damien syed
anirban chaudhury
অনির্বাণ চৌধুরী

এ বাংলায় তিনিই ফ্রান্সের প্রতিভূ। আশ্চর্য কী, তাঁর নামের সঙ্গে জুড়ে গিয়েছে ফ্রান্স ইন কলকাতা হ্যাশট্যাগ। আসন্ন ৪২তম আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলার প্রথম সাংবাদিক বৈঠকে স্বাভাবিক ভাবেই ভারত-ফ্রান্সের সৌহার্দ্য নিয়ে সরব হলেন তিনি, ফরাসি কনসাল জেনারেল দ্যামিয়েন সইদ। পাশাপাশি বৈঠক শেষে খবর অনলাইন-কে অন্তরঙ্গ কথোপকথনে জানালেন বইমেলার প্রস্তুতি ও ভবিষ্যত পরিকল্পনার বিশদ কথা।

২০১৫ সাল থেকে আপনি বাংলায় ফরাসি সরকারের প্রতিনিধি। কেমন কাটছে সময়টা?

সইদ: বেশ ভালো। আজকের সাংবাদিক বৈঠকে শুনলাম ফ্রান্সকে ইউরোপের শিক্ষা-সংস্কৃতির পীঠস্থান বলে উল্লেখ করা হল। কিন্তু এই সাংস্কৃতিক গভীরতার দিক থেকে বাংলাই বা কম কীসে? সাহিত্য বলুন, ছবি বলুন, জীবনযাত্রা বলুন – বাংলার সব কিছুতেই আমি সমৃদ্ধ এক মননশীলতার পরিচয় পেয়েছি। এবং সেটা শুধু এখানে এসেই নয়। বাংলার সাংস্কৃতিক দিকের সঙ্গে ফরাসি দেশ অনেক দিন ধরেই অবগত। বিশেষ করে সত্যজিৎ রায়ের কথা প্রায় প্রত্যেক ফরাসিই জানেন। তাঁর ছবি নিয়ে মাঝে মাঝেই ফ্রান্সে রেট্রোস্পেকটিভ হয়। ফ্রান্সের ফিল্ম স্টাডিজেও সত্যজিৎ রায় খুব গুরুত্বপূর্ণ এক নাম।

নিশ্চয়ই! তবে আইফেল টাওয়ার দিয়েও কিন্তু দুই দেশ এখন খুব কাছাকাছি চলে এসেছে। এই শহরেও তো একটা আইফেল টাওয়ার আছে!

সইদ: (হেসে ফেলে) আলবাত! আপনি ইকো পার্কের রেপ্লিকার কথা বলছেন তো?

হ্যাঁ।

সইদ: সত্যি বলতে কী, এ রকম আন্তরিকতা খুব কম দেশে দেখতে পাওয়া যায়। প্যারিস হানার পরে যখন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্যোগে ইকো পার্কে আইফেল টাওয়ারের প্রতিমূর্তির কাজ শুরু হল, আমি নিজে তার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলাম। পৃথিবীর আর কোনো দেশই কিন্তু প্যারিস হানায় নিহত মানুষদের জন্য এতটা আন্তরিক হয়ে উঠতে পারেননি। বিশ্বের কাছে এ বাংলার এক নজির!

নজির তো আরও একটা আছে। ১৯৯৭ সালের পর থেকে এই নিয়ে তিনবার ফ্রান্স আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলায় ফোকাল থিম কান্ট্রি হিসেবে উপস্থিত থাকছে…

সইদ: নিঃসন্দেহে এ এক বিরল সম্মান! কেন না, কলকাতা বইমেলা  এশিয়ার বেশ বড়োসড়ো এক অনুষ্ঠান। বিশ্বের নিরিখেও তার গুরুত্ব কম নয়। পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে মানুষ আসেন এই বইমেলায়। সাংস্কৃতিক ভাববিনিময় হয়। এ রকম এক অনুষ্ঠানে ফ্রান্স নিজের কথা বলার সুযোগ পাচ্ছে। ফ্রান্স কী ভাবছে সাহিত্য নিয়ে, তা পৌঁছে দিতে পারছে বইপ্রেমীদের কাছে। এর চেয়ে ভালো মাধ্যম আর কী হতে পারে? তবে একটা কথা বলা জরুরি। ফ্রান্স তার সাহিত্যকে এ বারের বইমেলায় তুলে ধরার পাশাপাশি ডিজিটাল বইয়ের প্ল্যাটফর্মটাও পোক্ত করতে চাইছে। এখন তো অনেকেই ডিজিটালি বই পড়েন। তা ছাড়া কাগজ তৈরির প্রসঙ্গে প্রকৃতি সংরক্ষণের দিকটাও উপেক্ষা করার মতো নয়। ফলে আমরা এ বারের মেলায় ভাগ নেওয়ার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি! আশা করছি, বাংলার প্রত্যাশা আমরা পূরণ করতে পারব। এটুকু বলতে পারি, এ বারে ফ্রান্সের প্যাভিলিয়ন সবাইকে চমকে দেবেই!

মানে, প্যাভিলিয়নের গঠনগত দিক এবং অন্দরসজ্জায় মিলিয়ে একটা চমক থাকছে?

সইদ: একদম! বলতে পারেন, এ বারে ফ্রান্সের প্যাভিলিয়নে বিস্ময়ের চাবিকাঠি হল সৃজনশীলতা। আমরা ফ্রান্সের আধুনিক রূপটা তো বটেই, বিশেষ করে ইন্দো-ফরাসি সৌহার্দ্যের আধুনিক দিকটা এ বারের প্যাভিলিয়নে তুলে ধরতে চলেছি।

বিশেষ করে আধুনিক দিকটাই বা কেন?

