Connect with us

প্রবন্ধ

গীতিকার প্রণব রায়ের প্রয়াণবার্ষিকীতে সশ্রদ্ধ প্রণাম

আজ থেকে ঠিক ৪৫ বছর আগে এমনই এক ৭ আগস্টে প্রয়াত হয়েছিলেন তিনি।

Published

on

শুভদীপ রায় চৌধুরী

“…প্রভাতে কে আর মনে রাখে বলো রজনী শেষের চাঁদে,/ শুধু দুদিনের সাথীরে কে আর মালার বাঁধনে বাঁধে।।…”

আজ ৭ আগস্ট। কবি ও গীতিকার প্রণব রায়ের (Pranab Roy) প্রয়াণবার্ষিকী। আজ থেকে ঠিক ৪৫ বছর আগে এমনই এক ৭ আগস্টে প্রয়াত হয়েছিলেন তিনি।

প্রণব রায়ের জন্ম ১৯১১ সালের ৫ ডিসেম্বর, প্রখ্যাত সাবর্ণ রায় চৌধুরী পরিবারে। সাবর্ণ পরিবারের সুসন্তান প্রণব রায়ের রচিত প্রায় সাড়ে তিন হাজার গান রয়েছে যা বাংলা আধুনিক গানের ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে।

ছাত্রাবস্থায় ‘কমরেড’ শীর্ষক কবিতা লেখায় তাঁকে কারাবাসও করতে হয়, তবুও তাঁর সৃষ্টি থেমে থাকেনি। কাজী নজরুল ইসলামের ভাবশিষ্য প্রণব রায় ব্রাহ্ম বয়েজ স্কুল থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সিটি কলেজে ভর্তি হন। ছেলেবেলা থেকেই সাহিত্যের নেশা ছিল তাঁর। ‘বিশ্বদূত’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর ‘কমরেড’ কবিতাটি। গীতিকার হওয়ার প্রেরণা পেয়েছিলেন কাজী নজরুলের কাছ থেকে। তাঁর বহু রচনায় কাজী নজরুল সুরও করেছিলেন।

ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য ও মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের রেকর্ড করা প্রথম গানের রচয়িতা প্রণব রায়। এ ছাড়া যূথিকা রায়ের কণ্ঠে আধুনিক গানের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া ‘সাঁঝের তারকা আমি’ ও ‘আমি ভোরের যূথিকা’ গান দু’টির রচয়িতাও তিনি। ১৯৩৪ সালে গীতিকবি প্রণব রায়ের প্রথম গান রেকর্ড হয় কাজী নজরুলের তত্ত্বাবধানে। ১৯৩৬ সালে ‘পণ্ডিতমশাই’ ছায়াছবিতে প্রথম আত্মপ্রকাশ করেন গীতিকার প্রণব রায়। তাঁর প্রথম গানটি কমল দাশগুপ্তের সুরে এবং ভবানী দাসের কণ্ঠে রেকর্ড করা হয়।

প্রথম গল্পগীতি লেখেন প্রণব রায়। জগন্ময় মিত্রের কণ্ঠে গাওয়া তাঁর লেখা গল্পগীতি ‘চিঠি’, ‘সাতটি বছর আগে পরে’ ব্যাপক জনপ্রিয় হয়েছিল। তাঁর গীতিকবিতার প্রতিটি ছন্দে জীবনের সূক্ষ সূক্ষ অনুভূতি ধরা পড়ত, যার অধিকাংশই তিনি রচনা করেছিলেন বাংলা চলচিত্রের জন্য। প্রায় তিনশোটি ছবির গান লিখেছিলেন তিনি। ছবির পরিবেশের সঙ্গে সাযুজ্য রেখেই গান রচনা করতেন। এমনকি তিরিশ থেকে চল্লিশের দশকে গীতিকবিতার রচয়িতা হিসাবে রবীন্দ্রনাথ, কাজী নজরুলের সঙ্গে একত্রে উচ্চারিত হত তাঁর নাম।

ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যের কণ্ঠে এবং শৈলেন দাশগুপ্তের সুরে প্রণব রায় লিখেছিলেন ‘কেন দিলে এত গান’, রবীন চট্টোপাধ্যায়ের সুরে লিখেছিলেন ‘মনের দুয়ার খুলে কে’, সুবল দাশগুপ্তের সুরে লিখেছিলেন ‘যদি ভুলে যাও মোরে’। এ ছাড়াও লিখেছিলেন ‘সে বুঝি ফিরে গেছে’, ‘কোথায় হারালো দিন’, ‘নিশিরাত বাঁকা চাঁদ আকাশে’, ‘মধুর আমার মায়ের হাসি’, “চম্পা চামেলি গোলাপেরই বাগে’, ‘আমার সোনা চাঁদের কণা’ ইত্যাদি অসংখ্য গান। সুরকার দুর্গা সেনের সুরে লিখেছিলেন ‘যে গান হল না গাওয়া’, ১৯৪২ সালে শৈলেন দাশগুপ্তের সুরে লিখেছিলেন ‘সেদিন মাধবী রাতে’, ১৯৪৫ সালে কমল দাশগুপ্তের সুরে লিখেছিলেন ‘কণ্ঠে আমার নিশিদিন’ ইত্যাদি।

শুধু গীতিকারই নন, বহুমুখী প্রতিভার মানুষ ছিলেন প্রণব রায়। চিত্রনাট্যকার, কাহিনিকার হিসাবেও কাজ করেছেন তিনি। ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় ও জহর রায় অভিনীত বিখ্যাত কমেডি ‘ভানু গোয়েন্দা জহর অ্যাসিস্টেন্ট’-এর কাহিনি রচনা করেছিলেন প্রণব রায়।

অনেকেরই জানা নেই হয়তো, রহস্য-রোমাঞ্চ বা ভৌতিক গল্প রচনাতেও তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত। অতীত দিনের রহস্য-সাহিত্যে জনপ্রিয় পত্রিকা ‘রোমাঞ্চ’ এবং অন্যান্য পত্রিকায় তাঁর নিয়মিত লেখা প্রকাশিত হত।

গীতিকার, চিত্রনাট্যকার, কাহিনিকার প্রণব রায়ের আরেকটা পরিচয় ছিল – তিনি ছিলেন সাংবাদিক। বছরখানেক কাজ করেছিলেন ‘বসুমতী’ পত্রিকায় বার্তা সম্পাদক হিসাবে। ব্রিটিশবিরোধী পত্রিকা ‘নাগরিক’-এর সম্পাদক ছিলেন তিনি।

ব্যক্তিগত জীবনে প্রণব রায় ছিলেন খুব কম কথার মানুষ। বাংলা সংস্কৃতি জগতের এই প্রতিভাধর মানুষটির প্রতি রইল অনেক শ্রদ্ধা।

প্রবন্ধ

প্রগতিশীল সামাজিক-রাজনৈতিক সাংবাদিকতার অন্যতম প্রবর্তক ও পথপ্রদর্শক ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর

আজ ২৬ সেপ্টেম্বর। পূর্ণ হল ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ২০০ বছর। এই পুণ্য দিনে তাঁর প্রতি খবর অনলাইনের শ্রদ্ধাঞ্জলি।

Published

on

শম্ভু সেন

“সাংবাদিক বলতে যা বোঝায়, বিদ্যাসাগর ঠিক তা ছিলেন না। কিন্তু বাংলা সাংবাদিকতার সঙ্গে তিনি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। যে কয়েকখানি পত্রপত্রিকার সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সংস্রব ছিল তাঁর মধ্যে প্রধান হল:  (১) সর্ব্বশুভকরী পত্রিকা, (২) তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা, (৩) সোমপ্রকাশ, এবং (৪) ইংরেজি পত্রিকা ‘হিন্দু প্যাট্রিয়ট’।…এই ধরনের যে পত্রিকাগুলি বাংলাদেশে সাংবাদিকতার ইতিহাসে নতুন অধ্যায় রচনা করেছে, বিদ্যাসাগর ঠিক সেই পত্রিকাগুলির সঙ্গেই যখন সংশ্লিষ্ট ছিলেন, তখন সাংবাদিকতাতেও তাঁর দান অস্বীকার করা যায় না।”

যশস্বী প্রাবন্ধিক বিনয় ঘোষ তাঁর ‘বিদ্যাসাগর ও বাঙালী সমাজ’-এ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর সম্পর্কে এই মন্তব্য করেছেন।

বিদ্যাসাগরকে আমরা অসংখ্য অভিধায় অভিহিত করতে পারি – তিনি বিধবাবিবাহের প্রবর্তক, তিনি সমাজসংস্কারক, তিনি বাংলায় স্ত্রীশিক্ষা প্রসারে পথিকৃৎ, তিনি বাংলা গদ্য-ভাষার জনক – আরও কত কী! কিন্তু বাংলা সাংবাদিকতায় তাঁর অমূল্য অবদানের বিষয়টি বোধহয় আমাদের স্মরণে চট করে আসে না।

সমাজসংস্কারের উদ্দেশ্যে ১২৫৬ বঙ্গাব্দের ফাল্গুনে উত্তর কলকাতার ঠনঠনিয়ায় বাবু রামচন্দ্র দত্তের বাড়িতে ‘সর্ব্বশুভকরী’ সভার প্রতিষ্ঠা হয়। সেই সভার তরফে মাসিক ‘সর্ব্বশুভকরী’ পত্রিকা প্রকাশিত হয় ১২৫৭ বঙ্গাব্দের ভাদ্রে (১৮৫০ সালের আগস্টে)। এই পত্রিকা প্রকাশের পিছনে মূল ভূমিকা ছিল বিদ্যাসাগরের। ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ‘বাংলা সাময়িক-পত্র, প্রথম খণ্ড’-এ লিখেছেন, “প্রকৃতপক্ষে বিদ্যাসাগর ও মদনমোহনই পত্রিকাখানির প্রতিষ্ঠাতা। মতিলাল চট্টোপাধ্যায় নামে সম্পাদক ছিলেন।” এ সম্পর্কে বিনয় ঘোষ লিখেছেন, “সমাজসংস্কার ও সমাজকল্যাণের আদর্শ নিয়ে বাংলা পত্রিকা প্রকাশের প্রেরণা বিদ্যাসাগরই দিয়েছিলেন।”

এর আগেই বিদ্যাসাগর নেমে পড়েছেন সামাজিক আন্দোলনে। বিধবাদের দুরবস্থায় তাঁর চোখে জল আসে। কন্যাসন্তানদের বাল্যবিবাহ তাঁকে ব্যথিত করে। এ সব বন্ধ করতে লেখনী ধরলেন বিদ্যাসাগর। ১৮৫০ সালে বাঙালি সমাজ পেল এক মূল্যবান লেখা – ‘বাল্যবিবাহের দোষ’। লেখাটি প্রকাশিত হল মাসিক ‘সর্ব্বশুভকরী’ পত্রিকায়। রচনায় অবশ্য লেখকের নাম ছিল না। তবে ওই লেখা যে বিদ্যাসাগরেরই, তার উল্লেখ পাওয়া যায় মনীষী রাজনারায়ণ বসুর লেখা ‘আত্মচরিত’-এ এবং বিদ্যাসাগর-অনুজ শম্ভুচন্দ্র বিদ্যারত্নের লেখা ‘বিদ্যাসাগর জীবনচরিত ও ভ্রমনিরাস’-এ।

শম্ভুচন্দ্র লিখেছেন, “হিন্দু-কলেজের সিনিয়র ডিপার্টমেন্টের ছাত্রগণ ঐক্য হইয়া ‘সর্ব্ব-শুভকরী’ নামক মাসিক সংবাদপত্রিকা প্রকাশ করেন। উক্ত সংবাদপত্রের অধ্যক্ষ বাবু রাজকৃষ্ণ মিত্র প্রভৃতি অনুরোধ করিয়া, অগ্রজকে বলেন যে, ‘আমাদের এই নূতন কাগজে প্রথম কি লেখা উচিত তাহা আপনি স্বয়ং লিখিয়া দিন। প্রথম কাগজে আপনার রচনা প্রকাশ হইলে, কাগজের গৌরব হইবে এবং সকলে সমাদরপূর্ব্বক কাগজ দেখিবে।’ উহাদের অনুরোধের বশবর্ত্তী হইয়া, তিনি প্রথমত বাল্যবিবাহের দোষ কি, তাহা রচনা করিয়াছিলেন।”

‘বাল্যবিবাহের দোষ’-এ বিদ্যাসাগর লিখলেন, “বিধবার জীবন কেবল দুঃখের ভার। এবং এই বিচিত্র সংসার তাহার পক্ষে জনশূন্য অরণ্যাকার। পতির সঙ্গে সঙ্গেই তাহার সমস্ত সুখ সাঙ্গ হইয়া যায়। এবং পতিবিয়োগদুঃখের সহ সকল দুঃসহ দুঃখের সমাগম হয়। উপবাস দিবসে পিপাসা নিবন্ধে কিম্বা সাংঘাতিক রোগানুবন্ধে যদি তাহার প্রাণাপচয় হয়, তথাপি নির্দ্দয় বিধি তাহার নিঃশেষ নীরস রসনাগ্রে গণ্ডূষমাত্র বারি বা ঔষধ দানেরও অনুমতি দেন না।”

বিদ্যাসাগর দিনের পর দিন পুথি ঘাঁটতে লাগলেন, বিধবাবিবাহের সমর্থনে যদি কোনো শাস্ত্রসম্মত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। শেষ পর্যন্ত সফল হলেন। নিজের আন্দোলনে পেলেন শাস্ত্রের সমর্থন। পরাশর-সংহিতার পাতা ওলটাতে ওলটাতে তিনি পেয়ে গেলেন – ‘নষ্টে মৃতে প্রব্রজিতে ক্লীবে চ পতিতে পতৌ।/পঞ্চস্বাপৎসু নারীণাং পতিরন্যো বিধিয়তে’। অর্থাৎ ‘স্বামী যদি নিরুদ্দেশ হয়, মারা যায়, প্রব্রজ্যা বা সন্ন্যাস নেয়, ক্লীব বা জরাগ্রস্ত, পুরুষত্বহীন বা অক্ষম হয়, যদি পতিত হয়, তা হলে এই পঞ্চ প্রকার আপদে নারীর অন্য পতিগ্রহণ বিধেয়’। এই উক্তি স্বয়ং পরাশর মুনির।

‘বিধবা বিবাহ প্রচলিত হওয়া উচিত কিনা এতদ্বিষয়ক প্রস্তাব’ শীর্ষক বিদ্যাসাগরের একটি রচনা ১৮৫৪ খ্রিস্টাব্দের ফাল্গুন মাসে ‘তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা’য় প্রকাশিত হয়। এর এক মাস আগেই ১২৬০ বঙ্গাব্দের ১০ মাঘ তথা ১৮৫৪ খ্রিস্টাব্দের ২৮ জানুয়ারি রচনাটি পুস্তিকারূপে প্রকাশিত হয়েছিল।

ব্রাহ্ম সম্প্রদায়ের আন্দোলন জিইয়ে তোলার উদ্দেশ্যে ১২৪৬ বঙ্গাব্দের (১৮৩৯ খ্রিস্টাব্দ) ৩ কার্তিক জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের নেতৃত্বে ‘তত্ত্ববোধিনী সভা’ প্রতিষ্ঠিত হয়। সেই সভার মুখপত্র মাসিক ‘তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা’ প্রকাশিত হয় ১২৫০ বঙ্গাব্দের ১ ভাদ্র (১৮৪৩ সালের ১৬ আগস্ট)। সম্পাদক হন অক্ষয়কুমার দত্ত। পত্রিকা পরিচালনার জন্য দেবেন্দ্রনাথ ১৮৪৮ সালে এশিয়াটিক সোসাইটির ধাঁচে পেপার কমিটি তথা প্রবন্ধ নির্বাচনী সভা গঠন করেন।

তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা।

শোভাবাজারের রাজা রাধাকান্ত দেবের দৌহিত্র আনন্দকৃষ্ণ বসু ছিলেন বিদ্যাসাগরের অকৃত্রিম বন্ধু। এই আনন্দকৃষ্ণই ‘তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা’র সম্পাদক অক্ষয়কুমার দত্তের লেখা-সহ পত্রিকার বিভিন্ন বিষয়ে বিদ্যাসাগরের সঙ্গে আলোচনা করতেন। সেই সূত্রে অক্ষয়কুমারের লেখা পড়ে সেই সব লেখায় কিছু ত্রুটির কথা আনন্দকৃষ্ণকে বলেছিলেন বিদ্যাসাগর। আনন্দকৃষ্ণ সেগুলি সংশোধন করে দিতে বলেন। সম্পাদক বা লেখকের অনুমতি বিনা কোনো লেখার উপর কলম চালানোয় বিশ্বাসী ছিলেন না বিদ্যাসাগর। তাই গোড়ার দিকে এ কাজে রাজি হননি তিনি। কিন্তু আনন্দকৃষ্ণের পীড়াপীড়িতে বিদ্যাসাগর ওই সব ত্রুটি সংশোধন করে দেন এবং অক্ষয়কুমার অত্যন্ত আনন্দিত হন। পরে শোভাবাজার রাজবাড়িতে অক্ষয়কুমারের সঙ্গে আলাপ হয় বিদ্যাসাগরের। এবং সেই আলাপ প্রগাঢ় বন্ধুত্বে পরিণত হয়।

দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং অক্ষয়কুমার দত্তের অনুরোধে বিদ্যাসাগর ‘তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা’র লেখক গোষ্ঠীতে যুক্ত হন। পরে পেপার কমিটির সদস্য হন। ‘তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা’র প্রায় সমস্ত লেখার সম্পাদনা তিনিই করতেন। তিনি ওই পত্রিকার ঘোষিত সম্পাদক না হয়েও সম্পাদনায় অন্যতম ব্যক্তিত্ব ছিলেন। প্রত্যক্ষ ভাবে সাংবাদিকতায় যুক্ত না থেকেও সংবাদ বা তথ্য পরিবেশনা, পরিমার্জনায় তিনি ছিলেন অগ্রদূত। তাঁর লেখনীতে সমৃদ্ধ হয়েছিল ‘তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা’। পরবর্তী সময়ে ‘তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা’র নীতি নির্ধারণের প্রশ্নে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে বিদ্যাসাগরের মতবিরোধ হয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, পত্রিকা সম্পাদক অক্ষয়কুমার দত্তের সঙ্গেও মতবিরোধ হয়েছিল দেবেন্দ্রনাথের। তার জেরে তাঁকেও ‘তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা’ ছাড়তে হয়েছিল।           

ইতিমধ্যে বিদ্যাসাগরের প্রথম পুস্তিকা প্রকাশিত হওয়ার পর দেশের গোঁড়া পণ্ডিতগোষ্ঠী তীব্র প্রতিবাদ করে কয়েকটি পুস্তিকা প্রচার করেন। সেই সব পণ্ডিতের মতামত খণ্ডন করার জন্য ১৮৫৫ সালের অক্টোবরে বিদ্যাসাগর বিধবাবিবাহ নিয়ে দ্বিতীয় পুস্তিকা প্রকাশ করলেন – ‘বিধবা বিবাহ প্রচলিত হওয়া উচিত কিনা এতদ্বিষয়ক প্রস্তাব। দ্বিতীয় পুস্তক।’ বিস্তর শাস্ত্রবাক্য উদ্ধার করে বিদ্যাসাগর নিঃসংশয়ে প্রমাণ করলেন যে কলিযুগে বিধবাবিবাহ শাস্ত্রসম্মত কর্তব্য কর্ম, বিধবাবিবাহ প্রচলিত হওয়া উচিত। বাংলা তথা সারা ভারতবর্ষে আলোড়ন পড়ে গেল। শেষ পর্যন্ত ১৮৫৬ সালে ২৬ জুলাই বিধবাবিবাহ আইন পাশ হল।

শুধু বিধবাবিবাহ প্রচলনই নয়, সমাজসংস্কারক হিসাবে বাল্যবিবাহ রদ, বহুবিবাহ নিষিদ্ধ, নারীশিক্ষার প্রসার প্রভৃতি সামাজিক কর্মকাণ্ডে নিজেকে সম্পূর্ণ রূপে নিয়োজিত করেছিলেন বিদ্যাসাগর। আর এ সব কর্মকাণ্ড সঠিক পথে চালানোর ক্ষেত্রে সংবাদপত্রের যে একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে তা তিনি পরিষ্কার বুঝতেন।

‘তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা’র পরে বাংলা সাময়িকপত্রের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ এক নতুন ধারা প্রবর্তন করে ‘সোমপ্রকাশ’ পত্রিকা। ১৮৫৮ সালের ১৫ নভেম্বর (১২৬৫ বঙ্গাব্দের ১ অগ্রহায়ণ) সাপ্তাহিক সংবাদপত্র রূপে প্রকাশিত হয় ‘সোমপ্রকাশ’। এই পত্রিকা প্রকাশেরও আদত পরিকল্পনা বিদ্যাসাগরের। শুধু তা-ই নয়, প্রথম সংখ্যায় প্রকাশিত লেখাগুলিও তাঁর।

‘সোমপ্রকাশ’ যে বিদ্যাসাগরেরই পরিকল্পনা তা জানিয়ে ১৮৬৫ সালের ৯ জানুয়ারি ‘হিন্দু প্যাট্রিয়ট’ লিখেছে, “The Shoma Prokash was first published by Pundit Eswar Chunder Vidyasaghur, and we believe the first number was written by him…”।

হরপ্রসাদ শাস্ত্রী লিখেছেন, “বিদ্যাসাগর মহাশয়ের আর এক কীর্ত্তি সোমপ্রকাশ। বিদ্যাসাগর মহাশয় দেখিতেন – যে-সকল বাংলা কাগজ ছিল, তাহাতে নানা রকম খবর থাকিত; ভাল খবর থাকিত, মন্দ খবরও থাকিত। লোকের কুৎসা করিলে কাগজের পসার বাড়িত, অনেক সময় কুৎসা করিয়া তাহারা পয়সাও রোজগার করিত। বিদ্যাসাগর মহাশয় দেখিলেন যদি কোনো কাগজে ইংরেজীর মত রাজনীতি চর্চ্চা করা যায়, তাহা হইলে বাংলা খবরের কাগজের চেহারা ফেরে। তাই তাঁহারা কয়েকজন মিলিয়া সোমপ্রকাশ বাহির করিলেন; সোমবারে কাগজ বাহির হইত বলিয়া নাম হইল সোমপ্রকাশ।”  

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের পরিকল্পনামতো ‘সোমপ্রকাশ’ ছিল রাজনৈতিক সমাজসচেতন পত্রিকা। এই পত্রিকায় লেখার জন্য সম্ভাব্য লেখকদের একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে প্রয়োজনমতো লেখা পাওয়া যেত না। তাই বিভিন্ন কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকার মধ্যেই স্বয়ং বিদ্যাসাগরকেই অনেক লেখা লিখতে হত এবং নানা পরামর্শ দিয়ে পত্রিকা সচল রাখতেন। বিহারীলাল সরকার লিখেছেন, “বিদ্যাসাগর মহাশয় স্বয়ং সোমপ্রকাশে লিখিতেন।”

বিনয় ঘোষ লিখেছেন, “সোমপ্রকাশের প্রধান আলোচ্য বিষয় ছিল রাজনীতি, অর্থনীতি ও সমাজ, এবং নির্ভীক প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে প্রত্যেক বিষয়ের আলোচনা ও সমালোচনা করা হতো। আলোচনার মানও এত উন্নত ছিল যে আজকের দিনেও সোমপ্রকাশের রচনাবলী পড়লে একেবারে আধুনিক রচনা বলে মনে হয়। একথা পরিষ্কার বোঝা যায় যে পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরই সর্বপ্রথম এই ধরনের একখানি বলিষ্ঠ প্রগতিশীল বাংলা রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক পত্রিকার আবশ্যকতা বোধ করেছিলেন, এবং তাঁর প্রীতিভাজন বন্ধু দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণকে সেই পত্রিকা সঠিকভাবে নির্দিষ্ট পথে পরিচালনার ব্যাপারে সর্বপ্রকারে সাহায্য করেছিলেন।”

সোমপ্রকাশ পত্রিকা

এ বার হরিশ্চন্দ্র মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত ইংরেজি পত্রিকা ‘হিন্দু প্যাট্রিয়ট’ পত্রিকার কথায় আসা যাক। তখনকার দিনে নীলকর সাহেবদের অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে ‘হিন্দু প্যাট্রিয়ট’ লিখত এবং একটি বিরাট আন্দোলনও সংঘটিত করেছিল। কাগজ চালানোর জন্য হরিশ্চন্দ্র পরিশ্রম করতেন এবং এর সঙ্গে ছিল তাঁর অতিরিক্ত মদ্যপানের নেশা। এরই ফলস্বরূপ ১৮৬১ খ্রিস্টাব্দের ১৪ জুন মাত্র ৩৭ বছর বয়সে হরিশ্চন্দ্র প্রয়াত হন। তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে প্রতিহিংসাপরায়ণ নীলকর সাহেবরা নানা কৌশলে এবং আইনের প্যাঁচে ফেলে ‘হিন্দু প্যাট্রিয়ট’ প্রেস এবং অন্যান্য সম্পত্তি নিজেদের করায়ত্ত করে হরিশ্চন্দ্রের অসহায় বিধবা পত্নীকে পথে বসানোর চেষ্টা করে। এই সংবাদ বিদ্যাসাগরের কানে পৌঁছোয়। তাঁর অনুরোধে তাঁর অত্যন্ত স্নেহভাজন কালীপ্রসন্ন সিংহ (হুতোম প্যাঁচা) পাঁচ হাজার টাকায় সব কিছু কিনে হরিশ্চন্দ্রের অসহায় পরিবার এবং ‘হিন্দু প্যাট্রিয়ট’ পত্রিকাটি বাঁচান। কালীপ্রসন্নের ইচ্ছায় তাঁর বন্ধু শম্ভুচন্দ্র মুখোপাধ্যায় পত্রিকার ম্যানেজিং এডিটর হন। কিন্তু বেশি দিন থাকতে পারলেন না তিনি। কালীপ্রসন্ন তখন পত্রিকার ভার বিদ্যাসাগরের হাতে অর্পণ করেন।

বিদ্যাসাগর তখন নানা কাজে ব্যস্ত। তাই অল্প কিছুদিন তিনি কুঞ্জলাল বন্দ্যোপাধ্যায়কে দিয়ে পত্রিকা সম্পাদনার কাজ চালিয়ে নিলেন। তার পর যতীন্দ্রমোহন ঠাকুর ও বিদ্যাসাগর ‘হিন্দু প্যাট্রিয়ট’-এর সম্পাদন-ভার মাইকেল মধুসূদনকে নিতে অনুরোধ করলেন। মাইকেল দায়িত্ব নিলেন, কিন্তু তিন মাস পর বিলেত চলে গেলেন ব্যারিস্টারি পড়ার জন্য। বিদ্যাসাগর তখন ২৩-২৪ বছরের তরুণ কৃষ্ণদাস পালকে পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্ব দিলেন। কৃষ্ণদাস তখন ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশনে চাকরি করেন। সংবাদপত্র পরিচালনা, সম্পাদনা বা সাংবাদিকতায় তিনি অনভিজ্ঞ ছিলেন। তাই কৃষ্ণদাস নামে সম্পাদক হলেও বিদ্যাসাগরকেই সব কিছু করতে হত। বিদ্যাসাগরের অধীনে থেকেই সম্পাদকের কাজ করতেন কৃষ্ণদাস।

কৃষ্ণদাস পালের জীবনীকার রামগোপাল সান্যাল লিখেছেন, “কৃষ্ণদাস শ্রদ্ধেয় পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয়ের অনুগ্রহে হিন্দুপেট্রিয়টের সম্পাদকতা প্রাপ্ত হন।… কৃষ্ণদাস তখন বালক। সুতরাং বিদ্যাসাগর মহাশয় কৃষ্ণদাসের উপর সম্পূর্ণ বিশ্বাস না করিয়া নিজের ইচ্ছানুরূপ প্রবন্ধাদি তাহাকে দিয়া লিখাইয়া লইয়া হিন্দুপেট্রিয়ট চালাইতে লাগিলেন।…কৃষ্ণদাস বিদ্যাসাগর মহাশয়ের অধীনে থাকিয়া হিন্দুপেট্রিয়ট চালাইতে বোধ হয় ইচ্ছুক ছিলেন না। তাই তিনি তলায় ব্রিটিস ইন্ডিয়ান সভার সভ্যদিগকে উক্ত কাগজের স্বত্বাধিকারী হইবার জন্য উত্তেজিত করিতে লাগিলেন। কালীপ্রসন্ন সিংহ মহাশয়ের নিকট প্রস্তাব হইতে লাগিল যে, হিন্দুপেট্রিয়ট বিদ্যাসাগরের অধীনে না রাখিয়া উহা কতিপয় ট্রস্টির হস্তে সমর্পিত হউক।…এই কথা চলাচালি হইতে হইতে বিদ্যাসাগর সময় পরিশেষে জানিতে পারিলেন যে, কালীপ্রসন্ন বাবুর নিকট এ প্রস্তাব হইতেছে। তেজস্বী ব্রাহ্মণশ্রেষ্ঠ বিদ্যাসাগর এইরূপ লুকোচুরির মধ্যে থাকিবার লোক নহেন। তিনি অবিলম্বে হিন্দুপেট্রিয়টের কর্ত্তৃত্ব পরিত্যাগ করিলেন।”

বিনয় ঘোষের কথা দিয়েই এই নিবন্ধ শেষ করি। তিনি লিখেছেন, “নিজে সম্পাদক না হয়েও এবং সাংবাদিকের কাজ যথাযথভাবে না করে, বাংলা সাংবাদিকতাকে ক্ষুদ্রতার গণ্ডি থেকে মুক্ত ক’রে বিদ্যাসাগর বৃহত্তর ও সুস্থতর সমাজ-জীবনের দর্পণস্বরূপ করে তুলেছিলেন। বাংলাদেশে এই কারণে তাঁকে বলিষ্ঠ ও প্রগতিশীল সামাজিক-রাজনৈতিক সাংবাদিকতার অন্যতম প্রবর্তক ও পথপ্রদর্শক বলা যায়।”

খবর অনলাইনে আরও পড়তে পারেন

স্বামীজির সেই ঐতিহাসিক শিকাগো বক্তৃতা আজ যেন আরও বেশি প্রাসঙ্গিক

Continue Reading

প্রবন্ধ

স্বামীজির সেই ঐতিহাসিক শিকাগো বক্তৃতা আজ যেন আরও বেশি প্রাসঙ্গিক

পঙ্কজ চট্টোপাধ্যায় শিকাগোর আর্ট ইনস্টিটিউটে বসেছে ‘দ্য পার্লামেন্ট অব ওয়ার্ল্ড রিলিজিয়নস’। ভারত থেকে এক তরুণ সন্ন্যাসী এসেছেন, হিন্দু ধর্মের প্রতিনিধি হয়ে। তাঁর বক্তৃতা করার পালা এল প্রায় বিকেলের দিকে। কিছুটা যেন নার্ভাস। জ্ঞানের অধিষ্ঠাত্রী দেবী সরস্বতীকে প্রণাম করে শরীরে-মনে যেন একটা নতুন উদ্যম পেলেন। মনে হল তাঁর শরীরে কে যেন ভর করেছেন। বক্তৃতা শুরু করলেন […]

Published

on

vivekananda

পঙ্কজ চট্টোপাধ্যায়

শিকাগোর আর্ট ইনস্টিটিউটে বসেছে ‘দ্য পার্লামেন্ট অব ওয়ার্ল্ড রিলিজিয়নস’। ভারত থেকে এক তরুণ সন্ন্যাসী এসেছেন, হিন্দু ধর্মের প্রতিনিধি হয়ে। তাঁর বক্তৃতা করার পালা এল প্রায় বিকেলের দিকে। কিছুটা যেন নার্ভাস। জ্ঞানের অধিষ্ঠাত্রী দেবী সরস্বতীকে প্রণাম করে শরীরে-মনে যেন একটা নতুন উদ্যম পেলেন। মনে হল তাঁর শরীরে কে যেন ভর করেছেন। বক্তৃতা শুরু করলেন ‘সিস্টারস অ্যান্ড ব্রাদার্স অব আমেরিকা’ সম্বোধন করে। সাত হাজার দর্শক-শ্রোতা দাঁড়িয়ে উঠে করতালি দিয়ে অভিনন্দন জানালেন সেই তরুণ সন্ন্যাসীকে। দু’ মিনিট ধরে চলল হাততালি। ফলে সেই সন্ন্যাসীর জন্য বরাদ্দ সময় বাড়াতে বাধ্য হলেন উদ্যোক্তারা। আমেরিকা-সহ বিদেশ জয় শুরু হল স্বামী বিবেকানন্দের।

স্বামীজির বিশ্বজয়ের সেই সূত্রপাতের ১২৮ বছর আজ, এই ১১ সেপ্টেম্বর।

১৮৯৩-এর ১১ সেপ্টেম্বর। শিকাগোর আর্ট ইনস্টিটিউটে বসেছিল ‘দ্য পার্লামেন্ট অব ওয়ার্ল্ড রিলিজিয়নস’। সে দিন আমেরিকাবাসীর মন কেড়ে নেওয়ার ফলস্বরূপ ১১ সেপ্টেম্বরের পরে আরও পাঁচ দিন বক্তৃতা করতে হয়েছিল স্বামীজিকে। ১৫, ১৯, ২০, ২৬ ও ২৭ সেপ্টেম্বর। ধর্ম, সংস্কৃতি, সভ্যতা নিয়ে অনেক কিছু বলেছিলেন তিনি। কিন্তু সব চেয়ে বড়ো কথা হল, সে দিন তিনি এমন কিছু বলেছিলেন, যা আজ একুশ শতকের দ্বিতীয় দশকের শেষে এই পৃথিবীতে সমান প্রাসঙ্গিক।

কী বলেছিলেন তিনি, এক বার খুব সংক্ষেপে মনে করা যেতে পারে।

“… আমরা শুধু সব ধর্মের প্রতি সহনশীল – তা-ই নয়। আমাদের কাছে সমস্ত ধর্মই সমান সত্যি। পৃথিবীর সমস্ত ধর্মের, সমস্ত জাতির তাড়া খাওয়া মানুষ, শরণাগত মানুষকে আশ্রয় দিয়েছে যে জাতি, আমি সেই জাতির এক জন বলে গৌরববোধ করি। রোমানরা যে বছর ভয়ংকর অত্যাচারে ইজরায়েলের মানুষদের পবিত্র মন্দির ধ্বংস করেন, সে বছরই সে দেশের বহু মানুষ দক্ষিণ ভারতে এসে আশ্রয় নেন। এ কথা আমার বলতে গর্ববোধ হয় যে, সেই সব খাঁটি ইজরায়েলবাসীর বংশধরদের আমরা বুকে করে রেখে দিয়েছি। লক্ষ লক্ষ মানুষ যে স্তোত্র আজও পাঠ করেন, আমিও যা ছোটোবেলা থেকে উচ্চারণ করে আসছি, তার কয়েকটা লাইন বলছি : ‘নানা নদীর উৎস নানা জায়গায়, কিন্তু যেমন তারা সবাই একই সমুদ্রে তাদের জল ফেলে মিশে যায়, তেমনই, হে ঈশ্বর, মানুষ আলাদা আলাদা সংস্কারের বশে, জটিল বা সরল যে পথেই থাক না কেন, সকলের গন্তব্য এক তুমিই।

“… গীতাতেও আছে সেই আশ্চর্য তত্ত্ব — ‘ যে যে-ভাব নিয়েই আমার কাছে আসুক না কেন, আমার কাছে পৌঁছোয়। মানুষ নানান পথের পথিক হতে পারে, কিন্তু সব পথই শেষে আমাতে এসে মেশে। সাম্প্রদায়িকতা, গোঁড়ামি আর তার ভয়ংকর পরিণাম ধর্মোন্মত্ততা, এই সুন্দর পৃথিবীকে ছেয়ে ফেলেছে। পৃথিবীকে হিংসায় পূর্ণ করেছে, মানুষের রক্তে ভিজিয়ে দিয়েছে, সভ্যতাকে ধ্বংস করে সমস্ত বিশ্বকে হতাশায় ডুবিয়ে দিয়েছে। এই ভয়ংকর দানবগুলো না থাকলে মানুষের সমাজ এখন যতটা না এগিয়েছে, তার চেয়ে অনেক বেশি এগিয়ে যেত।

“… সংকীর্ণ ভাবনাই আমাদের মধ্যে এত ঝগড়াঝাঁটির কারণ। আমি একজন হিন্দু – আমি আমার ছোট্টো কুয়োর মধ্যে বসে আছি আর সেটাকেই গোটা পৃথিবী ভাবছি। খ্রিস্টান ধর্মে যিনি বিশ্বাসী, তিনি তাঁর নিজের ছোট্টো কুয়োয় আর সেটাকেই গোটা দুনিয়া মনে করছেন। মুসলমানও নিজের ছোট্টো কুয়োয় বসে আছেন আর সেটাকেই গোটা জগৎ মনে করছেন।

“… যতই মিলমিশের কথা বলো, তার মধ্যে কিছু লোক এমন কথা বলবেই যাতে সেই মিলনের সুরটা কেটে যাবে। আমি সেই কথাগুলোকেও বিশেষ ধন্যবাদ দিই, কারণ তারা জোরালো বিরোধ দেখিয়েছে বলেই তো আমাদের এই সামগ্রিক মিলন গানের সুর আরও বলিষ্ঠ ও দৃঢ় হয়ে উঠছে।

“…বিভিন্ন ধর্মের মধ্যে সাধারণ ঐক্যের ভিত্তি ঠিক কোন্‌ জায়গাটায়, তা নিয়ে অনেক বলা-কওয়া হয়ে গেছে। এই কথাটা বলা জরুরি মনে করি; কেউ যদি মনে করে একটা নির্দিষ্ট ধর্ম জিতে যাবে, আর বাকি সব ধর্ম খতম হয়ে যাবে, আর সেই ভাবে ঐক্য আসবে, তবে তাকে একটাই কথা বলার – এই আশা বাস্তবে মোটেও ফলবে না। প্রত্যেককে অন্যের ধর্মের সারটুকু নিতে হবে, অন্য ধর্মের প্রতি মর্যাদা দিতে হবে। আবার নিজের ধর্মের নিজস্বতাকেও বাঁচিয়ে রাখতে হবে। পবিত্রতা, ঔদার্য — এগুলো কোনো বিশেষ ধর্মসম্প্রদায়ের সম্পত্তি নয়। সব ধর্মসম্প্রদায়ই যুগেযুগে খুব উঁচু চরিত্রের মানুষের জন্ম দিয়েছে।

