পাতালগঙ্গায় জোয়ার, মেরুকরণের বৃত্তে ঠাঁই নেই দলিতের

0
1406
V P Singh,L K Advani, Kanshi Ram
দেবারুণ রায়

জেনে বা না জেনে ভারতমায়ের আঁচলে হাজার বুটির নকশায় হাত দিয়ে ফেলেছে শাসনযন্ত্র। তাই নকশার বুনোটেই মাতৃস্নেহের বন্ধন। যে বন্ধন একই জাতির পরিচয়ে আগলে রেখেছে ব্রাহ্মণ-শূদ্র-চণ্ডালকে। বিদেশি শাসক চিনেছিল এই মাতৃভক্ত দেশকে। তাই ১৮৫৭-এর বিদ্রোহের চেহারা দেখে ব্রিটিশ সরকার বীজ ছড়িয়েছিল সাম্প্রদায়িকতার। তাদেরই রসায়নে তৈরি ডিভাইড অ্যান্ড রুলের বিশেষ আরক গিলিয়ে না দিলে আরও নব্বই বছর স্বাধীনতার অপেক্ষায় প্রহর গুনতে হত না ভারতবাসীকে। সমস্ত বিদ্রোহ-বিপ্লবের শিকড় উপড়ে ক্ষমতা হস্তান্তরের নিরাপদ নির্ঘণ্ট করা হলেও জাগ্রত জাতির মেরুদণ্ডে চিড় ধরাল দেশভাগ। দ্বিজাতিতত্ত্বের প্রাচীন কল্পনা ছিল উত্থানপর্বের আস্তাকুঁড়ে। সেই অষ্টাবক্রে পিণ্ডে প্রাণসঞ্চার করল বিদেশি শাসকেরা। ‘কাণ্ডারী বল ডুবিছে মানুষ’ – এ কথা কেউ শুনল না। ভারতবাসীর পরিচয় হল মা বা মাটির পরিচয়ে নয়, ধর্মের রঙে।

তবু দ্বিজাতিতত্ত্বের খড়গে খণ্ড ভূখণ্ডের একাংশ পাকিস্তান ইসলামিক রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেও ভারত বেছে নিল আধুনিকতায় আলোকিত গণতন্ত্রের পথ। ড. আম্বেডকরের নির্দেশিত পথে রাষ্ট্রের শ্রেষ্ঠ সনদ সংবিধানে ধর্মাচরণের স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের অধিকার ও সব ধর্ম-বর্ণ-জাতপাতকে সমানাধিকার দেওয়া হল। নির্বাসন দেওয়া হল লিঙ্গবৈষম্য ও অস্পৃশ্যতাকে। তফশিলি জাতি ও উপজাতির জন্য সংরক্ষণ চালু হল। এবং এমনই সংরক্ষণের দাবি মেনে আরও সাড়ে চার দশক পরে দলিতের পাশাপাশি অনগ্রসরকে করা হল আলোকিত। সংবিধান যে হেতু ধর্মের ভিত্তিতে সংরক্ষণের দাবি স্বীকার করতে অপারগ, তাই সংখ্যালঘুদের ন্যায়সঙ্গত অধিকার মেনে নিয়েও কোটা বরাদ্দ করার প্রশ্ন উঠল না।

বিজ্ঞাপন

জরুরি অবস্থার কালো দিনে সংবিধানের দেওয়া সব অধিকারই কার্যত হরণ করে নিয়ে জনতার রায়ে মসনদচ্যুত হলেন ইন্দিরা। প্রথম প্রমাণ হল, এ দেশে গণতন্ত্রের ভিত কতটা মজবুত। একাত্তরের পরাক্রমী ইন্দিরা সর্বেসর্বা স্বৈরতন্ত্রী হয়ে উঠলেও মাত্র পাঁচ বছরের মাথায় তাঁকে স্বীকার করতে হল নিজের ভয়ংকর ভুল। এবং বিহারে দলিত হত্যার নৃশংস ঘটনা ঘটার পর সেই দুর্গম গ্রামে গিয়ে দলিতের পাশে দাঁড়ানোর পরই তাঁর ক্ষমতায় ফেরার পথ প্রশস্ত হল। কেন্দ্রের প্রথম অকংগ্রেসি সরকার সুশাসনের নানা ঝলক দেখিয়ে, গণতন্ত্রের ভিত আরও শক্ত করেও আর জনাদেশ পেল না। সেই ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়েছে ভারতের রাজনীতি। মহাত্মা গান্ধীর পর আচার্য নরেন্দ্র দেব, রামমনোহর লোহিয়া, আচার্য কৃপালনী হয়ে সমাজবাদী চিন্তাস্রোতে ভেসে এলেন জয়প্রকাশ নারায়ণ। রাজনীতির চালচিত্র থেকে এঁরা বিদায় নেওয়ার এক যুগ পর প্রধানমন্ত্রী বিশ্বনাথপ্রতাপই পাদপ্রদীপের আলোয় আনলেন সাতাত্তরের প্রধানমন্ত্রী মোরারজী দেশাইয়ের প্রবর্তিত মণ্ডল কমিশনের সুপারিশ। ধুন্ধুমার লেগে গেল সারা দেশে। তখন তো উচ্চ বর্ণের মূল প্রবক্তা কংগ্রেসই। তাদেরই মৃদু প্রশ্রয়ে অযোধ্যা হয়ে উঠল রাজনীতির মূল ইস্যু। মণ্ডল রুখতে এল কমণ্ডল। তবুও সেই উন্মেষকালে অনগ্রসর-দলিত-সংখ্যালঘু মানুষের জোট পিছু হটল না। বিজেপির পালানপুর প্রস্তাবমাফিক রামমন্দির নির্মাণের আন্দোলন তুঙ্গে ওঠা সত্ত্বেও তারা কেন্দ্রে সরকারে এল না।

