অময় দেব রায়

দিন কয়েক আগেই জমে গেছিল লড়াই। ওড়িশার সঙ্গে সেই লড়াইয়ে জিতে গেছে বাংলা। রসগোল্লার জিওগ্রাফিকাল আইডেন্টিফিকেশন স্বত্ব পেয়েছে পশ্চিমবঙ্গ। কিন্তু শুধু পশ্চিমবঙ্গ বললেই তো চলে না। জানতে ইচ্ছা হয় সেই রসে ভরা ইতিহাস। কোথা থেকে পথ চলা শুরু হয়েছিল রসগোল্লার? সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে রানাঘাটের নাম উঠে ঠিকই। কিন্তু হারাধন মণ্ডলের তৈরি সেই রসগোল্লাকে ঠিক আজকের রসগোল্লার পূর্বসুরি বলা যায় না। সেই ইতিহাস খুঁজতে গেলে উঠে আসে কলকাতার এক সদ্য তরুণের কাহিনি। বেঁচে থাকার সংগ্রাম আর সৃষ্টিশীলতার মিশেল যাকে করে তুলেছিল ‘রসগোল্লার কলোম্বাস’। চলুন ফিরে যাওয়া যাক প্রায় দেড়শো বছর আগে কলকাতা শহরে।

আরও পড়ুন: রসগোল্লার স্বীকৃতিতে নিজেদের জয় দেখছে রানাঘাট

জন্মের তিনমাস আগেই বাবার মৃত্যু। ততদিনে পারিবারিক চিনির ব্যবসাও লাটে উঠেছে। দারিদ্র চরমে। পরিবারের সামর্থ্য নেই, তবু পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার ভীষণ ইচ্ছে। একরকম বাধ্য হয়েই কাজ নিলেন ইন্দ্রদের দোকানে। ইন্দ্রদের পরিবার ছিল মায়ের দিককার দূরসম্পর্কের আত্মীয়। দোকানে মালিকের চূড়ান্ত দুর্ব্যবহার। টিকতে পারলেন না। কাজ ছাড়তে হল। বয়স তখন সবে আঠেরো। এক বন্ধুকে সঙ্গী করে জোড়াসাঁকোয় মিষ্টির দোকান খুলে বসলেন এক সদ্য তরুণ। নাম, নবীনচন্দ্র দাস।

একসময়ের প্রতিপত্তিশালী চিনি ব্যবসায়ীর ছেলে কিনা মিষ্টির দোকান দেবে! সুনজরে দেখেনি কেউ। তখন মিষ্টির ব্যবসা চলত ধারবাকিতে। লাইনে নতুন নবীন ময়রা হালে পানি পেলেন না। কিছুদিনের মধ্যেই ঝাঁপ বন্ধ হল দোকানের। ইতিমধ্যে বন্ধুটিও পালিয়েছে। পুঁজিপাটা চুলোয় গেছে। কিন্তু তাতে কি! হাল ছাড়লেন না। ঝুঁকি নিতে ভালোবাসেন নবীনচন্দ্র। আবার একটা নতুন দোকান খুললেন। এবার একেবারে ইন্দ্রদের ‘মিঠাই’ এর মুখোমুখি। যেন সম্মুখ সমরে নবীনচন্দ্র।

মিষ্টির তালিকায় তখন এক নম্বরে সন্দেশ। শুকনো মিষ্টি গিলতে মাঝেমধ্যেই শুকিয়ে আসত গলা। মোক্ষম চালটি চাললেন নবীন দাস। বাঙালির রসনায় রসসংযোগ ঘটালেন। ওলন্দাজদের থেকে শিখে নিলেন সাইট্রিক অ্যাসিড প্রয়োগে দুধ ছিন্ন করে উন্নত মানের ছানা তৈরির কৌশল। ছানার দলা চিনির শিরায় ডুবিয়ে তৈরি হল নতুন এক মিষ্টি। ধবধবে সাদা সুস্বাদু । নাম রসগোল্লা।

সে মিষ্টি মোটেই মনে ধরল না বাঙালির। বেশিক্ষণ ধরে ফোটানো বলে যথেষ্ট নিন্দে জুটল রসগোল্লার কপালে। ১৮৭০ সাল নাগাদ এক গ্রীষ্মের দুপুরে ঘটে গেল আর এক কাণ্ড! শেঠ রায়বাহাদুর ভগবান  দাস পরিবার নিয়ে চলেছেন বাগবাজারের রাস্তায়। গরমে কাহিল ছেলে। হাঁটাচলার শক্তিটুকুও নেই।  সামনেই নবীন দাসের মিষ্টির দোকান। ছুটে গিয়ে ছেলের জন্য এক গ্লাস জল চাইলেন বাবা। মায়া হল নবীন দাসের। সঙ্গে একখানা রসগোল্লা খেতে দিলেন। মিষ্টির স্বাদ পেয়ে চনমনে হয়ে উঠল ছেলে। চোখেমুখে খেলে গেল আনন্দের ঝিলিক। ছেলের খুশি দেখে বাবাও খেয়ে ফেললেন একখানা। তারপর আরও একটা। আরও একটা। এভাবে প্রায় গোটা কুড়ি। কলকাতার নামজাদা ব্যবসায়ী ভগবান দাস খেয়েই থামলেন না। দোকানের সমস্ত রসগোল্লা কিনে বিলিয়ে দিলেন। সেই শুরু। আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। ঘরে ঘরে বাঙালি আপন করে নিল নতুন মিষ্টিকে। বাগবাজারের নবীনদাস হলেন কলকাতার কলোম্বাস।

আরও পড়ুন: ইতিহাস থেকে বর্তমান, বউবাজারের সোনামাখা পথে জেগে আছে কলকাতার মিষ্টান্ন বিলাস

ডাক্তার পশুপতি ভট্টাচার্য রবি ঠাকুরের সাথে দেখা করতে গেলেই নিয়ে যেতেন নবীন দাসের রসগোল্লা। একবার স্টক শেষ। বাধ্য হয়েই যেতে হল অন্য দোকানে। মিষ্টি খেয়েই ধরে ফেললেন রবি ঠাকুর। বললেন, “অন্য কারও নয়। আনলে নবীন দাসের রসগোল্লাই এনো”।

শুধু কি রসগোল্লা! একের পর এক নতুন মিষ্টি এনে তাক লাগিয়ে দিলেন নবীন দাস। কাশিমবাজারের রানি মা ছিলেন ভোজনরসিক। পছন্দসই মিষ্টি জুটছিলো না কিছুতেই। ডাক পড়ল নবীন দাসের। অদ্ভুত এক সন্দেশ বানিয়ে ছুটলেন মুর্শিদাবাদ। মুখে দিতেই উত্তেজিত রানি মা। আহ্লাদে চিৎকার করে বললেন, ‘আবার খাবো’। সেদিন থেকে বাজারে এলো নতুন সন্দেশ, নাম ‘আবার খাবো’। সারদা মায়ের বিশেষ পছন্দ ছিল নবীন দাসের দেদো সন্দেশ। রামকৃষ্ণ আশ্রমের সন্ন্যাসীরা এখনও নবীন দাসের মিষ্টি বলতে পাগল।

 নবীন দাস নেই, আছে তাঁর সৃষ্টিরা। রসগোল্লার কদর বেড়েছে উত্তরোত্তর। যোগ্য উত্তরসুরির হাতে আড়েবহরে বেড়েছে বাণিজ্য। নবীন দাসের ছেলে কৃষ্ণদাসের নামে তৈরি হয়েছে কোম্পানি। কে.সি.দাস প্রাইভেট লিমিটেড। কলকাতা থেকে বেঙ্গালুরু- খুলেছে একের পর এক কাউন্টার। বিজ্ঞানমনস্ক নাতি সারদাচরণ রসগোল্লাকে কৌটোজাত করে ছড়িয়ে দিয়েছেন গোটা বিশ্বে।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here