ফিরে যাই ১৫ বছর আগের ডিসেম্বরে দক্ষিণ আফ্রিকায় সৌরভের ‘দাদাগিরি’-তে

0
দক্ষিণ আফ্রিকায় সৌরভ। ছবি Twitter থেকে নেওয়া।

শ্রয়ণ সেন

১১ মাস পর কামব্যাক করছে ছেলেটা। বদলে গিয়েছে স্টান্স। হাবভাবে যেন আরও বেশি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। সামনে দক্ষিণ আফ্রিকার অন্যতম সেরা পেসার মাখায়া এনতিনি।

শর্ট বল করলেন এনতিনি। এই বল তাঁর কাছে দুর্বলতা। বলটা দেখলেই আড়ষ্ট হয়ে যান। কিন্তু তিনি আজ সম্পূর্ণ অন্য মুডে যে। সেই শর্ট বলকেই মহারাজকীয় কায়দায় পুল করলেন তিনি। বল গিয়ে পড়ল গ্যালারির বাইরে। দীর্ঘদিন পর ক্রিকেট মাঠে আবার ‘বাপি বাড়ি যা!’

এক কঠিন লড়াইয়ের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি, সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়। ১১ মাস পর টেস্ট দলে কামব্যাক হয়েছে তাঁর। আগের দিন এক্কেবারে শেষ লগ্নে ব্যাট হাতে নামেন। শন পোলক, মাখায়া এনতিনি, আন্দ্রে নেল সংবলিত দক্ষিণ আফ্রিকান পেস আক্রমণের লাগাতার বাউন্সার অবলীলায় সামলেছেন।

সেই সঙ্গে আন্দ্রে নেলের উত্তেজনা সৃষ্টিকারী গালিগালাজও ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়েছেন তিনি। কারণ এ বার যে তাঁর লক্ষ্য একটাই। প্রত্যাবর্তনের লড়াই তাঁকে জিততেই হবে যে, গ্রেগ চ্যাপেলের মুখের ওপরে ঝামাটা ঘষে দিতে হবে তো!

দক্ষিণ আফ্রিকা কখনও সে ভাবে খালি হাতে ফেরায়নি সৌরভকে। ২০০৩-এর বিশ্বকাপের সময়টা কী ভাবে ভুলতে পারি। তারও দু’বছর আগে সদ্য অধিনায়ক হওয়া সৌরভের কাছে এই দক্ষিণ আফ্রিকাই ছিল প্রথম সব থেকে বড়ো পরীক্ষা।

বিশ্বকাপের সময় অধিনায়কত্বের জগতে সৌরভ অনেকটাই পরিণত। গোটা বিশ্বকাপটা আমাদের জীবনের সঙ্গে কেমন আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ছিল। তখন ক্লাস সিক্সের পরীক্ষা দিয়ে সেভেনে উঠব। পরীক্ষার পালা শেষ। চুটিয়ে উপভোগ করেছিলাম সেই সময়টা। সৌরভের ভারত একের পর এক প্রতিপক্ষকে গুঁড়িয়ে ফাইনালে উঠছে, আর আমাদের আনন্দ যেন বাঁধ মানছে না।

ফর্ম হারিয়ে ফেলা ব্যাটসম্যান সৌরভকে ফর্মে ফেরালও এই বিশ্বকাপই। তিন তিনটে শতরানের সঙ্গে গোটা বিশ্বকাপে সব থেকে বেশি রান সংগ্রহকারীর তালিকায় দ্বিতীয় স্থান দখল করলেন তিনি।

বিশ্বকাপের শেষটা আমাদের কাছে ভীষণই দুঃখের ছিল তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু বুক চিতিয়ে লড়াই করার যে স্বপ্ন অধিনায়ক হওয়ার সময় সৌরভ দেখিয়েছিলেন, সেটা পূরণ হল এই বিশ্বকাপে।

