Connect with us

প্রবন্ধ

তৃণমূল-বধে তিন নতুন অস্ত্রে শান বিজেপির

দুর্গাপুজো, ফুটবল এবং টলিউড। ২০২১-এর লক্ষ্য ছুঁতে বঙ্গ-বিজেপির নতুন তিন ক্ষেত্র। ঘুরে দেখলেন আরাত্রিকা রায়

শেষ লোকসভা ভোটে পশ্চিমবঙ্গের প্রায় অর্ধেকের কাছাকাছি আসনে জিতে অধিক-উৎসাহী হয়ে উঠেছে বিজেপি। রাজ্যের ক্ষমতাসীন তৃণমূলের মোকাবিলায় সর্বাত্মক ভাবে এগিয়ে চলেছে গেরুয়া শিবির। বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি বা ফুটবল ক্লাব অথবা দুর্গাপুজো, এমনকি কলকাতা হাইকোর্টের আইনজীবীদের সংগঠনের নিয়ন্ত্রণ, সর্বত্রই আক্রমণাত্মক বিজেপি প্রায় সমস্ত রকম কৌশলে তৃণমূলের সঙ্গে সমানে-সামনে টক্কর দিতে চাইছে। লক্ষ্য একটাই – ২০২১ রাজ্য বিধানসভা নির্বাচন।

পুজো রাজনীতি

চলতি মাসের শুরুর দিক থেকেই আসন্ন দুর্গাপুজোর তোড়জোড় শুরু হয়ে গিয়েছে। কলকাতার ছোটো-বড়ো পুজো উদ্যোক্তারা খুঁটিপুজো শুরু করেছেন ঢাক-ঢোল পিটিয়ে। রাজ্যের প্রায় সমস্ত পুজো কমিটির মাথায় রয়েছেন শাসকদলের নেতা-মন্ত্রীরা। সেই জায়গায় থাবা বসানোর পরিকল্পনা এঁটেছেন বিজেপি নেতা মুকুল রায়। সম্প্রতি দক্ষিণ কলকাতার একটি প্রেক্ষাগৃহে দলের সাংসদ-বিধায়কদের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠকে সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত আলোচনা করেন বলে জানা যায়।

তথ্য-পরিসংখ্যান পকেটে নিয়ে ঘোরা অভ্যেস মুকুলের। ওই বৈঠকে তিনি পরিসংখ্যান দিয়ে দলের প্রতিনিধিদের জানিয়েছেন, কোন দুর্গাপুজো কমিটিতে প্রভাব কোন তৃণমূল নেতার, কোন নেতার প্রভাব ক্রমশ কমছে, কী ভাবে সেখানে বিজেপির প্রভাব বাড়ানো যাবে ইত্যাদি বিষয়ে। সমসাময়িক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তৃণমূলের রাশ আলগা হওয়া কমিটিগুলোকে দখলে নিয়ে আসাই যে বিজেপির লক্ষ্য, সেটাও স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দিয়েছেন মুকুল।

সূত্র মারফত খবর ওই বৈঠকে তিনি বলেন, “রাজ্যে প্রায় ৪২ হাজার বারোয়ারি দুর্গাপুজো হয়। এখন যা পরিস্থিতি, তাতে মেরে-কেটে হাজার দুয়েক পুজো কমিটিতে তৃণমূলের প্রভাব আছে। বাকি পুজো কমিটিগুলির দিকে আমাদের সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে হবে।” তবে কলকাতা এবং শহরতলির নাম-ডাকওয়ালা পুজো কমিটিগুলিতে প্রভাব বিস্তারেই বেশি করে মনোনিবেশ করার দলীয় নির্দেশ দিল্লি থেকে এসেছে বলেও শোনা যাচ্ছে। বাঙালির শারদোৎসবকে পুঁজি করে বিধানসভা ভোটের পর বিজয়োৎসবে মেতে ওঠার পথ পরিষ্কারে মনোনিবেশ করেছেন দিল্লি নেতারাও।

দুর্গাপুজোর রাজনীতিকে হাতিয়ার করায় আগ্রহ দেখাচ্ছেন খোদ নরেন্দ্র মোদী। বিজেপির বঙ্গ-ব্রিগেড সূত্রে খবর, প্রধানমন্ত্রী তাদের নির্দেশ দিয়েছেন, বাংলার বিভিন্ন জায়গার দুর্গাপুজোর রাশ এ বার যেন গেরুয়া শিবিরের হাতে থাকে।

রাজ্য বিজেপির সাধারণ সম্পাদক সায়ন্তন বসু বলেন, “আমরা কিছু পুজো সংগঠকের সঙ্গে আলোচনা করেছি যাতে এ বারে দুর্গাপুজো উদ্বোধনে অমিত শাহ এবং অন্যান্য কেন্দ্রীয় মন্ত্রীকেও আমরা নিয়ে আসতে পারি। দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে মানুষের কাছে পৌঁছোতে হবে, এমনটাই বার্তা দিয়েছেন আমাদের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব।”

ফুটবল রাজনীতি

১৩ জুন, ২০১৭, বিজেপি দেশের প্রাচীনতম দু’টি ফুটবল ক্লাব, মোহনবাগান এবং ইস্টবেঙ্গলকে চিঠি দেয়। ওই চিঠিতে গেরুয়া শিবির কলকাতার দুই ক্লাবকে জানায়, তাদের ‘কোনো রকম’ সাহায্য করতে পারলে তারা নিজেরা ‘গর্বিত’ হবে। সে সময়, ক্লাবগুলি দু’টি বড়োসড়ো ইস্যু নিয়ে লড়াই করছিল – প্রথমত, ইন্ডিয়ান সুপার লিগে (আইএসএল) খেলা এবং আই লিগের তাৎপর্য ক্রমহ্রাসমান হওয়ার জটিলতা। যে কারণে তখন দু’টি ক্লাবের কেউই বিজেপির চিঠিতে সাড়া দেয়নি।