“…চোখের সামনে এত সব তথ্যপ্রমাণ সত্ত্বেও, কেউ যদি স্বপ্ন দেখে, তার নিজের ধর্মটি, একলা বিরাট হয়ে বেঁচে থাকবে, আর অন্যগুলি নিপাত যাবে, সেটা ভুল। তাকে জানতে হবে, যতই বাধা আসুক না কেন, সব ধর্মের পতাকায় খুব শীঘ্রই লেখা থাকবে, ‘বিবাদ নয়, সহায়তা। বিনাশ নয়, আত্মস্থ করা। মতবিরোধ নয়, সমন্বয় ও শান্তি”।

শিকাগো ধর্মসভা সম্মেলনে স্বামী বিবেকানন্দের ঐতিহাসিক বক্তৃতার নির্বাচিত অংশকে আজ ফিরে দেখা খুবই জরুরি – আমাদের দেশ, আমাদের মহাদেশ এবং আমাদের বিশ্বের বর্তমান পরিস্থিতিতে। পবিত্র সেই সেপ্টেম্বরে বিনম্র নিবেদন –

কেন আজ আমার এ দেশে / আমার এই পৃথিবীতে / নিয়ত ষড়যন্ত্র করে / অমানবিক হিংস্রতা? / কেন আমার দেশের / আর আমার পৃথিবীর / আজকের নাম হল / মৃত্যুর উপত্যকা? / যদিও, ‘শৃন্বন্ত বিশ্বে’ / সবাই ‘অমৃতস্য পুত্রার’ – / তবুও কেন খুন হয় মানুষ / অন্য এক মানুষের হাতে? / যদিও পৃথ্বীর নীল আকাশে / ধ্বনিত ‘বসুধৈব কুটুম্বকম’ – / তবুও মানুষ নিপীড়িত হয় / এক অন্য মানুষের ছলনায়। / ওগো পৃথিবীর অধিদেবতা, / আমার স্বদেশের গণদেবতা – / বাঁচাও আমার দেশ-পৃথিবীকে / ফিরিয়ে দাও তার শাশ্বত পরিচয় – / সেই অনির্বাপিত শান্তির যজ্ঞে / দধীচির অস্থির মতো / দিতে পারি আমার সব কিছু — / যদি প্রয়োজন হয়।

Continue Reading

প্রবন্ধ

বামেদের সঙ্গে জোটের কারিগর প্রণব ‘চাণক্য’ মুখোপাধ্যায়

যখন ইউপিএ গঠিত হল, এবং দৃশ্যপট থেকে সরে গেলেন সুরজিৎ, তখন ইউপিএ-বাম সমন্বয়ের মূল কাজটি প্রণববাবু করতেন সীতারাম ইয়েচুরিকে ডেকে নিয়ে।

Published

on

এক বই প্রকাশ অনুষ্ঠানে প্রণব মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে মনমোহন সিং ও সীতারাম ইয়েচুরি।

দেবারুণ রায়

সারা দেশে বামেদের সঙ্গে জোট গড়ার ভাবনা মূর্ত হয়েছিল প্রণব ‘চাণক্য’ মুখোপাধ্যায়ের (Pranab Mukhopadhyay) মুনশিয়ানায়। প্রিয়রঞ্জন দাসমুন্সি থাকলে নিশ্চয়ই সে দিনের এক জ্বলন্ত সাক্ষীর সাক্ষ্য পাওয়া যেত। সূচনা পর্বের আগাগোড়া, জোটের নীল নকশার সূত্রধর ছিলেন সিপিএমের সেই সময়ের সাধারণ সম্পাদক হরকিষেন সিং সুরজিৎ (Harkishen Singh Surjit)। আর নেপথ্যের মহানায়কের নাম বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং (Vishwanath Pratap Singh)। ১৯৯৬-এর ঐতিহাসিক ভুল ভারতীয় রাজনীতির সমকালীন অনুঘটক বামেদের রণনীতি বদলাতে বাধ্য করেছিল। গঠনতন্ত্রের গোঁড়ামি বহাল রাখলেও কংগ্রেসের (Congress) ব্যাপারে ছুৎমার্গ অনেকটাই কাটিয়ে উঠছিল সিপিএম (CPM)। এবং কংগ্রেসের সঙ্গে বোঝাপড়া করে সাম্প্রদায়িকতাকে রোখার লাইনটিকে মাইলফলক বানিয়ে পাদপ্রদীপের আলো থেকে সরে গিয়েছিলেন সিপিএমের নবরত্নসভার শেষ দুই কমরেড। অনেকটাই অবসৃত জ্যোতি বসুকে (Jyoti Basu) সঙ্গে নিয়ে দলে সংখ্যালঘু  সাধারণ সম্পাদক সুরজিৎ নেমেছিলেন পার্টির লাইন বদলের দিশায় ইনার পার্টি স্ট্রাগলে। বাইরের জমি তৈরি করতে সুরজিৎকে সহারা দিয়েছিলেন ভিপি। আর রাজীবের বন্ধু থেকে শত্রু হওয়া ভিপির অক্লান্ত চেষ্টা আর শুভানুধ্যায়ীদের মধ্যস্থতায় কংগ্রেসের সভানেত্রী সনিয়া গান্ধীর (Sonia Gandhi) ভুল ভেঙেছিল ভিপির বিষয়ে।

ছিয়ানব্বইয়ে সিপিএমের সরকারে না যাওয়ার জেদ দেখে অকংগ্রেসি ধর্মনিরপেক্ষ শিবিরের মুকুটহীন রাজা বিশ্বনাথপ্রতাপ সবাইকে বলেছিলেন, কংগ্রেসকেই জোটের নেতৃত্বে আনা ছাড়া সরকার গড়া বা তা স্থিতিশীল করা যাবে না। বাংলায়, কেরলে সংগঠন বাঁচাতে ভাবের ঘরে চুরি করার রণনীতি বহাল রেখেই সেকুলার জোট গড়তে হবে। এবং কংগ্রেসের নেতা কে হবেন তা নিয়ে কংগ্রেসই মাথা ঘামাবে। বিশ্বনাথের সঙ্গে সম্পর্ক মধুর ছিল না প্রণবের। তাই প্রণবকে সঙ্গে নিয়ে জমি তৈরির কাজে নামলেন সুরজিৎ। বিশ্বনাথ ব্যক্তিগত ভাবে ভোট-রাজনীতি থেকে সন্ন্যাস নিয়েও সনিয়ার সঙ্গে লাগাতার কথা বলতে শুরু করলেন। কার্যক্ষেত্রে তার ফলোআপ করতেন সুরজিৎ ও তাঁর সঙ্গী সিপিআইয়ের শীর্ষনেতা এবং লালু, মুলায়মের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ কমরেড অর্ধেন্দুভূষণ বর্ধন, যিনি এবি বর্ধন নামেই পরিচিত। নাগপুরের বাঙালি বর্ধনদার সঙ্গে খাতিরের সম্পর্ক শরদ পওয়ারের। সনিয়া ও পওয়ারের তিক্ততা মিটিয়ে বোঝাপড়ার কথা হল কংগ্রেস ও এনসিপির। এই আগাগোড়া একের সঙ্গে আরেককে জোড়ার কঠিনতম কাজটি পড়ল প্রণববাবুর ও সুরজিতের ওপর। পরিস্থিতি অনেকটা পরিপক্ব হওয়ার পর আসরে এলেন জ্যোতি বসু।

