মজার মানুষ রবীন্দ্রনাথ

0
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। সংগৃহীত ছবি

২৫ বৈশাখ মানেই ‘গঙ্গাজলে,গঙ্গাপুজো’। রবিপ্রণাম, কবিপ্রণাম, রবিস্মরণ। সবেতেই থরেথরে সাজানো তাঁরই ‘নৈবেদ্য’। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬১তম জন্মবার্ষিকীতে তাঁর জীবনের সঙ্গে জড়িত কিছু মজার কথা নতুন করে তুলে ধরলেন সিদ্ধার্থ সিংহ

১. চিনি গো চিনি

মরিস সাহেব শান্তিনিকেতনে ইংরাজি ও ফরাসি পড়াতেন। তিনি একবার তাঁর ছাত্র প্রমথনাথ বিশীকে বললেন, গুরুদেব সুগার অর্থাৎ চিনি নিয়ে একটা গান লিখেছেন। যেটা খুবই মিষ্টি হয়েছে। প্রমথনাথ বিশী সে কথা শুনে বললেন, চিনি নিয়ে লিখলে সেটা তো মিষ্টি হবেই। তা গানটা কী? মরিস সাহেব গাইলেন, ‘আমি চিনি গো চিনি তোমারে, ওগো বিদেশিনী।’ এটা শুনে প্রমথনাথ বিশী বললেন, গানটাতে বেশ কয়েক চামচ চিনি মিশিয়েছেন গুরুদেব। তাই এত মিষ্টি। কিন্তু এই চিনিই যে সুগার সেটা আপনাকে কে বলল?

মরিস সাহেব জানালেন, কে আবার, স্বয়ং গুরুদেব নিজেই তাঁকে এ কথা জানিয়েছেন।

২. বাঁশির স্থলে কাশি

কবিগুরুর পঞ্চাশ বছর বয়সে পদার্পণ উপলক্ষ্যে শান্তিনিকেতনের একটি কক্ষে সভা বসেছিল। যেখানে তিনি স্বকণ্ঠে গান গেয়েছিলেন। তো, তিনি সে দিন গাইলেন, ‘এখনো তারে চোখে দেখিনি, শুধু কাশি শুনেছি।’ কবিগুরু এটি গেয়েছিলেন আচার্য যতীন্দ্রমোহন বাগচি ওই কক্ষে ঢোকার আগের মুহূর্তে, তাই বাগচি মহাশয় কক্ষে প্রবেশ করে বিস্মিত নয়নে সকলের দিকে তাকিয়ে রইলেন। ‘সিঁড়িতে তোমার কাশির শব্দ শুনেই গুরুদেব তোমাকে চিনেছেন’, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত তখন বাগচি মহাশয়কে বুঝিয়ে দিলেন, ‘তাই তো তাঁর গানের কলিতে বাঁশির স্থলে কাশি বসিয়ে তিনি গানটি গেয়েছেন।’

৩. একেবারে সানাই!

সাহিত্যিক ‘বনফুল’ তথা শ্রীবলাইচাঁদের এক ছোটোভাই বিশ্বভারতীতে পড়ার জন্য শান্তিনিকেতনে পৌঁছেই কার কাছ থেকে যেন জেনেছিলেন, রবীন্দ্রনাথ কানে একটু কম শোনেন। ফলে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তিনি যখন দেখা করতে গেলেন রবীন্দ্রনাথ বললেন, ‘কী হে, তুমি কি বলাইয়ের ভাই কানাই নাকি?’,

তখন বলাইবাবুর ভাই চেঁচিয়ে জবাব দিলেন, ‘আজ্ঞে না, আমি অরবিন্দ।’

রবীন্দ্রনাথ তখন হেসে উঠে বললেন, ‘না কানাই নয়, এ যে দেখছি একেবারে সানাই!’

