মে দিবসে ছুটি: পথ দেখিয়েছিল কেরল, ২০ বছর পর যুক্ত হয় পশ্চিমবঙ্গের নাম

0

শম্ভু সেন

আজ ১ মে। আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস (International Workers’ Day) বা আন্তর্জাতিক শ্রম দিবস (International Labour Day)। যে নামেই ডাকা হোক না কেন, বিশ্বের নানা প্রান্তে নানা ভাবে পালিত হচ্ছে আজকের দিনটি। আমাদের দেশও তার ব্যতিক্রম নয়।

এ দেশে প্রথম যিনি মে দিবস উদযাপন করেছিলেন তিনি হলেন মালায়াপুরম সিঙ্গারাবেলু। এবং মে দিবসকে ছুটির দিন হিসাবে ঘোষণা করার দাবি তিনিই প্রথম তুলেছিলেন।       

দিনটা ছিল ১ মে ১৯২৩। ওই দিনই সিঙ্গারাবেলু তাঁর ‘লেবার কিষান পার্টি অব হিন্দুস্তান’ গঠন করেন। এর বছর পাঁচেক আগেই অবশ্য দেশের প্রথম ট্রেড ইউনিয়ন গড়ে ফেলেছেন তিনি। সিঙ্গারাবেলু তাঁর দলের প্রতিষ্ঠা দিবস পালনের জন্য আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবসকেই বেছে নিয়েছিলেন। একই দিনে উদযাপিত হল দলের প্রতিষ্ঠা দিবস এবং মে দিবস। এই উপলক্ষ্যে ভারতের মাটিতে প্রথম উড়ল লাল পতাকা।

মে দিবস পালনের জন্য মাদ্রাজ শহরে (অধুনা চেন্নাই) দু’টি জায়গা বেছে নিয়েছিলেন সিঙ্গারাবেলু – একটি, মাদ্রাজ হাইকোর্টের উলটো দিকে মেরিনা বিচে এবং দ্বিতীয়টি, ট্রিপ্লিকেনে। বেশ ভালোই জমায়েত হয়েছিল মে দিবসের সভায়।

এ সম্পর্কে মাদ্রাজ থেকে প্রকাশিত ইংরেজি দৈনিক ‘দ্য হিন্দু’ লিখেছিল – “চেন্নাইয়ে মে দিবস উদযাপনের সূচনা করল লেবার কিষান পার্টি। সভায় পৌরোহিত্য করেন কমরেড সিঙ্গারাবেলু। সভায় গৃহীত এক প্রস্তাবে বলা হয়েছে, সরকারের উচিত মে দিবসকে ছুটির দিন ঘোষণা করা। দলের সভাপতি তাঁর দলের অহিংস নীতির কথা ব্যাখ্যা করেন। আর্থিক সাহায্যের জন্যও অনুরোধ করা হয়। স্বাধীনতা অর্জনের জন্য বিশ্বের সমস্ত শ্রমিকের যে ঐক্যবদ্ধ হওয়া দরকার, সভায় সে কথা জোর দিয়ে বলা হয়।”

এই সিঙ্গারাভেলু সম্পর্কে মুজফ্‌ফর আহ্‌মদ তাঁর আত্মজীবনী ‘আমার জীবন ও ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি’ গ্রন্থে লিখেছেন, “মাদ্রাজে কমিউনিস্ট পার্টি গড়ার কথা বলতে হলে সব কিছুর আগে উল্লেখ করতে হবে মায়লাপুরম সিঙ্গারাভেলু চেট্টিয়ারের নাম। ১৯২২ সালে তাঁর বয়স ৪৭ বছরের মতো ছিল, অন্তত পুলিসের লোকেরা তাই মনে করতেন। আমার মনে হয় পুলিসের অনুমান সত্য নয়। তাঁর বয়স তখন আরও বেশি ছিল। তিনি মাদ্রাজ হাইকোর্টের উকিল ছিলেন। অসহযোগ আন্দোলনের সময় তিনি ওকালতি ছেড়ে দেন। ১৯২২ সালে তিনি মজুর আন্দোলন করতেন।” মুজফ্‌ফর আহ্‌মদের অনুমান ঠিক ছিল। ১৯২২ সালে সিঙ্গারাবেলুর বয়স ছিল ৬২।

সিঙ্গারাবেলুর সম্মানে প্রকাশিত ডাকটিকিট।

এগিয়ে এল কেরল

মে দিবসকে ছুটির দিন হিসাবে ঘোষণা করার যে দাবি সিঙ্গারাভেলু তুলেছিলেন, তা আংশিক ভাবে বাস্তবায়িত হল ৩৪ বছর পর, ভারত স্বাধীন হওয়ার ১০ বছর পর। পথ দেখাল কেরল।

১৯৫৭ সালের আগে পর্যন্ত ভারতের কোনো রাজ্যেই ১ মে ছুটি থাকত না। আন্তর্জাতিক শ্রম দিবসে সরকারি ভাবে প্রথম ছুটির দিন ঘোষণা করা হয় কেরলে, যখন ইএমএস নাম্বুদিরিপাদের নেতৃত্বে কমিউনিস্ট পার্টি রাজ্যের শাসনক্ষমতায় আসে। ভারতের কোনো অঙ্গ রাজ্যে সেই প্রথম কমিউনিস্টরা নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে। সেই প্রথম শ্রম দিবসকে ভারতে সরকারি ভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

২০ বছর পর পশ্চিমবঙ্গ

এর পর ১ মে-কে সরকারি ছুটির দিন হিসাবে ঘোষণা করার তালিকায় যুক্ত হয় পশ্চিমবঙ্গের নাম। স্বাধীনতার পর প্রথম ২০ বছর রাজ্যের শাসনক্ষমতায় ছিল কংগ্রেস। ডা. বিধানচন্দ্র রায়ের প্রয়াণের পর প্রফুল্লচন্দ্র সেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হন। তাঁর আমলে ১৯৬৬-তে খাদ্য আন্দোলনে উত্তাল হয়ে ওঠে রাজ্য। তারই ফলশ্রুতিতে কংগ্রেস দল দু’ ভাগ হয়ে যায়। অজয় মুখার্জি কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে এসে ‘বাংলা কংগ্রেস’ গঠন করেন।

১৯৬৭-এর নির্বাচনে রাজ্যের বিরোধী দলগুলি কংগ্রেসের বিরুদ্ধে দু’টি জোট গঠন করে। একটি সিপিআইয়ের নেতৃত্বাধীন পিপলস্‌ ইউনাইটেড লেফট্‌ ফ্রন্ট তথা পিইউএলএফ আর অন্যটি সিপিআইএম-এর নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড লেফট্‌ ফ্রন্ট তথা ইউএলএফ। অজয়বাবুর ‘বাংলা কংগ্রেস’ প্রথমোক্ত জোটে শামিল হয়। ভোটে দু’টি জোটের কেউই গরিষ্ঠতা না পেলেও সামগ্রিক ফলে তাদের মোট আসনসংখ্যা ছাপিয়ে গেল কংগ্রেসকে। রাজ্যের ক্ষমতা থেকে হটে গেল কংগ্রেস। ক্ষমতায় এল বিরোধীদের সম্মিলিত জোট যুক্তফ্রন্ট।

সেই যুক্তফ্রন্ট সরকারের মুখ্যমন্ত্রী হলেন অজয় মুখার্জি। সিপিআইএম ভোটে সব চেয়ে বেশি আসন জিতলেও বিরোধী ঐক্যের স্বার্থে দলের নেতা জ্যোতি বসু উপ-মুখ্যমন্ত্রী হলেন। মূলত জ্যোতি বসু এবং তৎকালীন শ্রমমন্ত্রী এসইউসিআই দলের সুবোধ ব্যানার্জির উদ্যোগে অজয় মুখার্জির সরকার ১ মে সরকারি ছুটির দিন ঘোষণা করে। সেই থেকে আন্তর্জাতিক শ্রম দিবস পশ্চিমবঙ্গে ছুটির দিন হিসাবে পালিত হয়ে আসছে।

এর পর ভারতের বেশ কিছু রাজ্য আন্তর্জাতিক শ্রম দিবসে সরকারি ছুটির দিন ঘোষণা করে। এই তালিকায় একে একে যুক্ত হল ত্রিপুরা, বিহার, ওড়িশা, অসম, ঝাড়খণ্ড, মণিপুর, গোয়া, কেরল, তামিলনাড়ু ও কর্নাটকের নাম।

ছবি twitter থেকে নেওয়া।

অন্যান্য রাজ্যের ছবি

রাজস্থানের ছবিটা একটু অন্য রকম। সেখানে ১ মে গেজেটেড ছুটি নয়। কিন্তু রাজ্যের শ্রম দফতর মে দিবসে ছুটি দেওয়ার জন্য নিয়োগকর্তাদের প্রতি ‘আবেদন’ জানান। এটা নেহাতই আবেদন, আইনত বাধ্যতামূলক নয়। তবে বেশির ভাগ নিয়োগকর্তাই সেই আবেদনে সাড়া দেন।

ওড়িশায় সমস্ত সরকারি অফিস খোলা থাকে। তবে রাজ্য সরকার পরিচালিত শিল্পকারখানাগুলির বেশির ভাগ বন্ধ থাকে। তবে এর জন্য কোনো গেজেট বিজ্ঞপ্তি জারি হয় না।  

গুজরাত ও মহারাষ্ট্রেও ১ মে ছুটি থাকে। তবে তার কারণ ভিন্ন। ১৯৬০ সালের ১ মে ওই তৎকালীন বোম্বে রাজ্য ভেঙে দুই রাজ্যের জন্ম হয়েছিল। তাই ওই দিন গুজরাত ও মহারাষ্ট্রে সরকারি ভাবে ঘোষিত ছুটির দিন।

আরও পড়তে পারেন

সাহিত্য সম্মাননা থেকে পুস্তক প্রকাশ, ‘বনপলাশি’র বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠানে এক মনোজ্ঞ সন্ধ্যা

একটি উত্তরণ: এক অজানা প্রণম্য কাহিনি

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন