পায়েল সামন্ত

বাংলা সিনেমাকে ছকের গণ্ডি পেরিয়ে হাঁটার অভ্যেস করিয়েছে ‘পথের পাঁচালী’। আর এর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির জন্য আমরা আপ্লুত হয়ে যাই অহরহ। কিন্তু কতটা খোঁজ নিই সেই বোড়ালের, যেখানে ‘পথের পাঁচালী’র শ্যুটিং হয়েছে টানা তিন-চার বছর ধরে। কেমন আছে বোড়াল?

মেট্রো স্টেশন থেকে যখন বোড়ালের দিকে রওনা হচ্ছি, তখন খুব নিশ্চিন্ত ছিলাম যে এখানকার কোনো মানুষই বলে দিতে পারবেন ‘কোথায় পাব তারে’। কিন্তু ক্রমেই বুঝলাম ব্যাপারটা এত সোজা নয়।

আবাসনের দাপট গ্রাস করেছে গড়িয়া এবং তার চারপাশ। নতুন নতুন বাসিন্দার ভিড়ে বোড়াল বেশ গমগম করছে। তাঁদের অনেকেই বেজার মুখে জানালেন, তাঁরা এ তল্লাটে নতুন। আর ‘পথের পাঁচালী’র লোকেশন সম্পর্কে ‘লেস ইন্টারেস্টেড’।

চমক লাগেনি! সত্যিই তো, ৬২ বছরেরও বেশি আগে এ জায়গায় কবে কোন সত্যজিৎ রায় এসে কিছু দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করে নিয়ে গেছেন, তাতে তাঁদের কী? তাঁরা কি কখনও সিনেমাটা দেখেছেন? অনেকে দেমাকের সঙ্গে তো বলেই দিলেন, ‘পুরোনো বেঙ্গলি ফিল্ম দেখি না।’ এঁরা ভারতকে জানেন ২৬ জানুয়ারি আর ১৫ আগস্ট দিয়ে। ২৬ আগস্ট এঁদের অজানা।

হ্যাঁ, তাই বাঙালিদের দু’ভাগে ভাগ করা যায়। এক, যাঁরা ‘পথের পাঁচালী’ দেখেছেন।  আরেক, যাঁরা সেটা দেখেননি। যাক সে কথা, স্থানীয় কাউন্সিলার দীপা ঘোষ আমাকে সাহা্য্য না করলে এ যাত্রায় আর গৌরগোপাল মুখোপাধ্যায়ের বাড়ি দেখা হত না। ইতিহাস বলে, এঁরই ভাঙাচোরা, জীর্ণ মাটির বাড়িকে শিল্প নির্দেশক বংশী চন্দ্রগুপ্ত আর সত্যজিৎ রায় বেছে নিয়েছিলেন ‘পথের পাঁচালী’র লোকেশন হিসেবে। তার পর দীর্ঘ পথ পেরিয়ে ১৯৫৫ সালের ২৬ আগস্ট মুক্তি পেল ছবিটা।

এই ছিল হরিহরের জীর্ণ ভিটে।

রোদে ঘেমে অনেক বাঁক ঘুরে সত্যজিৎ রায়ের একখানা আবক্ষ মূর্তির কাছে পৌঁছে বুঝলাম, এসে গেছি সিনেমার তীর্থস্থানে। এখানে বলে রাখি, যিনি এত পারফেকশনিস্ট ছিলেন, তাঁর মূর্তিটা অনেক কষ্টকল্পনা করেই চিনতে হল। দীপাদি আঙুল তুলে দেখালেন, মূর্তির থেকে মিটার পঞ্চাশেক দূরেই নাকি সেই লোকেশন। রেললাইনের অংশটুকু নেওয়ার জন্য পরিচালককে অবশ্য পালসিটে যেতে হয়েছিল। বাকি সবটার শ্যুটিং এখানেই হয়েছিল।

সেই পুকুর যেখানে দুর্গার পুঁতির মালাটা ছুড়ে ফেলে দিয়েছিল অপু।

ওমা! এ তো দেখছি সব আছে, অথচ কিছুই নেই গোছের অবস্থা! হ্যাঁ, বাড়িটা আছে বটে, কিন্তু এখন সেটা পুরোদস্তুর পাকাবাড়ি। বাড়ির পাশের পুকুরে জল নেই, কচুরিপানার অবাধ রাজত্ব। আজ অপুরূপী সুবীর বন্দ্যোপাধ্যায়েরও ভাবতে অবাক লাগবে, এই পুকুরেই অপু কিনা দুর্গার পুঁতির মালাটা ছুড়ে ফেলেছিল!

