দিঘা বার বার

0
622

sambhuশম্ভু সেন

এই নিয়ে কত বার দিঘা আসা হল তোমার ?

১২৭ বার।

যা! – ঋভু বিস্মিত।

না, আসলে এত বার দিঘা আসা হয়েছে যে গুনতির বাইরে চলে গেছে।

সি-হকের যে ঘরটা লনের সঙ্গে লাগোয়া হয়ে একটেরে, ছন্নছাড়া, সেই ঘরের বিছানায় শুয়ে শুয়ে খোশ গল্প করছি সকলে। এই ঘরটায় থাকলে মনে হয় সমুদ্রেই শয্যা পেতেছি। এরই সংলগ্ন সি-হকের পাঁচিল, তার পরেই সমুদ্রের গার্ড ওয়াল বরাবর বাঁধানো পথ। জোয়ার চলছে। বিশাল বিশাল ঢেউ গার্ড ওয়াল টপকে ভিজিয়ে দিচ্ছে রাস্তা। আর জলকণা অবিরাম ছিটকে চলে আসছে আমাদের ঘরে। তাই আমাদের ঘরে বালি কিরকির করছে, মেঝে ভিজে ভিজে।digha-5

এ যাত্রায় দিঘা এসেছি দুরন্তয়। ট্রেনেই মিলেছে দুপুরের খাওয়া। গরমের দুপুরে আপাতত বিশ্রাম আর আড্ডা। আবার নিষ্ক্রমণ বিকেলে।       

এই সুযোগে পুরনো দিনের দিঘার কথা শুনতে চেয়েছিল ঋভু।

এখানে আমার প্রথম আসা সত্তরের একেবারে গোড়ায়, তখনও স্কুলের গণ্ডি পেরোইনি। পাড়া থেকে এক দঙ্গল লোক নিয়ে, এক দিনের ঝটিতি সফরে। তখন আসতে হত খড়গপুর হয়ে। মাঝ রাতে বাস ছাড়ত খড়গপুর থেকে, সূর্য চোখ মেলার আগেই পৌঁছে যেত দিঘায়। সারা সকাল সমুদ্রে দাপিয়ে, মধ্যাহ্নভোজ সেরে ফের বাসযাত্রা। সন্ধেতে খড়গপুর, সেখান থেকে ট্রেনে হাওড়া। সৈকতাবাস তখন পাঁচ-ছ’ বছরের শিশু। সরকারি টুরিস্ট লজ বয়সে আরও ছোট। কিছু সরকারি বাংলো সবে তৈরি হয়েছে। আর ইতিউতি হোটেল গজিয়ে উঠছে। বাজার এলাকা ছাড়িয়ে গেলেই ঝাউবনের বিস্তার, যত দূর পথ যায়। সন্ধের পর ওই পথে যেতে রীতিমতো গা ছমছম করত।

দিঘা ক্রমশ ছড়াতে লাগল, তৈরি হল নিউ দিঘা। আসলে সৈকত তো ছিলই, বীরকূল গ্রামের ৭ কিলোমিটার দীর্ঘ সৈকত, এখানেই ছিল ওয়ারেন হেস্টিংসের গ্রীষ্মাবাস।  ১৭৮০-তে স্ত্রীকে লেখা এক চিঠিতে হেস্টিংস যাকে বলেছিলেন ‘ব্রাইটন অফ দ্য ইস্ট’। বিলিতি সাহেবরা মাঝেমাঝেই প্রশস্তি করেছেন বীরকূল তথা দিঘার। কিন্তু কাজের কাজ কিছু হয়নি। ১৯২৩-এ এই সৈকতভূমির রূপে মুগ্ধ হয়ে বেলাবাস শুরু করলেন জন ফ্রাঙ্ক স্নেইথ নামে এক ব্রিটিশ ব্যবসায়ী। চাপ দিলেন তৎকালীন সরকারকে দিঘার উন্নয়নের জন্য। কিন্তু এ বারও নিষ্ফল। অবশেষে স্বাধীনতার পর পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায়ের ছোঁয়ায় জন্ম হল সৈকতরানি দিঘার।digha-4

