখা যায় না।

বিজ্ঞাপন
loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here