Connect with us

প্রবন্ধ

‘গায়কদের গায়ক’ অখিলবন্ধু ঘোষ: শতবর্ষে শ্রদ্ধাঞ্জলি

আজ ২০ অক্টোবর। আজ থেকে ঠিক ১০০ বছর আগে বাঙালি পেয়েছিল এমন এক সংগীতশিল্পীকে যিনি ছিলেন স্বকীয়তায় সমুজ্জ্বল, নিজস্বতায় ভরপুর, যাঁর সুর সংযোজনায় ছিল অভিনবত্ব, গায়কি ছিল অনন্য।

Published

on

অখিলবন্ধু ঘোষ।

“সময়টা মনে নেই, হুগলি জেলায় একটা কলেজে অনুষ্ঠানে গিয়েছি গান গাইতে। অখিলদাও গেছেন, আর ছিলেন হাস্যকৌতুক শিল্পী শীতল বন্দ্যোপাধ্যায়। অনেক দূরের পথ, সকালে রওনা হয়ে দুপুরে পৌঁছে খাওয়া-দাওয়া করে সবাই একটু বিশ্রাম নিচ্ছি। সন্ধেবেলায় আমাদের জলসা। হঠাৎ কান্নার শব্দ, দেখি অখিলদা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছেন। আমরা দুজন একেবারে অবাক। তাড়াতাড়ি কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করে জানলাম – টার্ফ রোডের বাড়িতে দোতলায় ময়না পাখিটাকে খেতে দিয়ে আসেননি, কী করে যে ভুলে গেছেন, বৌদিও আজকে বাড়ি নেই, পাখিটা বোধহয় মারা যাবে…। এমন মানসিকতা না থাকলে কেউ মরমী শিল্পী হতে পারে?”

ঠিকই চিনেছিলেন অনুজ সংগীতশিল্পী মৃণাল চক্রবর্তী। মরমী শিল্পী বলতে যা বোঝায়, ঠিক তা-ই ছিলেন অখিলবন্ধু ঘোষ। ‘শিপ্রা নদীর তীরে’, ‘কবে আছি কবে নেই’, ‘এমনি দিনে মা যে আমার’, ‘তোমার ভুবনে ফুলের মেলা, আমি কাঁদি সাহারায়’, ‘ও বাঁশুরিয়া বাঁশি বাজায়ো না’ – প্রতিটি গানে এক বিরহী মনের হাহাকার আর অভিমান ছুঁয়ে যায় শ্রোতার মন।

তবে শুধু বিরহই কি তাঁর গানের একমাত্র সম্পদ ছিল? যখন শুনি ‘পিয়ালশাখার ফাঁকে ওঠে’, ‘ওই যে আকাশের গায়’, ‘যেন কিছু মনে কোরো না’, ‘সেদিন চাঁদের আলো’, ‘ঐ যাঃ! আমি বলতে ভুলে গেছি’ ইত্যাদি গান, তখন আমরা অন্য অখিলবন্ধুকে পাই। আসলে তাঁর গান ছিল স্বকীয়তায় সমুজ্জ্বল, নিজস্বতায় ভরপুর, সুর সংযোজনায় অভিনব, গায়কিতে অনন্য।

Loading videos...

এ প্রসঙ্গে ‘ঐ যাঃ! আমি বলতে ভুলে গেছি’ গানটির কথা আলাদা করে বলতে হয়। গীতিকার পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা গানটিতে নিজে সুর বসিয়ে অখিলবন্ধু রেকর্ড করেন ১৯৭১ সালে। গানের শুরুতেই ‘ঐ যাঃ!’ অংশটি অখিলবন্ধু এমন ভাবে বলেন যে গানের পরবর্তী অংশটি অর্থাৎ ‘আমি বলতে ভুলে গেছি’র সঙ্গে ঠিক ভাবে খাপ খেয়ে যায়। অর্থাৎ কিছু বলতে ভুলে গেলে ‘ঐ যাঃ!’ অংশটুকু আমাদের মুখ থেকে যে ভাবে বেরিয়ে আসা স্বাভাবিক, ঠিক সে ভাবেই বলেন অখিলবন্ধু। ঠিক এখানেই মিল খুঁজে পাওয়া যায় শচীন দেববর্মণের ‘বাঁশি শুনে আর কাজ নাই, সে যে ডাকাতিয়া বাঁশি’র গায়নে। এই গানটি শুরু করার আগে শচীনকর্তা ‘আঃ’ কথাটি বলে উঠতেন। অখিলবন্ধুর ‘ঐ যাঃ! আমি বলতে ভুলে গেছি’ গানে শচীনকর্তার ‘ডাকাতিয়া বাঁশি’র যে প্রভাব আছে তা অস্বীকার করা যায় না।

