জালিয়ানওয়ালা বাগ – শতবর্ষের বেদিমূলে শ্রদ্ধা

0
jallianwalabagh well
এখানেই রয়েছে সেই কুয়ো।

পঙ্কজ চট্টোপাধ্যায়

সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশের পায়ের জুতো আর হাতের চাবুকের ঘা খেয়ে খেয়ে জীবন্মৃত হয়ে পড়ে আছে কী বিশাল দেশ – নাম পরাধীন ভারতবর্ষ। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর  – অত্যাচার আর অত্যাচার। হুকুম, চাবুক, গুলি, ষড়যন্ত্র, গুপ্তহত্যা, বিশ্বাসঘাতকতা। বিদেশি শাসকের সঙ্গী সহযোগী দেশের মীরজাফর-বিভীষণরা।  

জেগে উঠেছে ক্রোধ, প্রতিবাদ, প্রতিরোধের আকাঙ্ক্ষা। শুরু হল সন্ন্যাসী বিদ্রোহ,  সাঁওতাল বিদ্রোহ, সিপাহি বিদ্রোহ, বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন, কুলিমজুরদের বিদ্রোহ, পালকি বেহারাদের বিদ্রোহ  – দেশমাতৃকার পরাধীনতার শৃঙ্খল ছিন্ন করার নানা মরণপণ সংগ্রাম।

এ দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি যখন এই রকম তখন নেমে এল সারা পৃথিবী জুড়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অভিশাপ। সেটা ১৯১৪ সাল। চলল চার বছর। চার দিকে ধ্বংস আর মৃত্যু, পোড়া মাংসের সঙ্গে বারুদের গন্ধ – মানুষের পরিচয় পালটে হয়ে গেল ‘লাশ’।

ব্রিটিশরা তখন ভারতবর্ষের শাসক আর মিত্রশক্তির দলভুক্ত। ব্রিটিশদের পক্ষ থেকে তৎকালীন কংগ্রেস দলকে প্রস্তাব ও প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় যে, তাদের পক্ষ নিয়ে ভারতের সেনারা যুদ্ধে যোগ দিলে যুদ্ধের শেষে ভারতবর্ষকে স্বায়ত্তশাসন দেওয়া হবে। এই প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বাস করে কংগ্রেস দল ও মহাত্মা গান্ধী-সহ দেশনেতারা যুদ্ধে ব্রিটিশদের সমর্থন জানিয়েছিলেন। ১৯১৮ সালে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ব্রিটিশরাজ প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ তো করলই, তার সঙ্গে সঙ্গে যে ভারতীয় সৈন্যরা যুদ্ধে যোগ দিয়েছিল তাদের ‘বেকার’ ঘোষণা করে কাজ থেকে খারিজ করে দিল। যুদ্ধ শেষে সারা দেশে অর্থনৈতিক মন্দা আর দুর্ভিক্ষ দেখা দিল। ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারি মারা গেল এক কোটির বেশি ভারতবাসী। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন জোরদার হল। সেই সময় ব্রিটিশ সরকার এক দিকে ‘মন্টেগু-চেমসফোর্ড শাসন সংস্কার আইন’ করে ভারতবাসীকে ভোলানোর চেষ্টা করতে লাগল, অন্য দিকে রাওলাট আইন করে সরকারবিরোধী সব রকম বিক্ষোভ কড়া হাতে দমন করার পরিকল্পনা করল। ওই আইনের বলে চলল নির্যাতন, বিনা কারণে গ্রেফতার, বিনা বিচারে বন্দি, অন্তরীণ ইত্যাদি।

বছর চারেক আগে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ফেরা মহাত্মা গান্ধী সত্যাগ্রহ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে প্রতিবাদ করলেন। ১৯১৯ সালের এপ্রিলের প্রথম দিকে পঞ্জাব যাওয়ার পথে তাঁকে গ্রেফতার করল ব্রিটিশরা। গর্জে উঠল সারা দেশ। সরকার গান্ধীকে মুক্ত করতে বাধ্য হল। কিন্তু বিক্ষোভ বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়তে লাগল পূর্ব থেকে পশ্চিমে, উত্তর থেকে দক্ষিণে। ধর্মঘট আর বিক্ষোভের লক্ষ্য হয়ে উঠল সরকারি দফতর, যানবাহন, সাদা চামড়া ইংরেজ কর্মকর্তারা আর তাদের এ দেশীয় আমলাদের দল।  

দেশ জুড়ে আন্দোলন চলতে লাগল। ১৯১৯ সালের ৯ এপ্রিল ডঃ সইফুদ্দিন কিচলু এবং সত্যপালকে গ্রেফতার করা হয়। তাঁদের এই গ্রেফতারের প্রতিবাদে পরের দিন ১০ এপ্রিল পঞ্জাবের অমৃতসরে গেট ব্রিজের কাছে সংগঠিত প্রতিবাদ মিছিলের ওপর ব্রিটিশ সরকারের পুলিশ বাহিনী উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে গুলি চালায়। শান্তিপূর্ণ মিছিলে গুলি চালানোর ফলে আগুন জ্বলে উঠল দেশব্যাপী। প্রতিবাদে মুখর হয়ে উঠল দেশের স্বাধীনতাকামী জনসাধারণ। উত্তেজিত এবং ক্রুদ্ধ জনতা পাঁচজন সাহেবকে হত্যা করল। ব্রিটিশ শাসক জারি করল ১৪৪ ধারা। সারা অমৃতসর শহর জুড়ে চলল অবর্ণনীয় অত্যাচার, ধরপাকড়।   

নৃশংসতার সেই দিন – ১৯১৯ সাল ১৩ এপ্রিল – শিখ ধর্মাবলম্বীদের পবিত্র নববর্ষের বৈশাখী উৎসব, বাঙলায় যেমন পয়লা বৈশাখ। ওই দিন বিকেল সাড়ে চারটেয় প্রতিবাদসভার ডাক দেওয়া হয়েছিল অমৃতসর শহরের জালিয়ানওয়ালা বাগে। সেই ডাকে সাড়া দিয়ে বর্ণ-ধর্ম নির্বিশেষে অসংখ্য মানুষ সমবেত হয়েছিল বৈশাখী বিকেলে। হঠাৎ অমৃতসরের তৎকালীন ব্রিটিশ সামরিক কমান্ডার অস্থায়ী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রেগিন্যাল্ড ডায়ার বিভিন্ন বাহিনীর ৯০ জন শিখ, বালুচ, গুর্খা ও রাজপুত সেনা নিয়ে হাজির হলেন অকুস্থলে। এদের মধ্যে ৫০ জনের হাতে ছিল ‘পয়েন্ট থ্রিনটথ্রি এনফিল্ড’ রাইফেল। আর জেনারেল ডায়ারের সঙ্গে ছিল মেশিনগান সংযুক্ত দু’টি সাঁজোয়া গাড়ি। সেই গাড়িগুলি পার্কের প্রবেশ আর বেরোনোর পথে এমন ভাবে রাখা হল যাতে ভেতরের কেউ বেরোতে না পারে।  

তখন পার্কের মধ্যে সমাবেত বহু পুরুষ, মহিলা ও শিশু, – সবাই যে প্রতিবাদসভায় এসেছিলেন তা নয়, বৈশাখীর দিন হরমন্দির সাহেবে প্রণাম করে অনেকেই বাগের উদ্যানে এসেছিলেন বেড়াতে।

কোনো রকম সতর্কীকরণ ছাড়াই জেনারেল ডায়ারের নির্দেশে তাঁর বাহিনী গুলি চালাতে শুরু করল। একটানা দশ মিনিট ধরে চলল গুলি চলল। সে দিন মোট ১৬৫০ রাউন্ড গুলি চলেছিল। রক্তে ভেসে গেল জালিয়ানওয়ালা বাগ-এর মাটি, প্রাণ হারালেন অগণিত মানুষ। উদ্যানের মাঝখানে একটি কুয়ো ছিল। প্রাণ বাঁচাতে সেই কুয়োয় ঝাঁপিয়ে পড়েছিল বহু মানুষ – যাদেরও পরিণাম হয়েছিল মৃত্যু। সেই সংখ্যা আজও অজানা। উদ্যানের পাঁচিল ডিঙিয়ে প্রাণ হাতে করে কয়েক জন পালাতে গেল। তাদেরও গুলি করে মারা হল। চারদিকে আর্তনাদ, কান্নার রোল। মরণযন্ত্রণার কাতরানি। হান্টার কমিশনের রিপোর্ট অনুযায়ী এই হত্যাকাণ্ডে মৃত্যু হয় ৩৭৯ জনের, আহত প্রায় ১৫০০। কিন্তু আদতে নিহতের সংখ্যাটা অনেক বেশি। কংগ্রেসের হিসাবে হাজারেরও বেশি। আর মহাত্মা গান্ধীকে জাতীয়তাবাদী নেতা স্বামী শ্রদ্ধানন্দ জানিয়েছিলেন, মৃতের সংখ্যা ১৫০০-এর মতো। এই হত্যাকাণ্ডের পর পঞ্জাবের লেফটেন্যান্ট গভর্নর স্যার মাইকেল ও’ ডায়ার এক চিঠিতে জেনারেল ডায়ারকে লিখলেন, “আপনি সঠিক কাজ করেছেন। এতে লেফটেন্যান্ট গভর্নরের অনুমোদন আছে।”    

স্তম্ভিত পৃথিবী! হতবাক সভ্যতা! মর্মান্তিক যন্ত্রণায় বিদ্ধ মানুষের হৃদয়। না, এই খবর সঙ্গে সঙ্গে সে দিন সারা পৃথিবী জানতে পারেনি। কারণ সুচতুর ব্রিটিশ শাসক সেই হত্যালীলার নৃশংসতা চাপা দিতে চেয়েছিল পৃথিবীর মানুষের কাছে।  

কিন্তু সত্য কখনওই চাপা থাকে না। অত্যন্ত গোপনে, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সেই ঘটনার সংবাদ এবং ছবি সংগ্রহ করেছিলেন এক জন সংবাদদাতা – নাম গোবর্ধন দাস। সংবাদটি তিনি তখনকার ‘বোম্বে ক্রনিক্যাল’ পত্রিকার সম্পাদক মিস্টার বেঞ্জামিন গাই হর্নিম্যানকে দিলেন। ব্রিটিশ সাংবাদিক হর্নিম্যান সেই খবর পাঠিয়ে দেন লেবার পার্টির মুখপত্র ‘দ্য ডেইলি হেরাল্ড’-এ। এই অপরাধে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারের রোষের শিকার হন গোর্বধন দাস ও মিঃ হর্নিম্যান। তাঁদের কারাবাস হয়। মুক্তির পর হর্নিম্যানকে ভারত ছেড়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।

যাই হোক সেই সংবাদ ততক্ষণে ইংল্যন্ডের ‘ডেইলি হেরাল্ড’-এ প্রকাশ হয়ে গিয়েছে। ব্রিটিশ পার্লামেন্টে উঠল ঝড়। জালিয়ানওয়ালা বাগ হত্যাকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়ল পৃথিবীর নানা দেশে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যালীলার পুঙ্খানুপুক্ষ বিবরণ প্রকাশিত হয়  বি জি হর্নিম্যানের লেখা ‘অমৃতসর অ্যান্ড আওয়ার ডিউটি টু ইন্ডিয়া’ গ্রন্থে (প্রথম প্রকাশ করেন টি ফিশার আনউইন লিমিটেড, লন্ডন, ১৯২৯)।

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, ভারতের সংবাদ মাধ্যমে এই হত্যাকাণ্ডের খবর সে ভাবে প্রকাশিত হয়নি এবং এই ঘটনার বলিষ্ঠ প্রতিবাদও সে ভাবে কেউ করেননি। ব্যতিক্রম শুধু রবীন্দ্রনাথ। তিনি তাঁর প্রিয় বন্ধু মিঃ চার্লস ফ্রেডরিক এন্ড্রুজকে (যিনি দীনবন্ধু এন্ড্রুজ নামে পরিচিত) পাঠালেন মহাত্মা গান্ধীর কাছে। কবিগুরুর ইচ্ছার কথা জানাতে। রবীন্দ্রনাথের ইচ্ছা ছিল – মহাত্মা গান্ধীকে নিয়ে তিনি  জালিয়ানওয়ালা বাগে যাবেন এবং প্রতিবাদ করবেন ব্রিটিশদের এই জঘন্যতম কাজের। এবং আহত আর নিহতদের পরিবারের পাশে দাঁড়াবেন। না, সে দিন গান্ধীজি সম্মত হননি রবীন্দ্রনাথের এই পরিকল্পনায়। কিন্তু কেন?  আসলে স্বায়ত্তশাসন নিয়ে ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে একটা গোলটেবিল বৈঠক হওয়ার কথা চলছে তখন, তাই। কবি চেয়েছিলেন, জালিয়ানওয়ালা বাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে কলকাতায় একটা প্রতিবাদসভা হোক, কংগ্রেসের ডাকে। সেই সভায় তিনি পৌরোহিত্য করবেন। কিন্তু রাষ্ট্রনেতাদের কাছে এ ব্যাপারেও সাড়া পেলেন না তিনি।  

অবশেষে একাকী রবীন্দ্রনাথ। তিনি ঘৃণায় পরিত্যাগ করেছিলেন ব্রিটিশদের দেওয়া সর্বোচ্চ সম্মান ‘নাইট’ উপাধি। ভাইসরয় লর্ড চেমসফোর্ডকে লেখা চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ লিখলেন, “এখন সময় এসেছে, যখন সাম্মানিক খেতাবগুলো অসঙ্গত অপমানের প্রেক্ষিতে আমাদের লজ্জা আরও প্রকট করে তুলেছে।… সমস্ত বিশেষ সম্মান ফেলে দিয়ে আমি আমার দেশের মানুষের পাশে দাঁড়াতে চাই, যাঁরা তাঁদের তথাকথিত গুরুত্বহীনতার জন্য এমন অমর্যাদা সহ্য করতে বাধ্য হচ্ছেন, যা কোনো মানবজাতির পক্ষেই বেমানান… আপনাকে যথোচিত ভাবে দুঃখের সঙ্গে বলছি, আমাকে নাইটহুড খেতাব থেকে মুক্ত করুন…।”    

চিঠি তো নয়, একটি লাঞ্ছিত, অপমানিত মাতৃভুমির স্বদেশাত্মার বলিষ্ঠ প্রতিবাদের অগ্নিস্নাত বাণীরূপ। যার প্রতিটি অক্ষরে অক্ষরে ঝরে পড়েছিল জালিয়ানওয়ালা বাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদের বিরুদ্ধে তীব্র ঘৃণা।

তথ্যসূত্র –

১। আমার জীবন ও ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (১ম খণ্ড) – মুজফফর আহমেদ

২। রাজনীতিতে রবীন্দ্রনাথ  ১৮৭৫-১৯১৯ – বিজলী সরকার 

ছবি: শ্রয়ণ সেন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.