এ দিকে সীতারাম ইয়েচুরি ও প্রকাশ কারাটের সঙ্গে নিত্যই দিল্লিতে পার্টি সেন্টারে হাজির পিবি সদস্যদের বৈঠকে কথা বলতেন সুরজিৎ। জ্যোতি বসুর মতামত তো নিতেনই। এই সময়ে তালকাটৌরা রোডের ১৩ নম্বর বাড়িতে সন্ধ্যার পর আসতেন সুরজিৎ। ওঁর সঙ্গে অতীতে রাজ্যসভা থেকেই ঘনিষ্ঠতা ছিল প্রণববাবুর। দিনের পর দিন প্রণববাবুর কাছে গিয়ে দেখা হয়েছে কমরেড সুরজিৎয়ের সঙ্গে। দীর্ঘ পরিচয়ের সূত্রে ওঁর কাছেও সস্নেহ প্রশ্রয়ের অভাব ছিল না। সুরজিৎয়ের মজা ছিল, কী কথা হল, কার সঙ্গে হল, এ সব বলতেন না। বলতেন, সময় হলে সব জানতে পারবে। শুধু জেনে রাখো সব কিছু সঠিক ভাবে এগোচ্ছে।

সুরজিৎয়ের সঙ্গে বৈঠকের পর একদিন প্রণববাবুর কাছে গিয়ে জানতে চাইছি। ‘দাদা’ রাজনীতিবিদ হিসেবে উৎকর্ষের শিখরে থেকে স্বভাবতই ব্যক্তিগত বিশ্বাসযোগ্যতায় আস্থা রাখতেন। স্নেহের সম্পর্ক এক দিনে গড়ে  উঠত না বা ভেঙেও যেত না। ইতিহাস বা রাজনীতির অজ্ঞতা যদি কারও প্রশ্নে ধরা পড়ত তা হলে তার ধমক খাওয়া অনিবার্য ছিল।  সুরজিৎয়ের সঙ্গে বৈঠকের পর সে দিন ‘দাদা’র মেজাজ বেশ ফুরফুরে। বললেন, সুরজিৎ একদম ভাইস চ্যান্সেলর। দারুণ রাজনীতির লোক। ওর দলের ছেলেগুলো ওর কাছ থেকে কিছু শিখল না। সিরিয়স কথা, কিন্তু বললেন হাসির ছলে। প্রকাশ কারাটের সঙ্গেও কথা বলতেন ‘দাদা’। কিন্তু সুরজিৎয়ের সঙ্গে বৈঠকের সুবাদে সীতারাম অনেক বেশি যেতেন। এবং সীতারামকে একটু বেশিই স্নেহ করতেন অর্থনীতির ভালো ছাত্র বলে। পরে যখন ইউপিএ গঠিত হল, এবং দৃশ্যপট থেকে সরে গেলেন সুরজিৎ, তখন ইউপিএ-বাম সমন্বয়ের মূল কাজটি প্রণববাবু করতেন সীতারাম ইয়েচুরিকে ডেকে নিয়ে। বৈঠকের পর ব্রিফিংয়ে শুধু সীতারামকেই বলতে বলতেন। নিজে  বলতেন দু’টো-একটা কথা।

এই ভাবেই ২০০৪-এর সরকারের মুশকিল আসান প্রণববাবু চার বছর নিরুপদ্রবেই চালিয়ে নিয়েছিলেন। মাঝেমধ্যে জ্যোতিবাবুর সঙ্গে দেখা করতে যেতেন কলকাতায় গেলে। দু’ জনের কথাবার্তার পর প্রেস মিডিয়া ছেঁকে ধরেছে দু’ জনকেই। প্রণববাবুর সৌজন্য এত প্রখর ছিল, যা শেখার মতো। হাসিমুখে ক্যামেরাকে বলেছেন জ্যোতিবাবুকে দেখিয়ে, ওঁর কাছে আগে যান। এবং জ্যোতিবাবুর মস্তিষ্ক  মিডিয়ার সামনে শেষ দিনেও ছিল প্রখর। প্রণবকে দেখিয়ে বলেছেন, “জিজ্ঞাসার কিছু নেই। ও আছে তো। সব ঠিকমতোই করছে। ও আমাদের পার্টিকে জানে। আমরা কী চাই সেটা খুব ভালো করে জানে। তাই কোনো সমস্যা নেই।” সে দিন অভিভূত হাসিমুখ ছাড়া প্রণববাবু মিডিয়াকে আর কিছুই দেননি।

সেই সরকার থেকে বামদের সমর্থন তুলে নেওয়ার ঘটনাটি রোখার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করেছিলেন ‘দাদা’। পরমাণু চুক্তির কিছু প্রস্তাবিত ধারার বয়ান বদলানোর চেষ্টা তিনি কী ভাবে করেছিলেন তা জানতেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, প্রকাশ কারাট ও সীতারাম ইয়েচুরি। সনিয়াকেও রাজি করিয়ে নিয়েছিলেন। কিন্তু আমেরিকার তৎকালীন বুশ প্রশাসন ছিল অনমনীয়। তখন একমাত্র প্রধানমন্ত্রী মনমোহনই পারতেন ‘হয়’ কে ‘নয়’ করতে। কিন্তু যাঁরা তাকে দুর্বল প্রধানমন্ত্রী বলে প্রচারে নেমেছিলেন তাঁদের নেতা আডবাণীও বিলক্ষণ জানতেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী কখনও দুর্বল হন না। এই সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রী ঈশ্বরের মতোই সর্বশক্তিমান। তা ছাড়া কংগ্রেস সভানেত্রী বহু জনমুখী কর্মসূচিতে বামেদের কথামতো চাপ দিলেও চাননি প্রধানমন্ত্রীর কর্তৃত্ব কোনো ভাবে খর্ব হোক আন্তর্জাতিক চুক্তির ক্ষেত্রে।

যাঁরা প্রণববাবুর সম্পর্কে কিছুই না জেনে অনর্গল প্রচারে বলেন, উনি সাধারণ মানুষের জন্যে, রাজ্যের জন্যে কিছু করেননি, তাঁদের জেনে রাখা ভালো, একশো দিনের কাজ থেকে রাজ্যের পরিকাঠামো উন্নয়ন ও সর্বভারতীয় প্রতিষ্ঠানের স্থাপনা-সহ বাজেটে এমন বহু জনমুখী কর্মসূচি নিতে প্রধানমন্ত্রীকে চাপ দিয়েছেন যেগুলো কোনো দিন আলোর মুখ দেখত না। চিদম্বরম অর্থমন্ত্রী থাকাকালীন সব জনমুখী প্রকল্প রুখতেন টাকা নেই বলে। এবং মনমোহন তাতে সায় দিতেন। প্রণববাবু নীরবে এই ‘না’গুলোকে ‘হ্যাঁ’ করিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীকে দিয়ে। সনিয়াকেও সঙ্গে পেয়েছেন।

কিন্তু শেষ যে দিন মনমোহন দেখলেন প্রণববাবুর সমঝোতার সূত্রে বামেরা রাজি এবং চুক্তির মূল বয়ানের কিছুটা বদলাতে হবে, সে দিন তিনি তাঁর শান্ত এবং বরফশীতল কণ্ঠ শোনালেন দলনেত্রীকে। ৭, রেসকোর্স রোডে সনিয়াজি যখন এলেন মনমোহন তাঁকে ঠান্ডা গলায় জানিয়ে দিলেন, “পরমাণু চুক্তির বয়ান বদল করতে হলে আমি এখনই পদত্যাগ করব। এটাই আমার অপরিবর্তনীয়  স্থির সিদ্ধান্ত”। এর পরই রীতিমতো হতবাক সনিয়া প্রধানমন্ত্রীকে বলেছিলেন, তাঁর কর্তৃত্ব কখনোই খর্ব হবে না। তিনি যা বলবেন সেটা অবশ্যই শেষ কথা।  রাতেই চূড়ান্ত হল চুক্তির বয়ান। বামেদের বিসর্জন দিয়েও স্পিকারকে পাশে নিয়ে মনমোহন যে চুক্তি করলেন তা দিল্লির মসনদকে ধাক্কা দিয়ে গেল। প্রণবকে সব বিষয়ে শেষ কথা বলার অধিকার দিলেও এই পরমাণু চুক্তির বিষয়ে তিনি পুরোপুরি অনমনীয়  থাকলেন। শেষে বার্তা চলে গেছে যখন বুশের দফতরে তখনও প্রণববাবুর কাছে কোনো বিস্তারিত বয়ান নেই। কিন্তু মনমোহনের সঙ্গে সম্পর্কের রসায়ন চমৎকার থাকায় প্রণববাবু নিষ্ঠ সহযোগীর দায়িত্বও চালিয়ে গেলেন। বামেদের বিচ্ছিন্ন হওয়ার ক্ষোভ চেপে সরকার বাঁচাতে নতুন বন্ধু খুঁজতে নামলেন। বাম বিকল্প বাংলাতেই বেড়ে উঠছিল। সনিয়ার নয়া অবস্থান তীব্র বাম বিরোধিতা মমতাকে যে জলপাই পাতা দেখাল তার আসমানি আয়োজন আর জেমিনি জোটের ছবি আঁকা ছিল প্রণববাবুরই ক্যানভাসে।

