Connect with us

প্রবন্ধ

তৃণমূল-বধে তিন নতুন অস্ত্রে শান বিজেপির

Published

on

দুর্গাপুজো, ফুটবল এবং টলিউড। ২০২১-এর লক্ষ্য ছুঁতে বঙ্গ-বিজেপির নতুন তিন ক্ষেত্র। ঘুরে দেখলেন আরাত্রিকা রায়

শেষ লোকসভা ভোটে পশ্চিমবঙ্গের প্রায় অর্ধেকের কাছাকাছি আসনে জিতে অধিক-উৎসাহী হয়ে উঠেছে বিজেপি। রাজ্যের ক্ষমতাসীন তৃণমূলের মোকাবিলায় সর্বাত্মক ভাবে এগিয়ে চলেছে গেরুয়া শিবির। বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি বা ফুটবল ক্লাব অথবা দুর্গাপুজো, এমনকি কলকাতা হাইকোর্টের আইনজীবীদের সংগঠনের নিয়ন্ত্রণ, সর্বত্রই আক্রমণাত্মক বিজেপি প্রায় সমস্ত রকম কৌশলে তৃণমূলের সঙ্গে সমানে-সামনে টক্কর দিতে চাইছে। লক্ষ্য একটাই – ২০২১ রাজ্য বিধানসভা নির্বাচন।

Loading videos...

পুজো রাজনীতি

চলতি মাসের শুরুর দিক থেকেই আসন্ন দুর্গাপুজোর তোড়জোড় শুরু হয়ে গিয়েছে। কলকাতার ছোটো-বড়ো পুজো উদ্যোক্তারা খুঁটিপুজো শুরু করেছেন ঢাক-ঢোল পিটিয়ে। রাজ্যের প্রায় সমস্ত পুজো কমিটির মাথায় রয়েছেন শাসকদলের নেতা-মন্ত্রীরা। সেই জায়গায় থাবা বসানোর পরিকল্পনা এঁটেছেন বিজেপি নেতা মুকুল রায়। সম্প্রতি দক্ষিণ কলকাতার একটি প্রেক্ষাগৃহে দলের সাংসদ-বিধায়কদের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠকে সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত আলোচনা করেন বলে জানা যায়।

তথ্য-পরিসংখ্যান পকেটে নিয়ে ঘোরা অভ্যেস মুকুলের। ওই বৈঠকে তিনি পরিসংখ্যান দিয়ে দলের প্রতিনিধিদের জানিয়েছেন, কোন দুর্গাপুজো কমিটিতে প্রভাব কোন তৃণমূল নেতার, কোন নেতার প্রভাব ক্রমশ কমছে, কী ভাবে সেখানে বিজেপির প্রভাব বাড়ানো যাবে ইত্যাদি বিষয়ে। সমসাময়িক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তৃণমূলের রাশ আলগা হওয়া কমিটিগুলোকে দখলে নিয়ে আসাই যে বিজেপির লক্ষ্য, সেটাও স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দিয়েছেন মুকুল।

সূত্র মারফত খবর ওই বৈঠকে তিনি বলেন, “রাজ্যে প্রায় ৪২ হাজার বারোয়ারি দুর্গাপুজো হয়। এখন যা পরিস্থিতি, তাতে মেরে-কেটে হাজার দুয়েক পুজো কমিটিতে তৃণমূলের প্রভাব আছে। বাকি পুজো কমিটিগুলির দিকে আমাদের সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে হবে।” তবে কলকাতা এবং শহরতলির নাম-ডাকওয়ালা পুজো কমিটিগুলিতে প্রভাব বিস্তারেই বেশি করে মনোনিবেশ করার দলীয় নির্দেশ দিল্লি থেকে এসেছে বলেও শোনা যাচ্ছে। বাঙালির শারদোৎসবকে পুঁজি করে বিধানসভা ভোটের পর বিজয়োৎসবে মেতে ওঠার পথ পরিষ্কারে মনোনিবেশ করেছেন দিল্লি নেতারাও।

দুর্গাপুজোর রাজনীতিকে হাতিয়ার করায় আগ্রহ দেখাচ্ছেন খোদ নরেন্দ্র মোদী। বিজেপির বঙ্গ-ব্রিগেড সূত্রে খবর, প্রধানমন্ত্রী তাদের নির্দেশ দিয়েছেন, বাংলার বিভিন্ন জায়গার দুর্গাপুজোর রাশ এ বার যেন গেরুয়া শিবিরের হাতে থাকে।

রাজ্য বিজেপির সাধারণ সম্পাদক সায়ন্তন বসু বলেন, “আমরা কিছু পুজো সংগঠকের সঙ্গে আলোচনা করেছি যাতে এ বারে দুর্গাপুজো উদ্বোধনে অমিত শাহ এবং অন্যান্য কেন্দ্রীয় মন্ত্রীকেও আমরা নিয়ে আসতে পারি। দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে মানুষের কাছে পৌঁছোতে হবে, এমনটাই বার্তা দিয়েছেন আমাদের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব।”

ফুটবল রাজনীতি

১৩ জুন, ২০১৭, বিজেপি দেশের প্রাচীনতম দু’টি ফুটবল ক্লাব, মোহনবাগান এবং ইস্টবেঙ্গলকে চিঠি দেয়। ওই চিঠিতে গেরুয়া শিবির কলকাতার দুই ক্লাবকে জানায়, তাদের ‘কোনো রকম’ সাহায্য করতে পারলে তারা নিজেরা ‘গর্বিত’ হবে। সে সময়, ক্লাবগুলি দু’টি বড়োসড়ো ইস্যু নিয়ে লড়াই করছিল – প্রথমত, ইন্ডিয়ান সুপার লিগে (আইএসএল) খেলা এবং আই লিগের তাৎপর্য ক্রমহ্রাসমান হওয়ার জটিলতা। যে কারণে তখন দু’টি ক্লাবের কেউই বিজেপির চিঠিতে সাড়া দেয়নি।

তবে ছবিটা এখন অনেকটাই পালটে গিয়েছে। এ মাসের শুরুতেই মোহনবাগান এবং ইস্টবেঙ্গল-সহ আই লিগের শীর্ষস্থানীয় ছয়টি ক্লাব প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে তাদের অস্তিত্বের সংকট নিয়ে চিঠি দিয়েছিল। আইএসএল দেশের অন্যতম বড়ো প্রতিযোগিতা হিসাবে বিকশিত হয়েছে। চিঠি হাতে পাওয়ার পর পরই প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে বিজেপির পশ্চিমবঙ্গের কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষক কৈলাস বিজয়বর্গীয় ক্লাবগুলির সঙ্গে বৈঠক করেন।

উল্লেখযোগ্য ভাবে, মোহনবাগান ক্লাবে রয়েছেন তৃণমূলের মন্ত্রী, দুই প্রাক্তন সাংসদ এব মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাই। জানা যায়, ওই বৈঠকে এক প্রাক্তন সাংসদও হাজির ছিলেন। তবে ক্লাবের পক্ষ থেকে স্পষ্ট ভাবেই জানানো হয়েছে, কোনো রাজনীতি নয়, ক্লাব এবং ফুটবলের উন্নয়নের জন্যই তারা এগিয়ে চলেছে।

বৈঠক প্রসঙ্গে কৈলাস জানিয়েছেন, “আমরা উভয় ক্লাবের সমস্যা নিয়ে কথা বলেছি। আমরা কেন্দ্রীয় ক্রীড়ামন্ত্রী এবং ক্লাবগুলির মধ্যে একটি বৈঠকের ব্যবস্থা করার চেষ্টা করছি। তাদের সমস্যাগুলি সমাধানের জন্য সমস্ত উদ্যোগ নেওয়া হবে।” মোহনবাগানের অর্থসচিব দেবাশিস দত্তের বক্তব্য, “আমাদের একমাত্র ধর্ম ফুটবল। আমরা যা কিছু করেছি তা ক্লাবকে বাঁচানোর জন্য। আমরা কোনো রাজনৈতিক দলের সভাপতিকে চিঠি দিইনি। আমরা এই দেশের প্রধানমন্ত্রীকে লিখেছি।”

টলিউড রাজনীতি

দিল্লিতে গিয়ে এক ডজনের বেশি টলিউডজীবী যোগ দিয়েছেন বিজেপিতে। তারও আগে বাংলা চলচ্চিত্রশিল্পের শিল্পী এবং টেকনিসিয়ানদের স্বার্থরক্ষায় এক জোড়া নতুন সংগঠনের দরজা খুলেছে গেরুয়া শিবির। সেই সংগঠনের দ্বন্দ্ব, অথবা সংগঠনে যোগ দেওয়া নিয়ে যতই বিতর্ক থাক না কেন, ফিল্মিপাড়ায় খবরে রয়েছে বিজেপি। কেউ চাইছেন ন্যায্য কাজের অধিকার, কেউ চাইছেন টলিউডে দুই তৃণমূল নেতার একাধিপত্য খর্ব হোক অথবা কেউ চাইছেন রাজ্যে পরিবর্তনের পরিবর্তন হোক। এমন সব দাবি সামনে রেখেই বিজেপিতে নাম লেখাচ্ছেন টলিপাড়ার কলাকুশলীরা। আদতে সেটাই কি কারণ?

বিদগ্ধজনেরা বলছেন, আসলে টলিউডে সে অর্থে কাজ নেই। বড়ো পর্দার বড়ো ছবি হচ্ছে হাতে গোনা, কাজ পাচ্ছেন নামমাত্র ক’ জন। আর বাকিদের অধিকাংশটা নির্ভর করে রয়েছে টেলিভিশনে। স্বাভাবিক ভাবেই এক দিকে কাজের অভাব, অন্য দিকে বিজেপির ক্রমবর্ধমান প্রভাব। দুইয়ে মিলে রাজনৈতিক নীতি-আদর্শের কথা শিকেয় তুলে ভাত জোগাড়ের নিশ্চয়তা পেতেই টলিউডের শিল্পীরা ঝাঁপ দিচ্ছেন পদ্ম-পুকুরে।

তা যা-ই হোক, সমালোচকরা অনেক কথাই বলেন এবং বলবেন। কিন্তু বিজেপিতে অভিনেতা-অভিনেত্রীদের ঘনঘটা অনেক আগেই। শেষ লোকসভা ভোটে দলের প্রার্থী হয়েছিলেন লকেট চট্টোপাধ্যায়, জয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো অভিনেতারা। লকেট হুগলি থেকে জিতে সংসদে গিয়েছেন। তবে তাঁদেরও একটা রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ড রয়েছে। কিন্তু জলের তোড়ের মতো এখন যাঁরা আসছেন তাঁরা যে ২০২১ বিধানসভা ভোটের দিকে তাকিয়েই বিজেপির নৌকায় উঠছেন, তা ভাবার আর কোনো বিকল্প কী আছে!

প্রবন্ধ

‘নো ভোট টু বিজেপি’ স্লোগানই কার্যকর করেছেন বামপন্থী ভোটার

গোটা দেশ জুড়েই বিজেপির রাজনীতির বিরুদ্ধে জনমত তুঙ্গে উঠেছে। এই অবস্থানের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পশ্চিমবঙ্গের বামপন্থীরা মনে করেছেন তাঁরা ‘ফ্যাসিস্ত’ শক্তিকে প্রতিহত করার লড়াইয়ে নেমেছেন।

Published

on

শৈবাল বিশ্বাস

বামপন্থীরা এ বারের নির্বাচনে প্রায় ধূলিসাৎ হয়ে গিয়েছে, কিন্তু কেন? এই নিয়ে কাটাছেঁড়া চলছে, আগামী দিনেও চলবে। সিপিএমের উত্তর ২৪ পরগনা জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য‌ তন্ময় ভট্টাচার্য ইতিমধ্যেই টিভি চ্যানেলে বলে দিয়েছেন গোটাটাই নেতৃত্বর দোষ। কেউ কেউ সংগঠনের দুর্বলতার প্রশ্নও তুলছেন। আংশিক ভাবে হয়তো সবটাই সত্য‌, কিন্তু সেটাই সব নয়।

Loading videos...

এ বারে বামপন্থীদের পরাজয়ের সঠিক পরিপ্রেক্ষিত বোঝার জন্য‌ সর্বভারতীয় রাজনীতির দিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন। সেই প্রেক্ষিতে বিচার না করলে পশ্চিমবঙ্গে বামপন্থীদের এই ‘ভয়াবহ’ ফলাফলের কারণ বের করা সম্ভব হবে না।

অনেকেই যুক্তি দিচ্ছেন, কেরলে বামপন্থীরা যে রেকর্ড করে দ্বিতীয় বারের জন্য‌ ক্ষমতায় ফিরেছে সেটা তো কংগ্রেসকে পরাজিত করে। সত্যিকারের লড়াইটা যদি বিজেপির সঙ্গে হত, তা হলে হিম্মত বোঝা যেত। এ প্রসঙ্গে বলে রাখা ভালো, কংগ্রেস সে রাজ্যে শক্তিশালী বলে, বিজেপি একেবারে চেপে বসে গিয়েছিল তা মোটেই নয়। মেট্রোম্যান শ্রীধরনকে সামনে রেখে তারা কেরলে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে ঝাঁপানোর চেষ্টা করেছিল। সে রাজ্যে আরএসএসের সংগঠন যথেষ্ট মজবুত। সেই সূত্রে বিজেপি সাম্প্রদায়িক লাইনে ভোট করে ফায়দা লোটার আপ্রাণ চেষ্টা চালায়। শবরীমালার মতো কয়েকটি স্থানীয় বিষয়কে সামনে এনে সিপিএমকে ‘নাস্তিক’ প্রমাণ করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছি্ল। কিন্তু তারা জনগণের কাছ থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। হ্যাঁ, প্রত্যাখ্যাত যে হবে সেটা আগাম অনুমান করে প্রচারের রাশ খানিকটা আলগা করেছিল, এই সত্য‌ও অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু বামেদের ফাঁকা মাঠ ছেড়ে দিয়ে তারা চলে এসেছিল, এটাও ভাবার কোনো কারণ ঘটেনি। বরং বিষয়টা এ ভাবে দেখা ভালো, চেষ্টা করেও দক্ষিণের এই রাজ্যে বিজেপি তাদের রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করতে সম্পূর্ণ ব্য‌র্থ হয়েছে।

তামিলনাড়ুতে তারা চেষ্টা করেছিল ক্ষমতাসীন এআইডিএমকের সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে দক্ষিণের রাজনীতিতে পা ফেলতে। হয়তো বিজেপির সঙ্গে হাতে হাত মেলানোটাই পালানিস্বামীদের পক্ষে কাল হল। তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে ব্রাহ্মণ্য‌ সংস্কৃতি বিরোধী যে ধারা রয়েছে, তার সম্পূর্ণ ফায়দা তুলতে সক্ষম হল স্টালিনের নেতৃত্বাধীন ডিএমকে জোট। ইচ্ছা করেই অমিত শাহ, নরেন্দ্র মোদীরা সে রাজ্যে ঘনঘন গিয়ে ব্রাহ্মণ্য‌বাদে সুড়সুড়ি দেওয়া থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু দ্রাবিড় জনতা মোদী-শাহকে বাদ দিয়েও সমগ্র বিজেপি দলটাকেই মনুবাদী সংস্কৃতির সঙ্গে এক করে ধরেছে। তারা মনে করেছে, তামিলনাড়ুতে এই দল আগ্রাসী রাজনীতির প্রকাশ ঘটিয়ে স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলকে গুলিয়ে দেবে। প্রশ্ন তুলে দেবে দ্রাবিড় সংস্কৃতি নিয়ে।

এই সত্য‌টা বাংলার ক্ষেত্রেও খানিকটা কাজ করেছে। রবীন্দ্রনাথের মতো দাড়ি রাখলেই যে রবীন্দ্রপ্রেমী হওয়া যায় না, বরং ভুল উচ্চারণে রবীন্দ্রনাথের কবিতা বললে বাঙালির রাগ হয়, এটা নরেন্দ্র মোদীর বোঝা উচিত ছিল। সে যা-ই হোক, তামিলনাড়ুতে বিজেপির সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে শক্তিশলী প্রতিপক্ষ হিসাবে ডিএমকে-কেই সেখানকার জনতা বেছে নিয়েছে।

ছবি ফেসবুক থেকে নেওয়া।

একমাত্র অসম ও পুদুচ্চেরিতে এনডিএ-র লাভ হয়েছে। অসমে কংগ্রেস ভালো ভাবেই প্রচারে এগোচ্ছিল। কিন্তু তরুণ গগৈ-এর মতো শক্তপোক্ত নেতার অভাবে প্রচারের ধার অনেকটাই কমে যায়। তার উপর সেখানে বাঙালি ও অহমিয়া ভোটারদের মধ্যে বিভাজন এতটাই তীব্র হয়েছে যে কংগ্রেসের পক্ষে জাতিস্বাতন্ত্র্যের রাজনীতিকে ভেদ করে অসাম্প্রদায়িক-বিভাজন বিরোধী রাজনৈতিক অস্তিত্ব তুলে ধরা সম্ভব হয়নি। অসমের বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তিগুলি মনে করে, কংগ্রেস তাদের প্রধানতম দুশমন কারণ, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে অনুপ্রবেশের সুবিধা করে দিয়ে তারা জনজাতির অস্তিত্বকেই অতীতে বিপন্ন করে তুলেছিল। এই জায়গা থেকে কংগ্রেস সরে আসতে না পারায় লাভের গুড় বিজেপিতে খেয়ে গিয়েছে।

এই কথাগুলি বলার অর্থ একটাই – সর্বভারতীয় রাজনৈতিক মানচিত্রে বিজেপি এ বারের নির্বাচনে কতটা অপ্রাসঙ্গিক শক্তি হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেছে, সেটা তুলে ধরা। পশ্চিমবঙ্গ এই হিসাবের বাইরে নয়। পশ্চিমবঙ্গে এ বারের ভোট হয়েছে মূলত বিজেপিকে আটকানোর জন্য‌। তৃণমূল কংগ্রেসের ৫০ শতাংশর কাছাকাছি ভোট পুরোটাই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘সুশাসনের’ ভোট এমনটা মনে করা বৃথা। এই ভোটের একটা বড়ো অংশই ‘নো বিজেপি’ ভোট। প্রতিষ্ঠান-বিরোধী ভোট এ বার মমতার বিরুদ্ধে পড়েনি, পড়েছে মোদীর বিরুদ্ধে। পশ্চিমবঙ্গের মানুষ কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছে। এর মধ্যে যেমন দক্ষিণপন্থী ভোটার রয়েছেন, তেমনই বামপন্থী ভোটাররাও রয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গের সৎ বামপন্থীদের একটা বিরাট অংশই এ বার মনে করেছেন, বিজেপিকে আটকানোই প্রধান কর্তব্য‌। বিজেপি কর্পোরেটের হাত ধরে দেশকে বেচে দিতে চলেছে। তাদের প্রতিটি পদক্ষেপই কর্পোরেট স্বার্থে।

