Connect with us

প্রবন্ধ

‘গায়কদের গায়ক’ অখিলবন্ধু ঘোষ: শতবর্ষে শ্রদ্ধাঞ্জলি

আজ ২০ অক্টোবর। আজ থেকে ঠিক ১০০ বছর আগে বাঙালি পেয়েছিল এমন এক সংগীতশিল্পীকে যিনি ছিলেন স্বকীয়তায় সমুজ্জ্বল, নিজস্বতায় ভরপুর, যাঁর সুর সংযোজনায় ছিল অভিনবত্ব, গায়কি ছিল অনন্য।

Published

on

অখিলবন্ধু ঘোষ।

“সময়টা মনে নেই, হুগলি জেলায় একটা কলেজে অনুষ্ঠানে গিয়েছি গান গাইতে। অখিলদাও গেছেন, আর ছিলেন হাস্যকৌতুক শিল্পী শীতল বন্দ্যোপাধ্যায়। অনেক দূরের পথ, সকালে রওনা হয়ে দুপুরে পৌঁছে খাওয়া-দাওয়া করে সবাই একটু বিশ্রাম নিচ্ছি। সন্ধেবেলায় আমাদের জলসা। হঠাৎ কান্নার শব্দ, দেখি অখিলদা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছেন। আমরা দুজন একেবারে অবাক। তাড়াতাড়ি কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করে জানলাম – টার্ফ রোডের বাড়িতে দোতলায় ময়না পাখিটাকে খেতে দিয়ে আসেননি, কী করে যে ভুলে গেছেন, বৌদিও আজকে বাড়ি নেই, পাখিটা বোধহয় মারা যাবে…। এমন মানসিকতা না থাকলে কেউ মরমী শিল্পী হতে পারে?”

ঠিকই চিনেছিলেন অনুজ সংগীতশিল্পী মৃণাল চক্রবর্তী। মরমী শিল্পী বলতে যা বোঝায়, ঠিক তা-ই ছিলেন অখিলবন্ধু ঘোষ। ‘শিপ্রা নদীর তীরে’, ‘কবে আছি কবে নেই’, ‘এমনি দিনে মা যে আমার’, ‘তোমার ভুবনে ফুলের মেলা, আমি কাঁদি সাহারায়’, ‘ও বাঁশুরিয়া বাঁশি বাজায়ো না’ – প্রতিটি গানে এক বিরহী মনের হাহাকার আর অভিমান ছুঁয়ে যায় শ্রোতার মন।

Loading videos...

তবে শুধু বিরহই কি তাঁর গানের একমাত্র সম্পদ ছিল? যখন শুনি ‘পিয়ালশাখার ফাঁকে ওঠে’, ‘ওই যে আকাশের গায়’, ‘যেন কিছু মনে কোরো না’, ‘সেদিন চাঁদের আলো’, ‘ঐ যাঃ! আমি বলতে ভুলে গেছি’ ইত্যাদি গান, তখন আমরা অন্য অখিলবন্ধুকে পাই। আসলে তাঁর গান ছিল স্বকীয়তায় সমুজ্জ্বল, নিজস্বতায় ভরপুর, সুর সংযোজনায় অভিনব, গায়কিতে অনন্য।

এ প্রসঙ্গে ‘ঐ যাঃ! আমি বলতে ভুলে গেছি’ গানটির কথা আলাদা করে বলতে হয়। গীতিকার পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা গানটিতে নিজে সুর বসিয়ে অখিলবন্ধু রেকর্ড করেন ১৯৭১ সালে। গানের শুরুতেই ‘ঐ যাঃ!’ অংশটি অখিলবন্ধু এমন ভাবে বলেন যে গানের পরবর্তী অংশটি অর্থাৎ ‘আমি বলতে ভুলে গেছি’র সঙ্গে ঠিক ভাবে খাপ খেয়ে যায়। অর্থাৎ কিছু বলতে ভুলে গেলে ‘ঐ যাঃ!’ অংশটুকু আমাদের মুখ থেকে যে ভাবে বেরিয়ে আসা স্বাভাবিক, ঠিক সে ভাবেই বলেন অখিলবন্ধু। ঠিক এখানেই মিল খুঁজে পাওয়া যায় শচীন দেববর্মণের ‘বাঁশি শুনে আর কাজ নাই, সে যে ডাকাতিয়া বাঁশি’র গায়নে। এই গানটি শুরু করার আগে শচীনকর্তা ‘আঃ’ কথাটি বলে উঠতেন। অখিলবন্ধুর ‘ঐ যাঃ! আমি বলতে ভুলে গেছি’ গানে শচীনকর্তার ‘ডাকাতিয়া বাঁশি’র যে প্রভাব আছে তা অস্বীকার করা যায় না।

আর সেটা থাকাই তো স্বাভাবিক। প্রথমে সংগীতশিক্ষক মামা কালিদাস গুহ, তার পরে একে একে নিরাপদ মুখোপাধ্যায়, সংগীতাচার্য তারাপদ চক্রবর্তী, পণ্ডিত চিন্ময় লাহিড়ী এবং কিছু দিন পণ্ডিত কে জি ঢেকন প্রমুখ গুণীজনের কাছে সংগীত শিক্ষায় তালিম নিলেও, অখিলবন্ধু মনে মনে শচীন দেববর্মণকেও গুরু বলে মানতেন। মৃণাল চক্রবর্তীও বলেছেন, “উনি চিরকাল শচীন দেববর্মণের ভক্ত।” 

শাস্ত্রীয় সংগীতে তালিম নিয়েছিলেন তিনি। শাস্ত্রীয় সংগীতের সূক্ষ্ম কাজ অখিলবন্ধুর গলায় অনায়াসে খেলা করত, গানের মাঝে টুকরো তানকারিও করতেন। এক একটা মোড়, মুড়কী, গোটা গানের পরিবেশনে এমন প্রভাব ফেলত যে শ্রোতারা এক অনাবিল মুগ্ধতায় আবিষ্ট হয়ে যেতেন।