নিউ দিঘার অমরাবতী পার্কের উল্টো দিকেই আমাদের অফিসের হলিডে হোম। সৈকত থেকে বেশ কিছুটা দূরে, কিন্তু মাঝে ছিল বিস্তীর্ণ ঝাউবন। শুধুই ঝাউবন। হলিডে হোমের ছাদে দাঁড়ালে আমাদের নজর ঝাউবনের মাথা ছাপিয়ে চলে যেত সেখানে, যেখানে সবুজ সমুদ্র মিতালি করছে নীল আকাশের সঙ্গে। সেটা ছিল আশির দশকের গোড়া। তত দিনে ওল্ড দিঘা জমজমাট। এবং অল্প অল্প করে শুরু হয়েছে ভাঙন। আমরা তখন নির্জনতার খোঁজে পছন্দ করতাম নিউ দিঘা। হলিডে হোম থেকে ক্যাসুরিনার ছায়াপথ মাড়িয়ে ভোরেই চলে আসতাম নির্জন সৈকতে। শীতের দিনে সারা সকাল ব্যস্ত থাকতাম সমুদ্রের সঙ্গে আলাপচারিতায়। সমুদ্র তার ঢেউয়ের খেলা দেখাতে দেখাতে কখনও কখনও পিছিয়ে যেত বেশ দূরে, কখনও বা এগিয়ে এসে ভিজিয়ে দিত আচমকা। সমুদ্রস্নান করে হলিডে হোমে ফেরা। আবার বিকেলে সমুদ্র-দর্শন। পূর্ণ চাঁদের মায়াও জ্যোৎস্নারাতে টেনে আনত সৈকতে।

ঘনিষ্ঠ আলাপ হয়ে গেছিল নিউ দিঘার ভ্যানচালক উমাকান্ত গিরির সঙ্গে। তারই ভ্যানে চেপে আমরা হিলিদিল্লি ঘুরে বেড়াতাম। কখনও ওড়িশার সীমানা পেরিয়ে চন্দনেশ্বর-তালসারি, কখনও বা দিঘা মোহনা, শঙ্করপুর। শঙ্করপুরে তখনও মৎস্যবন্দর গড়ে ওঠেনি। নিউ দিঘা এলেই ডাক পড়ত উমাদার। আমাদের হলিডে হোমের ম্যানেজারের মাধ্যমে খবর চলে যেত উমাদার কাছে। আর উমাদাও ভ্যান নিয়ে হাজির। দিনকয়েক কাটিয়ে যখন বিদায় নিতাম, উমাদা আমাদের বাসে তুলে দিয়ে যেত, হাতে ধরিয়ে দিত তার খেতের কোনও সবজি।

মরশুমটা ইলিশের হলে উমাদা আমাদের অবশ্যই নিয়ে যেত দিঘা মোহনায়।  ইলিশের আড়ত সেখানে। সমুদ্রফেরত ট্রলারগুলো তাদের জালে ধরা পড়া রুপোলি সম্ভার এখানেই উজাড় করে দেয়। আমাদের চোখের তৃপ্তি হত বটে, কিন্তু ভয়ানক এক অতৃপ্তি নিয়ে ফিরে আসতে হত। কারণ সেই রুপোলি শস্য আমাদের নাগালের বাইরে, তাদের গন্তব্য যে কলকাতা। তবু উমাদার ভ্যানে সওয়ার হয়ে দিঘা মোহনায় আসা ছিল আমাদের নিত্যি রুটিন।digha-3

কালে কালে নিউ দিঘাও ওল্ড হয়ে গেল। আমাদের হলিডে হোমও সমুদ্র থেকে অনেক পিছিয়ে গেল। আসলে হলিডে হোম আর সমুদ্রের মাঝে যে ঝাউবনের জঙ্গল ছিল তা একেবারে সাফ হয়ে গেল। যত্রতত্র গড়ে উঠল হোটেল, নানা কিসিমের। সে সব হোটেলের ঘর থেকে সমুদ্র দেখার হাতছানি হাজারে হাজারে টেনে আনল পর্যটক। সমুদ্রসৈকতে যাওয়ার রাস্তাটা বাজার, খাওয়ার হোটেল, সামুদ্রিক পণ্যের পসরা সাজানো দোকানপাটে ঘিঞ্জি হয়ে উঠল। নির্জনতা হারিয়ে নিউ দিঘা হয়ে উঠল টুরিস্টি। ক্যাসুরিনার চাঁদোয়া মাথায় নিয়ে হলিডে হোম থেকে সৈকতে আসার আনন্দ উধাও হয়ে গেল। আমরাও মায়া কাটালাম নিউ দিঘার।