খবরঅনলাইনে আরও পড়তে পারেন

কংগ্রেসের সব প্রধানমন্ত্রীই সংঘের সঙ্গ করেছেন, হঠাৎ প্রণবকে নিয়ে দু’ বছর আগে কেন প্রশ্ন উঠেছিল

Continue Reading
Advertisement
দেশ28 mins ago

কৃষি বিলের প্রতিবাদে ‘দিল্লি চলো’র ডাক কৃষক সংগঠনের

coronavirus
রাজ্য28 mins ago

রাজ্যের কোভিড-পরিস্থিতি স্থিতিশীল, চিন্তায় রাখছে কলকাতা-উত্তর ২৪ পরগণা

রাজ্য1 hour ago

করোনার মৃদু উপসর্গ থাকলে বাড়িতে থেকে চিকিৎসা করাতে বললেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়

বিনোদন1 hour ago

দুর্গার বেশে ধরা দিয়ে খুনের হুমকি পাচ্ছেন নুসরত জাহান, দ্বারস্থ প্রশাসনের

রাজ্য2 hours ago

বদলি প্রক্রিয়া শুরুর দাবিতে বিকাশ ভবন যাচ্ছে শিক্ষক সংগঠন

জলপাইগুড়ি3 hours ago

‘একশো শতাংশ কাজ চাই, ঢিলেমি নয়’, উত্তরকন্যার প্রশাসনিক বৈঠকে স্পষ্ট বার্তা মুখ্যমন্ত্রীর

দেশ4 hours ago

ভারত এবং বিশ্বের স্বল্প ও মধ্যম আয়ের দেশগুলির জন্য বাড়তি ১০ কোটি ডোজ করোনা ভ্যাকসিন তৈরি করবে সেরাম

Mukesh Ambani
শিল্প-বাণিজ্য5 hours ago

লকডাউনের পর থেকে প্রতি ঘণ্টায় মুকেশ অম্বানির আয় ৯০ কোটি টাকা!

দেশ11 hours ago

কোভিড আপডেট: নতুন করে আক্রান্ত ৭০৫৮৯, সুস্থ ৮৪৮৭৭

দেশ2 days ago

জল্পনার অবসান! নীতীশ কুমারের দলে যোগ দিলেন বিহারের প্রাক্তন ডিজি

Mamata Banerjee
রাজ্য3 days ago

১ অক্টোবর থেকে শর্তসাপেক্ষে খুলছে সিনেমা হল, চালু খেলাধুলো-সহ অন্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান

north bengal rain
রাজ্য1 day ago

অতিবৃষ্টির হাত থেকে অবশেষে রেহাই পেল উত্তরবঙ্গ, আপাতত স্বস্তি

দেশ2 days ago

প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এবং বিজেপি নেতা জসবন্ত সিংহ প্রয়াত

বাংলাদেশ3 days ago

অবৈধ পথে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে নৌকাডুবি, বাংলাদেশি-সহ উদ্ধার ২২

রাজ্য3 days ago

বিজেপির কেন্দ্রীয় সম্পাদকপদ খুইয়ে হুঁশিয়ারি রাহুল সিনহার!

shubhman gill
ক্রিকেট3 days ago

শুভমান গিলের ব্যাটে ভর করে আইপিএলে খাতা খুলল কেকেআর

কেনাকাটা

কেনাকাটা21 hours ago

পছন্দসই নতুন ধরনের গয়নার কালেকশন, দাম ১৪৯ টাকা থেকে শুরু

খবর অনলাইন ডেস্ক : পুজোর সময় পোশাকের সঙ্গে মানানসই গয়না পরতে কার না মন চায়। তার জন্য নতুন গয়না কেনার...

কেনাকাটা4 days ago

নতুন কালেকশনের ১০টি জুতো, ১৯৯ টাকা থেকে শুরু

খবর অনলাইন ডেস্ক : পুজো এসে গিয়েছে। কেনাকাটি করে ফেলার এটিই সঠিক সময়। সে জামা হোক বা জুতো। তাই দেরি...

কেনাকাটা5 days ago

পুজো কালেকশনে ৬০০ থেকে ১০০০ টাকার মধ্যে চোখ ধাঁধানো ১০টি শাড়ি

খবর অনলাইন ডেস্ক: পুজোর কালেকশনের নতুন ধরনের কিছু শাড়ি যদি নাগালের মধ্যে পাওয়া যায় তা হলে মন্দ হয় না। তাও...

কেনাকাটা1 week ago

মহিলাদের পোশাকের পুজোর ১০টি কালেকশন, দাম ৮০০ টাকার মধ্যে

খবরঅনলাইন ডেস্ক : পুজো তো এসে গেল। অন্যান্য বছরের মতো না হলেও পুজো তো পুজোই। তাই কিছু হলেও তো নতুন...

কেনাকাটা1 week ago

সংসারের খুঁটিনাটি সমস্যা থেকে মুক্তি দিতে এই জিনিসগুলির তুলনা নেই

খবরঅনলাইন ডেস্ক : নিজের ও ঘরের প্রয়োজনে এমন অনেক কিছুই থাকে যেগুলি না থাকলে প্রতি দিনের জীবনে বেশ কিছু সমস্যার...

কেনাকাটা2 weeks ago

ঘরের জায়গা বাঁচাতে চান? এই জিনিসগুলি খুবই কাজে লাগবে

খবরঅনলাইন ডেস্ক : ঘরের মধ্যে অল্প জায়গায় সব জিনিস অগোছালো হয়ে থাকে। এই নিয়ে বারে বারেই নিজেদের মধ্যে ঝগড়া লেগে...

কেনাকাটা3 weeks ago

রান্নাঘরের জনপ্রিয় কয়েকটি জরুরি সামগ্রী, আপনার কাছেও আছে তো?

খবরঅনলাইন ডেস্ক: রান্নাঘরের এমন কিছু সামগ্রী আছে যেগুলি থাকলে কাজ করাও যেমন সহজ হয়ে যায়, তেমন সময়ও অনেক কম খরচ...

কেনাকাটা3 weeks ago

ওজন কমাতে ও রোগ প্রতিরোধশক্তি বাড়াতে গ্রিন টি

খবরঅনলাইন ডেস্ক : ওজন কমাতে, ত্বকের জেল্লা বাড়াতে ও করোনা আবহে যেটি সব থেকে বেশি দরকার সেই রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা...

কেনাকাটা3 weeks ago

ইউটিউব চ্যানেল করবেন? এই ৮টি সামগ্রী খুবই কাজের

বহু মানুষকে স্বাবলম্বী করতে ইউটিউব খুব বড়ো একটি প্ল্যাটফর্ম।

কেনাকাটা1 month ago

ঘর সাজানোর ও ব্যবহারের জন্য সেরামিকের ১৯টি দারুণ আইটেম, দাম সাধ্যের মধ্যে

খবরঅনলাইন ডেস্ক: ঘর সাজাতে কার না ভালো লাগে। কিন্তু তার জন্য বাড়ির বাইরে বেরিয়ে এ দোকান সে দোকান ঘুরে উপযুক্ত...

নজরে