সাড়ে তিন বছর পর আবার দক্ষিণ আফ্রিকায় ভারত। এ বার পরিস্থিতি এক্কেবারেই ভিন্ন। জন রাইটের বদলে কোচ হয়েছেন গ্রেগ চ্যাপেল। সৌরভকে সরিয়ে অধিনায়ক দ্রাবিড়। ভারতীয় ক্রিকেটে শুরু ‘চ্যাপেলওয়ে’, যার অন্যতম বলি হয়ে গিয়েছেন সৌরভ।

আসলে শুরু থেকে সব সময়ই পরীক্ষা এবং প্রমাণ করার মধ্যে দিয়ে ছুটতে হয়েছে সৌরভকে। সেই ১৯৯৬ সালে লর্ডসে অভিষেক থেকে শুরু। তার পর, কখনোই তাঁর ক্রিকেট-জীবন খুব একটা মসৃণ পথ দিয়ে যায়নি। বার বার প্রমাণ করে যেতে হয়েছে তিনি পারেন, তাঁর ক্ষমতা রয়েছে।

এ হেন সৌরভকে ২০০৫-এ ভারতীয় দল থেকে বের করে দেওয়ার নানা রকম ছলচাতুরি শুরু হল। চ্যাপেলের কথায় সায় দিয়ে সেটা করেও ফেললেন নির্বাচকরা। দ্রাবিড়কে খুব একটা দোষ দেওয়া যায় না। বরাবরের নির্বিবাদী ছেলেটা, দলে কোনো ঝামেলা চাইতেন না সম্ভবত, সে কারণেই চ্যাপেলের মুখের ওপরে কোনো প্রতিবাদ করেননি।

যা-ই হোক, সৌরভ তো ছেড়ে দেওয়া পাত্র নন। ফের প্রত্যাবর্তনের লড়াই শুরু করেন তিনি। কী কঠিন সেই লড়াই ছিল। কখনও ছুটে গিয়েছেন ধানবাদের কাছে কোনো কলেজ মাঠে বাংলার হয়ে রঞ্জি খেলার জন্য, কখনও অত্যন্ত কষ্টকর প্যারাসুট ট্রেনিংয়ে মনোনিবেশ করেছেন। পিঠে প্যারাসুট নিয়ে গোটা ইডেন দৌড়েছেন তখনকার বছর ৩৪-এর সৌরভ। লক্ষ্য একটাই, ভারতীয় দলে প্রত্যাবর্তন।

সেই লড়াইয়ের একটা পুরস্কারও তিনি পান আজ থেকে পনেরো বছর আগে নভেম্বরের এক দুপুরে। দক্ষিণ আফ্রিকাগামী ভারতীয় টেস্ট দলে জায়গা পেয়ে যান তিনি।

তবে শুধু জায়গা পেলেই তো হবে না, আবার প্রমাণ করতে হবে যে তিনি ফুরিয়ে যাননি। তাঁর মধ্যে লড়াইয়ের ক্ষমতা এখনও আছে। সেই লড়াই শুরু হল জোহানেসবার্গে, এমনই এক ডিসেম্বরের দুপুরে।

অবশ্য জোহানেসবার্গের সেই প্রথম টেস্টের আগেই সৌরভ বুঝিয়ে দিয়েছেন যে তিনি এ বার সব হিসেব উলটে দিতে এসেছেন। সেটা ছিল দক্ষিণ আফ্রিকা ‘এ’ দলের বিরুদ্ধে একটা প্রস্তুতি ম্যাচ। অল্প কিছু রানেই পাঁচ উইকেট পড়ে যাওয়া ভারতের উদ্ধারকর্তা হয়ে উদয় হন সৌরভই। খেলেন ৮৩ রানের একটা অসম্ভব ঝকঝকে ইনিংস।