সইদ: আসলে আধুনিক ফ্রান্স সম্পর্কে এ দেশের মানুষ বিশেষ অবগত নন। বিশেষ করে ফ্রান্সের আধুনিক সাহিত্য নিয়ে। কিছু মনে করবেন না, বিদেশি সাহিত্যের প্রসঙ্গ উঠলেই এ দেশের আগে মনে পড়ে অ্যাংলো-স্যাক্সন বা ইংরেজি সাহিত্যের কথা। কিন্তু এর বাইরেও সাহিত্যের একটা সমৃদ্ধি রয়েছে। সেই জন্যই এই প্রচেষ্টা। দেখবেন, আধুনিক ফ্রান্সের এই ঝলক-দর্শন বইমেলায় আসা মানুষকে হতাশ করবে না। আমার বিশ্বাস, তার সঙ্গে দুই দেশের মৈত্রীও আরও দৃঢ় হবে।

অবশ্যই! পাবলিশার্স অ্যান্ড বুকসেলার্স গিল্ড এবারের বইমেলা নিয়ে পরিকল্পনার কথা প্রথম সাংবাদিক বৈঠকে বিশদে যদিও বলছেন না, তবু আপনি কি ফ্রান্সের প্যাভিলিয়নের অন্দরসাজ নিয়ে বিশদে একটু বলবেন?

সইদ: নিশ্চয়ই! ৪০০০ বর্গফুটের এই প্যাভিলিয়নে এ বার আমরা অগমেন্টেড রিয়্যালিটিকে তুলে ধরতে চাই। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের সাহায্যে সম্পূর্ণ এক দুনিয়া তৈরি হবে প্যাভিলিয়নের ভিতরে। গভীর সাংস্কৃতিকবোধকে ছুঁয়ে থাকবে যা। বুঝতেই পারছেন, আধুনিক শহুরে স্থাপত্যকেই এ ব্যাপারে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি, এর উচ্চতাও হবে নজরকাড়া – পাক্কা ৯ মিটার! ভারত আর ফ্রান্সের সম্পর্কের অতীত, বর্তমান, ভবিয্যত – পুরোটাই ঠাঁই পাবে এই প্যাভিলিয়নে, যাকে আমরা তিন ভাগে ভেঙেছি। এই তিন ভাগ হল নবরূপায়ণ, সৃজনশীলতা আর সৌহার্দ্য। শিল্প, বাণিজ্য, কারুকৃতি – কোনো কিছুই বাদ যাবে না এই তালিকা থেকে। ডিজিটাল ফ্রান্সের এই রূপ এর আগে বড় একটা নজরে আসেনি।

আর বইয়ের অনুবাদ? সরাসরি ফরাসি ভাষায় সাহিত্যের রসাস্বাদন তো সবাই করতে পারবেন না। সে ব্যাপারে কী ভাবছে ফ্রান্স?

সইদ: কেন? বইয়ের অনুবাদ নিয়ে তো অনেক দিন ধরেই কাজ করছি আমরা। সে যেমন বাংলা থেকে ফ্রেঞ্চ, তেমনই ফ্রেঞ্চ থেকে বাংলাতেও। ভবিষ্যতে তার পরিমাণ বাড়বে বই কমবে না। তবে হ্যাঁ, এ ব্যাপারে কিছু অসুবিধা আছে বই-কি!

কী রকম?

সইদ: দেখুন, বিখ্যাত ভারতীয় লেখকরা আজকাল আর অনেকেই নিজের মাতৃভাষায় লেখেন না। ইংরেজিই হয়ে উঠছে তাঁদের লেখার ভাষা। সে ক্ষেত্রে অনুবাদকের যোগ্যতা নিয়ে একটা প্রশ্নচিহ্ন তৈরি হচ্ছে। বলতে দ্বিধা নেই, এ রকম চলতে থাকলে ভারতের অনেক ভাষাই, বিশেষ করে বাংলা মৃত ভাষায় পরিণত হবে।

আনকোরা লেখকদের যোগ্যতা পরীক্ষা করে দেখছেন না কেন?

সইদ: সে ক্ষেত্রে অসুবিধা আরও বেশি। আমরা যে হেতু পয়সা খরচ করিয়ে কাজটা করাচ্ছি, সেই জন্যই খুব বেশি ঝুঁকি নিতে পারছি না। অনুবাদকের অন্তত দু-তিনটে বই প্রকাশিত হতেই হবে। আমরা সে ক্ষেত্রে তাঁর পাঠকের সংখ্যা বিচারের সুযোগ পাব। সেইমতো তাঁর যোগ্যতার কিছুটা আঁচ পাওয়া যাবে। কিন্তু আনকোরাদের ক্ষেত্রে তো আর তা সম্ভব নয়!

আর চন্দননগর? বাংলার এই ফরাসি উপনিবেশ থেকে ফরাসি সংস্কৃতির চিহ্ন তো প্রায় মুছে যেতে বসেছে…

সইদ: হ্যাঁ, আমি নিজেও চন্দননগর ঘুরে ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছি। এবং ফরাসি সরকার এই সংস্কৃতি রক্ষণাবেক্ষণে নিশ্চেষ্ট হয়ে থাকবে না। আমরা ইতিমধ্যেই ওখানকার নানা হেরিটেজ বাড়িকে সংস্কারের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। বিশেষ করে রেজিস্ট্রি অফিসের। যা কথা হয়েছে, তাতে ওই বাড়িটা ঢেলে সাজতে ২ কোটি মতো খরচ হবে। তার পর সেখানে একটা কাফে হতে পারে বা হেরিটেজ হোটেল! দেখা যাক! এ নিয়ে সরকারি স্তরে কথাবার্তা চলছে।

(ছবি ফেসবুক থেকে সংগৃহীত)

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here