moitryমৈত্রী মজুমদার

কানহা ন্যাশনাল পার্ক। মধ্যপ্রদেশের বালাঘাট আর মান্ডলা, এই দুটি জেলা মিলিয়ে এর অবস্থান। মান্ডলা সদর শহর থেকে প্রায় ৬৫ কিমি দূরে সাতপুরা পর্বতমালার পশ্চিমের এই অরণ্য ১৯৩০ সালে প্রথম স্যাংচুয়ারির মর্যাদা পায়। তখন এই অঞ্চলের প্রধান দুই নদী হাঁলো আর বানজার-এর নামানুসারে এর ৯৪০ বর্গ কিমি-র কোর এরিয়া দু’ ভাগে বিভক্ত ছিল। ১৯৫৫ সালের ১ জুন থেকে এটি ন্যাশনাল পার্কের মর্যাদা পায়। পুরো অঞ্চলটিকে ৩টি রেঞ্জে ভাগ করা হয়। কানহা, কিসলি এবং মুক্কি। ইদানীং কালে অবশ্য আরও একটি রেঞ্জ যুক্ত হয়েছে, সেরাই।

কানহা এবং কিসলি রেঞ্জে ঢোকার প্রবেশদ্বার কিসলি গেট মান্ডলার খাটিয়া গ্রামে। অন্য দু’টি রেঞ্জের জন্য মুক্কি আর সেরাই – দু’টি আলাদা গেট আছে। এখানে পৌঁছনোর রাস্তাও আলাদা আলাদা। এই অরণ্য অঞ্চলের প্রধান দু’টি জনজাতি গোন্ড আর বাইগা।

যারা বুদ্ধদেব গুহ-র মাধুকরী উপন্যাসটি পড়েছেন, তাঁদের কাছে এই অঞ্চলের অরণ্য আর আরণ্যক জনজীবনের পরিষ্কার ছবি আছে। এ ছাড়াও যে দু’টি অনুষঙ্গ এই জায়গাটির আপাদমস্তকে ওতপ্রোত ভাবে মিশে আছে তা হল, রুডইয়ার্ড কিপলিং-এর ‘জাংগল বুক’-এর মংলির কাহিনির প্রেক্ষাপট আর বাল্মীকি রচিত রামায়ণের প্রেক্ষাপট।

গত কাল এখানে এসে থেকে আজ পর্যন্ত চোখে দেখা দৃশ্যাবলি আর মনের গহনে থাকা এই সব কথা কাহিনি মিলেমিশে একাকার হয়ে যেন কোন অজানা নেশায় বুঁদ করে রেখেছে। সে নেশা মহুয়ার নেশার থেকেও গহীন।

গত কাল বাঘ দেখার উত্তেজনায় এই জায়গার অন্য কোনও কথাই বলা হয়ে ওঠেনি। কিন্তু আজ সক্কাল সক্কাল জঙ্গলে ঢুকেই আবার এই সব কথা মনের মধ্যে ভিড় করে আসছিল।

আজকের সাফারি কানহা রেঞ্জে। দিনের আলো অল্প অল্প ফোটার সাথে সাথেই আমাদের যাত্রা শুরু। ভোর ৫টায় রিপোর্টিং টাইম। ভোরবেলা ঘর থেকে বেরোতেই হিমেল হাওয়ার ঝলক। ৪৯-৫০ ডিগ্রি গরমের কানহা পার্কের সকাল হয় হাড় হিম করা ঠান্ডায়। এই পাথুরে মালভূমি অঞ্চলের প্রকৃতি এমনটাই। শুধু জঙ্গল থাকার কারণে এখানে ঠান্ডাটা একটু বেশি। খোলা জিপের হিমেল হাওয়ায় রীতিমতো কাঁপতে কাঁপতেই আমাদের জঙ্গল-যাত্রা শুরু।

বাঘের দর্শন কাল মিলে গেছে, তাই আজ আমাদের সে রকম চাপ নেই। শুধু মনের ইচ্ছা এই সুযোগে যদি চিতাবাঘ আর ভল্লুকের দেখা পাই। যদিও আমাদের মন-মেজাজ কালকের অভিজ্ঞতায় যাকে বলে সম্পৃক্ত। তাই আজ যা যা আশেপাশে দেখতে পাচ্ছিলাম, দু’ চোখ ভরে সঞ্চয়ের ঘরে তুলে রাখছিলাম।

ঘন সবুজ শাল আর নানা জাতের ডেসিডুয়াস গাছের জঙ্গল, ছোট ছোট টিলা, ঢালু জমিতে বাঁশঝাড়, উন্মুক্ত ঘাসজমির খোলা মাঠ, নালা আর অনেকগুলি তাল বা লেক। এই নিয়েই কানহার জঙ্গল।

