christmas

ওয়েবডেস্ক: ২৫ ডিসেম্বর নয়। বড়োদিনের আসল তারিখ ৭ জানুয়ারি!

সে কী! এত দিন তা হলে আমরা ভুল জানতাম?

অন্তত সে রকমটাই দাবি পৃথিবীর বেশ কিছু দেশের। রাশিয়া, কাজাখস্তান, সার্বিয়া, ইউক্রেন, ইজিপ্ট, ইথিওপিয়া – সবাই বলছে জোর গলায় – বড়োদিন পালিত হওয়া উচিত ৭ জানুয়ারি। সঙ্গে দাবি করছে দেশগুলো, ২৫ ডিসেম্বর নয়, যিশু খ্রিস্টের জন্ম হয়েছিল আসলে ৭ জানুয়ারি। এবং শুধু দাবি করেই ক্ষান্ত থাকছে না তারা। ২৫ ডিসেম্বরের বদলে ৭ জানুয়ারি পালন করছে ঈশ্বরের পুত্রের জন্মোৎসব। তা-ও আবার জাঁকজমক করেই!

christmas

ব্যাপারটা কী?

গোলমালের সূত্রপাত আসলে ক্যালেন্ডারের পাতায়। পৃথিবীর এই সবক’টি দেশ, যারা জানুয়ারির সপ্তম দিনে যিশুর জন্মদিন পালনের পক্ষপাতী, অনুসরণ করে থাকে শতাব্দীপ্রাচীন জুলিয়ান ক্যালেন্ডার। কট্টরপন্থী গির্জার মতে, এই ক্যালেন্ডারই একমাত্র সঠিক ভাবে জানায় প্রভু যিশুর জন্মের তারিখটি। পরবর্তীকালে এই ক্যালেন্ডারকে সংশোধন করেই জন্ম নেয় অধুনা প্রচলিত গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার। আর তার সঙ্গেই বদলে যায় যিশুর জন্মতারিখও। ফলে, রক্ষণশীল গির্জার অনুগামী এই দেশগুলো গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারকে পাত্তা দেয় না।

এক এক করে দেখে নেওয়া যাক, জন্মতারিখে বদল ছাড়া আর কী কী পরিবর্তন ধরা পড়ে ৭ জানুয়ারির বড়োদিনে!

রাশিয়া:

christmas

সত্যি বলতে কী, এক সময়ে রাশিয়ায় বড়োদিন পালন বন্ধই হয়ে গিয়েছিল। ধর্মবিরোধী সোভিয়েত ইউনিয়নে সেই অনুমতি ছিল না। ফলে ১৯২৯ সালে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল রাশিয়ায় যিশুর জন্মদিন পালন। হোক না সে ৭ জানুয়ারি! এমনকি, ১৯৩১ সাল পর্যন্ত বন্ধ ছিল খ্রিস্টমাস ট্রি-র ব্যবহারও! পরে ১৯৯১ সালে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।

christmas

যদিও রাশিয়ার বড়োদিন পালন অনেকটাই অন্য রকম। পালনের তারিখ যেমন আলাদা, তেমনই আলাদা আচার-অনুষ্ঠানও। যেমন, এই দেশে চিরাচরিত সান্তা ক্লজকে খুঁজে পাওয়া যাবে না। বদলে দেখা মিলবে তুষার-বুড়ো আর তার সুন্দরী ভাইঝির। রাশিয়ায় তারাই নিয়ে আসে শিশুদের জন্য উপহার।

তেমনই রাশিয়ার বড়োদিনে বিখ্যাত খ্রিস্টমাস রোস্টের ঠাঁই নেই! খ্রিস্টমাস ইভ, অর্থাৎ বড়োদিনের আগের সাঁঝে, ৬ জানুয়ারি পুরোপুরি নিরামিষ ভক্ষণ করেন রাশানরা। পাত আলো করে থাকে বিটের স্যুপ, নিরামিষ পাই, পরিজ আর সালাদ। এ ছাড়া ফল শুকিয়ে তৈরি হয় ‘জাভার’ নামের এক মিষ্টি সরবত। এ সব খেয়ে-দেয়ে, শুদ্ধ মতে ৭ জানুয়ারি গির্জায় উপাসনা শেষ হলে তবেই মাংস খাওয়ার অনুমতি মেলে। যদিও বেশির ভাগ পরিবারই সেই অনুমতির দুর্ব্যবহার করে না। নিরামিষেই হাসিমুখে পালন করে বড়োদিন।

christmas

তেমনই হালফলে জনপ্রিয় হলেও রাশিয়ার বড়োদিনের সজ্জায় খ্রিস্টমাস ট্রি-র বদলে চোখে পড়ে মনোরম সব বরফ দিয়ে তৈরি ভাস্কর্য। যা ঝলমল করে ওঠে অপূর্ব আলোকসজ্জার সঙ্গতে।

কাজাখস্তান, সার্বিয়া, ইউক্রেন – এ সব জায়গাতেও বড়োদিন পালনের ছবিটা অনেকটা রাশিয়ার মতোই! শীতের তুষারশুভ্র অনুষঙ্গে এই সব দেশেও বরফের ভাস্কর্য আর আলোকসজ্জার প্রাধান্য চোখে পড়ে। আর দেখা যায় তুষার-বুড়ো আর তার ভাইঝিকে।

ইজিপ্ট:

christmas

সমীক্ষা বলছে, ইজিপ্টের জনসংখ্যার ১৫% খ্রিস্টান। যদিও মুসলিম-প্রধান এই দেশের বড়োদিনে ছায়া পড়েছে রোজা-পালনের। অনেকটা সেই আদলেই বড়োদিনের আগের ৪৩ দিন, অর্থাৎ ২৫ নভেম্বর থেকে ৬ জানুয়ারি পর্যন্ত দিনের বেলায় উপবাস পালন করা হয়। তাকে বলা হয় ‘হোলি নেটিভিটি ফাস্ট’। আর রাতে? তখন উপবাস ভাঙলেও আমিষ খাবার নৈব নৈব চ! এমনকি, দুধ যে হেতু প্রাণীর শরীর থেকে নিঃসৃত হয়, সেই জন্য ইজিপ্টের এই বড়োদিনের উপবাসে তা-ও গ্রহণ করা হয় না। জোর দেওয়া হয় শাকসবজি, ফলমূলেই!

এর পর খ্রিস্টমাস ইভে, মানে ৬ জানুয়ারি রাত ১০টার পর থেকে একে একে সবাই সমবেত হতে থাকেন গির্জায়। সেখানে চলে স্বেচ্ছাশ্রমের পালা। ভোর রাতে বাড়ি ফিরে, ফের সকাল সকাল শুরু হয় গির্জায় উপাসনা। তার পর বাড়ি ফিরে এসে সবাই মন দেন আমিষ ভোজনে। সেই ভোজে ডিম, দুধ আর মাংস ছাড়া কিছুই থাকে না! এ ছাড়া বিশেষ করে বানানো হয় ‘ফাটা’ নামের এক স্যুপ। সিদ্ধ ভেড়ার মাংস, রুটি, ভাত, রসুন কুচি মিলিয়ে তৈরি হয় ‘ফাটা’!

christmas

আর হ্যাঁ, ইজিপ্টেও সান্তা ক্লজের অস্তিত্ব নেই। সেখানে শিশুদের জন্য ‘কাহক’ নামের এক মিষ্টি বিস্কুট ঝোলায় করে নিয়ে আসেন ‘বাবা নোয়েল’!

ইথিওপিয়া:

christmas

ইথিওপিয়ার বড়োদিনের আচার-অনুষ্ঠান অনেকটা ইজিপ্টের মতোই! সেখানেও বড়োদিনের আগে ৪৩ দিন ব্যাপী উপবাস পালন করা হয়। উপবাস শেষে খাওয়া হয় বিশুদ্ধ নিরামিষ খাবার। তবে এ ক্ষেত্রে এক দিনে কেবল একটিই সবজি খাওয়া নিয়ম। অনেক সবজি মিলিয়ে-মিশিয়ে রান্না হয় না।

এর পর খ্রিস্টমাস ইভে চলে গির্জায় স্বেচ্ছাশ্রম। তার পর সকালে উপাসনা, কীর্তন। মজার ব্যাপার, এই কীর্তন শুরু হয় ভিড়ের একেবারে পিছন দিক থেকে। তার পর তা ধীরে ধীরে আসতে থাকে সামনের দিকে, মিলে যায় সেই সুরে সবার গলা!

christmas

বাড়ি ফিরে এখানেও বড়োদিনের ভোজটা আমিষ হয়। রাঁধা হয় ‘ওয়াট’ নামের এক বিশেষ মশলাদার স্যুপ। মাংস, আর সবজির এই স্যুপে কখনও-সখনও ডিমও পড়ে। তবে তা কোনো বাসনে খাওয়ার নিয়ম নেই। এই স্যুপ খেতে হয় ‘ইনজেরা’ নামের এক বড়োসড়ো রুটিকেই বাটির মতো গোল করে নিয়ে।

এ ছাড়া ইথিওপিয়ার এই ৭ জানুয়ারির বড়োদিনে ‘গানা’ নামের এক খেলার প্রতিযোগিতা হয়। লাঠি আর কাঠের বল নিয়ে অনেকটা হকির মতো এই খেলায় মেতে ওঠেন সবাই!

জর্জিয়া:

christmas

জর্জিয়াতেও বড়োদিন পালিত হয় ৭ জানুয়ারি। সকালে মূলত নতুন সাদা পোশাকে, হাতে সূর্য-তারা নিয়ে মিছিলে হাঁটেন সবাই। তার পর গির্জায় উপাসনা সেরে এসে শুরু হয় মোচ্ছব।

তবে জর্জিয়ার বড়োদিনের সাজে খ্রিস্টমাস ট্রি-তে কোনো সবুজ পাতা দেখা যায় না। এখানে গাছের শুকনো ডালে ছোটো ছোটো ফল, চকোলেট এ সব বেঁধে ঘর সাজানোই প্রথা। আর রাশিয়ার মতো এখানেও ছোটোদের জন্য উপহার নিয়ে আসে তুষার-বুড়ো। তাকে ডাকা হয় ‘তোভলিস পাপা’ নামে।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here