সংগীতজীবনের প্রথম দিকে বৈঠকী অর্ধ-রাগসংগীত বা রাগপ্রধান ধাঁচের গানেই বেশি আগ্রহ ছিল অখিলবন্ধুর। কিন্তু পরবর্তী কালে আধুনিক বাংলা গানে নিজস্ব ঘরানা সৃষ্টি করেন। রাগপ্রধান গানের জগতে তাঁর অবিস্মরণীয় কিছু সৃষ্টি হল ‘আজি চাঁদিনী রাতি গো’, ‘জাগো জাগো প্রিয়’, ‘বরষার মেঘ ভেসে যায়’, ‘আমার সহেলী ঘুমায়’ ইত্যাদি। বেশ কিছু নজরুলগীতিও তাঁর কণ্ঠে অন্য মাত্রা পেয়েছে। ১৯৬১ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি দু’টি রবীন্দ্রসংগীতও রেকর্ড করেন তিনি – ‘তুমি মোর পাও নাই পরিচয়’ এবং ‘যার মিলন চাও বিরহী”।    

সাংগীতিক ভাববিস্তারে অখিলবন্ধু ছিলেন সম্রাট। গানের কথার মধ্যে ঢুকে যেতেন তিনি। প্রতিটি শব্দের অর্থ ও ভাব বুঝে, তার অন্দরে প্রবেশ করে, তার পর তা উপহার দিতেন শ্রোতাদের। এ ব্যাপারে দেবব্রত বিশ্বাসের সঙ্গে তাঁর অনেক মিল খুঁজে পাওয়া যায়। গান গাওয়ার সময় তাঁর চোখদু’টি বন্ধ থাকত। একটা তদগত ভাব। সেই মুহূর্তে তিনি গানের মধ্যে ডুবে যেতেন। তাই শ্রোতাদের কাছে তাঁর সংগীত পরিবেশনা এক অনন্য মাধুর্য সৃষ্টি করত।

তাঁর অত্যন্ত জনপ্রিয় গান ‘ও দয়াল বিচার করো’-এর পাশাপাশি শোনা যাক ‘ও বাঁশুরিয়া বাঁশি বাজায়ো না’। দু’টিই প্রেমের গান। কিন্তু দু’টি গানের আকুতি ভিন্ন মাত্রায় প্রকাশ পেয়েছে। একটিতে দয়ালের কাছে বিচার চাওয়া হচ্ছে, আর অন্যটিতে বাঁশিকে থামতে বলা হচ্ছে। কী অনায়াস দক্ষতায় ভিন্ন মাত্রার এই আকুতি শ্রোতাদের কাছে সাবলীল ভাবে উপস্থাপন করেছিলেন অখিলবন্ধু তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।     

চিরকাল প্রচারের আড়ালে থেকে যাওয়া এই মানুষটি যোগ্য সঙ্গিনী পেয়েছিলেন দীপালি ঘোষকে। তাঁর সহধর্মিণী দীপালি ছিলেন তাঁর এক সময়ের ছাত্রী, তিনিও এক গুণবতী রত্ন, সুরকার। অখিলবন্ধুর বেশির ভাগ গান নিজের সুর দেওয়া হলেও, বেশ কয়েকটা গানে সুর দেন দীপালি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘যেন কিছু মনে কোরো না’, ‘সারাটি জীবন কী যে পেলাম’, ‘শ্রাবণ রাতি বাদল নামে’, ‘শ্রাবণ নিশীথে এসো’, ‘কেন ডাকো বারে বারে’ ইত্যাদি।

সুরসাধকের প্রয়াণ ১৯৮৮ খ্রিস্টাব্দের ২০ মার্চ। ৬৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই তিনি ইহলোক ত্যাগ করেন। জীবনে তিনি তাঁর যোগ্যতার উপযুক্ত সম্মান পাননি। তাঁর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যের মতো বিশিষ্ট শিল্পীরাও বলেছেন এ কথা। মৃত্যুতেও তিনি অবহেলার শিকার হয়েছেন। অন্ডালে একটি অনুষ্ঠান করে ফিরে এসেছিলেন সে দিন সকালে। দুপুরে হঠাৎ তাঁর শরীরটা খারাপ লাগতে থাকে। তাঁকে পিজি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে বেশ কিছুক্ষণ চিকিৎসাহীন অবস্থায় পড়ে থাকার পর তাঁকে শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়। সেখানে তাঁর চিকিৎসা শুরু হয়। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। তাঁকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।

মৃণাল চক্রবর্তী তাঁর আত্মজীবনী ‘খোলা জানালার ধারে’-তে লিখেছেন, “লেখকদের জগতে যেমন একটা কথা আছে লেখকদের লেখক, অখিলদাকে আমি আধুনিক বাংলা গানের ক্ষেত্রে গায়কদের গায়ক বলে মনে করি।”

একেবারে খাঁটি কথা। অখিলবন্ধুর গায়কি ছিল সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র, নিজস্ব। তাঁর গায়কি অনুসরণ করা একেবারেই সহজ ছিল না। মৃণাল চক্রবর্তীর অনুভবেরই প্রতিধ্বনি করে বলি, আধুনিক বাংলা গানে নিজের নির্জন স্বাক্ষর রেখে গিয়েছিলেন অখিলবন্ধু ঘোষ।

(তথ্য সংকলন: শম্ভু সেন)

ঋণ স্বীকার –

১। খোলা জানালার ধারে – মৃণাল চক্রবর্তী

২। শতবর্ষে অখিলবন্ধু – অভীক চট্টোপাধ্যায়, আনন্দবাজার পত্রিকা, ১৮ অক্টোবর ২০২০

৩। অখিল বন্ধু ঘোষ মার্জিত শোভন সুরসৃষ্টি – সংকলক সন্দীপ মুখোপাধ্যায় – https://bangodarshan.com/

খবরঅনলাইনে আরও পড়তে পারেন

প্রগতিশীল সামাজিক-রাজনৈতিক সাংবাদিকতার অন্যতম প্রবর্তক ও পথপ্রদর্শক ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর

Advertisement
Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

প্রবন্ধ

স্বামী নিত্যসত্যানন্দ মহারাজের সঙ্গে সেই কুড়িটা মিনিট কোনো দিনও ভুলব না

খুব বেশি হলে কুড়িটা মিনিট সময় কাটিয়েছিলাম স্বামীজির সঙ্গে। কিন্তু তাতেই কত আপন করে নিয়েছিলেন তিনি। মনে হচ্ছিল কত দিনের পরিচিত।

Published

on

রয় ভিলার সামনে স্বামী নিত্যসত্যানন্দজি মহারাজ।

শ্রয়ণ সেন

“এই ব্যাটা, অত প্রণামটনাম করতে হবে না! এমনিই আশীর্বাদ করলুম।”

Loading videos...

আজও খুব স্পষ্ট ভাবে মনে পড়ছে কী সুন্দর আর মজার ছলে কথাটা আমায় বলেছিলেন স্বামী নিত্যসত্যানন্দ মহারাজ। এখনও পরিষ্কার ভাবে মনে পড়ছে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ হওয়ার সেই দিনটা।

২০২০-এর জানুয়ারি। দার্জিলিংয়ের রায় ভিলায় বেড়াতে গিয়েছি। এই বাড়িতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন সিস্টার নিবেদিতা। সেটি বর্তমানে রামকৃষ্ণ মিশনের উদ্যোগে গড়ে ওঠা নিবেদিতা শিক্ষা-সংস্কৃতি কেন্দ্র। আর তারই দায়িত্বে ছিলেন স্বামী নিত্যসত্যানন্দ মহারাজ।

‘ছিলেন’ কেন বললাম? কারণ, রবিবার সন্ধ্যায় মন খারাপ করা খবরটি পেলাম।

রামকৃষ্ণলোকের উদ্দেশে যাত্রা করেছেন স্বামী নিত্যসত্যানন্দ মহারাজ। অত্যন্ত আকস্মিক ভাবে সবাইকে কাঁদিয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন তিনি।

সংবাদটা বিশ্বাস করতে ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল। মাত্র এক বছর আগেই যে মানুষটা আমাদের সঙ্গে মজার ছলে কিছুটা সময় কাটালেন, ‘ভূতকোঠি’ থেকে নিবেদিতা-সাধনার কেন্দ্র গড়ে ওঠার গল্প শোনালেন, যে মানুষটার সঙ্গে গত জানুয়ারিতেও প্রায় সাক্ষাৎ হয়েই যাচ্ছিল, তিনি আকস্মিক ভাবে চলে গেলেন কেন? কী-ই বা তাড়া পড়েছিল তাঁর।

২০১৩ সালে যে বাড়িটায় ‘রামকৃষ্ণ মিশন নিবেদিতা এডুকেশনাল অ্যান্ড কালচারাল সেন্টার’ (Ramakrishna Mission Nibedita Educational and Cultural Centre) গড়ে ওঠে, সেই রায়ভিলা তার আগে পর্যন্ত স্থানীয়দের কাছে ভূতকোঠি নামে পরিচিত ছিল।

–“প্রথম যখন এসেছিলেন, আপনাদের ভয় করেনি?”

–“না। আসলে জানেন তো, যারা দুষ্টুমি করে, আমার মতে তারা ভীতু হয় বেশি। তাই এরা আমাদের কোনো বাধা দেয়নি।”

— “সাত বছর হল আপনারা এসেছেন, স্থানীয়দের মনোভাব কেমন বুঝছেন?”

স্বামীজি তখন বলেছিলেন, প্রথমে স্থানীয়দের সন্দেহ ছিল। ‘ভূতকোঠি’তে আবার কী শুরু হচ্ছে, এই নিয়ে ভয়ডরও ছিল। কিন্তু মিশনের কাজ শুরু হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই সেই ভয় কেটে যায়।

ওই আড্ডার মধ্যেই পেছন থেকে এসে স্বামীজির গাল টিপে জড়িয়ে ধরল এক কিশোরী।

— “এঁরা বোধহয় নিজেদের বাড়িতে ভালোবাসা খুব একটা পায় না, না?”

— “ভালোবাসার অভাব তো ছিলই। সেটা আমরা পূরণ করার চেষ্টা করছি। মনে হচ্ছে সফলও হচ্ছি।”

এই কেন্দ্রের জন্যই এই আশেপাশের খুদেদের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল হয়ে গিয়েছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

প্রায় ৭০ জনের পড়াশোনার দায়িত্ব নিয়েছেন এখানকার মহারাজরা। স্কুল থেকে সোজা এখানে চলে আসে খুদেগুলো। বিভিন্ন বিষয়ে পড়ানোর পাশাপাশি আদর্শ মানুষ কী ভাবে হবে, সেই পাঠও দেওয়া হয়। আর এই সবই হচ্ছিল স্বামী নিত্যসত্যানন্দের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায়।

বাঙালি সমতল আর নেপালি দার্জিলিংয়ের মধ্যে তাঁরা একটা সেতুবন্ধনের কাজ করছে বলেও জানিয়েছিলেন স্বামী নিত্যসত্যানন্দ, আর সেই ব্যাপারে তাঁরা অনেকটাই সফল হয়েছেন।

এ ছাড়া নানা রকম ত্রাণকাজ তো রয়েছেই। দার্জিলিংয়ের সঙ্গে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে। বৃষ্টি-ধস-ভূমিকম্প কত কী লেগে থাকে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলে প্রথমেই ত্রাণের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ে মিশন। এ ছাড়া চা-বাগানগুলিতে রোজই ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হয়।

খুব বেশি হলে কুড়িটা মিনিট সময় কাটিয়েছিলাম স্বামীজির সঙ্গে। কিন্তু তাতেই কত আপন করে নিয়েছিলেন তিনি। মনে হচ্ছিল কত দিনের পরিচিত।

গত মাসে যখন দার্জিলিং গিয়েছিলাম, ইচ্ছে ছিল একবার স্বামীজির সঙ্গে দেখা করে আসি। কিন্তু সেটা হয়নি। কিন্তু তখন একবারও মনে হয়নি যে তাঁর সঙ্গে আর কোনো দিনও দেখা হবে না।

শুনলাম স্বামীজি নাকি ধ্যান করতে করতে দেহত্যাগ করেছেন। তাঁকে ধ্যানমগ্ন অবস্থায় পাওয়া গিয়েছে। কে বলতে পারে, হয়তো আগে থেকেই বুঝে গিয়েছিলেন এমন সময় আসতে চলেছে তাঁর। এই কারণেই বোধহয় এঁরা মহাপুরুষ!

স্বামী নিত্যসত্যানন্দ মহারাজ হয়তো শরীরে থাকলেন না। কিন্তু দার্জিলিংয়ের রায় ভিলা জুড়ে তিনিই থাকবেন। তাঁর দেখানো পথেই যে নিবেদিতা-সাধনার কেন্দ্রটি চলবে, সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত।

Continue Reading

প্রবন্ধ

‘কয়েকটা টাকার বিনিময়ে নেতাজির স্মৃতি ধুলোয় মিশিয়ে দেব?’, বলেছিলেন পদমবাহাদুর

মুখে বড়ো বড়ো কথা বললেও, নেতাজির আদর্শে চলার ব্যাপারে আমরা লবডঙ্কা। কবে আমরা ওঁর আদর্শে চলব, ঠিক পদমবাহাদুরের মতো?

Published

on

কার্শিয়াঙের নেতাজি মিউজিয়ামে নেতাজির আবক্ষ মূর্তি।

শ্রয়ণ সেন

আবার সেই পথে। এই তো ঠিক এক বছর আগে ২০২০-এর জানুয়ারিতে ঘুরে গিয়েছিলাম এখান থেকে। এই জানুয়ারিতে দার্জিলিঙের পথে গিদ্দা পাহাড়ের পাশ দিয়ে যেতে যেতে স্মৃতিতে ডুব দিলাম। মনের মধ্যে ভেসে উঠল পদমবাহাদুর ছেত্রীর মুখটা আর ওঁর কথাগুলো।

Loading videos...

“তখন ওরা কত করে আমায় বলল বাড়ির ইটগুলো বিক্রি করে দিতে, এতে আমার টাকা হবে। কিন্তু আমি ওদের কথা শুনিনি। আমার তখন একটাই লক্ষ্য, যে করেই হোক, ওদের হাত থেকে বাড়িটা বাঁচাতেই হবে।”

বেশ গর্ব করেই কথাগুলো বলেছিলেন পদমবাহাদুর। নেতাজি ইনস্টিটিউট ফর এশিয়ান স্টাডিজ তথা নেতাজি মিউজিয়ামের দেখভালের পুরো দায়িত্ব তাঁর ওপরে। তিন বছরের দুরন্ত নাতিকে সঙ্গে নিয়ে পুরো বাড়িটা আমাদের ঘুরিয়ে দেখিয়েছিলেন।

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে এই বাড়িটার অবদান হয়তো আমরা অনেকেই জানি না। কারণ এই বাড়িতে খুব বেশি কারও পা-ও পড়ে না।

নেতাজি ইনস্টিটিউট ফর এশিয়ান স্টাডিজ

“খুলা হ্যায়, খুলা হ্যায়।”

মূল ফটক দিয়ে বাড়ির দিকে এগোতেই আমাদের উদ্দেশ করে বলেছিল মিষ্টি অথচ দুরন্ত সেই শিশুটি। শীতের দিনের মিঠে রোদে পিঠ দিয়ে দাদুর কোলে বসেছিল নাতি। আমাদের বুঝিয়ে দিয়েছিল, মিউজিয়াম খোলা আছে, ভেতরে যেতে পারি।

বাইরে জুতো খুলে প্রবেশ করলাম। এটা তো ঠিকই, যে কোনো পবিত্র স্থানে প্রবেশ করতে গেলে জুতো খুলতেই হবে। নেতাজিকে ভালবাসেন, এমন যে কোনো মানুষের কাছে এই বাড়ি একটা সাধনাস্থল।

নেতাজির বহু বিরল ছবি, তাঁর ব্যবহৃত বিভিন্ন আসবাবপত্র আর বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ব্যক্তিকে লেখা চিঠি এখানে সযত্নে রাখা আছে।

১৯২২ সালে রলি ওয়ার্ড নামক এক ব্যক্তির কাছ থেকে কার্শিয়াংয়ের গিদ্দাপাহাড়ে অবস্থিত এই বাড়িটি কিনে নেন নেতাজির দাদা, তথা স্বাধীনতাসংগ্রামী শরৎচন্দ্র বসু।

১৯৩৩ থেকে ১৯৩৫, এই বাড়িতেই ব্রিটিশ সরকারের হাতে গৃহবন্দি করে রাখা হয়েছিল শরৎ বসুকে। এর পরের বছরেই নেতাজির পালা। এই বাড়িতে তাঁকে সাত মাসের জন্য বন্দি করে রাখা হয়।

দ্বিতীয় বার যখন এই বাড়িতে নেতাজি আসেন, তখন তিনি বন্দি নন। সেটা ১৯৩৭ সালের অক্টোবর। হরিপুরা কংগ্রেসের ভাষণ এই বাড়িতে বসেই লিখেছিলেন নেতাজি। এখান থেকে গান্ধীজি ও জওহরলাল নেহরুকে চিঠিও লিখেছিলেন।

নেতাজি মিউজিয়ামে প্রবেশদ্বার।

এই বাড়িতে থাকাকালীনই বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি চিঠি পেয়েছিলেন নেতাজি। তাতে ‘বন্দেমাতরম’ গানের প্রসঙ্গও ছিল।

চিঠির একটি অংশে রবীন্দ্রনাথ লিখছেন, “…যে রাষ্ট্রসভা ভারতবর্ষের সকল ধর্ম-সম্প্রদায়ের মিলনক্ষেত্র, সেখানে এই গান সর্বজনীন ভাবে সঙ্গত হতেই পারে না।”

এই বাড়িতে বহু দুর্লভ ছবির পাশাপাশি নেতাজি-কেন্দ্রিক প্রচুর চিঠিরও সংগ্রহ রয়েছে। সব চিঠি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়ার মতো সময় ছিল না। ‘বন্দেমাতরম’ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের চিঠির ব্যাপারটি একটি সংবাদমাধ্যম থেকে জেনেছিলাম। ওই চিঠির উত্তরও রবীন্দ্রনাথকে দিয়েছিলেন নেতাজি। কিন্তু তাঁর সেই জবাবের হাতের লেখা উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

কার্শিয়াংয়ের বাসিন্দাদের সঙ্গে নেতাজি কত যে একাত্ম হয়ে গিয়েছিলেন, তার প্রমাণও রয়েছে এখানে রক্ষিত বহু চিঠিতে।

নেতাজিকে নিয়ে এমন দুর্লভ ছবির সম্ভার ভারতে আর কোথাও আছে বলে মনে করতে পারি না।

নেতাজি এখানে থাকাকালীন প্রাতর্ভ্রমণে বেরোতেন। পাগলাঝোরায় প্রাতর্ভ্রমণরত নেতাজি, এমনই একটি ছবি রয়েছে। বসু পরিবারের সঙ্গে নেতাজির ছবি যেমন রয়েছে, তেমনই রয়েছে জওহরলাল নেহরু, সর্দার বল্লভভাই পটেলের সঙ্গে তোলা ছবিও।

এ ছাড়া নেতাজির ব্যবহার করা খাট, চেয়ার-টেবিল সবই সযত্নে রাখা হয়েছে। কার্শিয়াংয়ের ‘পয়েন্টস’ ভ্রমণের মধ্যেই নেতাজির এই বাড়ি পড়ে। কিন্তু এখানে আসতে হবে আলাদা ভাবে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময়ে দিয়ে ভালো করে দেখতে হবে। তবেই মনের শান্তি পাওয়া যাবে।

১৯৯৬ সাল পর্যন্ত বাড়িটি বসু পরিবারের অধীনে ছিল। এর পর বাড়িটি পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকার অধিগ্রহণ করে। সংস্কার করে তা কলকাতার ‘নেতাজি ইনস্টিটিউট ফর এশিয়ান স্টাডিজ’-এর হাতে তুলে দেওয়া হয়।

নেতাজির দুর্লভ ছবি, চিঠিপত্র আর ব্যবহৃত আসবাবপত্র নিয়ে এই সংগ্রহশালাটি উদ্বোধন হয় ২০০৫ সালে। ২০১৮ সালে সেই সংগ্রহশালার সংস্কারের কাজও হয়েছে।

নেতাজির এই বাড়িটার সঙ্গেই নিজেকে একাত্ম করে দিয়েছেন পদমবাহাদুর। তাঁর কথাবার্তা, আচার আচরণে বোঝা যায়, আশির কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়া এই বৃদ্ধ নেতাজিকে কখনও না দেখলেও তাঁকে রোজ অনুভব করেন।

শত চেষ্টা করেও পদমবাহাদুরকে ক্যামেরার সামনে আনা গেল না।

শরৎ বসুর রোপণ করা ক্যামেলিয়া গাছ।

১৯৭৩ থেকে এই বাড়িটার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন পদমবাহাদুর। তখন দিনপ্রতি দু’ টাকা হাজিরায় বসুদের কাছ থেকে এই বাড়িটির দেখভালের দায়িত্ব পান।

-“তব মহিনে মে ষাট (৬০) রুপ্যায় মিলতা থা।” গলায় গর্ব ঝরে পড়েছিল। 

এর পর বাড়িটা কত ঝড়ঝাপটার মধ্যে দিয়ে গিয়েছে, তবুও তিনি ছিলেন তাঁর লক্ষ্যে অবিচল।

কথা প্রসঙ্গেই উঠে এসেছিল ১৯৮৬ সালের গোর্খাল্যান্ড আন্দোলনের কথা। সুবাস ঘিসিংয়ের নেতৃত্বে সেই আন্দোলন মারাত্মক ধ্বংসাত্মক চেহারা নেয়। গত ১৫ বছরে গোর্খাল্যান্ড নিয়ে যে আন্দোলন হয়েছে, সুবাস ঘিসিংয়ের জঙ্গি আন্দোলনের কাছে সে সব নেহাতই শিশু।

তখনই পদমবাহাদুরের কাছে আন্দোলনকারীদের প্রস্তাব আসে এই বাড়ির এক একটা ইট বিক্রি করে দিয়ে বিনিময় টাকা নেওয়ার। আর প্রকারান্তরে সে টাকার কিছুটা অংশ আন্দোলনকারীদের দিয়ে দেওয়া।

পদম কিন্তু ছিলেন তাঁর লক্ষ্যে অবিচল। আন্দোলনকারীদের কথা কানেই তোলেননি তিনি। সোজা জানিয়ে দেন, নেতাজির স্মৃতিকে এ ভাবে ধুলোয় মিশে যেতে তিনি দেবেন না।

তাঁর কথায়, “মাত্র কয়েকটা টাকার জন্য নেতাজিতে বিকিয়ে দেব! আমি গরিব হতে পারি, লোভী নই।”

আমরা বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। আপশোশ, কার্শিয়াংয়ের এক নেপালি বৃদ্ধ নেতাজির আদর্শে চলতে পারেন, কিন্তু আমরা পারি না। আজ ১২৫ বছরে পড়লেন নেতাজি। মুখে বড়ো বড়ো কথা বললেও, নেতাজির আদর্শে চলার ব্যাপারে আমরা লবডঙ্কা। কবে আমরা ওঁর আদর্শে চলব, ঠিক পদমবাহাদুরের মতো?

ছবি: লেখক

আরও পড়ুন: সুভাষের খোঁজে সুভাষগ্রাম ও অন্যত্র

Continue Reading

প্রবন্ধ

শিল্পী – স্বপ্ন – শঙ্কা: সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে যেমন দেখেছি, ৮৭তম জন্মদিনে শ্রদ্ধার্ঘ্য

স্বপ্ন বদলে যায়, হারিয়েও যায় – শঙ্কা কিন্তু থেকেই যায়। আজ ওঁর জন্মদিন। আমরা প্রস্তুত তো? শিল্পীর স্বপ্ন সফল করতে?

Published

on

ডা. পাঞ্চজন্য ঘটক

আমি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে ব্যক্তিগত ভাবে চিনতাম না। আর পাঁচজন বাঙালির মতো ওঁর গুণমুগ্ধ ছিলাম। আজ ঠিক দু’ মাস চার দিন হল উনি চলে গেছেন। ওঁর মৃত্যু-পরবর্তী দিনগুলোয় অজস্র লেখা ও মূল্যায়ন দেখেছি। বিশেষ একটা ঘটনার কথা ভেবেছিলাম কেউ লিখবেন। এখনও পর্যন্ত চোখে পড়েনি। তাই এই লেখা।

Loading videos...

পর্দা আর মঞ্চ ছাড়া সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে আমি দু’ বার দেখেছি কাছ থেকে। ২০১০ সালে লন্ডনে এবিপির উদ্যোগে ‘আনন্দ-উৎসব’ হয়। আমাদের উত্তর ইংল্যান্ডের ‘পারাবার কালচারাল গ্রুপ’ একটি ছোটো নাটকের কিছু অংশ মঞ্চে পরিবেশন করার আমন্ত্রণ পায়। তারকাখচিত সমাবেশ – সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, শর্মিলা ঠাকুর, সোহা আলি খান, কুমার শানু, অঞ্জন দত্ত. আইয়ুব বাচ্চু, অলকা ইয়াগনিক। এঁদের মতো তাবড় শিল্পীরা তিন দিন ধরে মঞ্চ আলো করে থাকবেন। দফায় দফায়। আর তার ভেতরে ফিলারের মতো থাকবে বিলেতের স্থানীয় সংগঠনের ছোটো ছোটো প্রোগ্রাম। আমাদের বলা হয়েছিল মিনিট পনেরোর ভেতর একটা নাটক করতে। বিলেতে এ রকম অনুষ্ঠান এর আগে কখনও হয়নি, পরেও নয়।

আমরা খুবই উত্তেজিত। আমাদের গ্রুপের তিন জনে মিলে একটা মজার নাটক করতাম – ‘রাজযোটক’। মিনিট চল্লিশের। সময় কম ছিল। তাই ওই নাটকের কিছু দৃশ্য কাটছাঁট করে মিনিট পনেরোর মতো একটা স্ক্রিপ্ট খাড়া করা হল। মার্চ মাসের মাঝামাঝি ‘পারাবার’ গোষ্ঠীর সবাই মিলে চললাম আনন্দোৎসবে। তিন জন নাটক করব। বাকিরা উৎসাহ দেবেন আর জমাটি একটি অনুষ্ঠান দেখবেন।

অনুষ্ঠানের দিন পৌঁছে গেলাম উত্তর লন্ডনের সুবিশাল আলেকজান্ড্রা প্যালেসে। আমাদের আর্টিস্ট এন্ট্রি কার্ড থাকায় মঞ্চের পেছন দিকে যাওয়ার সুযোগ পেলাম। গ্রিনরুম দেখে আসার জন্য। মঞ্চের পেছনে অনেকটা এলাকা। কয়েকটা ঘর তারকাদের জন্য। আর বাকিদের ড্রেসআপ খোলা জায়গাতেই করতে হবে বুঝলাম। কয়েক জন উদ্যোক্তা গোছের লোক বড়ো বড়ো ব্যাজ পরে ব্যস্তভাব দেখিয়ে ঘোরাঘুরি করছেন। আমি বরাবর একটু উৎসুক গোছের। তারকাদের ঘরে কেউ আছে কিনা দেখতে গিয়ে দেখলাম একটির ভেতরে বসে আছেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। পর্দা খোলাই ছিল। একেবারে সামনাসামনি ওঁকে দেখে একটু হকচকিয়ে গেছিলাম। একটু সামলে উঠে বললাম, “ভেতরে আসব?” উনি বললেন, “এসো, এসো”।

সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। প্রণাম করলাম পায়ে হাত দিয়ে। ধুতি-পাঞ্জাবি পরেছিলেন। গরম চাদর গায়ে। চামড়ার বাঁধা স্যান্ডেল আর মোজা পায়ে। মাথায় হাত দিয়ে বললেন, “ভালো থেকো”। পরিচয় জানতে চাইলেন। বললাম, “ডাক্তারি করি আর শখের অভিনয় মাঝেসাঝে। এই মঞ্চে পরের দিন একটা ছোট্ট নাটক করব। তেমন কিছু নয়। ফিলার প্রোগ্রাম। আমাদের নাটক আর কে দেখতে আসছে এখানে”।

একটু ক্লান্ত লাগছিল ওঁকে। ধীরে ধীরে বললেন, “কোনো নাটক ছোটো নয়। নাটকের কোনো রোল ছোটো নয়। একটা লোকও যদি না থাকে হলে, তুমি তোমার শ্রেষ্ঠ অভিনয় করবে। স্টেজটাকে সম্মান জানিয়ে”।

আরেক বার প্রণাম করলাম ওঁকে। বললাম, “এই কথাগুলো চিরকাল মনে রাখবো”। মনে হচ্ছিল উনি একটু বিশ্রাম করতে চাইছেন। ধীরে ধীরে ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। কথাগুলো মনে রেখেছি। নাটক, শ্রুতি-নাটক, সিনেমা – যেটুকু সুযোগ পাই, নিজের পুরোটা দেওয়ার চেষ্টা করি।

একবার পেছনে তাকালাম। সোফায় মাথা এলিয়ে বিশ্রামের চেষ্টা করছেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। স্কাইলাইট দিয়ে তেরছা সূর্যের আলো পড়েছে চোখের উপর। একবার ভাবলাম পর্দা টেনে দিই। মনে হল, না থাক। সূর্যের এই স্পটলাইট আরো অনেক দিন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের মুখের ওপর থাকুক। সরাসরি।

এর আগে এক বার                                     

৬ ডিসেম্বর ১৯৯২। রবিবার। সন্ধ্যাবেলা খবর পাওয়া গেল বাবরি মসজিদ ধ্বংস হয়েছে। দেশের বিভিন্ন জায়গায় ধর্মীয় দাঙ্গা শুরু হয়ে গেছে। কলকাতায় দমচাপা পরিস্থিতি। সেই রাতে বিরাট দাঙ্গা কিছু হয়নি। মনে হয় দাঙ্গা শুরু হয় দিন কয়েক পর। পার্কসার্কাস অঞ্চলে ছিল আমাদের হোস্টেল। অশান্ত হয়ে ওঠে ওই অঞ্চল। কারফিউ, প্যারামিলিটারি, র‍্যাফ, মিলিটারি, আগুন, বেশ কিছু মানুষের মৃত্যু – দিন কয়েকের ভেতর বদলে যায় আমাদের চেনা কলকাতা। তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর প্রশাসনের তৎপরতায় দিন সাতেকের ভেতর দাঙ্গা আয়ত্তে আসে।

ঠিক মনে নেই তারিখটা – মনে হয় ১৩ বা ২০ ডিসেম্বর। রবিবার। বামফ্রন্টের পক্ষ থেকে একটি শান্তিমিছিল আহ্বান করা হয়। একটু অন্য রকম এই মিছিল। বলা হয় কোনো দলীয় পতাকা, ফেস্টুন থাকবে না এই মিছিলে। থাকবে না কোনো দলীয় স্লোগান। এই শান্তিমিছিলের একমাত্র উদ্দেশ্য হবে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ফিরিয়ে আনা। মিছিলের রুট ঠিক মনে নেই, তবে শুনলাম দুপুর তিনটে নাগাদ আমাদের হোস্টেলের কাছ দিয়ে মিছিল যাবে। মল্লিকবাজার অঞ্চল দিয়ে সার্কুলার রোড ধরে দক্ষিণের দিকে। আমরা কয়েক জন ঠিক করলাম ওখানে মিছিলে যোগ দেব। একটু আগেভাগে নোনাপুকুর ট্রামডিপোর কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। খানিক পর দেখলাম শীতের দুপুরের রোদ মেখে এগিয়ে আসছে এক মহামিছিল। কারো হাতে কোনো পতাকা নেই।

শুধু কয়েকটা স্লোগান শোনা যাচ্ছে –

‘হিন্দু মুসলিম ভাই ভাই, / দাঙ্গা নয় শান্তি চাই’।

‘দাঙ্গাবাজ লোক যত, / বাংলা থেকে দুর হটো’।

মিছিলের একদম সামনে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। নীল জিন্স পরা। গায়ে নীল জিন্সের পুরো হাতা জ্যাকেট। হাতা কনুই পর্যন্ত গোটানো। চোখে কোনো সানগ্লাস নেই। কাছাকাছি সানগ্লাস চোখে কোনো সেলিব্রিটি চোখে পড়ল না। আশেপাশে সাধারণ মানুষ। হিন্দু, মুসলিম পোশাকে খানিকটা আলাদা বোঝা গেলেও স্লোগান সবার গলায় এক। আর তার সঙ্গে গলা মেলাচ্ছেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়।

আমরা মিছিলে প্রবেশ করলাম সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের ঠিক পেছনে। বারবার চোখ চলে যাচ্ছিল ওঁর দিকে। চোয়াল শক্ত – কখনও মনে হচ্ছিল ‘হীরক রাজার দেশ’-এর উদয়ন পণ্ডিত, কখনও বা ফুটে উঠছিল ‘অভিযান’-এর নরসিং ড্রাইভারের চাপা অসন্তোষ। আর মাঝে মাঝে একটা ফরসা মুঠো করা হাত উঠে যাচ্ছিল শীতের নীল আকাশের দিকে – ‘দাঙ্গা নয়, শান্তি চাই’। সে দিনও কি পশ্চিম দিক থেকে সূর্যের তেরছা আলো পড়ছিল শিল্পীর মুখে? এত দিন পর ঠিক মনে করতে পারছি না।

আমি ব্যক্তিগত ভাবে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে না চিনলেও ওঁর সঙ্গে মিছিলে হেঁটেছি। ওঁর গলায় গলা মিলিয়ে স্লোগান দিয়েছি। এটা আমার একটা বিরাট গর্ব। বাঙালি অকুণ্ঠ সম্মান জানিয়েছেন তাঁদের প্রিয় শিল্পীকে। মৃত্যুর পর অমর করে দিয়েছেন। এখন ওঁর স্লোগানকে সত্যি করার দায়িত্ব বাঙালির ওপর।

স্বপ্ন বদলে যায়, হারিয়েও যায় – শঙ্কা কিন্তু থেকেই যায়। আজ ওঁর জন্মদিন। আমরা প্রস্তুত তো? শিল্পীর স্বপ্ন সফল করতে?

(ছবিটি এঁকেছেন চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডাঃ সোমজিত ঘোষ)

আরও পড়ুন: রবিবারের পড়া: শহর ছেড়ে তুমি কি চলে যেতে পারো তিন ভুবনের পারে

Continue Reading
Advertisement
Advertisement
Covid situation kolkata
রাজ্য5 hours ago

গত ২৪ ঘণ্টায় গোটা রাজ্যে কারও মৃত্যু হল না কোভিডে

বিজেপিতে যোগ দিলেন শ্রাবন্তী
বিনোদন6 hours ago

বিজেপিতে যোগ দিলেন অভিনেত্রী শ্রাবন্তী, ভোটে কি দাঁড়াবেন?

weather monsoon
রাজ্য7 hours ago

গরমে নাজেহাল রাঢ়বঙ্গ, পারদ কিছুটা কমল কলকাতায়

রাজ্য8 hours ago

বিজেপিকে রুখতে তৃণমূলকে সমর্থন, স্পষ্ট জানালেন তেজস্বী যাদব

দেশ9 hours ago

মুম্বইয়ে ভয়াবহ বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের পেছনেও চিনের হাত, মার্কিন সংস্থার রিপোর্টে তীব্র চাঞ্চল্য

