মধুমন্তী চট্টোপাধ্যায়

হিসেব মতো তার এখন ভরা যৌবন। ৩৩ বছর পার করেছে এ শহরে। অথচ আজকের কলকাতা কি কিছুটা অবহেলায় রেখেছে তাকে? মহানগরকে মাঝখানে রেখে চক্রাকারে পাক খেয়ে আসার মাঝের সময়টাতে কত গল্প এসে ঢুকে পড়েছে  হাওয়ায় হাওয়ায়। কত ঘটনা আবার ছিটকে গেছে স্টেশন আসার আগেই। কলকাতার চক্র রেল। জন্ম ১৯৮৪ সালের আগস্ট মাসে। তখন দমদম থেকে প্রিন্সেপ ঘাট পর্যন্ত চলত ট্রেন। ২০০৫ সাল থেকে মাঝেরহাট অবধি ট্রেন চলাচল সম্ভব হওয়ায় সার্থক হল চক্র রেল নাম।

কেন তৈরি হয়েছিল চক্র রেল? প্রশ্ন রেখেছিলাম পূর্ব রেলের সিনিয়র পাবলিক রিলেশনস অফিসার বিনোদকুমার শর্মার কাছে। শ্রী শর্মা জানালেন, ‘হাওড়া এবং শিয়ালদার ওপর চাপ কমিয়ে শহরতলির মানুষকে কত কম সময়ে এবং কম খরচে  কলকাতার বিভিন্ন এলাকায় তাঁদের গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়া যায়, এই চিন্তা থেকেই চক্র রেলের ভাবনা আসে প্রথম।’ অফিস টাইমে সবচেয়ে বেশি গাড়ি চলে প্রথম থেকেই। দমদম থেকে প্রথম গাড়ি ছাড়ে সকাল ৭ টা ৩৯ মিনিটে। গাড়িটি আসে হাসনাবাদ থেকে। ৮ টা ১০ -এর মধ্যে ঢুকে পড়ে অফিস পাড়ায়। হালে কলকাতায় কর্পোরেট অফিস এসছে, তথ্য-প্রযুক্তির আস্ত একটা সেক্টর এসছে, ইন্টারনেটে ৪ জি গতি এসেছে, সব মিলিয়ে জীবন হয়েছে দ্রুত। কিন্তু হাসনাবাদের একটা মানুষকে প্রতি সকালে ঘন্টা দুই/আড়াই-এর মধ্যে কলকাতার প্রাণ কেন্দ্রে পৌঁছে দেওয়ার মতো গতি আর কেউ আনতে পেরেছে? তাও আবার ৫ থেকে ১০ টাকায়!

দমদম থেকে মাঝেরহাটের দিকে শেষ ট্রেন ছাড়ে সন্ধে ৬টা ২৬-এ। আর দমদম যাওয়ার ট্রেন মাঝের হাট থেকে রাত ৮ টা ১০-এ। বিবাদি বাগ ছেড়ে যাওয়ার সময় যার ৮টা ৩২। সবটাই অফিস যাত্রীদের কথা ভেবে। দিনভর মোট ১৭ জোড়া ট্রেন। দুপুর দুপুর ট্রেন বেশ ফাঁকা থাকে। দমদম থেকে সেরকমই এক ট্রেনে চেপে বসলাম একদিন। কামরায় লোক বলতে মেরে কেটে দশ। কেউ কেউ কানে মোবাইলের তার গুজে সুখের ঘুম দিয়েছে। শেষ বিকেলের আলো এসে চোখে পড়লে ঘুমের মধ্যেই চোখ কুচকে একটু সরে আসা চলছে। কোনো কোনো স্টেশন থেকে উঠছে কলেজ পড়ুয়াদের ছোটখাটো দল। বেশির ভাগ-ই কলেজ কেটে শহর চেনার চেষ্টায় মশগুল।

গঙ্গাকে পাশে রেখে একটার পর একটা ঘাট পেরোচ্ছে ট্রেন। বাগবাজার, শোভাবাজার, বাবুঘাট, প্রিন্সেপ ঘাট। উল্টো দিকের জানলায় চোখ রাখতেই পুরনো কলকাতার ইট খসে পড়া সারি সারি ঘর। রেল লাইনের পাশে এক চিলতে মাঠে জমে ওঠা ক্রিকেট ম্যাচ। পাশের কামরা থেকে ভেসে আসা ভাটিয়ালি সুর। ট্রেনে ওঠার আগে স্বল্প আলাপে জেনেছি, কোচবিহার থেকে এসেছে বাউল উৎসবে, গন্তব্য প্রিন্সেপ ঘাট।

জানলা থেকে চোখ সরাতেই কামরার ভেতরের আরেক রকম ব্যস্ততা। ঘটিগরমের ডালি গলা থেকে নামিয়ে কাঁধের ময়লা ঝোলা থেকে টিফিন বাক্স বের করে আনছে বলি রেখা সমেত একটা হাত। ২ টো রুটি  সামান্য কোনো তরকারি দিয়ে মেখে জল দিয়ে গিলে ফেলার শেষে গলায় পেঁচিয়ে নিচ্ছে মাফলার। বাবু ঘাটে নামবে বোধহয়। ট্রেনের শব্দ ছাপিয়ে মাঝে মাঝে কানে আসছে জনাচারেক মহিলার আড্ডা। কার বাড়ির কোন ‘বৌদি’ কত জাঁদরেল, ফিরতি পথে আসর জমেছে তাই নিয়ে। এই শহরে আমিও থাকি। থাকি অথবা কাজে-অকাজে রোজ আসি যাই। স্মার্ট ফোনের চার্জ শেষ হয়ে গেলে ওলা-উবের না পেয়ে বাধ্য হয়ে ট্রেন আমাদেরও ধরতে হয় কোনো কোনো দিন, এই শহরেই। সেদিন বিরক্তির শেষ থাকে না। ভাবতে অবাক লাগছে আজ। বি-বা-দী বাগ এল বুঝি। ট্রেন থামতেই  অন্য দিকে দুই মধ্যবয়সির আলোচনা কানে এল, আজ সারাদিন গোলাপ তেমন বিক্রি হয়নি। কাল যদি এমন হয়, বেঁচে যাওয়া ফুল নিয়ে মালা গাঁথতে হবে দুপুরের আগে আগে। নেমে পড়লাম ট্রেন থেকে। সঙ্গে থাকল বেঁচে থাকা গল্পগুলো। মালা গাঁথতে হবে যে!

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here