কথায় বলে না, ‘ওল্ড ইজ গোল্ড’! আমরাও তাই ফিরে এলাম সেই ওল্ডে। কলকাতা থেকে সড়কপথে দিঘা গেলে ঠিক যে জায়গাটায় চোখের সামনে সমুদ্র ভেসে ওঠে, সেখান থেকে বাঁ দিকে গেলে ব্যারিস্টার কলোনির পথ। এখানেই একেবারে সমুদ্রের ধারে সৈকতবাস আর একটু এগোলেই হোটেল সি হক। রয়েছে আরও কিছু হোটেল। দিঘার ভিড়ভাট্টা এড়িয়ে একটু নিরিবিলিতে নিখাদ বিশ্রাম এবং ঘর থেকে সমুদ্রদর্শন করতে হলে এই ব্যারিস্টার কলোনির আবাসগুলো ভরসা।digha-1

সি হকের পিছনের গেট দিয়ে বেরিয়ে বাঁ দিকে সমুদ্রের ধার বরাবর বাঁধানো পথ ধরে গুটি গুটি পায়ে খানিকটা এগিয়ে গেলে পাওয়া যায় সেই পঞ্চাশ বছর আগেকার নির্জনতা। এখানে একটা এক টুকরো সৈকত। দিব্যি রয়েছে মানুষের ভিড়ভাট্টার আড়ালে।digha-2

আর মেলা মানুষের মেলা দেখতে হলে চলুন ডান দিকে। ঢেউ ভেঙে পড়ছে বাঁধানো পথের গায়ে। তেমন বড়োসড়ো দু-একটা ঢেউ ভিজিয়েও দিতে পারে। আর এই পথের ওপরেই বসেছে জিভে-জল-আনা নানা খাবারের পসরা। দিঘার বিখ্যাত মাছভাজা তো আছেই।

প্রস্তাবটা দিয়েছিল ঋভুই – “আরেকবার ঘুরে এলে হয় না, সেই অমরাবতী পার্ক, সায়েন্স সিটি, মেরিন অ্যাকোয়ারিয়াম আর ভেষজ উদ্যান।”

“তা হলে কালকের প্রোগ্রাম এটাই রইল” — আমি সম্মতি দিলাম।

আচ্ছা, গোপাল সুঁই আছেন ? ভেষজ উদ্যান দেখভালের দায়িত্বে থাকা বন দফতরের সেই কর্মী, দশ বছর আগে যিনি একটি একটি করে ১৮০ রকম প্রজাতির ওষধি বৃক্ষের সঙ্গে আমাদের আলাপ করিয়ে দিয়েছিলেন আর আপশোশ করেছিলেন তাঁর যত্নে গড়া এই উদ্যানটি কেউ দেখতে আসে না বলে।

কী ভাবে যাবেন

হাওড়া/সাঁতরাগাছি থেকে ট্রেনে দিঘা। মালদা, নিউ জলপাইগুড়ি, পুরী, বিশাখাপতনম থেকেও ট্রেন আসে দিঘায়। কলকাতার এসপ্ল্যানেড-সহ বিভিন্ন জায়গা, হাওড়া এবং রাজ্যের বিভিন্ন শহর থেকে বাস। গাড়ির পথ কোনা এক্সপ্রেসওয়ে, জাতীয় সড়ক ৬ ধরে মেচেদা, তার পর হলদিয়াগামী সড়ক ধরে নন্দকুমার, তার পর নরঘাট, নাচিন্দা, কাঁথি বাইপাস, রামনগর হয়ে।

কোথায় থাকবেন

দিঘা-শঙ্করপুর ডেভেলপমেন্ট অথরিটি পরিচালিত সৈকতাবাস। যোগাযোগ : ০৩২২০-২৬৬২৫৪। পশ্চিমবঙ্গ পর্যটনের টুরিস্ট লজ। যোগাযোগ :  ০৩২২০-২৬৬২৫৫, ৯৭৩২৫১০১৩৪, কলকাতা বুকিং : ৩/২ বিবিডি বাগ (পূর্ব), কলকাতা ৭০০০০১, ফোন ০৩৩-২২৪৮৮২৭১। অথবা অনলাইন বুকিং : www.wbtdc.gov.in  এ ছাড়া দিঘায় নানা মানের নানা দামের অসংখ্য বেসরকারি হোটেল আছে। গুগুলে ‘incredible india, where to stay, digha’  সার্চ করলে দিঘার বিভিন্ন বেসরকারি হোটেলের যোগাযোগের ঠিকানা ও ফোন নম্বর পাওয়া যায়।

বিজ্ঞাপন
loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here