তবে ছবিটা এখন অনেকটাই পালটে গিয়েছে। এ মাসের শুরুতেই মোহনবাগান এবং ইস্টবেঙ্গল-সহ আই লিগের শীর্ষস্থানীয় ছয়টি ক্লাব প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে তাদের অস্তিত্বের সংকট নিয়ে চিঠি দিয়েছিল। আইএসএল দেশের অন্যতম বড়ো প্রতিযোগিতা হিসাবে বিকশিত হয়েছে। চিঠি হাতে পাওয়ার পর পরই প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে বিজেপির পশ্চিমবঙ্গের কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষক কৈলাস বিজয়বর্গীয় ক্লাবগুলির সঙ্গে বৈঠক করেন।

উল্লেখযোগ্য ভাবে, মোহনবাগান ক্লাবে রয়েছেন তৃণমূলের মন্ত্রী, দুই প্রাক্তন সাংসদ এব মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাই। জানা যায়, ওই বৈঠকে এক প্রাক্তন সাংসদও হাজির ছিলেন। তবে ক্লাবের পক্ষ থেকে স্পষ্ট ভাবেই জানানো হয়েছে, কোনো রাজনীতি নয়, ক্লাব এবং ফুটবলের উন্নয়নের জন্যই তারা এগিয়ে চলেছে।

বৈঠক প্রসঙ্গে কৈলাস জানিয়েছেন, “আমরা উভয় ক্লাবের সমস্যা নিয়ে কথা বলেছি। আমরা কেন্দ্রীয় ক্রীড়ামন্ত্রী এবং ক্লাবগুলির মধ্যে একটি বৈঠকের ব্যবস্থা করার চেষ্টা করছি। তাদের সমস্যাগুলি সমাধানের জন্য সমস্ত উদ্যোগ নেওয়া হবে।” মোহনবাগানের অর্থসচিব দেবাশিস দত্তের বক্তব্য, “আমাদের একমাত্র ধর্ম ফুটবল। আমরা যা কিছু করেছি তা ক্লাবকে বাঁচানোর জন্য। আমরা কোনো রাজনৈতিক দলের সভাপতিকে চিঠি দিইনি। আমরা এই দেশের প্রধানমন্ত্রীকে লিখেছি।”

টলিউড রাজনীতি

দিল্লিতে গিয়ে এক ডজনের বেশি টলিউডজীবী যোগ দিয়েছেন বিজেপিতে। তারও আগে বাংলা চলচ্চিত্রশিল্পের শিল্পী এবং টেকনিসিয়ানদের স্বার্থরক্ষায় এক জোড়া নতুন সংগঠনের দরজা খুলেছে গেরুয়া শিবির। সেই সংগঠনের দ্বন্দ্ব, অথবা সংগঠনে যোগ দেওয়া নিয়ে যতই বিতর্ক থাক না কেন, ফিল্মিপাড়ায় খবরে রয়েছে বিজেপি। কেউ চাইছেন ন্যায্য কাজের অধিকার, কেউ চাইছেন টলিউডে দুই তৃণমূল নেতার একাধিপত্য খর্ব হোক অথবা কেউ চাইছেন রাজ্যে পরিবর্তনের পরিবর্তন হোক। এমন সব দাবি সামনে রেখেই বিজেপিতে নাম লেখাচ্ছেন টলিপাড়ার কলাকুশলীরা। আদতে সেটাই কি কারণ?

বিদগ্ধজনেরা বলছেন, আসলে টলিউডে সে অর্থে কাজ নেই। বড়ো পর্দার বড়ো ছবি হচ্ছে হাতে গোনা, কাজ পাচ্ছেন নামমাত্র ক’ জন। আর বাকিদের অধিকাংশটা নির্ভর করে রয়েছে টেলিভিশনে। স্বাভাবিক ভাবেই এক দিকে কাজের অভাব, অন্য দিকে বিজেপির ক্রমবর্ধমান প্রভাব। দুইয়ে মিলে রাজনৈতিক নীতি-আদর্শের কথা শিকেয় তুলে ভাত জোগাড়ের নিশ্চয়তা পেতেই টলিউডের শিল্পীরা ঝাঁপ দিচ্ছেন পদ্ম-পুকুরে।

তা যা-ই হোক, সমালোচকরা অনেক কথাই বলেন এবং বলবেন। কিন্তু বিজেপিতে অভিনেতা-অভিনেত্রীদের ঘনঘটা অনেক আগেই। শেষ লোকসভা ভোটে দলের প্রার্থী হয়েছিলেন লকেট চট্টোপাধ্যায়, জয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো অভিনেতারা। লকেট হুগলি থেকে জিতে সংসদে গিয়েছেন। তবে তাঁদেরও একটা রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ড রয়েছে। কিন্তু জলের তোড়ের মতো এখন যাঁরা আসছেন তাঁরা যে ২০২১ বিধানসভা ভোটের দিকে তাকিয়েই বিজেপির নৌকায় উঠছেন, তা ভাবার আর কোনো বিকল্প কী আছে!

প্রবন্ধ

গীতিকার প্রণব রায়ের প্রয়াণবার্ষিকীতে সশ্রদ্ধ প্রণাম

আজ থেকে ঠিক ৪৫ বছর আগে এমনই এক ৭ আগস্টে প্রয়াত হয়েছিলেন তিনি।

শুভদীপ রায় চৌধুরী

“…প্রভাতে কে আর মনে রাখে বলো রজনী শেষের চাঁদে,/ শুধু দুদিনের সাথীরে কে আর মালার বাঁধনে বাঁধে।।…”

আজ ৭ আগস্ট। কবি ও গীতিকার প্রণব রায়ের (Pranab Roy) প্রয়াণবার্ষিকী। আজ থেকে ঠিক ৪৫ বছর আগে এমনই এক ৭ আগস্টে প্রয়াত হয়েছিলেন তিনি।

প্রণব রায়ের জন্ম ১৯১১ সালের ৫ ডিসেম্বর, প্রখ্যাত সাবর্ণ রায় চৌধুরী পরিবারে। সাবর্ণ পরিবারের সুসন্তান প্রণব রায়ের রচিত প্রায় সাড়ে তিন হাজার গান রয়েছে যা বাংলা আধুনিক গানের ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে।

ছাত্রাবস্থায় ‘কমরেড’ শীর্ষক কবিতা লেখায় তাঁকে কারাবাসও করতে হয়, তবুও তাঁর সৃষ্টি থেমে থাকেনি। কাজী নজরুল ইসলামের ভাবশিষ্য প্রণব রায় ব্রাহ্ম বয়েজ স্কুল থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সিটি কলেজে ভর্তি হন। ছেলেবেলা থেকেই সাহিত্যের নেশা ছিল তাঁর। ‘বিশ্বদূত’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর ‘কমরেড’ কবিতাটি। গীতিকার হওয়ার প্রেরণা পেয়েছিলেন কাজী নজরুলের কাছ থেকে। তাঁর বহু রচনায় কাজী নজরুল সুরও করেছিলেন।

ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য ও মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের রেকর্ড করা প্রথম গানের রচয়িতা প্রণব রায়। এ ছাড়া যূথিকা রায়ের কণ্ঠে আধুনিক গানের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া ‘সাঁঝের তারকা আমি’ ও ‘আমি ভোরের যূথিকা’ গান দু’টির রচয়িতাও তিনি। ১৯৩৪ সালে গীতিকবি প্রণব রায়ের প্রথম গান রেকর্ড হয় কাজী নজরুলের তত্ত্বাবধানে। ১৯৩৬ সালে ‘পণ্ডিতমশাই’ ছায়াছবিতে প্রথম আত্মপ্রকাশ করেন গীতিকার প্রণব রায়। তাঁর প্রথম গানটি কমল দাশগুপ্তের সুরে এবং ভবানী দাসের কণ্ঠে রেকর্ড করা হয়।

প্রথম গল্পগীতি লেখেন প্রণব রায়। জগন্ময় মিত্রের কণ্ঠে গাওয়া তাঁর লেখা গল্পগীতি ‘চিঠি’, ‘সাতটি বছর আগে পরে’ ব্যাপক জনপ্রিয় হয়েছিল। তাঁর গীতিকবিতার প্রতিটি ছন্দে জীবনের সূক্ষ সূক্ষ অনুভূতি ধরা পড়ত, যার অধিকাংশই তিনি রচনা করেছিলেন বাংলা চলচিত্রের জন্য। প্রায় তিনশোটি ছবির গান লিখেছিলেন তিনি। ছবির পরিবেশের সঙ্গে সাযুজ্য রেখেই গান রচনা করতেন। এমনকি তিরিশ থেকে চল্লিশের দশকে গীতিকবিতার রচয়িতা হিসাবে রবীন্দ্রনাথ, কাজী নজরুলের সঙ্গে একত্রে উচ্চারিত হত তাঁর নাম।

ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যের কণ্ঠে এবং শৈলেন দাশগুপ্তের সুরে প্রণব রায় লিখেছিলেন ‘কেন দিলে এত গান’, রবীন চট্টোপাধ্যায়ের সুরে লিখেছিলেন ‘মনের দুয়ার খুলে কে’, সুবল দাশগুপ্তের সুরে লিখেছিলেন ‘যদি ভুলে যাও মোরে’। এ ছাড়াও লিখেছিলেন ‘সে বুঝি ফিরে গেছে’, ‘কোথায় হারালো দিন’, ‘নিশিরাত বাঁকা চাঁদ আকাশে’, ‘মধুর আমার মায়ের হাসি’, “চম্পা চামেলি গোলাপেরই বাগে’, ‘আমার সোনা চাঁদের কণা’ ইত্যাদি অসংখ্য গান। সুরকার দুর্গা সেনের সুরে লিখেছিলেন ‘যে গান হল না গাওয়া’, ১৯৪২ সালে শৈলেন দাশগুপ্তের সুরে লিখেছিলেন ‘সেদিন মাধবী রাতে’, ১৯৪৫ সালে কমল দাশগুপ্তের সুরে লিখেছিলেন ‘কণ্ঠে আমার নিশিদিন’ ইত্যাদি।

শুধু গীতিকারই নন, বহুমুখী প্রতিভার মানুষ ছিলেন প্রণব রায়। চিত্রনাট্যকার, কাহিনিকার হিসাবেও কাজ করেছেন তিনি। ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় ও জহর রায় অভিনীত বিখ্যাত কমেডি ‘ভানু গোয়েন্দা জহর অ্যাসিস্টেন্ট’-এর কাহিনি রচনা করেছিলেন প্রণব রায়।

অনেকেরই জানা নেই হয়তো, রহস্য-রোমাঞ্চ বা ভৌতিক গল্প রচনাতেও তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত। অতীত দিনের রহস্য-সাহিত্যে জনপ্রিয় পত্রিকা ‘রোমাঞ্চ’ এবং অন্যান্য পত্রিকায় তাঁর নিয়মিত লেখা প্রকাশিত হত।

গীতিকার, চিত্রনাট্যকার, কাহিনিকার প্রণব রায়ের আরেকটা পরিচয় ছিল – তিনি ছিলেন সাংবাদিক। বছরখানেক কাজ করেছিলেন ‘বসুমতী’ পত্রিকায় বার্তা সম্পাদক হিসাবে। ব্রিটিশবিরোধী পত্রিকা ‘নাগরিক’-এর সম্পাদক ছিলেন তিনি।

ব্যক্তিগত জীবনে প্রণব রায় ছিলেন খুব কম কথার মানুষ। বাংলা সংস্কৃতি জগতের এই প্রতিভাধর মানুষটির প্রতি রইল অনেক শ্রদ্ধা।

Continue Reading

প্রবন্ধ

শ্রাবণের এই রাখিপূর্ণিমাতেই জন্মেছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণ-শিষ্য স্বামী নিরঞ্জনানন্দ

শুভদীপ রায় চৌধুরী

সময়টা ১৮৮১-৮২ সালের কোনো এক দিন। দক্ষিণেশ্বরে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণকে দর্শন করতে হাজির কলকাতার এক যুবক। বয়স ১৮-১৯। ঠাকুর সে সময় থাকতেন দক্ষিণেশ্বরে রানি রাসমণির প্রতিষ্ঠিত কালীবাড়িতে। তাঁর অদ্ভুত ঈশ্বরনির্ভর জীবন ও সহজ সরল ব্যবহার তখনকার কলকাতার অনেকেই জানতেন এবং তাতে আকৃষ্ট হয়ে তাঁর কাছে ছুটে আসতেন। লোকমুখে ঠাকুরের কথা শুনে সেই যুবকও তাঁকে দর্শন করবেন বলে দক্ষিণেশ্বরে এসেছেন। দেখলেন ঠাকুর ভক্তপরিবেষ্টিত হয়ে রয়েছেন। সন্ধে হতেই ভক্তরা একে একে চলে গেলে ঠাকুর তাঁর ভবিষ্যতের প্রিয় শিষ্যকে পাশে বসিয়ে অনেক কথা বললেন, যেন কত দিনের চেনা। ভবিষ্যতের সেই প্রিয় শিষ্য হলেন নিত্যনিরঞ্জন ঘোষ তথা স্বামী নিরঞ্জনানন্দ।   

তাঁর তরুণ ভক্তের শক্তি ভুল পথে ব্যয়িত হচ্ছে দেখে শ্রীরামকৃষ্ণ চিন্তিত হলেন। বললেন, “দ্যাখ নিরঞ্জন, ভূত ভূত করলে তুই ভূত হয়ে যাবি, আর ভগবান ভগবান করলে ভগবান হবি। তা কোনটা হওয়া ভালো?” নিরঞ্জন সরল ভাবেই উত্তর দিলেন, তা ভগবান হওয়াই ভালো।

ঠাকুর কেন হঠাৎ সে দিন নিরঞ্জনের ভূত-সঙ্গের কথা পেড়েছিলেন? একটু পেছনে ফিরে যাওয়া যাক।  

উচ্চ আধ্যাত্মিক শক্তিসম্পন্ন নিত্যনিরঞ্জন ১২৬৯ বঙ্গাব্দের (১৮৬২ খ্রিস্টাব্দ) শ্রাবণ পূর্ণিমার দিন রাজারহাট-বিষ্ণুপুরে জন্মগ্রহণ করেন। বর্তমানে এই অঞ্চলটি কলকাতার মধ্যে অবস্থিত হলেও অতীতে এটি অবিভক্ত চব্বিশ পরগনার একটি গ্রাম ছিল। নিত্যনিরঞ্জনের বাবার নাম ছিল অম্বিকাচরণ ঘোষ। বারাসতের পণ্ডিত কালীকৃষ্ণ মিত্র ছিলেন নিরঞ্জনের মামা। মাতুলের কলকাতাস্থ বাড়িতে থেকে নিরঞ্জন লেখাপড়া করতেন।

স্বামী নিরঞ্জনানন্দ।

শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে আসার আগে নিরঞ্জন আহিরীটোলানিবাসী ডাক্তার প্যারীচাঁদ মিত্রের বাড়িতে একটি প্রেততত্ত্বান্বেষী দলের সঙ্গে পরিচিত হন। তারা নিরঞ্জনকে ভূত নামানোর মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার করত। এই ভাবে ভূতুড়েদের দলে যাতায়াত করতে করতে একটি ঘটনায় নিরঞ্জনের মনে বৈরাগ্যের সঞ্চার হয়। দীর্ঘ ১৮ বছর অনিদ্রায় ভোগার পর জনৈক ধনী ব্যক্তি নিরঞ্জনের শরণাপন্ন হন। নিরঞ্জন পরে বলেছিলেন, তাঁকে ওই ভাবে দারুণ কষ্ট পেতে দেখে তাঁর মনে হয়েছিল, তা হলে আর এত ধনসম্পত্তির কী প্রয়োজন।

বৈরাগ্য থেকেই নিরঞ্জনের মনে আধ্যাত্মিক রাজ্যের দ্বার খুলে গিয়েছিল। তত দিনে শুনেছেন ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের কথা। তাঁর অতুলনীয় ভগবৎপ্রেম ও আকর্ষণীয় উপদেশের কথা তখন লোকের মুখে মুখে প্রচার হচ্ছে। নিরঞ্জন ছুটে এলেন দক্ষিণেশ্বরে। সে দিন নিরঞ্জনকে ভুতুড়েসঙ্গ ত্যাগ করতে বলেছিলেন ঠাকুর এবং নিরঞ্জনে সেই সঙ্গ ত্যাগ করেছিলেন।

এর কয়েক দিন পরে নিরঞ্জন আবার এলেন দক্ষিণেশ্বরে। ঠাকুর ছুটে এসে জড়িয়ে ধরলেন তাঁকে, বললেন, “ওরে নিরঞ্জন, দিন যে যায়রে – তুই ভগবান লাভ করবি কবে? দিন যে চলে যায়, ভগবানকে লাভ না করলে সবই যে বৃথা যাবে। তুই কবে তাঁকে লাভ করবি বল, কবে তাঁর পাদপদ্মে মন দিবি বল? আমি যে তাই ভেবে আকুল!” নিরঞ্জন অবাক হয়ে ভাবলেন, ইনি কে? আমার ভগবানলাভ হচ্ছে না বলে, দিন চলে যাচ্ছে বলে আমার জন্য এঁর এত আর্তি কেন? পরের জন্য এ কি অহৈতুকী ভালোবাসা! নিরঞ্জন এ রহস্য ভেদ করতে পারলেন না বটে, কিন্তু ঠাকুরের এই আবেগভরা কথায় তাঁর হৃদয় বিগলিত হল। সে দিন আর কলকাতায় ফিরে যেতে পারলেন না তিনি। সেই দিন তো ছার, পর পর তিন দিন নিরঞ্জন থেকে গেলেন দক্ষিণেশ্বরে।

নিরঞ্জনের সরলতা ঠাকুরকে প্রথম থেকেই মুগ্ধ করেছিল। একদিন শ্রীম তথা মাস্টারমশায়কে ঠাকুর বলেছিলেন, “তোমায় নিরঞ্জনের সঙ্গে দেখা করতে বলছি কেন? সে সরল ইহা সত্য কি না, এইটি দেখবে বলে।” ১৮৮৪-এর ১৫ জুন কাঁকুড়গাছিতে সুরেন্দ্রনাথ মিত্রের বাগানবাড়িতে এক মহোৎসবে যোগ দেন ঠাকুর। এক সময় নিরঞ্জন এসে ঠাকুরকে ভূমিষ্ঠ হয়ে প্রণাম করলেন। ঠাকুর তাঁকে দেখেই উঠে দাঁড়ালেন, বললেন, “তুই এসেছিস।” কাছেই ছিলেন মাস্টার (শ্রীম)। নিরঞ্জনকে দেখিয়ে তাঁকে বললেন,  “দেখ, এ ছোকরাটি বড় সরল। সরলতা পূর্বজন্মে অনেক তপস্যা না করলে হয় না। কপটতা পাটোয়ারী এসব থাকতে ঈশ্বরকে পাওয়া যায় না।”

নিরঞ্জনের সরলতা ও বৈরাগ্যের জন্য ঠাকুর তাঁর প্রতি অত্যন্ত স্নেহপরায়ণ ছিলেন। একদিন এই প্রসঙ্গে ঠাকুর বলেছিলেন, “দেখছ না নিরঞ্জনকে? তোর এই নে, আমার এই দে”- ব্যস, আর কোন সম্পর্ক নাই। পেছু টান নাই।”

নিরঞ্জনের স্বভাবে কিছুটা উগ্র ভাব থাকলেও তিনি ছিলেন খুবই সাহসী। আর ভেতরে ভেতরে ছিলেন কোমল প্রকৃতির এক মানুষ, অত্যন্ত সেবাপরায়ণ। ঠাকুরের দেহত্যাগের পর নরেন্দ্রনাথ-সহ গুরুভাইরা যখন আঁটপুরে যান তখন নিরঞ্জনও গিয়েছিলেন। স্নান করতে গিয়ে একদিন সারদাপ্রসন্ন (পরবর্তী কালে স্বামী ত্রিগুণাতীতানন্দ) পুকুরে ডুবে যাচ্ছিলেন। তখন প্রাণের মায়া ত্যাগ করে নিরঞ্জন পুকুরে ঝাঁপিয়ে পড়ে তাঁকে উদ্ধার করেন। ১৮৮৮ সালে লাটু মহারাজের নিউমোনিয়া হলে নিরঞ্জন মহারাজ তাঁর সেবার দায়িত্ব নিয়েছিলেন। ভক্তপ্রবর বলরামবাবুর শেষ অসুখের সময়ও নিরঞ্জন প্রাণ ঢেলে তাঁর সেবা করেছিলেন।

গুরুভাইদের সঙ্গে স্বামী নিরঞ্জনানন্দ (একেবারে ডান দিকে)।

১৮৮৭ সালের প্রথম দিকে বরানগরে অন্য গুরুভ্রাতাদের সঙ্গে নিরঞ্জনও সন্ন্যাস গ্রহণ করেন। স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর নাম রাখেন ‘স্বামী নিরঞ্জনানন্দ’। সন্ন্যাস গ্রহণের পরেই তিনি শ্রীক্ষেত্র পুরীধামে গিয়ে ৮ এপ্রিল মঠে ফিরে আসেন। এর পর ১৮৮৯-এর নভেম্বরে আবার বেরিয়ে পড়েন স্বামী নিরঞ্জনানন্দ। প্রথমে দেওঘরে বৈদ্যনাথ দর্শন করেন। তার পর সেখান থেকে কাশীতে যান এবং বংশীদত্তের বাড়িতে কিছু দিন থেকে তপস্যা করেন। এ সময় তিনি মাধুকরী ভিক্ষা করে খেতেন। এরই মধ্যে স্বামী যোগানন্দের অসুস্থতার সংবাদ পেয়ে তিনি প্রয়াগে যান। সেই সুযোগে স্বামী নিরঞ্জনানন্দের কল্পবাসও হয়। পরে উত্তর ভারতের আরও কিছু তীর্থদর্শনে বেরিয়ে পড়েন তিনি এবং কোনো কোনো জায়গায় তপস্যাও করেন।  

কালীকিঙ্কর বোস তখনও স্বামী বিরজানন্দ হননি। ১৮৯১-৯২ সালে তখন তাঁর বয়স ১৮-১৯, বরানগর মঠে যাতায়াত শুরু করেছেন। সেই সময় নিরঞ্জন মহারাজকে প্রায়ই দেখতেন দক্ষিণেশ্বরের যেতে। সেখানে পঞ্চবটীতলায় ও ঠাকুরের ঘরে ধ্যান করতেন তিনি। মাঝেমধ্যে কালীকিঙ্করও তাঁর সঙ্গী হতেন। ১৮৯৩ সালে স্বামী নিরঞ্জনানন্দ আবার তীর্থদর্শনে এবং তপস্যার জন্য বেরিয়ে পড়লেন। ১৮৯৫ সালের প্রথম দিকে ঠাকুরের জন্মোৎসবের আগে তিনি আলমবাজার মঠে ফিরে আসেন।

স্বামী নিরঞ্জনানন্দ খুবই শৃঙ্খলাপরায়ণ ছিলেন। খবর পেলেন স্বামী বিবেকানন্দ বিশ্ব জয় করে ১৮৯৬-এর শেষ দিকে পশ্চিমের দেশ থেকে ভারতের উদ্দেশে রওনা হবেন। সেই খবর পেয়ে নিরঞ্জন মহারাজ বিশ্ববিজয়ী গুরুভাইকে অভ্যর্থনা জানাতে কলম্বো রওনা দেন। পরের বছর ১৫ জানুয়ারি স্বামীজি মহারাজ জাহাজ থেকে নামলে সর্ব প্রথম তাঁকে অভ্যর্থনা জানান নিরঞ্জন মহারাজ।

শুধুমাত্র ঠাকুরই নন, সারদাজননীর প্রতিও স্বামী নিরঞ্জনানন্দের অগাধ শ্রদ্ধাভক্তি ছিল। ঠাকুরের অদর্শনের পর শ্রীমাই ছিলেন তাঁর আশ্রয়স্থল। সবাইকে এই কথা মুক্তকণ্ঠে জানাতে দ্বিধাও করতেন না। অনেককে এই আশ্রয়ে তিনি পৌঁছেও দিয়েছেন। মা যে কেবল গুরুপত্নীই নন, তিনি যে জগজ্জননী আদ্যাশক্তি, এ কথা তিনি সর্ব সমক্ষে প্রচার করতেন।

১৯৫৩ সালের ২৪ আগস্ট স্বামী শিবানন্দ মহারাজের শিষ্য স্বামী সংশুদ্ধানন্দ মহারাজ কয়েক জন সন্ন্যাসী ও গৃহীভক্তকে নিয়ে রাজারহাট-বিষ্ণুপুরের ঘোষবাড়িতে আসেন। চণ্ডীমণ্ডপের ঠিক পূর্ব দিকের ঘরটিতে নিরঞ্জন ভূমিষ্ট হয়েছিলেন বলেই জানা যায়। সেই স্থানটিকে চিহ্নিত করে সেখানে ঠাকুর-মা-স্বামীজি ও স্বামী নিরঞ্জনানন্দের পট স্থাপন করে সকলে প্রণাম নিবেদন করেন। এর পর স্থানীয় ভক্তদের কঠোর পরিশ্রমে ‘শ্রীরামকৃষ্ণ-নিরঞ্জনানন্দ আশ্রম’-এর সূত্রপাত হয় ১৯৫৪ সালে। তখন বাৎসরিক উৎসব হত চণ্ডীমণ্ডপে ও আটচালায়।

ঘোষ পরিবারের মণিভূষণ ঘোষ দু’ শতক জমি আশ্রমকে দান করেন। সন্ন্যাসগ্রহণের পর নিরঞ্জন মহারাজ যখন শেষ বার আটচালায় এসেছিলেন সেই ঘটনার সাক্ষী ছিলেন মণিভূষণ ঘোষ মহাশয়। ১৯৮৬ সালের ২২ জুন স্নানযাত্রার দিন আশ্রমের নবনির্মিত মন্দিরের দ্বার উদ্ঘাটন করেন রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের পূজ্যপাদ শ্রীমৎ স্বামী ভূতেশানন্দজি।

নিরঞ্জন সম্পর্কে ঠাকুর বলেছিলেন, “ঈশ্বরকোটি, রামচন্দ্রের অংশে জন্ম।” রাখি পূর্ণিমার পুণ্য লগ্নে সেই পুণ্যপুরুষ স্বামী নিরঞ্জনানন্দের প্রতি রইল আমাদের প্রণাম।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার:

শ্রীরামকৃষ্ণ-ভক্তমালিকা – স্বামী গম্ভীরানন্দ

বিশ্বচেতনায় শ্রীরামকৃষ্ণ – সম্পাদনায় স্বামী প্রমেয়ানন্দ, নলিনীরঞ্জন চট্টোপাধ্যায় ও স্বামী চৈতন্যানন্দ

শ্রীম কথিত শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত

Continue Reading

প্রবন্ধ

যোগকেন্দ্র-জিম খোলার এটাই কি যথার্থ সময়?

অনুমতি দিয়েছে কেন্দ্র। সব কিছুই যখন একে একে খুলছে, তা হলে যোগকেন্দ্র অথবা জিম সেন্টার কেন নয়? লিখলেন ত্রিশিরা তঙ্কাদার

৫ আগস্ট থেকে যোগকেন্দ্র এবং জিম খোলার শর্তসাপেক্ষ অনুমোদন দিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। কোভিড-১৯ মহামারি (Covid-19 pandemic) পরিস্থিতিতে তৃতীয় ধাপের আনলক-এ শরীরচর্চার অন্যতম কেন্দ্রগুলি খোলার অনুমতি দেওয়ার পরেও দোটানায় ভুগছেন সেখানকার কর্তৃপক্ষ এবং সেখানে গিয়ে শরীরচর্চাকারী সদস্যরাও।

লকডাউনের জেরে বদ্ধঘরে থাকতে থাকতে এক দিকে যেমন স্থবিরতা আসছে শরীরে, তেমনই জড়তা জড়িয়ে ধরছে মনকেও। ঘরে বসে যতই শরীরচর্চা করা হোক না কেন, কেন্দ্রের মতো প্রশিক্ষকের তত্ত্বাবধান এবং যথোপযুক্ত পরিবেশ বাড়িতে অমিল। সারা পৃথিবীতে এমন কয়েক লক্ষ মানুষ রয়েছেন, যাঁরা ওষুধের পাশাপাশি শরীরচর্চাকেও রোগ থেকে সুস্থ হয়ে ওঠার উপাদান হিসেবে মেনে চলেন। ফলে করোনাভাইরাস সংক্রমণের জেরে যোগকেন্দ্র অথবা জিমে না যেতে পারার কারণে তাঁদের শারীরিক পরিস্থিতির অবনতি হওয়াটাই স্বাভাবিক। সঙ্গে মানসিক বিষণ্ণতা তো রয়েইছে। কিন্তু করোনা আক্রান্তের সংখ্যা যখন ক্রমশ বাড়ছে, তখন এই কেন্দ্রগুলি খুলে দেওয়া হলে উল্টো ফল যদি হয়!

এ ধরনের কেন্দ্রগুলি মূলত বদ্ধঘরেই হয়ে থাকে। বিশেষজ্ঞরা আবার বলছেন, বদ্ধঘরে এক জনের থেকে আর এক জনের শরীরে ভাইরাস সংক্রমণ ছড়ানোর সম্ভাবনা বেশি। ফলে কোনো উপসর্গহীন আক্রান্ত আগাম না বুঝেই যদি কেন্দ্রে আসেন, সে ক্ষেত্রে তাঁর থেকে অন্য কারো সংক্রামিত হওয়ার সম্ভাবনা থেকেই যায়। এ ক্ষেত্রে শর্ত হিসেবে শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখার বিষয়টিতেও সমান ভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রটির দরজা-জানলা খোলা রেখে আয়তনের তুলনায় কতজন সদস্যকে অনুমতি দেওয়া হবে, সেটাও দেখার বিষয়।

অন্য দিকে মাস্ক পরার বিষয়টিতে এখন সবমহলের তরফে সব থেকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু যোগ অথবা জিমের ক্ষেত্রে মাস্ক পরা অবস্থায় শরীরচর্চা করা কতটা যুক্তযঙ্গত, তা নিয়েও বিশেষজ্ঞ মহল একমত হতে পারছে না। ব্যায়ামের সঙ্গে শ্বাস-প্রশ্বাসের ওঠানামার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। ফলে শ্বাস-প্রশ্বাসে বাধার সৃষ্টি করতে পারে, এমন কোনো মাস্ক পরে ব্যায়াম করলে হিতে বিপরীত হতে পারে কি না, সেটা নিয়েও চলছে জোর আলোচনা।

এ ব্যাপারে চলে আসছে আমেরিকা প্রসঙ্গও। আক্রান্তের সংখ্যা যখন চূড়োর দিকে দৌড়োচ্ছে, তখন জর্জিয়া, ওকলাহোমার বেশ কিছু জিম সদস্যদের জন্য দরজা খুলে দেয়। কিন্তু কিছু দিনের মধ্যেই দেখা যায়, সংক্রমণ ছড়ানোর উৎস হয়ে উঠছে সেগুলি। কারণ, এ ধরনের কেন্দ্রগুলিতে যতই স্যানিটাইজেশন করা হোক না কেন, সর্বক্ষণ শারীরিক দূরত্ব, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা মুশকিলের কাজ। সেখানকার সরঞ্জামগুলো একাধিক ব্যক্তি ব্যবহার করেন। অন্য দিকে হংকং কিন্তু করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবে জিমের দরজা সম্পূর্ণ ভাবে বন্ধ করে দেয়।

তবে কেন্দ্রীয় সরকার যখন অনুমোদন দিয়েছে, তখন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শের পরই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তা এক প্রকার নিশ্চিত। একটি মহল এমনও বলছে, দোকান-বাজার, গণপরিবহণ যখন সব কিছুই খোলা, তখন যোগ-জিম সেন্টার আর কী দোষ করল!

হু কী বলছে?

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) সাম্প্রতিক একটি পর্যবেক্ষণে জানিয়েছে, বায়ু চলাচল অবরুদ্ধ কোনো ভিড়যুক্ত স্থান কোনো আক্রান্তের থেকে অন্যের শরীরে ভাইরাস সংক্রমণের সম্ভাবনা এড়িয়ে যাওয়া যায় না।

একই সঙ্গে বলা হয়েছে, বদ্ধঘরের বিষয়টি ব্যতিরেকেও আরও একটি অন্যতম কারণ, শরীরচর্চার সময় গভীর শ্বাস-প্রশ্বাস। গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে সংক্রমণ ছড়ানোর সম্ভাবনা থেকে যায়। এমনিতেই ড্রপলেটের মাধ্যমে ভাইরাসের বেশকিছুটা দূরত্ব অগ্রসর হওয়ার প্রমাণও মিলেছে। ফলে জিমে গিয়ে আধঘণ্টা থেকে একঘণ্টা সময় অতিবাহিত করার বিষয়টিতে আশঙ্কা থেকে যেতে পারে।

আবার একই সঙ্গে সংস্থা দাবি করেছে, কোনো প্রাপ্তবয়স্কের ক্ষেত্রে আধঘণ্টার শরীরচর্চা অনাক্রম্যতা বজায় রাখতে সহায়ক।

সংকট বাড়ছে জিম-মালিকদের

কেন্দ্রীয় নির্দেশিকা জারির পর উত্তরপ্রদেশ এবং হরিয়ানার মতো রাজ্য সরকারগুলিও আগামী ৫ আগস্ট থেকে জিম খোলার শর্তসাপেক্ষ অনুমোদন দিয়েছে।

জিম-মালিকরা বলছেন, মহামারিতে চরম আর্থিক লোকসানের মুখে পড়েছেন তাঁরা। এমনিতে মাস চারেক সম্পূর্ণ বন্ধ, তার উপর বকেয়া বিল মেটানোরও কোনো লক্ষণ নেই। বাড়িভাড়া-সহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয় বহন করতে হচ্ছে। যোগ অথবা জিমের প্রশিক্ষকরা অনলাইনে প্রশিক্ষণ দিলেও সেখান থেকে আয় নামমাত্র।

এমন পরিস্থিতিতে অন্যান্য ক্ষেত্রের মতোই তাঁরা স্বাস্থ্যবিধি মেনে কেন্দ্রগুলি চালু করতে আগ্রহী। কেউ কেউ স্থির করেছেন, কোনো সদস্যকে জিমে ঘুরে বেড়ানোর অনুমতি দেওয়া হবে না। প্রতিটি সদস্যকে সুতির মাস্ক এবং গ্লাভস দেওয়া হবে এবং প্রশিক্ষকরা পিপিই কিট পরে থাকবেন। এ ক্ষেত্রে জিমের মালিকরা নির্দিষ্ট সময়ে উপস্থিত সদস্য সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাখতে অনলাইনে রেজিস্টার ব্যবস্থাও চালু করছেন। তবে তাঁদের এই উদ্যোগে সদস্যরা কতটা আগ্রহ দেখাবেন, সেটাই মূল প্রশ্ন।

Continue Reading
Advertisement
Advertisement
দেশ34 mins ago

সাড়ে আট কোটি কৃষকের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ১৭,১০০ কোটি টাকা পাঠালেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী

দেশ4 hours ago

করোনাভাইরাস: ২১ লক্ষ ছাড়াল আক্রান্তের সংখ্যা, বাড়ল সুস্থতার হার

দেশ4 hours ago

কোভিড আপডেট: নতুন করে আক্রান্ত ৬৪৩৯৯, সুস্থ ৫৩৮৭৯

দেশ5 hours ago

অন্ধ্রপ্রদেশের কোভিড কেয়ার সেন্টারে আগুন, মৃত কমপক্ষে ৭ রোগী

বিনোদন5 hours ago

মহামারির আবহে নতুন রূপে এল ‘একলা চলো রে’

বিনোদন6 hours ago

হাসপাতালে ভরতি সঞ্জয় দত্ত, তবে করোনা নেগেটিভ

রাজ্য6 hours ago

বেসরকারি হাসপাতালে ভরতির সময় অগ্রিমের পরিমাণ বেঁধে দিল রাজ্য স্বাস্থ্য কমিশন

দেশ13 hours ago

বাংলাদেশের উন্নয়ন মানেই ভারতের উন্নয়ন, বললেন বাংলাদেশের বিদেশমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন

দেশ4 hours ago

কোভিড আপডেট: নতুন করে আক্রান্ত ৬৪৩৯৯, সুস্থ ৫৩৮৭৯

দেশ1 day ago

বিমান দুর্ঘটনা লাইভ: উদ্ধার ব্ল্যাক বক্স, উদ্ধারকারীদের কোয়ারান্টাইনে যাওয়ার নির্দেশ শৈলজার

দেশ2 days ago

১ সেপ্টেম্বর থেকেই স্কুলের ঘণ্টা বাজানোর কেন্দ্রীয় প্রস্তুতি

গাড়ি ও বাইক3 days ago

চলতি মাসে যে ৫টি নতুন মোটর বাইক বাজারে আসছে

কলকাতা1 day ago

ঢাকায় পথদুর্ঘটনায় নিহত পর্বতারোহী, শোকস্তব্ধ কলকাতার পাহাড়প্রেমীরা

প্রযুক্তি3 days ago

হ্যাকার এবং সাইবার অপরাধীরা করোনার সুযোগ নিচ্ছে : বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা

রাজ্য3 days ago

রাজ্যে প্রথম বার এক দিনে ২৫ হাজার টেস্ট, আক্রান্তের সংখ্যায় রেকর্ড হলেও সুস্থতার হারে স্বস্তি

বিজ্ঞান3 days ago

করোনা রোগীর মৃত্যুর ঝুঁকি কমাতে প্লাজমা থেরাপির কোনো ভূমিকা নেই, বলেছে এইমসের অন্তর্বর্তী বিশ্লেষণ

রবিবারের খবর অনলাইন

কেনাকাটা

কেনাকাটা3 days ago

ঘর ও রান্নাঘরের সরঞ্জাম কিনতে চান? অ্যামাজন প্রাইম ডিলে রয়েছে ৫০% পর্যন্ত ছাড়

খবরঅনলাইন ডেস্ক : অ্যামাজন প্রাইম ডিলে রয়েছে ঘর আর রান্না ঘরের একাধিক সামগ্রিতে প্রচুর ছাড়। এই সেলে পাওয়া যাচ্ছে ওয়াটার...

কেনাকাটা3 days ago

এই ১০টির মধ্যে আপনার প্রয়োজনীয় প্রোডাক্টটি প্রাইম ডে সেলে কিনতে পারেন

খবরঅনলাইন ডেস্ক : চলছে অ্যামাজনের প্রাইমডে সেল। প্রচুর সামগ্রীর ওপর রয়েছে অনেক ছাড়। ৬ ও ৭  তারিখ চলবে এই সেল।...

কেনাকাটা4 days ago

শুরু হল অ্যামাজন প্রাইম ডে সেল, জেনে নিন কোন জিনিসে কত ছাড়

খবরঅনলাইন ডেস্: শুরু হল অ্যামাজন প্রাইম ডে সেল। চলবে ২ দিন। চলতি মাসের ৬ ও ৭ তারিখ থাকছে এই অফার।...

things things
কেনাকাটা1 week ago

করোনা আতঙ্ক? ঘরে বাইরে এই ১০টি জিনিস আপনাকে সুবিধে দেবেই দেবে

খবরঅনলাইন ডেস্ক : করোনা পরিস্থিতিতে ঘরে এবং বাইরে নানাবিধ সাবধানতা অবলম্বন করতেই হচ্ছে। আগামী বেশ কয়েক মাস এই নিয়মই অব্যাহত...

কেনাকাটা2 weeks ago

মশার জ্বালায় জেরবার? এই ১৪টি যন্ত্র রুখে দিতে পারে মশাকে

খবরঅনলাইন ডেস্ক: একে করোনা তায় আবার ডেঙ্গুর প্রকোপ শুরু হয়েছে। এই সময় প্রতি বারই মশার উৎপাত খুবই বাড়ে। এই বারেও...

rakhi rakhi
কেনাকাটা2 weeks ago

লকডাউন! রাখির দারুণ এই উপহারগুলি কিন্তু বাড়ি বসেই কিনতে পারেন

সামনেই রাখি। কিন্তু লকডাউনের মধ্যে মনের মতো উপহার কেনা একটা বড়ো ঝক্কি। কিন্তু সেই সমস্যা সমাধান করতে পারে অ্যামাজন। অ্যামাজনের...

কেনাকাটা3 weeks ago

অনলাইনে পড়াশুনা চলছে? ল্যাপটপ কিনবেন? দেখে নিন ৪০ হাজার টাকার নীচে ৬টি ল্যাপটপ

ইনটেল প্রসেসর সহ কোন ল্যাপটপ আপনার অনলাইন পড়াশুনার কাজে লাগবে জেনে নিন।

কেনাকাটা3 weeks ago

করোনা-কালে ঘরে রাখতে পারেন ডিজিটাল অক্সিমিটার, এই ১০টির মধ্যে থেকে একটি বেছে নিতে পারেন

শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা বুঝতে সাহায্য করে এই অক্সিমিটার।

কেনাকাটা3 weeks ago

লকডাউনে সামনেই রাখি, কোথা থেকে কিনবেন? অ্যামাজন দিচ্ছে দারুণ গিফট কম্বো অফার

খবরঅনলাইন ডেস্ক : সামনেই রাখি। কিন্তু লকডাউনের মধ্যে দোকানে গিয়ে রাখি, উপহার কেনা খুবই সমস্যার কথা। কিন্তু তা হলে উপায়...

laptop laptop
কেনাকাটা4 weeks ago

ল্যাপটপ কিনবেন? দেখে নিন ২৫ হাজার টাকার মধ্যে এই ৫টি ল্যাপটপ

খবরঅনলাইন ডেস্ক : কোভিভ ১৯ অতিমারির প্রকোপে বিশ্ব জুড়ে চলছে লকডাউন ও ওয়ার্ক ফ্রম হোম। অনেকেই অফিস থেকে ল্যাপটপ পেয়েছেন।...

নজরে

Click To Expand