আর সেটা থাকাই তো স্বাভাবিক। প্রথমে সংগীতশিক্ষক মামা কালিদাস গুহ, তার পরে একে একে নিরাপদ মুখোপাধ্যায়, সংগীতাচার্য তারাপদ চক্রবর্তী, পণ্ডিত চিন্ময় লাহিড়ী এবং কিছু দিন পণ্ডিত কে জি ঢেকন প্রমুখ গুণীজনের কাছে সংগীত শিক্ষায় তালিম নিলেও, অখিলবন্ধু মনে মনে শচীন দেববর্মণকেও গুরু বলে মানতেন। মৃণাল চক্রবর্তীও বলেছেন, “উনি চিরকাল শচীন দেববর্মণের ভক্ত।” 

শাস্ত্রীয় সংগীতে তালিম নিয়েছিলেন তিনি। শাস্ত্রীয় সংগীতের সূক্ষ্ম কাজ অখিলবন্ধুর গলায় অনায়াসে খেলা করত, গানের মাঝে টুকরো তানকারিও করতেন। এক একটা মোড়, মুড়কী, গোটা গানের পরিবেশনে এমন প্রভাব ফেলত যে শ্রোতারা এক অনাবিল মুগ্ধতায় আবিষ্ট হয়ে যেতেন।

সংগীতজীবনের প্রথম দিকে বৈঠকী অর্ধ-রাগসংগীত বা রাগপ্রধান ধাঁচের গানেই বেশি আগ্রহ ছিল অখিলবন্ধুর। কিন্তু পরবর্তী কালে আধুনিক বাংলা গানে নিজস্ব ঘরানা সৃষ্টি করেন। রাগপ্রধান গানের জগতে তাঁর অবিস্মরণীয় কিছু সৃষ্টি হল ‘আজি চাঁদিনী রাতি গো’, ‘জাগো জাগো প্রিয়’, ‘বরষার মেঘ ভেসে যায়’, ‘আমার সহেলী ঘুমায়’ ইত্যাদি। বেশ কিছু নজরুলগীতিও তাঁর কণ্ঠে অন্য মাত্রা পেয়েছে। ১৯৬১ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি দু’টি রবীন্দ্রসংগীতও রেকর্ড করেন তিনি – ‘তুমি মোর পাও নাই পরিচয়’ এবং ‘যার মিলন চাও বিরহী”।    

সাংগীতিক ভাববিস্তারে অখিলবন্ধু ছিলেন সম্রাট। গানের কথার মধ্যে ঢুকে যেতেন তিনি। প্রতিটি শব্দের অর্থ ও ভাব বুঝে, তার অন্দরে প্রবেশ করে, তার পর তা উপহার দিতেন শ্রোতাদের। এ ব্যাপারে দেবব্রত বিশ্বাসের সঙ্গে তাঁর অনেক মিল খুঁজে পাওয়া যায়। গান গাওয়ার সময় তাঁর চোখদু’টি বন্ধ থাকত। একটা তদগত ভাব। সেই মুহূর্তে তিনি গানের মধ্যে ডুবে যেতেন। তাই শ্রোতাদের কাছে তাঁর সংগীত পরিবেশনা এক অনন্য মাধুর্য সৃষ্টি করত।

তাঁর অত্যন্ত জনপ্রিয় গান ‘ও দয়াল বিচার করো’-এর পাশাপাশি শোনা যাক ‘ও বাঁশুরিয়া বাঁশি বাজায়ো না’। দু’টিই প্রেমের গান। কিন্তু দু’টি গানের আকুতি ভিন্ন মাত্রায় প্রকাশ পেয়েছে। একটিতে দয়ালের কাছে বিচার চাওয়া হচ্ছে, আর অন্যটিতে বাঁশিকে থামতে বলা হচ্ছে। কী অনায়াস দক্ষতায় ভিন্ন মাত্রার এই আকুতি শ্রোতাদের কাছে সাবলীল ভাবে উপস্থাপন করেছিলেন অখিলবন্ধু তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।     

