তৃণমূল-বধে তিন নতুন অস্ত্রে শান বিজেপির

0
প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি

দুর্গাপুজো, ফুটবল এবং টলিউড। ২০২১-এর লক্ষ্য ছুঁতে বঙ্গ-বিজেপির নতুন তিন ক্ষেত্র। ঘুরে দেখলেন আরাত্রিকা রায়

শেষ লোকসভা ভোটে পশ্চিমবঙ্গের প্রায় অর্ধেকের কাছাকাছি আসনে জিতে অধিক-উৎসাহী হয়ে উঠেছে বিজেপি। রাজ্যের ক্ষমতাসীন তৃণমূলের মোকাবিলায় সর্বাত্মক ভাবে এগিয়ে চলেছে গেরুয়া শিবির। বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি বা ফুটবল ক্লাব অথবা দুর্গাপুজো, এমনকি কলকাতা হাইকোর্টের আইনজীবীদের সংগঠনের নিয়ন্ত্রণ, সর্বত্রই আক্রমণাত্মক বিজেপি প্রায় সমস্ত রকম কৌশলে তৃণমূলের সঙ্গে সমানে-সামনে টক্কর দিতে চাইছে। লক্ষ্য একটাই – ২০২১ রাজ্য বিধানসভা নির্বাচন।

পুজো রাজনীতি

চলতি মাসের শুরুর দিক থেকেই আসন্ন দুর্গাপুজোর তোড়জোড় শুরু হয়ে গিয়েছে। কলকাতার ছোটো-বড়ো পুজো উদ্যোক্তারা খুঁটিপুজো শুরু করেছেন ঢাক-ঢোল পিটিয়ে। রাজ্যের প্রায় সমস্ত পুজো কমিটির মাথায় রয়েছেন শাসকদলের নেতা-মন্ত্রীরা। সেই জায়গায় থাবা বসানোর পরিকল্পনা এঁটেছেন বিজেপি নেতা মুকুল রায়। সম্প্রতি দক্ষিণ কলকাতার একটি প্রেক্ষাগৃহে দলের সাংসদ-বিধায়কদের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠকে সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত আলোচনা করেন বলে জানা যায়।

তথ্য-পরিসংখ্যান পকেটে নিয়ে ঘোরা অভ্যেস মুকুলের। ওই বৈঠকে তিনি পরিসংখ্যান দিয়ে দলের প্রতিনিধিদের জানিয়েছেন, কোন দুর্গাপুজো কমিটিতে প্রভাব কোন তৃণমূল নেতার, কোন নেতার প্রভাব ক্রমশ কমছে, কী ভাবে সেখানে বিজেপির প্রভাব বাড়ানো যাবে ইত্যাদি বিষয়ে। সমসাময়িক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তৃণমূলের রাশ আলগা হওয়া কমিটিগুলোকে দখলে নিয়ে আসাই যে বিজেপির লক্ষ্য, সেটাও স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দিয়েছেন মুকুল।

সূত্র মারফত খবর ওই বৈঠকে তিনি বলেন, “রাজ্যে প্রায় ৪২ হাজার বারোয়ারি দুর্গাপুজো হয়। এখন যা পরিস্থিতি, তাতে মেরে-কেটে হাজার দুয়েক পুজো কমিটিতে তৃণমূলের প্রভাব আছে। বাকি পুজো কমিটিগুলির দিকে আমাদের সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে হবে।” তবে কলকাতা এবং শহরতলির নাম-ডাকওয়ালা পুজো কমিটিগুলিতে প্রভাব বিস্তারেই বেশি করে মনোনিবেশ করার দলীয় নির্দেশ দিল্লি থেকে এসেছে বলেও শোনা যাচ্ছে। বাঙালির শারদোৎসবকে পুঁজি করে বিধানসভা ভোটের পর বিজয়োৎসবে মেতে ওঠার পথ পরিষ্কারে মনোনিবেশ করেছেন দিল্লি নেতারাও।

দুর্গাপুজোর রাজনীতিকে হাতিয়ার করায় আগ্রহ দেখাচ্ছেন খোদ নরেন্দ্র মোদী। বিজেপির বঙ্গ-ব্রিগেড সূত্রে খবর, প্রধানমন্ত্রী তাদের নির্দেশ দিয়েছেন, বাংলার বিভিন্ন জায়গার দুর্গাপুজোর রাশ এ বার যেন গেরুয়া শিবিরের হাতে থাকে।

রাজ্য বিজেপির সাধারণ সম্পাদক সায়ন্তন বসু বলেন, “আমরা কিছু পুজো সংগঠকের সঙ্গে আলোচনা করেছি যাতে এ বারে দুর্গাপুজো উদ্বোধনে অমিত শাহ এবং অন্যান্য কেন্দ্রীয় মন্ত্রীকেও আমরা নিয়ে আসতে পারি। দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে মানুষের কাছে পৌঁছোতে হবে, এমনটাই বার্তা দিয়েছেন আমাদের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব।”

ফুটবল রাজনীতি

১৩ জুন, ২০১৭, বিজেপি দেশের প্রাচীনতম দু’টি ফুটবল ক্লাব, মোহনবাগান এবং ইস্টবেঙ্গলকে চিঠি দেয়। ওই চিঠিতে গেরুয়া শিবির কলকাতার দুই ক্লাবকে জানায়, তাদের ‘কোনো রকম’ সাহায্য করতে পারলে তারা নিজেরা ‘গর্বিত’ হবে। সে সময়, ক্লাবগুলি দু’টি বড়োসড়ো ইস্যু নিয়ে লড়াই করছিল – প্রথমত, ইন্ডিয়ান সুপার লিগে (আইএসএল) খেলা এবং আই লিগের তাৎপর্য ক্রমহ্রাসমান হওয়ার জটিলতা। যে কারণে তখন দু’টি ক্লাবের কেউই বিজেপির চিঠিতে সাড়া দেয়নি।

তবে ছবিটা এখন অনেকটাই পালটে গিয়েছে। এ মাসের শুরুতেই মোহনবাগান এবং ইস্টবেঙ্গল-সহ আই লিগের শীর্ষস্থানীয় ছয়টি ক্লাব প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে তাদের অস্তিত্বের সংকট নিয়ে চিঠি দিয়েছিল। আইএসএল দেশের অন্যতম বড়ো প্রতিযোগিতা হিসাবে বিকশিত হয়েছে। চিঠি হাতে পাওয়ার পর পরই প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে বিজেপির পশ্চিমবঙ্গের কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষক কৈলাস বিজয়বর্গীয় ক্লাবগুলির সঙ্গে বৈঠক করেন।

উল্লেখযোগ্য ভাবে, মোহনবাগান ক্লাবে রয়েছেন তৃণমূলের মন্ত্রী, দুই প্রাক্তন সাংসদ এব মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাই। জানা যায়, ওই বৈঠকে এক প্রাক্তন সাংসদও হাজির ছিলেন। তবে ক্লাবের পক্ষ থেকে স্পষ্ট ভাবেই জানানো হয়েছে, কোনো রাজনীতি নয়, ক্লাব এবং ফুটবলের উন্নয়নের জন্যই তারা এগিয়ে চলেছে।

বৈঠক প্রসঙ্গে কৈলাস জানিয়েছেন, “আমরা উভয় ক্লাবের সমস্যা নিয়ে কথা বলেছি। আমরা কেন্দ্রীয় ক্রীড়ামন্ত্রী এবং ক্লাবগুলির মধ্যে একটি বৈঠকের ব্যবস্থা করার চেষ্টা করছি। তাদের সমস্যাগুলি সমাধানের জন্য সমস্ত উদ্যোগ নেওয়া হবে।” মোহনবাগানের অর্থসচিব দেবাশিস দত্তের বক্তব্য, “আমাদের একমাত্র ধর্ম ফুটবল। আমরা যা কিছু করেছি তা ক্লাবকে বাঁচানোর জন্য। আমরা কোনো রাজনৈতিক দলের সভাপতিকে চিঠি দিইনি। আমরা এই দেশের প্রধানমন্ত্রীকে লিখেছি।”

টলিউড রাজনীতি

দিল্লিতে গিয়ে এক ডজনের বেশি টলিউডজীবী যোগ দিয়েছেন বিজেপিতে। তারও আগে বাংলা চলচ্চিত্রশিল্পের শিল্পী এবং টেকনিসিয়ানদের স্বার্থরক্ষায় এক জোড়া নতুন সংগঠনের দরজা খুলেছে গেরুয়া শিবির। সেই সংগঠনের দ্বন্দ্ব, অথবা সংগঠনে যোগ দেওয়া নিয়ে যতই বিতর্ক থাক না কেন, ফিল্মিপাড়ায় খবরে রয়েছে বিজেপি। কেউ চাইছেন ন্যায্য কাজের অধিকার, কেউ চাইছেন টলিউডে দুই তৃণমূল নেতার একাধিপত্য খর্ব হোক অথবা কেউ চাইছেন রাজ্যে পরিবর্তনের পরিবর্তন হোক। এমন সব দাবি সামনে রেখেই বিজেপিতে নাম লেখাচ্ছেন টলিপাড়ার কলাকুশলীরা। আদতে সেটাই কি কারণ?

বিদগ্ধজনেরা বলছেন, আসলে টলিউডে সে অর্থে কাজ নেই। বড়ো পর্দার বড়ো ছবি হচ্ছে হাতে গোনা, কাজ পাচ্ছেন নামমাত্র ক’ জন। আর বাকিদের অধিকাংশটা নির্ভর করে রয়েছে টেলিভিশনে। স্বাভাবিক ভাবেই এক দিকে কাজের অভাব, অন্য দিকে বিজেপির ক্রমবর্ধমান প্রভাব। দুইয়ে মিলে রাজনৈতিক নীতি-আদর্শের কথা শিকেয় তুলে ভাত জোগাড়ের নিশ্চয়তা পেতেই টলিউডের শিল্পীরা ঝাঁপ দিচ্ছেন পদ্ম-পুকুরে।

তা যা-ই হোক, সমালোচকরা অনেক কথাই বলেন এবং বলবেন। কিন্তু বিজেপিতে অভিনেতা-অভিনেত্রীদের ঘনঘটা অনেক আগেই। শেষ লোকসভা ভোটে দলের প্রার্থী হয়েছিলেন লকেট চট্টোপাধ্যায়, জয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো অভিনেতারা। লকেট হুগলি থেকে জিতে সংসদে গিয়েছেন। তবে তাঁদেরও একটা রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ড রয়েছে। কিন্তু জলের তোড়ের মতো এখন যাঁরা আসছেন তাঁরা যে ২০২১ বিধানসভা ভোটের দিকে তাকিয়েই বিজেপির নৌকায় উঠছেন, তা ভাবার আর কোনো বিকল্প কী আছে!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here