dalits' rally in bhopal on the bharat bandh day
ভারত বন্‌ধের দিন ভোপালে দলিতদের সমাবেশ।

তত দিনে দলিত অ্যাজেন্ডা নিয়ে এগিয়ে এসেছেন কাঁসিরাম। রাজীব গান্ধীর মর্মান্তিক মৃত্যু রাজনীতির স্বাভাবিক গতিপথ বদলে দেওয়ার পর অযোধ্যার আন্দোলন পৌঁছোল চূড়ান্ত পরিণতিতে। উত্তরপ্রদেশের রাজনীতি তারা আগে থেকেই কক্ষবদল করতে শুরু করেছে। সপা-বসপা জোট ভেঙে যাওয়ার পর আডবাণীর সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এর তত্ত্ব পল্লবিত হল আরএসএস-এর কুশলী নেতা গোবিন্দাচার্যের হাতে। ‘দলিত কি বেটি’ মায়াবতী লখনউয়ের তখ্‌তে বসলেন বিজেপির সমর্থনে। মুরলীমনোহর জোশী, লালজি ট্যান্ডন আর কলরাজ মিশ্রদের হাতে মায়াবতী রাখি বাঁধলেন রক্ষাবন্ধনের দিন। দলিত বস্তিতে গিয়ে পাত পেড়ে খেতে বসলেন বামুন-ঠাকুর-কায়েত কুলতিলকরা। সেই থেকে দলিতের মর্ম বোঝা শুরু। কালক্রমে বদল এল বিহারেও। যে রামবিলাস বলতেন, ‘ভোট হমারা, রাজ তুমহারা, নহি চলেগা’, তিনিই যোগ দিলেন বাজপেয়ী-ক্যাবিনেটে। মোদী জমানায় আরও এক ধাপ এগিয়ে নখদন্তহীন বিরোধী শিবির ছেড়ে মহারাষ্ট্রের দলিত নেতা আরপিআই-এর রামদাস আটওলে এলেন বিজেপি সরকারে। রামবিলাস ও রামদাসদের নিয়ে কেন্দ্রের শাসন যখন সরগরম, সেই সময়েই দলিতদের ডাকা ভারত বন্‌ধে উত্তাল সারা দেশ। হিন্দি বলয় ছেড়ে পুবে ও পশ্চিমেও ছড়িয়েছে বিক্ষোভের আঁচ। দলিত মিছিলে গুলিবর্ষণে নিহতের সংখ্যা ১০ ছাড়িয়েছে এক দিনেই।

এ বার পাতালগঙ্গায় জোয়ার আসার পালা। দলিত রাজনীতি প্রথাগত মুখ বদলেছে। ‘ইনকামব্যান্সি ফ্যাক্টর’-এর সুবাদে হার্দিক পটেল গুজরাতে যতটা হাওয়া তুলেছেন মাত্র ২৪ বছর বয়সে, তার চেয়ে আরও গভীর স্তর থেকে সক্রিয় জিগনেশ মেবানি। হার্দিকের চেয়ে বয়সও কিছুটা বেশি। অনগ্রসরদের নতুন নেতা অল্পেশ ঠাকোরের মতো তিনি কংগ্রেসে যাননি। যাননি হার্দিকও। হার্দিক শুধু পটেলদের সংগঠিত করার লক্ষ্যে স্থির হলেও জিগনেশের দৃষ্টি অদূর ভবিষ্যতের আলো আঁধারিতে গুলিয়ে যাওয়ার জন্য নয়। পশ্চিম থেকে পূর্বের, উত্তর থেকে দক্ষিণের শাখাপ্রশাখায় কিশলয় দেখা দিচ্ছে। সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ নয় যারা, তারা পড়ে থাকবে পিছুর টানে। মেরুকরণের বৃত্তে ওদের জায়গা নেই। যাঁরা বিবেকানন্দের কথা বলেন, তাঁরা মূর্খ ভারতবাসীকে, চণ্ডাল ভারতবাসীকে অধিকারের জমি ছেড়ে দিন। এই জনতরঙ্গকে গুলি নয়, ক্ষমতা দিন – সত্তা মে হিসসেদারি। ক্ষমতার ভাগীদারি। এটাই সংবিধানের সঙ্কেত।

এক ক্লিকে মনের মানুষ,খবর অনলাইন পাত্রপাত্রীর খোঁজ

loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here