সৌরভের এই অসম্ভব লড়াকু ইনিংসের জন্য প্রস্তুতি ম্যাচে বিপক্ষকে হারিয়ে দেয় ভারত। টেস্ট সিরিজ শুরু হওয়ার আগে বাড়তি অক্সিজেন পায় রাহুল দ্রাবিড়-গ্রেগ চ্যাপেলের দল।

প্রস্তুতি ম্যাচে পর এ বার সিরিজের প্রথম টেস্টের পালা। এক অদ্ভুত দমবন্ধকর পরিস্থিতি তখন সৌরভের কাছে। ব্যর্থ হলে ভারতীয় দলে আর কোনো দিনও সুযোগ না পাওয়ার আশঙ্কা। কিন্তু সৌরভ তো অদম্য। তাঁর জেদকে এখনও কুর্নিশ জানায় ক্রিকেটবিশ্ব।

শুরুতেই যেটা বললাম, মাখায়া এনতিনিকে ওই ছক্কা মেরেই সৌরভ বুঝিয়ে দিলেন, তিনি এখনও পারেন। আগের দিন, অর্থাৎ টেস্টের প্রথম দিন এক্কেবারে শেষলগ্নে ব্যাট করতে নেমে ১৪ রানে অপরাজিত ছিলেন তিনি। এক মুহূর্তের জন্যও তাঁকে অপ্রস্তুত লাগেনি। দক্ষিণ আফ্রিকার বোলারদের বাউন্সার এবং গালিগালাজ অবলীলায় সামলেছেন।

দ্বিতীয় দিন সৌরভ এগিয়ে নিয়ে গেলেন নিজের ইনিংস। করলেন দুর্ধর্ষ একটা অর্ধশতরান। কামব্যাকের ইনিংসেই ঝকঝকে পঞ্চাশের মধ্যে দিয়ে চ্যাপেলের মুখে ঝামা ঘষে দিলেন তিনি। এর পর আর ফিরে তাকানো নয়। 

দক্ষিণ আফ্রিকা কখনোই সৌরভকে খালি হাতে ফেরায়নি, সে বারও ফেরাল না। সিরিজের দ্বিতীয় টেস্ট, ডারবানে অবশ্য বেশি কিছু রান করতে পারেননি তিনি। কিন্তু তৃতীয় টেস্টে আরও একটি অর্ধশতরান এসেছিল তাঁর ব্যাট থেকে। ওই সিরিজে তিনটে টেস্টে মোট ২১৪ রান করেন সৌরভ।

এর পর গঙ্গা-যমুনা-ব্রহ্মপুত্র দিয়ে বয়ে গিয়েছে অনেক জল। সৌরভ এখন ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডে প্রধান। অধিনায়ক সৌরভ তাঁর সাফল্যের কাহিনি ক্রিকেট প্রশাসনে নিয়ে আসতে পেরেছেন কি না, সেই নিয়ে অনেক তর্ক-বিতর্ক চলবে। অধিনায়ক সৌরভ যে ভাবে স্বাধীন ছিলেন, প্রশাসক সৌরভ স্বাধীন কি না, সেই নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে।

কিন্তু একটা ব্যাপার নিয়ে কোনো প্রশ্ন কখনও উঠবেই না। তা হল সৌরভের মতো বর্ণময় চরিত্র ভারতীয় ক্রিকেটে আগে কখনও আসেনি, আর হয়তো কোনো দিনও আসবে না।

ভারতের ক্রিকেট প্রশাসনের প্রধান এখন এই সৌরভ। তাঁরই আমলে আজ ২৬ ডিসেম্বর থেকে শুরু হচ্ছে দক্ষিণ আফ্রিকায় ভারতের ক্রিকেট সফর। সেই সফরের ঠিক আগে সৌরভের সেই ‘কাম ব্যাক সিরিজ’-এর কথা আরেকবার স্মরণ করিয়ে দেওয়া গেল পাঠকদের।

আরও পড়তে পারেন

সব ধরনের ক্রিকেট থেকে অবসর নিলেন হরভজন সিংহ  

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন