মধুমন্তী চট্টোপাধ্যায়

বছরের এই সময়টায় হাওয়াতেই কেমন যেন একটা কেক-কেক গন্ধ ভেসে বেড়ায়, তাই না? কেক বলতেই নিউ মার্কেট-এর নাহোমস এর কথা মনে পড়ে গেল। একটা বড়োদিনের মাস চলে যাবে, নতুন বছর চলে যাবে, নাহোমস-এর মাফিন কিংবা পাম কেকের গুঁড়ো হাতে-মুখে লেগে থাকবে না, হয় নাকি? ১১৫টা বড়োদিনের মরশুম পার করেও কিছু গন্ধ এক থেকে যায়। বছর কয়েক আগে কত লেখালিখি হল কাগজে, বেকারির মালিক ডেভিড এলিয়াস নাহোম মারা গেলেন। শহরে হাতে গোনা যে ক’জন ইহুদি রয়েছেন, ৮৬ বছরের ডেভিড ছিলেন তাঁদেরই একজন। মানুষগুলো হারিয়ে যাচ্ছেন। ইতিহাসের শেষ কটা পাতাও ফুরিয়ে আসছে। তাই আর দেরি নয়। খবর অনলাইন পা রাখল তাঁদের পরবর্তী গন্তব্যে। নাভে সালোম সিনাগগ।
ব্রেবোর্ন রোড আর ক্যানিং স্ট্রিটের সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে ফুটপাথে সার দিয়ে সেজে থাকা দোকানগুলোয় জিজ্ঞেস করছিলাম, “দাদা এখানে সিনাগগটা কোথায়?” উত্তর আসছিল, “এটাই তো সিনাগগ স্ট্রিট”। বেশ খানিকক্ষণ এ-দিক ও-দিক ঘুরপাক খেয়ে বুঝলাম, সিনাগগের ঠিক নীচেই দাঁড়িয়ে, সারি সারি দোকানের মাঝে চাপা পড়ে গেছে ঢোকার মুখ। এ শহরে নাকি এক সময় পাঁচ পাঁচ খানা সিনাগগ ছিল। এখন রয়েছে তিনটি। বর্তমানে এই একটিতেই সাধারণ মানুষের প্রবেশের অনুমতি রয়েছে। ৬৩, জেউইশ গার্লস স্কুল, পার্ক স্ট্রিট থেকে অনুমতি নিতে হয়।


ইহুদিদের এই উপাসনালয়ের বয়স ১৯২ বছর। গৃহযুদ্ধে জর্জরিত আজকের সিরিয়ার আলেপ্পো থেকে ১৭৯৮ সালে কলকাতায় আসেন সালোম ওবেদিয়া কোহেন। তাঁর বাবার স্মৃতির উদ্দেশে তৈরি করেন এই উপাসনালয়। ১৯৩১ সালে নতুন করে এর সংস্কার হয়।  ইহুদিদের মধ্যে তিনিই প্রথম আসেন আমাদের শহরে। তার পর একে একে ইরান, ইরাক থেকে ইহুদি জনসংখ্যার একটি বড়ো অংশ কলকাতায় চলে আসে ব্যবসা করতে। মজার ব্যাপার, ভারতে আসা বিদেশি ধর্মের মানুষের মধ্যে ইহুদিরা প্রায় প্রথম বললেই চলে। কিন্তু কলকাতায় ইহুদিরা আসেন সব শেষে। তত দিনে ইংরেজরা বেশ জাঁকিয়ে বসেছেন। ব্রিটিশ উপনিবেশ ভারতের তৎকালীন রাজধানী কলকাতায় তাঁদের ব্যবসা ছড়াতে থাকে রমরমিয়ে। এক সময়ে এ শহরে প্রায় ৬০০০ ইহুদির বসবাস ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৮ সালে ইজরায়েল নতুন রাষ্ট্র হিসেবে তৈরি হল। সদ্য স্বাধীন হওয়া ভারতে লক্ষ স্মৃতি ফেলে ইহুদিরা চলে যেতে থাকলেন তাঁদের নিজেদের দেশে। বর্তমানে এ শহরে ইহুদিদের সংখ্যা ২০ থেকে ২৫-এর মধ্যে। সারা ভারতে ওঁদের সংখ্যা ৫০০-রও কম।


শহরের বাকি দু’টি সিনাগগ আর্কিওলজিকাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার তত্ত্বাবধানে থাকলেও নাভে সালোম-এর রক্ষণাবেক্ষণ করে জিউইশ সম্প্রদায়ের নিজস্ব ট্রাস্টি বোর্ড। কেয়ারটেকার মাসুদ ভাই ঘুরে দেখালেন সব। তিন পুরুষ ধরে এটাই ওঁদের পেশা। মাসুদ ভাই-এর ধর্ম ইসলাম। অথচ কত নিষ্ঠা ভরে দেখালেন সিনাগগের সব খুঁটিনাটি। অসহিষ্ণুতার জোয়ারে ভাসতে থাকা একটা দেশে এ রকম ঘটনাও তা হলে আজও ঘটে।


উপাসনালয়ের ভেতরে জাঁকজমক নেই তেমন। আছে ইতিহাস। ছিমছাম, সুন্দর ভাবে সাজানো বিশাল হল। একেবারে সামনের মঞ্চের ওপর হিব্রু অক্ষরে লেখা রয়েছে উপাসনালয়ের নাম। হিব্রু নাকি আরবির মতোই। ডান দিক থেকে বাঁ দিকে লেখা হয়। সিনাগগের দোতলায় রয়েছে আর্ট গ্যালারি। মস্ত মস্ত সব ছবি রাখা তাতে।
নাভে সালোমে গিয়ে প্রথম বার বুঝলাম, জুদাইজম নিয়ে কিছুই জানা হয়নি এত দিন। ওদের উৎসবের মরশুম ‘হাই হলিডে’ (সেপ্টেম্বর-অক্টোবর)-তে কখনও শুভেচ্ছা জানানো হয়নি ওঁদের। অথচ পৃথিবীর প্রাচীনতম ধর্মের একটি জুদাইজম। খ্রিস্টধর্মের জন্মও কিন্তু এখান থেকেই। ইসলামের প্রতিষ্ঠাতা হজরত তাঁর প্রথম জীবনে ধর্মবিশ্বাসে ছিলেন হানিফ। জুদাইজমের প্রায় সমসাময়িক সেই ধর্ম। মিলও রয়েছে বিস্তর। এঁরা বিশ্বাস করেন ঈশ্বর নিরাকার। মঞ্চের দিকে চোখ চলে যাচ্ছিল বারবার। দরজার ও-পাশের ঘরে রাখা তোরাহ (ইহুদিদের ধর্মগ্রন্থ)। সন্ধে নামল কলকাতায়। শীতকালে যে ভাবে নামে, কোনো ভূমিকার তোয়াক্কা না করে। পৃথিবীর সব প্রান্তেই শীতের সন্ধ্যেগুলো কি এক রকম হয়? জেরুজালেম কিংবা মক্কায়? সব শহরেই কি একটু একটু করে মুছে যেতে থাকে ইতিহাস?  এমনই কত সন্ধেয় হয়তো প্রার্থনা সেরে ফিরতেন হজরত কিংবা যীশু। মাসুদ ভাইয়েরও নামাজের সময় হল এ বার। আমার পড়শি ঘরের তুলসীতলায় প্রদীপ জ্বলবে একটু পরেই। ঘরে ফেরা যাক।