উঠোন, ঘরবাড়ির মধ্যে হরিহর রায়ের সেই মর্মস্পর্শী দারিদ্র্যের ছাপ নেই। দোতলা বাড়িতে এসি মেশিনের উপস্থিতি মুখোপাধ্যায় বাড়ির আর্থিক অবস্থার কথা জানান দেয়। মনে হয় যেন কোনো সাধারণ মধ্যবিত্তের বাড়ি। অথচ এই বাড়িতেই পরিচালক মাসিক ৫০ টাকার চুক্তিতে শ্যুটিং করেছেন, সেট সাজিয়েছেন। তখন ধ্বংসস্তূপ ছাড়া আর কিছুই ছিল না।

মুখোপাধ্যায়-বাড়ির এখনকার প্রজন্ম তখন অফিসের তাড়ায় ব্যস্ত। কথা বলার সুযোগই দিলেন না। তা-ও কোনো ভাবে দুর্গার মৃত্যুর দৃশ্যের ঘরটা দেখিয়ে দিলেন। ছবির ঘরের সঙ্গে তার কোনো মিলই নেই। আমি নিজেই কল্পনা করে নিলাম, ঘন বর্ষার রাতে এই ঘরের জানলা দিয়ে সেই পর্দাখানা উড়ছে। অবশ্য কোথাও একটা পড়েছিলাম সেটা পর্দা নয়, চট ছিল।

মুখোপাধ্যায়দের উঠোনে ঝোপেঝাড়ে ঢাকা তুলসীমঞ্চটাও তো রয়ে গিয়েছে। কেউ যে সেখানে ‘প্রভাতে গোময়ের ছড়া’ দেয় না, হলফ করে তা বলা যায়!

দীপাদিই জানালেন, উঠোনের জবাগাছটা সত্যজিৎ রায় নিজের হাতে পুঁতেছিলেন। সঙ্গে যোগ করলেন, “আগের ৩৪ বছরের প্রশাসন তো সত্যজিৎ রায়ের একটা মূর্তি করে দিয়েই হাত তুলে ফেলল। আর কী করল?”

বাঁশবন তেমনই আছে।

ও সব রাজনৈতিক কচকচি কানে ঢুকছিল না। আমি ততক্ষণে হাঁটতে হাঁটতে নিশ্চিন্দিপুর খুঁজে পেয়ে গেছি। ভাঙা পাঁচিলের চৌহদ্দি পেরিয়ে খুঁজে পেলাম সেই বাঁশবন, এখানেই কোথাও বসে চুণীবালা দেবীকে নিয়ে ইন্দির ঠাকরুণের মৃত্যুদৃশ্য শ্যুট করা হয়েছিল। এখনও যা বাঁশঝাড় রয়েছে, তাতে গা শিউরে উঠছে! বর্ষাকালে সাপের ভয়ে নয়, ছবিতে দেখা দৃশ্যকে ফিরে পাওয়ার আনন্দে।

জায়গাটার নাম বকুলতলা হলেও বকুল গাছটা আর নেই।

অবশেষে বুঝলাম, স্বপ্নভঙ্গ হওয়ার অনেক কাছে এসেও স্বপ্নটা সত্যি হয়েছে। মুখোপাধ্যায়দের বাড়ি ছাড়াও বোড়ালে এখনও টিকে আছে সেই জোড়া মন্দির, যেখানে হরিহর গ্রাম ছাড়ার আগে প্রার্থনা করেছিল। অবশ্য সেই ঝাঁকড়া বকুলগাছটা আর নেই। পেছনের পুকুরটারও একেবারে তলায় জল! যে কোনো সংবেদনশীল মানুষেরই মন খারাপ হয়ে যাবে বই-কি! বৃষ্টি থেকে বাঁচতে গাছতলাতেই আশ্রয় নিয়েছিল অপু-দুর্গা! পুকুরে তখন কত জল ছিল! জায়গাটার নাম বকুলতলা। গাছের পাশেই চা-ডিম সেদ্ধর দোকানের তাঁবু। বিক্রেতা বললেন, “এখান থেকে অটো ধরে কবি নজরুল মেট্রো পৌঁছে যাওয়া যায়। মেট্রোর জন্য বোড়ালে এখন ফ্ল্যাটের দাম অনেক। পুকুর বুজিয়ে সব কমপ্লেক্স হচ্ছে। জমি কিনে বাড়ি করলেও পোষাবে না!”

সত্যিই, চিনিবাস ময়রা, পাঠশালার গুরুমশাই বা ‘এক পয়সার মুড়ি’র নিশ্চিন্দিপুর হিসেবে বোড়ালকে কল্পনা করাটা আজ বেশ কষ্টকর। চিন্তা হল, প্রোমোটারদের আগ্রাসী হাত থেকে কত দিন টিকে থাকবে অপু-দুর্গাদের স্মৃতি বিজড়িত এই ভিটে! কোনো সংরক্ষণ নেই, কোনো উদ্যোগ নেই।

দুর্গার মৃত্যুর পর হরিহর কাজের খোঁজে সপরিবার গ্রাম ছেড়ে পাড়ি দিয়েছিল শহরে। যে কোনো দিনই স্বাচ্ছন্দ্য আর লক্ষ লক্ষ টাকার বিনিময়ে হারিয়ে যেতে পারে দরিদ্র হরিহরের সেই জরাজীর্ণ কুটিরের শেষ স্মৃতিটুকুও। বাংলা ছবিও ইদানীং শ্যুটিং করতে আফ্রিকা, ইউরোপ, আমেরিকা যায়। তা হলে মাইগ্রেশন কি এটাই?

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here