কানহা ন্যাশনাল পার্ক বাঘ ছাড়াও যেটার জন্য বিখ্যাত তা হল ‘বারাশিঙা’ হরিণ। এরা লুপ্তপ্রায়। আর কানহা ছাড়া ভারতের কোথাও পাওয়া যায় না। বন দফতর তাই এদের বংশবৃদ্ধির জন্য জঙ্গলের একটি অঞ্চলে ফেনসিং দিয়ে বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছে। এর সঙ্গে কৃষ্ণসার হরিণ, যেটি লুপ্তই হয়েছিল, আবার নতুন করে একই উপায়ে সংরক্ষণের চেষ্টা চলছে।

এ ছাড়া যা যা সহজেই চোখে পড়ে, তা হল চিতল, সম্বর হরিণের দল, গায়ে সাদা দাগওয়ালা কালো বড়সড় ইন্ডিয়ান গোর। লোকে এদের বাইসন বলে ভুলও করে থাকে। কালোমুখো হনুমান বা লেঙুর, সারা জঙ্গলে যাদের পপুলেশন সত্যিই উল্লেখযোগ্য।

আচ্ছা, রবীন্দ্রনাথের বর্ষার সেই গানটা মনে পড়ে, ‘হৃদয় আমার নাচেরে আজিকে…’?  আরে না না। আমাদের হৃদয়ের অবস্থা বর্ণনা করার জন্য বলছি না, বলছি ময়ূরের নাচের কথা। ময়ূরের নাচ দেখার জন্য ঈশানকোণে মেঘের অপেক্ষা করার দরকার নেই কানহায়। আজ সকাল থেকে পেখম-তোলা ময়ূর ছাড়া আর একটা ময়ূরও দেখিনি মশাই। আপনারাই ভাবুন ঘন সবুজ উন্মুক্ত ঘাসজমি, পিছনে ঘন সবুজ বড় বড় শাল গাছের ব্যাক ড্রপে এক সঙ্গে ৭-৮টা ময়ূর পেখম তুলে নৃত্যরতা।kanh2

হ্যাঁ, এই দৃশ্য কিন্তু কানহার ‘মেডো’-য় অবশ্যম্ভাবী এক দৃশ্য। গার্ডের কাছে জানতে পারলাম ময়ূর, হরিণ আর লেঙুর-এরা জঙ্গলে এক সঙ্গেই থাকে এবং বাঘ ইত্যাদি হিংস্র জানোয়ারের উপস্থিতি বুঝলে একে অন্যকে ইশারা করে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে। ভাবুন কী কমিউনিটি স্পিরিট।

আজ অবশ্য এখনও আমাদের কপালে বাঘা বা স্বজাতীয়দের দর্শন মেলেনি। তবে যা মিলেছে, তা-ই বা কম কী। বিভিন্ন পাখির মাঝে দেখা পেলাম ইন্ডিয়ান রোলার বার্ড, যাকে আমরা নীলকণ্ঠ পাখি বলি।  দুর্গাষষ্ঠীর দিনে যে পাখিকে আকাশে ওড়ানোর প্রথা আছে, শিবের কাছে মায়ের পৌঁছনো সংবাদ দেওয়ার জন্য।

এ ছাড়া এখানে পাবেন বন্য কুকুর, যাকে স্থানীয় ভাষায় ‘ঢোল’ বলা হয়। অত্যন্ত হিংস্র প্রজাতি। এ ছাড়া বন্য বরাহ, বন্য মুরগি, বাচ্চা-সহ শিয়ালের গোটা পরিবার, কানহার ঘন জঙ্গল আর সবুজ ঘাসে ঢাকা মেডো-তে এদের অজস্র বার দেখতে পাবেন। সাপও আছে তবে অনেক রাতের বেলা বেরোয়।

এ সব দেখছি আর সমৃদ্ধ হচ্ছি আর জঙ্গলের ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে ভাবছি, সূয্যিমামা কখন প্রকট হয়। এরই মধ্যে জিপ এসে থামল একটি বাংলো ধরনের জায়গায়। এখানে ব্রেকফাস্ট আর চা-এর ব্রেক। ট্যুরিস্টরা নিজেদের হোটেল থেকে খাবার সঙ্গে করে এনেও এখানে খেতে পারেন। ‘জঙ্গলে জলখাবার’ ! এ এক অনন্য অনুভূতি।

(আগামি সংখ্যায় সমাপ্য)

ছবি: লেখক ও রঞ্জনা ঘোষাল

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here