চিরকাল প্রচারের আড়ালে থেকে যাওয়া এই মানুষটি যোগ্য সঙ্গিনী পেয়েছিলেন দীপালি ঘোষকে। তাঁর সহধর্মিণী দীপালি ছিলেন তাঁর এক সময়ের ছাত্রী, তিনিও এক গুণবতী রত্ন, সুরকার। অখিলবন্ধুর বেশির ভাগ গান নিজের সুর দেওয়া হলেও, বেশ কয়েকটা গানে সুর দেন দীপালি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘যেন কিছু মনে কোরো না’, ‘সারাটি জীবন কী যে পেলাম’, ‘শ্রাবণ রাতি বাদল নামে’, ‘শ্রাবণ নিশীথে এসো’, ‘কেন ডাকো বারে বারে’ ইত্যাদি।

সুরসাধকের প্রয়াণ ১৯৮৮ খ্রিস্টাব্দের ২০ মার্চ। ৬৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই তিনি ইহলোক ত্যাগ করেন। জীবনে তিনি তাঁর যোগ্যতার উপযুক্ত সম্মান পাননি। তাঁর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যের মতো বিশিষ্ট শিল্পীরাও বলেছেন এ কথা। মৃত্যুতেও তিনি অবহেলার শিকার হয়েছেন। অন্ডালে একটি অনুষ্ঠান করে ফিরে এসেছিলেন সে দিন সকালে। দুপুরে হঠাৎ তাঁর শরীরটা খারাপ লাগতে থাকে। তাঁকে পিজি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে বেশ কিছুক্ষণ চিকিৎসাহীন অবস্থায় পড়ে থাকার পর তাঁকে শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়। সেখানে তাঁর চিকিৎসা শুরু হয়। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। তাঁকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।

মৃণাল চক্রবর্তী তাঁর আত্মজীবনী ‘খোলা জানালার ধারে’-তে লিখেছেন, “লেখকদের জগতে যেমন একটা কথা আছে লেখকদের লেখক, অখিলদাকে আমি আধুনিক বাংলা গানের ক্ষেত্রে গায়কদের গায়ক বলে মনে করি।”

একেবারে খাঁটি কথা। অখিলবন্ধুর গায়কি ছিল সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র, নিজস্ব। তাঁর গায়কি অনুসরণ করা একেবারেই সহজ ছিল না। মৃণাল চক্রবর্তীর অনুভবেরই প্রতিধ্বনি করে বলি, আধুনিক বাংলা গানে নিজের নির্জন স্বাক্ষর রেখে গিয়েছিলেন অখিলবন্ধু ঘোষ।

(তথ্য সংকলন: শম্ভু সেন)

ঋণ স্বীকার –

১। খোলা জানালার ধারে – মৃণাল চক্রবর্তী

২। শতবর্ষে অখিলবন্ধু – অভীক চট্টোপাধ্যায়, আনন্দবাজার পত্রিকা, ১৮ অক্টোবর ২০২০

৩। অখিল বন্ধু ঘোষ মার্জিত শোভন সুরসৃষ্টি – সংকলক সন্দীপ মুখোপাধ্যায় – https://bangodarshan.com/

খবরঅনলাইনে আরও পড়তে পারেন

প্রগতিশীল সামাজিক-রাজনৈতিক সাংবাদিকতার অন্যতম প্রবর্তক ও পথপ্রদর্শক ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর

Advertisement
Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

প্রবন্ধ

‘ভাইপো’কে কেন ভয়?

ভাইপোকে ঘিরেই কোনো অশুভ বা বিপদের আশঙ্কা ঘণীভূত হয়েছে মুরলীধর সেন লেনে?

Published

on

তৃণমূল এবং বিজেপির মিছিল। প্রতীকী ছবি
Jayanta Mondal
জয়ন্ত মণ্ডল

ভোটের আগে বাজার গরম করাটাই সব থেকে বড়ো কাজ। ভোটের ফলাফলে যা হবে, তা হবে। কিন্তু ভোটের আগে দল, দলীয় কর্মীদের চাঙ্গা রাখতে যে কোনো ইস্যুতেই গরমাগরম বুলি ঝেড়ে পিকচারে থাকতে হবে। একুশে নীলবাড়ি দখলে রাখা এবং দখল করার উভমুখী লক্ষ্যপূরণে সেই প্রক্রিয়াই শুরু হয়ে গিয়েছে রাজ্য-রাজনীতিতে।

একটু পিছনে তাকালে দেখা যাবে, শেষ কয়েকটি বিধানসভা ভোটে সব থেকে বেশি ব্যবহৃত শব্দগুলির মধ্যে অন্যতম ‘কৃষি ভিত্তি, শিল্প ভবিষ্যৎ’, ‘হার্মাদ’, ‘সিঙ্গুর’, ‘নন্দীগ্রাম’, ‘পরিবর্তন চাই’, ‘চিটফান্ড’, ‘সারদা’, ‘নারদা’ ইত্যাদি। এই তালিকা অবশ্য অতি দীর্ঘ। ভোট যত এগিয়ে আসে নিত্যনতুন শব্দ সংযোজিত হয় রাজনীতির কারবারিদের বুলির অভিধানে। এ বারে হাতে রয়েছে আরও বেশ কিছু সময়, তবে এখনই বেশ কিছু শব্দ শাসক-বিরোধী দলের নেতা-নেত্রীদের মুখে-মুখে ঘুরছে। উপরতলা থেকে সেই সমস্ত শব্দ ক্রমশ ছড়িয়ে যাচ্ছে নিচুতলায়।

করোনাভাইরাস নিয়ে একটা চাপা আতঙ্ক ছিল গত মাস আটেক সময় ধরে। লকডাউন উঠেছে, দোকানপাট, কলকারখানা, অফিস খুলেছে। বাস-ট্রেন-মেট্রো সবই চলছে। তবে ভোটের হাওয়া ঢুকতেই এখন করোনা থাকলেও সেই আতঙ্ক আর নেই। শীত ঢুকে পড়লেও ভোটের গরমে ফুটতে শুরু করেছে বাংলা। যত দিন গড়াবে, ততই উঠবে বাষ্প এবং বিষবাষ্প। অভিযোগ, পালটা অভিযোগ এবং অভিযোগ খণ্ডন করতে কতই না নিত্যনতুন শব্দের আমদানি হবে। এখন যা হচ্ছে।

Loading videos...

আপাতত শাসক-বিরোধী তরজায় বহুল ব্যবহৃত শব্দগুলির মধ্যে সেরার তালিকায় রয়েছে ‘বহিরাগত’ এবং ‘ভাইপো’। রাজ্যের শাসক দল নাম ধরে ধরে বলে দিচ্ছে কারা বহিরাগত। গায়ে লাগতেই বিজেপি নেতারা আবার পালটা দিচ্ছেন। রাজ্য-রাজনীতিতে শব্দটা পুরনো হলেও নতুন রূপে বিজেপির আমদানি ভাইপো। তৃণমূল বলছে, বুকের পাটা নেই নাম বলার, তাই ভাইপো বলছে।

২০২১ বিধানসভা ভোটকে সামনে রেখে পশ্চিমবঙ্গকে পাঁচটি জোনে ভাগ করে দলের পাঁচ কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে দায়িত্ব দিয়েছে বিজেপি। কিন্তু তাঁরা কেউ-ই এ রাজ্যের নন। তৃণমূলের অভিযোগ, যাঁরা রাজ্যের অলিগলি চেনেন না, তাঁদের দায়িত্ব দিয়ে বিজেপি বুঝিয়ে দিয়েছে, রাজ্য তাঁদের কোনো যোগ্য নেতা নেই। তাই বহিরাগতদের উড়িয়ে নিয়ে আসতে হচ্ছে। যাঁদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তাঁরা বাংলার ঐতিহ্য, সংস্কৃতি সর্বোপরি বাংলার মানুষকে বোঝেন না। রাজ্যের মানুষ এ সব মোটেই মেনে নেবে না।

তৃণমূল এই ইস্যুতে লাগাতার আক্রমণ শানিয়েছে, পালটা দিয়েছে বিজেপি। ফলাফল দেখা যাচ্ছে, আখেরে লাভ হয়েছে তৃণমূলের। কারণ, হিন্দিভাষী ওই পাঁচ পর্যবেক্ষককে কয়েক দিনের জন্য সে ভাবে আর প্রকাশ্যে নিয়ে আসেনি বিজেপি। তৃণমূলের তুলে ধরা খামতিগুলো হয়তো পূরণের চেষ্টা চলছে গেরুয়া শিবিরে। তার পর আটঘাট বেঁধে পুরোদমে ময়দানে নামিয়ে দেওয়া হবে তথাকথিত ‘বহিরাগত’দের। এই কাজ দেশের সব থেকে ধনী রাজনৈতিক দলের কাছে মোটেই অসাধ্য নয়।

অন্য দিকে ভাইপো ইস্যুও আজকের নয়। তবে বিজেপির একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা যেমন অমিত শাহ, পশ্চিমবঙ্গে দলের কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষক কৈলাস বিজয়বর্গীয় থেকে শুরু করে রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ এই হাতিয়ার ব্যবহার করায় অন্য মাত্রা পেয়ে গিয়েছে ‘ভাইপো’।

এ বিষয়ে দিলীপের সাম্প্রতিক বক্তব্য, “ভালোবেসে ভাইপো বলা হয়। আমি বলছি খোকাবাবু। উনি কোলে চড়ে রাজনীতিতে এসেছেন। কোলে চড়ে এসে সাংসদ হয়েছেন। যাঁরা দলের জন্য প্রাণ দিয়েছেন, তাঁরা ব্রাত্য। সাধারণ মানুষ সব কিছু দেখছে”। ও দিকে ডায়মন্ডহারবারের সাংসদ এবং মুখ্যমন্ত্রীর ভাইপো অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় সরাসরি বলেছেন, “দিলীপ ঘোষ গুন্ডা। কৈলাস বিজয়বর্গীয়র ছেলে আকাশ বিজয়বর্গীয় গুন্ডা। অমিত শাহ, সুনীল দেওধররা বহিরাগত। ওরা ভাইপো-ভাইপো করছে, নাম ধরে বললে আইনি ব্যবস্থা নিয়েছি। তাই নাম বলতে ভয় পাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত নাম বলতে ভয় পান”।

সিপিএম নেতারাও বলছেন, “সবাই জানে কে এই ভাইপো”। কিন্তু বিজেপির নিশানায় থাকা ভাইপো যদি এই ভাইপো হন, তা হলেও রাজ্যের মানুষের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়বে বলে মনে হয় না। কারণ, এই ভাইপো যখন রাজনীতিতে ছিলেন না, তখন সেই ভাইপোরা ছিলেন। এই ভাইপো যখন থাকবেন না, তখন অন্য ভাইপোরা রাজনীতিতে থাকবেন। তফাতটা শুধু এ দিক আর ও দিককার।

গত বছরে লোকসভা ভোটের আগে গেরুয়া শিবিরে নাম লেখান রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী এবং শিলিগুড়ির মেয়র অশোক ভট্টাচার্যের ভাইপো অর্কদীপ। দার্জিলিংয়ের সাংসদ সুরেন্দ্র সিংহ আহলুওয়ালিয়ার হাত থেকে পতাকা নিয়ে বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ‘ভুল স্বীকার’ করে বিজেপি ছেড়েছিলেন দাপুটে সিপিএম নেতার ভাইপো।

এই তো ক’ সপ্তাহ আগে বিজেপিতে যোগ দিলেন প্রাক্তন বিধায়ক সুভাষ মাহাতোর ছেলে সিদ্ধার্থ। পরের সপ্তাহেই দলবদল করলেন তাঁর ভাই সুব্রত। দু’জনেই সম্পর্কে বাগমুণ্ডির কংগ্রেস বিধায়ক নেপাল মাহাতোর ভাইপো। যা দেখে কাকা নেপাল জোরের সঙ্গে জানিয়েছেন, ভাইয়ে-ভাইয়ে বিভেদের চেষ্টা করে লাভ হবে না, বাঘমুণ্ডিতে কংগ্রেসই বিপুল ব্যবধানে জিতবে।

চলতি মাসেই সংবাদ মাধ্যমের শিরোনাম উঠে আসেন পশ্চিম বর্ধমান জেলার বিজেপির সভাপতির ভাইপো। বিজেপি নেতা লক্ষ্মণ ঘোড়ুইয়ের ভাইপো, সহদেব ঘোড়ুইয়ের বিরুদ্ধে দলীয় কর্মীর মেয়েকে ধর্ষণ-ব্ল্যাকমেলের অভিযোগ ওঠে। তাঁর বাড়িতে আদালতের সমনও যায়। ১৬ ডিসেম্বরের মধ্যে হাজিরা দিতে বলা হয়। রাজনীতিতে ভাইপো, এবং অভিযোগের নিশানায় এমন ভাইপোদের সংখ্যা নেহাত কম নয়। ওয়েটের দিক থেকে কোথাও ‘হেভি’ আর কোথাও ‘লাইট’।