৪. তা বলে আট গোল

শান্তিনিকেতনের ছেলেদের সঙ্গে অন্য প্রতিষ্ঠানের ছেলেরা ফুটবল খেলছে। শান্তিনিকেতনের ছেলেরা আট-শূন্য গোলে জিতেছে। সবাই দারুণ খুশি। শুধু রবীন্দ্রনাথ মন্তব্য করলেন, ‘জিতেছে ভালো, তা বলে আট গোল দিতে হবে? ভদ্রতা বলেও তো একটা কথা আছে, নাকি।’

৫. ফকিরকে দান

শান্তিনিকেতনে নতুন একটি ছেলে ভরতি হয়েছে, তার নাম ভাণ্ডারে। ছেলেটির সঙ্গে তখনও রবীন্দ্রনাথের পরিচয় হয়নি। রবীন্দ্রনাথ একদিন শান্তিনিকেতনের পথ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন, তার পরনে দীর্ঘ আলখাল্লা, মাথায় টুপি। ভাণ্ডারে তাঁকে দেখে ছুটে গিয়ে হাতে আধুলি মানে আটআনা পয়সা দিয়ে এল। অন্য ছেলেরা জিজ্ঞাসা করল, ‘গুরুদেবকে তুই কী দিলি?’

‘গুরুদেব কোথায়? ও তো একজন ফকির। মা বলেছে ফকিরকে দান করলে পুণ্যি হয়।’ ভাণ্ডারের সাফ জবাব।

যা-ই হোক, অল্প দিনেই বোঝা গেল ভাণ্ডারে ভীষণ দুরন্ত ছেলে। তার দৌরাত্ম্যে ছাত্র-শিক্ষক সবাই অস্থির। নালিশ গেল গুরুদেবের কাছে। গুরুদেব তাকে ডেকে বললেন, ‘ভাণ্ডারে তুই কত ভালো ছেলে। তুই একবার আমাকে একটা আধুলি দিয়েছিলি। কেউ তো আমাকে একটা পয়সাও কখনও দেয় না। তুই যদি দুরন্তপনা করিস, তা হলে কি চলে?’

গুরুদেবের কথায় ভাণ্ডারের দুষ্টুমি কিছুটা কমেছিল।

৬. দণ্ড নিতে হবে

একবার শান্তিনিকেতনের অধ্যাপক নেপাল রায়কে রবীন্দ্রনাথ লিখে পাঠালেন, ‘আজকাল আপনি কাজে অত্যন্ত ভুল করছেন। এটা খুবই গর্হিত অপরাধ। এ জন্য কাল বিকেলে আমার এখানে এসে আপনাকে দণ্ড নিতে হবে।’

এ কথা শুনে চিন্তিত নেপালবাবু পরের দিন কবির কাছে উপস্থিত হলেন। আগের রাতে দুশ্চিন্তায় তিনি ঘুমোতেও পারেননি। সারা দিন ছটফট করেছেন। কী ভুল করেছেন তিনি! বিকেল হওয়ার আগেই তিনি পৌঁছে গেলেন রবীন্দ্রনাথের কাছে। নেপাল রায় এসেছেন শুনে রবীন্দ্রনাথ একটি মোটা লাঠি হাতে নিয়ে তাঁর সামনে এলেন। নেপালবাবুর তখন ভয়ে অজ্ঞান হওয়ার অবস্থা। তিনি ভাবলেন, এ বার সত্যিই বুঝি তাঁর মাথায় লাঠি পড়বে। কবি তখন সেটি বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, “এই নিন আপনার দণ্ড! সে দিন আপনি এই লাঠিটা মানে এই দণ্ডটা আমার এখানে ফেলে গিয়েছিলেন। তা একদম ভুলে গেছেন।” 

৭. বাঁদোর আছে

এক বার এক ঘরোয়া আসর জমেছে। সবাই হাসি গল্পে মশগুল। রবীন্দ্রনাথ বললেন, এ ঘরে একটা ‘বাঁদোর আছে।’

সবাই এ-ওঁর মুখের দিকে চাওয়াচাওয়ি করছেন। গুরুদেব কাকে বাঁদর বললেন! ঠিক তখনই রবীন্দ্রনাথ বুঝিয়ে দিলেন, ‘এ ঘরে দু’টো দরজা আছে, মানে দোর। একটা ডান দিকে অন্যটা বাম দিকে। তাই বলছিলাম, এ ঘরে একটা বাঁদোর আছে।’