রাজ্য9 hours ago

অমিত শাহের বঙ্গসফর বাতিল

শিক্ষা ও কেরিয়ার9 hours ago

৮ লক্ষ যুবক-যুবতীকে প্রশিক্ষণ দিয়ে কাজের সুযোগ করে দিচ্ছে কেন্দ্রের এই প্রকল্প, জানুন বিস্তারিত

দেশ11 hours ago

কোভিড-১৯ ভ্যাকসিনের প্রথম ডোজ নিলেন দুই মুখ্যমন্ত্রী

রাজ্য2 days ago

ব্রিগেড সমাবেশ: দরকারে ‘শান্তিনিকেতন’ বাড়ি নিলাম করে প্রতারিত মানুষের টাকা ফেরত, হুঁশিয়ারি মহম্মদ সেলিমের

BJP TMC Congress CPIM
রাজ্য2 days ago

পশ্চিমবঙ্গে ফিরতে পারে তৃণমূল সরকার, কী বলছে সমীক্ষা

ভ্রমণের খবর3 days ago

দোলেই ভোট! পর্যটন ব্যবসায়ে ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কায় হতাশ রাঢ়বঙ্গ

ফুটবল2 days ago

পাঁচ গোল করেও ওড়িশার কাছে ছয় গোলের মালা পরল ইস্টবেঙ্গল

রাজ্য2 days ago

কলকাতায় তেজস্বী যাদব, হতে পারে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ

রাজ্য2 days ago

দক্ষিণবঙ্গে ক্রমশ বাড়ছে গরম, কলকাতায় তাপমাত্রা ছুঁল ৩৬ ডিগ্রি

দঃ ২৪ পরগনা1 day ago

প্রার্থী তালিকা ঘোষণার আগেই দেওয়াল লিখে চমক এসইউসি-র

দেশ3 days ago

নতুন করে কোভিড আক্রান্তের ৫০ শতাংশের বেশি একটি রাজ্যেই

কেনাকাটা

কেনাকাটা3 weeks ago

সরস্বতী পুজোর পোশাক, ছোটোদের জন্য কালেকশন

খবরঅনলাইন ডেস্ক: সরস্বতী পুজোয় প্রায় সব ছোটো ছেলেমেয়েই হলুদ লাল ও অন্যান্য রঙের শাড়ি, পাঞ্জাবিতে সেজে ওঠে। তাই ছোটোদের জন্য...

কেনাকাটা3 weeks ago

সরস্বতী পুজো স্পেশাল হলুদ শাড়ির নতুন কালেকশন

খবরঅনলাইন ডেস্ক: সামনেই সরস্বতী পুজো। এই দিন বয়স নির্বিশেষে সবাই হলুদ রঙের পোশাকের প্রতি বেশি আকর্ষিত হয়। তাই হলুদ রঙের...

কেনাকাটা1 month ago

বাসন্তী রঙের পোশাক খুঁজছেন?

খবরঅনলাইন ডেস্ক: সামনেই আসছে সরস্বতী পুজো। সেই দিন হলুদ বা বাসন্তী রঙের পোশাক পরার একটা চল রয়েছে অনেকের মধ্যেই। ওই...

কেনাকাটা1 month ago

ঘরদোরের মেকওভার করতে চান? এগুলি খুবই উপযুক্ত

খবরঅনলাইন ডেস্ক: ঘরদোর সব একঘেয়ে লাগছে? মেকওভার করুন সাধ্যের মধ্যে। নাগালের মধ্যে থাকা কয়েকটি আইটেম রইল অ্যামাজন থেকে। প্রতিবেদন লেখার...

কেনাকাটা1 month ago

সিলিকন প্রোডাক্ট রোজের ব্যবহারের জন্য খুবই সুবিধেজনক

খবরঅনলাইন ডেস্ক: নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন সামগ্রী এখন সিলিকনের। এগুলির ব্যবহার যেমন সুবিধের তেমনই পরিষ্কার করাও সহজ। তেমনই কয়েকটি কাজের সামগ্রীর খোঁজ...

কেনাকাটা1 month ago

আরও কয়েকটি ব্র্যান্ডেড মেকআপ সামগ্রী ৯৯ টাকার মধ্যে

খবরঅনলাইন ডেস্ক: আজ রইল আরও কয়েকটি ব্র্যান্ডেড মেকআপ সামগ্রী ৯৯ টাকার মধ্যে অ্যামাজন থেকে। প্রতিবেদন লেখার সময় যে দাম ছিল...

কেনাকাটা1 month ago

রান্নাঘরের এই সামগ্রীগুলি কি আপনার সংগ্রহে আছে?

খবরঅনলাইন ডেস্ক: রান্নাঘরে বাসনপত্রের এমন অনেক সুবিধেজনক কালেকশন আছে যেগুলি থাকলে কাজ অনেক সহজ হয়ে যেতে পারে। এমনকি দেখতেও সুন্দর।...

কেনাকাটা1 month ago

৫০% পর্যন্ত ছাড় রয়েছে এই প্যান্ট্রি আইটেমগুলিতে

খবরঅনলাইন ডেস্ক: দৈনন্দিন জীবনের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসগুলির মধ্যে বেশ কিছু এখন পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ৫০% বা তার বেশি ছাড়ে। তার মধ্যে...

কেনাকাটা1 month ago

ঘরের জন্য কয়েকটি খুবই প্রয়োজনীয় সামগ্রী

খবরঅনলাইন ডেস্ক: নিত্যদিনের প্রয়োজনীয় ও সুবিধাজনক বেশ কয়েকটি সামগ্রীর খোঁজ রইল অ্যামাজন থেকে। প্রতিবেদনটি লেখার সময় যে দাম ছিল তা-ই...

কেনাকাটা2 months ago

৯৯ টাকার মধ্যে ব্র্যান্ডেড মেকআপের সামগ্রী

খবর অনলাইন ডেস্ক : ব্র্যান্ডেড সামগ্রী যদি নাগালের মধ্যে এসে যায় তা হলে তো কোনো কথাই নেই। তেমনই বেশ কিছু...

নজরে