এ প্রসঙ্গে আরও অনেক ব্যাখ্যা তুলে ধরা যায়। আসল কথাটা প্রকাশ করেছেন, আমার বন্ধু এক বিশিষ্ট বামপন্থী নেতা। তিনি ভোটের দিন পরিচিত বামপন্থী বন্ধুদের মধ্যে যে মনোভাব লক্ষ করেছেন, তা কতকটা এ রকম – “নরেন্দ্র মোদী-অমিত শাহর বিভাজনের রাজনীতি রুখতে তৃণমূলকে ভোট দিতেই হবে। ভোট বিভাজন করে বিজেপির সুবিধা করে দেওয়াটা বামপন্থীদের উচিত হবে না। বরং প্রকৃত বামপন্থীদের কাজ হবে যে কোনো মূল্যে বিজেপিকে পরাজিত করা।”

গোটা দেশ জুড়ে কৃষক আন্দোলন, অন্যান্য‌ গণআন্দোলনের অভিমুখ এখন বিজেপির বিরুদ্ধে। উত্তরপ্রদেশের মতো হিন্দিভাষী রাজ্যেও এখন বিজেপি কোণঠাসা। সাংস্কৃতিক আধিপত্য‌বাদ, গুন্ডামি, কৃষকদের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে কর্পোরেট তোষণ, বিভাজনের বিরুদ্ধে উত্তরপ্রদেশের জনতাও ক্ষিপ্ত। অর্থাৎ গোটা দেশ জুড়েই বিজেপির রাজনীতির বিরুদ্ধে জনমত তুঙ্গে উঠেছে। এই অবস্থানের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পশ্চিমবঙ্গের বামপন্থীরা মনে করেছেন তাঁরা ‘ফ্যাসিস্ত’ শক্তিকে প্রতিহত করার লড়াইয়ে নেমেছেন। এই অবস্থান যে বামপন্থী ভোটাররা নিতে চলেছেন তা সিপিআইএমএলের সাধারণ সম্পাদক দীপঙ্কর ভট্টাচার্যর বিবৃতিতেই স্পষ্ট হয়েছিল। সিপিএম নেতৃত্ব যে তা বোঝেননি তা নয়, কিন্তু ভোটে তৃণমূল ও বিজেপিকে একাসনে বসিয়ে লড়াই না করলে দলেই হয়তো বিদ্রোহ হয়ে যেত।

আরও পড়ুন: Bengal Polls 2021: ভয়ংকর খেলা! আরও মজবুত কেষ্টর গড়

Continue Reading

প্রবন্ধ

সত্যজিতের চলচ্চিত্র না দেখা আর পৃথিবীতে বাস করে চন্দ্র-সূর্য না দেখা একই কথা, বলেছিলেন আকিরা কুরোসাওয়া

তবে প্রশস্তির পাশে সমালোচনাও কম সহ্য করতে হয়নি সত্যজিৎকে।

Published

on

অরুণাভ গুপ্ত

সত্যজিৎ রায়ের আবার একটা জন্মদিন। তার উপর শতবর্ষ। ফলে বাঙালির গা-হাত-পা ঝেড়ে লেগে পড়ার পালা। তার পর অবশ্য যে কে সেই। এত সময় কোথায়? ঘর-সংসার সামলে বড়ো সংখ্যার মানুষ ব্যস্ত থাকেন গুচ্ছের অন্তহীন টিভি সিরিয়াল, নিউজ আপডেটে। আর এখন তো বাড়তি অভিজ্ঞতা করোনা। আছে, নেই-এর টাগ অব ওয়ার। তবুও এরই মধ্যে হয়তো গুছিয়ে সত্যজিৎ নস্টালজিয়া হতে পারত কিন্তু সেখানেও হল্ট হেঁকেছে বাংলার নির্বাচন। সুতরাং নমো নমো করে সারো!

Loading videos...

করোনার জন্য শারীরিক দূরত্ব। সংগঠনগত ভাবে সত্যাজিৎ-স্মরণের পথে হয়তো মূল অন্তরায়। তবে ভার্চুয়াল যুগে অনেক কিছুই সম্ভব। কিন্তু বাংলার চোখ এ দিনটায় ভোটের ফলাফলের দিকে তাকিয়ে। স্বাভাবিক ভাবেই সরকারি ভাবে হোক বা অন্য কোনো ভাবে সত্যজিৎ রায়ের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষ্যে বিশেষ অনুষ্ঠানের প্রচার ততটা নেই। শুনছি, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রক না কি কী সব অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। কিন্তু সত্যি বলতে কী, সে সবের প্রচার বেশ ঝাপসা।

এক দিকে করোনা অন্য দিকে ভোটের বহুপ্রতীক্ষিত ফলাফল। এই দুইয়ের মাঝেও সত্যজিৎ-স্মরণে যেটুকু হচ্ছে তার মূলে সংবাদ মাধ্যম। ওরা স্মরণে রাখে, স্মরণ করে। প্রায় জোর করে আমজনতার কানে নামটা শুধিয়ে দিচ্ছেন, সেটা সংক্ষিপ্ত ভাবে হলেও। সত্যজিৎ রায়ের কর্মজীবন ১৯৫০-১৯৯২। টুকটাক তথ্য না দিলে ন্যাড়া ন্যাড়া লাগবে। তা ছাড়া ভারী হলে মনে রাখা দায়। এটা শুধু আমাদের স্বভাব নয়, তাবড় রাজনীতির কুশীলবরা বেমালুম সন-তারিখ ভুলে গিয়ে বিশিষ্ট চরিত্রদের যেখানে সেখানে জন্মস্থান বলে ফেলে বিজ্ঞের হাসি হাসছেন।

যা হোক সত্যজিতের জন্ম ২ মে, ১৯২১, আর মৃত্যু ২৩ এপ্রিল ১৯৯২। অনস্বীকার্য বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র নির্মাতাদের অন্যতম তিনি। কলকাতার বুকে জন্ম হলেও পূর্বপুরুষের ভিটে ছিল কিশোরগঞ্জ (বর্তমানে বাংলাদেশে)। লেখাপড়া কলকাতার প্রেসিডেন্সি ও শান্তিনিকেতনে। সত্যজিৎ রায়ের কর্মজীবন শুরু হয় বিজ্ঞাপন সংস্থায় চিত্রকরের ভূমিকায়। তবে প্রতিভা যেখানে স্ফুরিত হওয়ার সেখানে হবেই। কলকাতায় ফরাসি চলচ্চিত্র নির্মাতা জঁ রেনোয়ার সঙ্গে মুখোমুখি দেখা হওয়া এবং পরে লন্ডনে সফরকালীন ইতালির নব্যবাস্তববাদী চলচ্চিত্র ‘লাদ্রি দি বিচিক্লেত্তে’ (বাইসাইকেল চোর) দেখার পর সত্যজিতের মাথায় চেপে বসে ছবি তৈরির ভূত। সর্বপ্রথম ছবি ‘পথের পাঁচালী’ (১৯৫৫)। এর পর আর রোখে কার সাধ্য! তাঁর ছবি সংখ্যার থেকে ক্রমশ লম্বা হয়ে গিয়েছে প্রাপ্ত পুরস্কারের তালিকা। যে তালিকার চূড়োয় রয়েছে অস্কার।

আকিরা কুরোসাওয়ার সঙ্গে। ছবি পিন্টারেস্ট থেকে।

নতুন করে বলার নয়, সত্যজিৎ ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। চিত্রনাট্য রচনা, চরিত্রায়ন, সঙ্গীত-স্বরলিপি রচনা, চিত্রগ্রহণ, শিল্পনির্দেশনা, সম্পাদনা ও সর্বোপরি কল্পকাহিনির সফল লেখক। গোয়েন্দা প্রফেসর শঙ্কু কিশোরের অবিচ্ছেদ্য বন্ধু। বাংলা চলচ্চিত্র তো বটেই, এমনকি পুরো উপমহাদেশের চলচ্চিত্রকে এক ভিন্ন মাত্রায় নিয়ে গিয়েছিলেন। পুরো ভারত তো বটেই, ভারতের বাইরেও তাঁর ছবি জনপ্রিয়তা এবং সম্মান লাভ করেছিল। সব মিলিয়ে, সত্যজিৎ রায়- এই নামটাই যেন যথেষ্ট। বাঙালি শুধু নয়, গোটা বিশ্ববাসীর কাছে তিনি জনপ্রিয়।

হয়তো এটা বললে ভুল হবে না যে শুধুমাত্র সত্যজিৎ রায়ের কারণেই আজ বাংলা ভাষায় তৈরি চলচ্চিত্রকে পৃথিবী জুড়ে সম্মানের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়। পাশাপাশি, তিনি শুধু সিনেমার নন, সাহিত্যেরও। সাহিত্যের প্রতি, বিশেষত ছোটোদের সাহিত্যের প্রতি তাঁর অন্তর উৎসারিত ভালোবাসা লেখক সত্যজিৎকেও অবিস্মরণীয় করে তুলেছে।

সত্যজিতের ছবিতে মানবতা প্রধান উপাদান আপাত কিন্তু আড়ালে জটিলতা জড়িত। তাঁকে নিয়ে আকিরা কুরোসাওয়ার অবিস্মরণীয় উক্তি- “সত্যজিতের চলচ্চিত্র না দেখা আর পৃথিবীতে বাস করে চন্দ্র-সূর্য না দেখা একই কথা”। প্রশস্তির পাশে সমালোচনাও কম সহ্য করতে হয়নি তাঁকে। সমালোচকরাও এমনও বলেছেন, তাঁর ছবিগুলি অত্যন্ত ধীর গতির যেন ‘রাজকীয় শামুকে’র চলার মতো। এখানেও পাল্টা দিয়েছেন কুরোসাওয়া। বলেছেন, সত্যজিতের ছবিগুলো মোটেই ধীর গতির নয়, বরং এগুলোকে বলা হোক শান্ত চরিত্রে বহমান এক বিশাল নদী। মজার বিষয় হল, আরেক বরেণ্য পরিচালক মৃণাল সেনও ‘নায়ক’ ছবিতে উত্তম কেন প্রশ্ন তুলেছিলেন। প্রত্যুত্তরে সত্যজিতের বক্তব্য ছিল, মৃণাল কেবল সহজ লক্ষ্যগুলোতে আঘাত হানতে জানেন। অর্থাৎ মৃণালের বিষয়বস্তু বাঙালি মধ্যবিত্ত শ্রেণি।

সৃষ্টি থাকবে, সঙ্গে থাকবে সমালোচনাও। তবে আঙ্গিক, মেজাজ, প্রকৃতি-সহ আগাগোড়া খোলনলচে বদলে সত্যজিৎ বাংলা ছবিকে এনে দিয়েছিলেন আন্তর্জাতিক ছবির স্বীকৃতি। তাঁর মৃত্যুর ২৯ বছর পরেও তিনি আছেন। থাকবেন-ও বিশ্বচলচ্চিত্রের গম্ভীর চর্চায়। আজকের মতো বাস্তব যতই রুক্ষ ও নিষ্ঠুর হোক না কেন!

আরও পড়ুন: রাজনৈতিক ধারাভাষ্য না হলেও সত্যজিতের বেশির ভাগ ছবির আনাচেকানাচে তো রাজনীতিরই অনুরণন

Continue Reading

প্রবন্ধ

রাজনৈতিক ধারাভাষ্য না হলেও সত্যজিতের বেশির ভাগ ছবির আনাচেকানাচে তো রাজনীতিরই অনুরণন

জন্মের শতবর্ষ পূর্ণ হওয়ার দিনে শ্রদ্ধাঞ্জলি।

Published

on

ছবি ফেসবুক থেকে।

শৈবাল বিশ্বাস

আজীবন কলকাতার বাসিন্দা সত্যজিৎ রায়ের কাছে এই শহর শুধু কাজের পটভূমি নয়, অত্যন্ত সোচ্চার এক নিজস্ব ভূমিকা নিয়ে সে উপস্থিত। ঘুরেফিরে শহরের গল্প যত বার আসে এ শহর যেন প্রত্যেক বার আর পাঁচটা চরিত্রের সঙ্গে মিশে নিজেও চরিত্র হয়ে ওঠে। এই চরিত্র হয়ে ওঠার ব্যাপারটা একমুখীন নয়, কলকাতা যেমন শিল্পীমানসে বিষয় জুগিয়ে চলে শিল্পী তেমনি পুনর্নির্মাণ করেন বিষয়ের অংশ। যে অংশ সমগ্রের প্রতিনিধি বটে, তবে সমগ্র থেকে সম্পূর্ণ আলাদা নিজস্ব বৈশিষ্ট্যময় উপস্থিতি কলকাতা শহর সত্যজিৎ রায়ের জানাবোঝা এবং প্রতিবিম্বনের স্বাক্ষর।

Loading videos...

এ শহরের নানা গল্পের মধ্য দিয়ে বাংলার মধ্যবিত্ত সংস্কৃতি চর্চা এবং গোষ্ঠীজীবনের যে ইথোস পুনর্নির্মিত হয়েছে তা শিল্পীর নিজস্ব ভাবনার জারকে সিঞ্চিত। ছবি থেকে সামাজিক ইতিহাস-সাংস্কৃতিক ইতিহাস খুঁজে বের করার যে প্রয়াস চলে তার লক্ষ্য দু’টি। প্রথমত, পরিবেশ-প্রতিবেশের ইমেজকে খুঁজে বের করা। যে চিত্রকল্পগুলি বাস্তবের স্বাক্ষর হয়ে উঠতে চায় তার সন্ধান হল দ্বিতীয়ত। বাস্তব কী ভাবে কোন বাস্তবতার প্রতিনিধি হয়ে ওঠে, তা খোঁজা। আর আমরা এই যাত্রাপথের কিছু মুহূর্ত বেছে নিয়ে পিছুটান বাঁকগুলির হিসেব কষি। কলকাতা কখন সত্যজিতের কোন মানসের তুলির পোঁচ ধরে রেখেছে, তার অনুসন্ধানে রত হই।

‘মহানগর’-এ অনিল চট্টোপাধ্যায় ও মাধবী মুখোপাধ্যায়।

‘পরশপাথর’, ‘নায়ক’, ‘মহানগর’, ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ ও ‘জন অরণ্য’-এর মতো ছবিগুলো বহু আলোচ্য। অন্য ছবিগুলোও ধরে ধরে আলোচনা করা যেতে পারে। আরও অনেক ছবি আলোচনার অপেক্ষা রাখে। ওই ছবিগুলোতেও কলকাতাকে সমান গুরুত্ব দিয়ে চিত্রায়িত করা হয়েছে। বিশেষত ‘সীমাবদ্ধ’ ও ‘অপু’ চিত্রত্রয়ের কথা এ প্রসঙ্গে বিশেষ মনোযোগ দাবি করে।

তবে সত্তরের দশকের কলকাতা নিয়ে কাজ করতে বসে সত্যজিৎ রাজনীতিকেই ছবির মুখ্য বিষয় করে তুলে ধরেননি, যদিও সম্ভাবনা এবং প্রলোভন দুই-ই যথেষ্ট ছিল। এক অর্থে সত্যজিতের কোনো ছবিই সরাসরি রাজনৈতিক বিবরণ নয়, এ কথা তিনি নিজেই নানা দেশি-বিদেশি সমালোচককে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তুলে ধরেছেন। তবে ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ কীসের গল্প?

এক অবিরাম পথচলা যুবকের আত্মোপলব্ধির গল্প? শৈশবের হারানো পাখির ডাক শুনে মফস্‌সলের একাকী হোটেল ঘরে নিজেকে ফিরে পাওয়ার গল্প? সিদ্ধার্থের প্রতিদ্বন্দ্বী শহর তার প্রতিটা নাগরিকের কীর্তিকলাপে বেয়াড়া নিয়ন্ত্রণহীন। সে চাপ মানুষকে স্বস্তির নি‌শ্বাস ফেলতে দেয় না। উদ্যম আধুনিক এক জীবনযাত্রার দিকে ঠেলে দেয় যেখানে বাবা-মা পরিবার ভেঙে পড়ছে, সরল কিশোরী পাশ্চাত্য নাচ শিখে নিজেকে পণ্য করে তুলছে, দীর্ঘ ইন্টারভিউয়ের লাইনে অসুস্থ চাকরিপ্রার্থী, হাসপাতালে সেবিকা দেহ বিক্রি করে, হবু ডাক্তার রেডক্রসের পয়সা চুরি করে মদ খায়, ফিল্ম সোসাইটির নাক-উঁচু সভ্যের পাশাপাশি অসভ্য বিকৃতরুচি মধ্যবিত্ত সেক্সম্যানিয়াকের ভিড়, এমনকি রাজনৈতিক নেতাও বামপন্থী করা বলে নিজেকে আড়ালে রাখে, পার্টিজানদের আদর্শ আর বেঁচে থাকা নিয়ে সওদা করে।

এ সব অসুস্থ জীবনযাপনের ভিড়ে সিদ্ধার্থ নিজেকে মিশিয়ে দিয়েছে। এলোমেলো বিবেক মূল্যবোধ কখনও তাকে রাগায়, কখনও দু’মুখো শহরের মতোই নিছক সমঝোতার দিকে এগিয়ে দেয়। কখনও টেবিলের ও ধারের লোকগুলিকে ব্যঙ্গ করে, কখনও নিজেই পরিচালকের ব্যঙ্গের শিকার হয়।

‘নায়ক’ ছবিতে উত্তমকুমার ও প্রেমাংশু বসু।

সত্যিকারের হিংস্রতা আর কাল্পনিক হিংস্রতার মধ্যের বেড়াটি মাঝে মাঝেই গুলিয়ে যায়, বিনা কারণে ভিড়ের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ে এক প্রাইভেট গাড়ির মালিকের দিকে হাত চালায় সিদ্ধার্থ। নাগরিক দোলাচলে বিকীর্ণ এক চরিত্র। কোথাও গোটা শহরের চরিত্রের সঙ্গে যেন তার নিজের যোগসূত্র স্থাপিত হয় সে নিজেই যেন কলকাতা।

আমাদের শহর উঠে এসেছে নদী ঘেরা পঞ্চদশ শতাব্দীর ছোট জনপদ থেকে। তারপর লোভ, রিরংসা, প্রগতি পুঁজির একটানা দৌরাত্ম্য বুকে নিয়ে তার এক অনির্দেশ যাত্রা। সিদ্ধার্থ তেমনই এক যুবক। সে যেমন অসহায় তেমনি অসহনীয় নিজেও। আর তাই তার বিপ্লবী ছোটো ভাই আজ তার কাছ থেকে দূর খুঁজে নিয়েছে। কিন্তু ছবির শেষে সিদ্ধার্থের মফস্‌সলে পাখির ডাকে নিজেকে খুঁজে পাওয়া নিয়ে কিছু প্রশ্ন উঠে আসে। এ শহরের সব যন্ত্রণার অবসান কি প্রকৃতির কোলে? প্রকৃতির ভাঁড়ামিকে আঘাত করবে সমাজ সচেতনতা না প্রকৃতির কোলে কৌম জীবন?

সত্যজিৎ ‘রাম নাম সৎ হ্যায়’ ব্যবহার করে স্পষ্ট ইঙ্গিত রেখেছেন। ছবির শেষে তাঁর মানবতাবাদী মূল্যবোধের কাছে নাগরিক জীবনযাত্রার মৃত্যু ঘটে। আর এ ভাবে সিদ্ধার্থের মৃত্যু হয়। প্রেমিকাকে লেখা চিঠিতে শৈশবের পাখির ডাক শুনতে পাওয়ার কথা জানিয়ে এতাবতকালের নগর ডিঙিয়ে আসার বিবরণের সমাপ্তি ঘোষণা করে। ছবির শেষে পর্দায় ফুটে ওঠে ‘ইতি সিদ্ধার্থ’।

সত্যি বলতে কি ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’র কলকাতা ‘জন অরণ্য’ ছবিতে আমূল বদলে যায়। তবে সেখানেও সোমনাথের দাদা ভালো-খারাপের বৈপরীত্যের নতুন ব্যাখ্যাটি বৃদ্ধ বাবার সামনে ধরে। সে অন্য জগতের মানুষ, যে মানুষ ভালো-খারাপের দ্বন্দ্বটি স্পষ্ট করে বুঝে নিতে চায়। সোমনাথের বাবা নকশাল ছেলেদের বিদ্রোহের পিছনের কারণটি বুঝতে চেষ্টা করেন, আবার নিজের ছেলের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনিয়মের প্রতিবাদও করতে চান।

অন্য দিকে ‘নায়ক’ ছবিতে বীরেশের সূত্র ধরে শহরের রাজনৈতিক জীবনের একটা চিত্র মূর্ত হয়। ছবির বীরেশ পর্বটি খানিকটা অসংযত, ফলে নানা রকম প্রশ্ন ওঠার সুযোগ রয়েছে। বুঝে নিতে অসুবিধা হয় না বীরেশ এক জন বামপন্থী ট্রেড ইউনিয়ন লিডার। কিন্তু ছবির কোথাও তার রাজনৈতিক মতাদর্শ সম্পর্কে, তার পার্টির সংগঠিত কাজকর্ম সম্পর্কে মন্তব্য নেই।

অরিন্দম আর বীরেশের গেট মিটিং পর্বে মনে হয় বীরেশ নিজের নেতা এবং একক রাজনৈতিক অস্তিত্ব। বীরেশ যখন অরিন্দমকে মিটিংয়ে বক্তৃতা করার জন্য অনুরোধ করে তখন রাজনৈতিক সুবিধাবাদীদের এই চেহারাটি সত্যজিৎ কোথা থেকে এবং কী ভাবে পেলেন, তা ভাবতে অবাক লাগে। সুবিধাবাদীদের এত সহজ সমীকরণ টানা সেই বামপন্থী দলগুলোর পক্ষে সম্ভব ছিল না।

‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ ছবিতে ধৃতিমান চট্টোপাধ্যায়।

রাজনৈতিক নেতা অথবা ট্রেড ইউনিয়ন কর্মী অভিনেতাকে দিয়ে বক্তৃতা করিয়ে সস্তায় বাজিমাত করাতে চায়, এ ধরনের ঘটনা বীরেশের রাজনৈতিক চরিত্র সম্পর্কে সন্দিহান করে তোলে। যে হেতু বীরেশ সম্পর্কে সত্যাজিতের অন্য কোনো সরাসরি মন্তব্য নেই সুতরাং আমাদের বুঝে নিতে অসুবিধা হয় না যে তার রাজনীতির সামগ্রিক চেহারাটাই এখানে প্রকাশিত হল। বীরেশ রাজনৈতিক বাস্তবতা এড়িয়ে একটি ভুঁইফোঁড় চরিত্রের আদল নেয়। এ ধরনের ট্রেড ইউনিয়ন অথবা রাজনৈতিক আন্দোলন সে সময় বিরল নয়, অভিনব-ও বটে।

তবে সত্যজিতের ছবিতে কলকাতা, সমকালীন জীবন, মূল্যবোধের বিস্তৃত আলোচনা সম্ভব নয় নেহাতই এই স্বল্প পরিসরে। ফলে সংক্ষেপে এতটাই বলা যায়, ‘পরশপাথর’-এর তীব্র ব্যঙ্গ ‘মহানগর’ ছবিতে ট্র্যাজিক নাটকে রূপান্তরিত হয়। শহর কলকাতা ব্যর্থতা, সংগ্রাম আর আশায় বুক বেঁধে এগিয়ে চলা ‘মহানগর’। ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ ছবিতে আমরা মহানগরের পরাজয়ের খোঁজ পাই। সত্যজিৎ কিছুতেই প্রগতির নামে এই নাগরিক ভণ্ডামি বরদাস্ত করতে পারছিলেন না। মহানগরের ট্র্যাজিক নাটক রূপান্তরিত হল তীব্র প্রতিক্রিয়ায় ভরা শিল্পীর দার্শনিক প্রশ্নের আখ্যানে।

যার এক দিকে রয়েছে নাগরিকতার পোশাকি স্মার্টনেসকে চরম ব্যঙ্গ, অন্য দিকে এই ভণ্ডামিকে এড়িয়ে যাওয়ার স্পৃহা। ‘জন অরণ্য’ ছবিতে এড়িয়ে যাওয়া মুলতুবি রেখে ফিরে আসতে হয় নগরের কাছে। আলো-অন্ধকার, সুখ-দুখগুলিকে নিস্পৃহ ভাবে চিনিয়ে দিতে হয়। এ চেনানোর মধ্যে কোনো ঘোষিত দার্শনিকতা নেই, আছে ক্রমশ ছড়িয়ে পড়া গভীর অসুখ আর তার মাঝখানে বেঁচে থাকা আলো-আঁধারিতে ভরা কয়েকটি জীবনের কিছু পরিচয়।

Continue Reading
Advertisement
Advertisement
দেশ1 hour ago

ভোট পরবর্তী হিংসার তদন্তে রাজ্যে আসছে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের গড়া চার সদস্যের দল

দেশ3 hours ago

Coronavirus Second Wave: প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী তথা আরএলডি নেতা অজিত সিংহ প্রয়াত

দেশ3 hours ago

Corona Update: দু’তিনটে রাজ্যে সংক্রমণবৃদ্ধির জের, ভারতের দৈনিক সংক্রমণ ভেঙে দিল অতীতের রেকর্ড

Coronavirus Delhi
দেশ4 hours ago

Coronavirus Second Wave: আশার আলো, দিল্লি-সহ একাধিক রাজ্যে সংক্রমণের হার কমছে

কোচবিহার4 hours ago

Sitalkuchi Incident: কোচবিহারের সেই পুলিশ সুপারকে সরিয়ে দিল রাজ্য

Covid situation kolkata
দেশ5 hours ago

Bengal Corona Update: ১.৩ শতাংশেরও কম, মৃত্যুহারের নিরিখে দশম স্থানে নামল পশ্চিমবঙ্গ

দেশ5 hours ago

Coronavirus Second Wave: তৃতীয় ঢেউ আসবেই, সাফ কথা কেন্দ্রের

পরিবেশ12 hours ago

২০ বছরে বাংলাদেশের সুন্দরবনে ২৫ বার আগুন, পুড়ে গেছে প্রায় ৮১ একর বনভূমি

ক্রিকেট3 days ago

Covid Crisis in IPL: বরুণ-সহ দুই ক্রিকেটার কোভিড পজিটিভ, সোমবারের ম্যাচ স্থগিত

শিক্ষা ও কেরিয়ার3 days ago

NEET 2021: কোভিডের কারণে চার মাস স্থগিত নিট পিজি ২০২১ পরীক্ষা

yogi adityanath
দেশ2 days ago

UP Panchayat Polls: বারাণসী, অযোধ্যা, মথুরায় ধরাশায়ী বিজেপি

রাজ্য1 day ago

Oath Ceremony: তৃতীয় বারের জন্য মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়

election commission of india
রাজ্য2 days ago

নন্দীগ্রামের সেই রিটার্নিং অফিসারের বাড়তি নিরাপত্তা

ক্রিকেট1 day ago

Corona Crisis In IPL: জৈব বলয় ভেদ করে কী ভাবে ঢুকল করোনা, উঠে এল একাধিক কারণ

শিক্ষা ও কেরিয়ার2 days ago

JEE Main 2021: মে মাসের জয়েন্ট এন্ট্রাস (মেইন‌) ২০২১ পরীক্ষা স্থগিত, জানালেন শিক্ষামন্ত্রী

রাজ্য2 days ago

Bengal Corona Update: ঊর্ধ্বমুখী দৈনিক সংক্রমণ, তাল মিলিয়ে বাড়ছে সুস্থতাও

ভিডিও

কেনাকাটা

কেনাকাটা2 months ago

বাজেট কম? তা হলে ৮ হাজার টাকার নীচে এই ৫টি স্মার্টফোন দেখতে পারেন

আট হাজার টাকার মধ্যেই দেখে নিতে পারেন দুর্দান্ত কিছু ফিচারের স্মার্টফোনগুলি।

কেনাকাটা3 months ago

সরস্বতী পুজোর পোশাক, ছোটোদের জন্য কালেকশন

খবরঅনলাইন ডেস্ক: সরস্বতী পুজোয় প্রায় সব ছোটো ছেলেমেয়েই হলুদ লাল ও অন্যান্য রঙের শাড়ি, পাঞ্জাবিতে সেজে ওঠে। তাই ছোটোদের জন্য...

কেনাকাটা3 months ago

সরস্বতী পুজো স্পেশাল হলুদ শাড়ির নতুন কালেকশন

খবরঅনলাইন ডেস্ক: সামনেই সরস্বতী পুজো। এই দিন বয়স নির্বিশেষে সবাই হলুদ রঙের পোশাকের প্রতি বেশি আকর্ষিত হয়। তাই হলুদ রঙের...

কেনাকাটা3 months ago

বাসন্তী রঙের পোশাক খুঁজছেন?

খবরঅনলাইন ডেস্ক: সামনেই আসছে সরস্বতী পুজো। সেই দিন হলুদ বা বাসন্তী রঙের পোশাক পরার একটা চল রয়েছে অনেকের মধ্যেই। ওই...

কেনাকাটা3 months ago

ঘরদোরের মেকওভার করতে চান? এগুলি খুবই উপযুক্ত

খবরঅনলাইন ডেস্ক: ঘরদোর সব একঘেয়ে লাগছে? মেকওভার করুন সাধ্যের মধ্যে। নাগালের মধ্যে থাকা কয়েকটি আইটেম রইল অ্যামাজন থেকে। প্রতিবেদন লেখার...

কেনাকাটা3 months ago

সিলিকন প্রোডাক্ট রোজের ব্যবহারের জন্য খুবই সুবিধেজনক

খবরঅনলাইন ডেস্ক: নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন সামগ্রী এখন সিলিকনের। এগুলির ব্যবহার যেমন সুবিধের তেমনই পরিষ্কার করাও সহজ। তেমনই কয়েকটি কাজের সামগ্রীর খোঁজ...

কেনাকাটা3 months ago

আরও কয়েকটি ব্র্যান্ডেড মেকআপ সামগ্রী ৯৯ টাকার মধ্যে

খবরঅনলাইন ডেস্ক: আজ রইল আরও কয়েকটি ব্র্যান্ডেড মেকআপ সামগ্রী ৯৯ টাকার মধ্যে অ্যামাজন থেকে। প্রতিবেদন লেখার সময় যে দাম ছিল...

কেনাকাটা3 months ago

রান্নাঘরের এই সামগ্রীগুলি কি আপনার সংগ্রহে আছে?

খবরঅনলাইন ডেস্ক: রান্নাঘরে বাসনপত্রের এমন অনেক সুবিধেজনক কালেকশন আছে যেগুলি থাকলে কাজ অনেক সহজ হয়ে যেতে পারে। এমনকি দেখতেও সুন্দর।...

কেনাকাটা4 months ago

৫০% পর্যন্ত ছাড় রয়েছে এই প্যান্ট্রি আইটেমগুলিতে

খবরঅনলাইন ডেস্ক: দৈনন্দিন জীবনের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসগুলির মধ্যে বেশ কিছু এখন পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ৫০% বা তার বেশি ছাড়ে। তার মধ্যে...

কেনাকাটা4 months ago

ঘরের জন্য কয়েকটি খুবই প্রয়োজনীয় সামগ্রী

খবরঅনলাইন ডেস্ক: নিত্যদিনের প্রয়োজনীয় ও সুবিধাজনক বেশ কয়েকটি সামগ্রীর খোঁজ রইল অ্যামাজন থেকে। প্রতিবেদনটি লেখার সময় যে দাম ছিল তা-ই...

নজরে