৮. গরু না কি গোরু

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বানান সংস্কারের জন্য একটা কমিটি গঠন করে দিলে সেই কমিটি বাংলা বানানের পুরোনো রীতি পালটে নতুন বানানরীতি চালু করে। এই কমিটি এই কাজ করতে গিয়ে ‘গরু’ বানান নিয়ে সমস্যায় পড়ে। কমিটি ঠিক করে যে ‘গরু’ বানানটি গরু না লিখে ‘গোরু’ লেখা উচিত। কারণ শব্দটির উৎপত্তি সংস্কৃতের ‘গো’ শব্দ থেকে এসেছে। আদিতে ‘ও’ কার, সে জন্য এখানেও ‘ও’ কার থাকা উচিত। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, প্রায় সব বাংলাভাষী লেখক, ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক সবাই ‘ও’ কার ছাড়া গরু বানান লেখেন। কিন্তু কী করা যায়! কমিটির সিদ্ধান্ত হল, এ ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের মত নেওয়া দরকার। দেখা যাক, উনি কী বলেন। কমিটির প্রধান ছিলেন ভাষাবিদ সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়। তাঁর নেতৃত্বে কমিটির লোকজন চলল শান্তিনিকেতনে। সেখানে গিয়ে তাঁরা সাক্ষাৎপ্রার্থী হলেন কবির। কবি তাঁদের আগমনের হেতু জানতে চাইলে তাঁকে বিষয়টি বোঝানো হল। বলা হল, আমরা আপনার মত জানতে এসেছি।

রবীন্দ্রনাথ কথাটা শুনে মৃদু হেসে বললেন, ‘তা তোমাদের ও-কার দিয়ে গরু লেখার ব্যাপারে অন্তত একটা সুবিধেই হবে যে, আমাদের দেশের জীর্ণকায় হাড় জিরজিরে গরুগুলোকে অন্তত একটু মোটা ও তাজা দেখাবে!’

৯. পাত্রী বিভ্রাট

কবিগুরু এক বার কিছু বন্ধুবান্ধব নিয়ে বাংলা মুলুকের বাইরে পাত্রী দেখতে গেলেন। পাত্রী খুব ধনী, সাত লাখ টাকার উত্তরাধিকারী। সে যুগে সাত লাখ টাকা যৌতুক, ভাবা যায়! তিনি যে ঘরে বসে আছেন, সে ঘরে দু’জন অল্পবয়সি মেয়ে এসে বসল। এক জন চুপচাপ, সাধাসিধে, জড়ভরতের মতো এক কোনায় বসে রইল। অন্য মেয়েটি যেমন সুন্দরী, তেমনি চটপটে, স্মার্ট। একটুও জড়তা নেই, সুন্দর ইংরেজি উচ্চারণ। পিয়ানো বাজাল দারুণ। সংগীত নিয়ে জ্ঞানগর্ভ টুকটাক আলোচনাও করল। রবীন্দ্রনাথের খুব পছন্দ হল মেয়েটিকে। এমন সময় বাড়ির কর্তা ঘরে ঢুকে শুভেচ্ছা বিনিময়ের পর মেয়ে দু’টির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। সুন্দরী মেয়েটিকে দেখিয়ে বললেন, ‘হিয়ার ইজ মাই ওয়াইফ।’ আর জড়ভরতকে দেখিয়ে বললেন, ‘হিয়ার ইজ মাই ডটার।’

পাত্রী দেখার দল বিস্ময়ে হতবাক!

১০. পাত্র উপুড়

জীবনের শেষ দিকে এসে রবীন্দ্রনাথ একটু সামনের দিকে ঝুঁকে উবু হয়ে লিখতেন। একদিন তাঁকে ও ভাবে উবু হয়ে লিখতে দেখে তাঁর এক শুভাকাঙ্ক্ষী বলল, ‘আপনার নিশ্চয় ও ভাবে উপুড় হয়ে লিখতে কষ্ট হচ্ছে। বাজারে এখন এ রকম অনেক চেয়ার আছে, যেগুলোতে আপনি হেলান দিয়ে বেশ আয়েশের সঙ্গে লিখতে পারেন। ও রকম একটা আনিয়ে নিলেই তো পারেন।’

লোকটার দিকে খানিকক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে রবীন্দ্রনাথ জবাব দিলেন, ‘তা তো পারি। তবে কি জানো, এখন উপুড় হয়ে না লিখলে কি আর লেখা বেরোয়! পাত্রের জল কমে তলায় ঠেকলে একটু উপুড় তো করতেই হয়।’

আরও পড়তে পারেন

গীতাঞ্জলির রবীন্দ্রনাথ

রবীন্দ্রজীবনে মৃত্যু

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন