নগর-দর্পণ: লালবাজারের কাছে চিনাপাড়ার প্রাতঃরাশে

0
1357
পায়েল সামন্ত

চাইনিজ ফুডে আসক্তি নেই, এই প্রজন্মের এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া যায় না। রাস্তাঘাটে তাই স্টল বানিয়ে গুচ্ছের সস আর আজিনামোটো ঢেলে দেদার বিকোচ্ছে চাউমিন। যাঁরা আরেকটু খাদ্যরসিক, তাঁরা চিনা খাবার বলতে মাঞ্চুরিয়ান, মোমো আর স্যুপ বোঝেন। তার বাইরে নৈব নৈব চ।

খানাপিনা নিয়ে উৎসাহী যাঁরা, বাঙালির হাতে চিনে খাবার খেয়ে মুখে অরুচি, তাঁরা সাতসকালে বেরিয়ে বেন্টিঙ্ক স্ট্রিটের কাছে খাঁটি চিনাদের ঘাঁটিতে আসতে পারেন। ওঁদের হাতে তৈরি দুর্দান্ত প্রাতঃরাশ খেয়ে হিউয়েন সাঙ, ফা হিয়েনকে নিজের মধ্যে জাগিয়ে তুলে বলতে পারেন, বাহঃ চায়না!

আরও পড়ুন: মোবি মিল্‌সের হেঁশেল থেকে : ফিশ অ্যান্ড মিট বল সুপ

সম্প্রতি এক চিনা অভিনেত্রী সলমন খানকে বলেছেন, ভারতে চাইনিজ বলে যে সমস্ত খাবার বিক্রি হয়, তা আদতে চাইনিজের থেকে আলাদাই। আসলে ভারতের সাগরতীরে শক-হুন-পাঠান-মোগলের মতো চিনে খাবারও পাঁচফোড়নে লীন হয়ে তার আপন অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলেছে!

এই মিশ্র সংস্কৃতির মধ্যেও দলছুট হয়ে কিছু জিনিস টিকে থাকে। লালবাজারের কাছের ছাতাগলিতে সকাল-সকাল পৌঁছে গেলে এমন কয়েক জন চিনাকে আপনি পেয়ে যাবেন। এই এলাকায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বাস চিনাদের। সেখানে আপনার জন্য অপেক্ষা করে আছে ‘চুং’। না, সে কোনও তরুণী নয়। দারুচিনির দ্বীপের মতো অদেখা, অচেনা এই বস্তুটা পুরোপুরি স্টিমে তৈরি। স্টিকি রাইস বা স্টিমড রাইস যাঁরা পছন্দ করেন, বাজি রেখে বলছি এটা তাঁদের পছন্দ হবেই। মসুর ডাল, পর্ক, ডিম আর ভাত দিয়ে তৈরি এই ‘চুং’-এর দাম ৬০ টাকা। সঙ্গে ঘরে তৈরি চিলি-গার্লিক সস। কলাপাতার মোড়ক খুলে নিপুণ হাতে যখন নিকোলাস সুতো দিয়ে ‘চুং’ টুকরো টুকরো করে দিচ্ছিলেন, তখনই কথা হচ্ছিল ওঁর সঙ্গে। সদ্য তরুণ নিকোলাসের রক্তে চিন। পেশার সূত্রে তিনি অটোমোবাইলের সঙ্গে যুক্ত। শনি-রবির সকালে চিনে খাবার বিক্রি তাঁর বাড়তি উপার্জন।

‘চুং’-এর সঙ্গে নিকোলাসের সম্ভারে ছিল পর্ক ও চিকেন পাই। দেখতে অবিকল ফ্রায়েড চিকেন মোমোর মতো। কিন্তু, খেলে বুঝবেন মুরগির মাংসে ঠাসা পুরে সামান্য পেঁয়াজ দেওয়া চিকেন পাই, মোমো নয়, তার তুতো ভাই! ওভেন বেক্‌ড এই পদের দাম ২৫ টাকা পিস। বাঙালি মোমো খেয়ে যাঁরা আহ্লাদ করেন, তাঁরা নিকোলাসদের চিউ পাই খাবেন। বুঝবেন, ‘চাঁদনি চক টু চায়না’র দূরত্ব কতখানি!

‘চুং’ বা চিকেন পাই মুখে দিতেই আপনার চারপাশ থেকে শহর কলকাতা উধাও হয়ে যেতে পারে। চারপাশে নেমে আসতে আসতে পারে মাওয়ের চিন। এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়ান ছাতাগলিতে, দেখুন-চাখুন চিনে খাবার। এক চিনে মহিলা স্পষ্ট বাংলা বলেন। তাঁর স্টলে ঝোলা মেনুকার্ডে লেখা ‘সুই মাই’। ছবিতেই দারুণ লোভনীয়। ‘সুই মাই’ মাছ আর চিংড়ির দুর্দান্ত ফিউশন। বড়ো বড়ো পাত্রে রাখা ধোঁয়া-ওঠা গরম স্যুপের জন্য ভিড় জমেছে এখানে। মিট বল স্যুপ, চিকেন স্যুপ, পর্ক স্যুপ, ফিশ বল স্যুপ, কী খেতে চান! মাঞ্চুরিয়ান আর সেজুয়ানে অভ্যস্ত বাঙালির জন্য এ যেন মেইনল্যান্ড চায়না! ওই মহিলার স্টলের পেছনেই ‘পৌ হিং’ নামের একটা চাইনিজ রেস্তোরাঁ। অত সকালে তখনও খোলেনি সেটা।

এই রাস্তায় টালা পার্কের গৌরবকে দেখা গেল বান্ধবীর সঙ্গে। ওঁদের হাতে ফ্রায়েড চিকেন ওয়ান্টান। বালিগঞ্জ ফাঁড়ির মিস্টার জেমস ১৬ বছর ধরে এখানে আসেন প্রাতঃরাশ সারতে। কীসের টানে তাঁর আসা? ফিশ মোমো আর ফিশ বল স্যুপ। জেমস জানালেন, আগের থেকে চিনে বিক্রেতার সংখ্যা কমেছে। তবু, স্বাদ একই থেকে গিয়েছে।

জেমসের সঙ্গে এক টেবিলে ক্লাস ফাইভের নিশা হাজরা। ৪০ টাকা দিয়ে এক বাটি পর্ক স্যুপ নিয়ে সদ্ব্যবহার করছে। বাবার সঙ্গেই তার এ চত্বরে প্রথম আসা। ঠোঙা থেকে কী যেন একটা বের করে ছিঁড়ে ছিঁড়ে স্যুপে ডোবাচ্ছে আর খাচ্ছে। কী এটা? নিশা বলল, চিনা লাঠি!

প্রতি দিনই বসে এই চিনে পথ-রেস্তোরাঁ। শনি-রবিবার দোকানির সংখ্যা থাকে বেশি। নিকোলাসের বাবা বললেন, “২০ বছর আগেও এ জায়গাটা ছিল জমজমাট। এখন আর সেই দিন নেই।” ছাতাগলি এখন আক্ষরিক অর্থে কসমোপলিটান — চিনেদের সঙ্গে পাঠান, বাঙালি, হিন্দুস্তানি, সকলের সহবাস।

সকাল ছ’টা থেকে ঘণ্টা তিনেকের ব্যবসা। লাভ মন্দ নয়, তবু আর নতুন প্রজন্ম এই ব্যবসায় ঝুঁকছে না। তাই এ যেন কলকাতায় চিনা ‘মিসিং লিঙ্কের’ প্রদর্শনী। চিংড়ি মাছের চিপস্ আর প্যাকেট ভর্তি নুডলস্ নিয়ে এক মহিলা বসেছিলেন। ছবি তুলতে যেতেই বেজায় রেগে গেলেন। তাঁরা চিনা হতে পারেন, চিড়িয়াখানার সামগ্রী নন। কেন ছবি তোলা হবে? তাই পাঠক সেই সরু সরু দুধসাদা প্যাকেটবন্দি নিখাদ চৈনিক নুডলসের দর্শন পেলেন না। যে কোনো দিন সকালে চলে যান ছাতাগলি — চোখে দেখুন, চেখে দেখুন!

ছবি: লেখক

(কলকাতা তো বটেই, এছাড়াও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রাচীন, ঐতিহ্যশালী শহরগুলির পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে নানা আকর্ষণীয় গল্প, ইতিহাস। ফিচার লিখে পাঠান আমাদের। সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয়টির কয়েকটি ছবি। নির্বাচিত হলে প্রকাশ করা হবে। পাবেন পারিশ্রমিক। অবশ্যই অভ্র বা ইউনিকোডে লিখবেন। [email protected])

এক ক্লিকে মনের মানুষ,খবর অনলাইন পাত্রপাত্রীর খোঁজ

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here