ক’দিন আগেই যেমন গোয়ার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী প্রয়াত মনোহর পর্রীকরের ভাইপো অখিল সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়ে গিয়েছিলেন আয়ুষমন্ত্রী শ্রীপদ নায়েকের বিরুদ্ধে মুখ খুলে। নায়েকের বিরুদ্ধে জোরালো অভিযোগ তুলে একটি ভিডিও পোস্ট করেন বিজেপি নেতা অখিল। বলেন, মন্ত্রীর নিজের কেন্দ্রটিই তাঁর কাছে উপেক্ষিত। ভোটে জেতার পর তিনি না কি ওই কেন্দ্র থেকে নিখোঁজ হয়ে গিয়েছেন। বিতর্ক সামাল দিতে অখিলকে ‘শিশু’ এবং তাঁর আচরণকে ‘শিশুসুলভ’ তকমা দিয়েছেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী।

আবার উত্তরপ্রদেশে কাকা-ভাইপোর সম্পর্কের নরম-গরম সম্পর্ক অনেকের কাছেই চর্চার বিষয় হয়ে ওঠে প্রায়শই। কাকা শিবপাল যাদব এবং ভাইপো অখিলেশ সিংহ যাদবের নাটকীয় বিচ্ছেদ এবং সন্ধি নতুন কিছু নয়! দু’জনের রাজনৈতিক উঠোন ভিন্ন হয়ে গিয়েছে। কিন্তু ঘটনাপ্রবাহে ফের কাছাকাছি আসছে মুলায়ম সিং যাদবের সমাজবাদী পার্টি এবং শিবপালের প্রগতিশীল সমাজবাদী পার্টি। উত্তরপ্রদেশে বিধানসভা ভোট ২০২২-এ, তার আগেই অবশ্য একুশের মহারণ এ রাজ্যে। ইস্যু আসবে, ইস্যু তলিয়েও যাবে। কিন্তু একটা ইস্যুকে জাগিয়ে রাখতে হবে আর একটা ইস্যু আসা না পর্যন্ত। এই এখন যেমন চলছে ‘বহিরাগত’ অথবা ‘ভাইপো’কে ঘিরে।

তবে গেরুয়া শিবিরের সমালোচনা শুনে মনে হতে পারে, ভাইপোর জন্য রাজ্যের শাসক দলের ভাবমূর্তির ক্ষতি হচ্ছে এবং হবে, এমন আশঙ্কায় তৃণমূলের থেকেও যেন বেশি চিন্তিত বিজেপি। বদনামের বিষোদ্গার করে ভাইপোকে রোখা, না কি তৃণমূলকে ভাইপোমুক্ত করে স্বস্থানে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে বিজেপি, আক্রমণের ধরনে সেটাই মাঝেমধ্যে ঘুলিয়ে যাচ্ছে।

বিজেপি কেন্দ্রে। তার হাতে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা। ফলে কখন কয়লা আর কখন গোরু পাচার নিয়ে তদন্ত হবে, সেটা তারাই স্থির করবে। সেই সূত্র ধরেই ভোটের মুখে এই পাচারের নেপথ্যে নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে কাঠগড়ায় তুলে আক্রমণ শানাতেই পারে বিজেপি। তবে এগুলো যতটা পরিষ্কার, ততটা পরিষ্কার নয় ভাইপোর কারণে তৃণমূল থেকে কয়েকজন নেতামন্ত্রীর ছেড়ে যাওয়ার ইঙ্গিতে বিজেপির মুষড়ে পড়ার ঘটনা। তা হলে কি, ‘দিদি’র দিকে থেকে বিজেপির ভয়ের অভিমুখ এখন ঘুরছে ‘ভাইপো’র দিকেই? ভাইপোকে ঘিরেই কোনো অশুভ বা বিপদের আশঙ্কা ঘণীভূত হয়েছে মুরলীধর সেন লেনে?

আরও পড়তে পারেন: সামনে ভোট, বরাদ্দ-ব্যবসা তো জমবেই!

Continue Reading

প্রবন্ধ

মারাদোনা – গোল করা আর ভুল করা যাঁর কাছে দু’টোই সমান!

১০ নম্বর জার্সির মালিকরা যে রকম ভাবেন, তেমনই ভেবেছেন মারাদোনা।

Published

on

দিয়েগো আরমান্দো মারাদোনা। ফাইল ছবি

শুনুন ‘লেখক’, এখন আর কেউ জন্ম-মৃত্যু নিয়ে ঘ্যাঁট খায় না। সোজাসুজি চলে যায় বাছাই ডিশে, দেখে নেয় যে এল আর গেল তার মাঝখানের বছরগুলোয় সে কতটা আঁচড় কাটতে পারল। নো ডাউট, যাঁকে নিয়ে এই স্ক্রিপ্ট, তাঁর নাম-ই কাফি। লিখলেন অরুণাভ গুপ্ত

মারাদোনা-নামের মধ্যে বসে থাকা আরমান্দো মোটেই ঝিমুচ্ছে না, বলছে, এর অর্থ হল ‘ম্যান ইন দ্য আর্মি’। ফ্যামিলিও সেই রকম। খাওয়ানোর খ্যামতা নেই, অথচ সন্তানসংখ্যা চড়া পরদায় বাঁধা, অভাব-অনটন দরজায় কড়া তো নাড়বেই! তবে মা দোনাতোতা মমতাময়ী বটে! হাতড়াতে হবে না, খোদ মারাদোনার মুখ থেকে শুনি – “তাঁর কোনো দিন পেট ব্যথা ছিল না, তিনি শুধু চাইতেন আমাদের কোনো রকমে পেট ভরাতে। যখনই খাবার নিয়ে বসতেন, তাঁর একটাই কথা ছিল, আমার না বুঝলি পেটটা গড়বড় করছে। কী মিথ্যে কথা-আ। আমি জানতাম, এটা একটা অজুহাত, কারণ তাঁর ভাঁড়ারে যথেষ্ট খাবার থাকত না। আর এই কারণেই আমি এই মহিলাকে এতটা ভালোবাসতাম।” সত্যিই তাই, মারাদোনার প্রতিটি ক্ষেত্রে মায়ের ভূমিকা অসামান্য।

মজার ঘটনা হল, মারাদোনার তিন বছর বয়সের জন্মদিনে খুড়তুতো ভাই বেতোজারেত খুদে ভাইকে একটা বল উপহার দেয়। মারাদোনাকে আর পায় কে! এমনকি ঘুমোনোর সময় বলটাকে জামার ভিতর ঢুকিয়ে লুকিয়ে রাখত ছোট্ট মারাদোনা। যাতে কেউ সেই বল হাতিয়ে নিতে না পারে। মা কিন্তু তখন প্রচুর বকাবকি করতেন, তাঁর সাধ, ছেলে লেখাপড়ায় মন দিক। গরিবের ঘরে এ সব মানায় না। পরে মা বুঝলেন, তাঁর এই সন্তানকে ফুটবল ডাকে।

Loading videos...

দৃশ্য: ২

কত হবে, বড়োজোড় আট। ঢুকে পড়লেন লাস ওগোলিতাস ছেলেদের দলে। যারা আবার ‘দ্য লিটল ওনিয়নোস’ নামে পরিচিত। ব্যস, ঢুকেই প্রতিপক্ষদের ভো-কাট্টা। পর পর ১৩৬ ম্যাচে জয়। এবং একই সঙ্গে ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নশিপ সম্মান ক্লাবের। ১৯৭৬-এ প্রথম ডিভিশনে যাত্রা শুরু, তার চার মাস বাদেই একেবারে জাতীয় দলে সুযোগ। এর আগে এত অল্প বয়সে আর্জেন্তিনার আর কেউ এমন কৃতিত্ব পায়নি। কাগজে খেলার পাতায় ছাপা হল, ‘দেয়ার ওয়াজ আ কিড উইথ দ্য অ্যাটিটিউড অ্যান্ড ট্যালেন্ট অব আ স্টার’। ফাটাফাটি প্রচার, কিন্তু প্রুফ রিডারের ক্যাপাকাইটিতে মারাদোনার নাম হল ‘ক্যারাদোনা’, বলিহারি ব্যাপারস্যাপার। অথবা দোষ কারও নয় গো মা….।

যা হোক, তাতে মারাদোনার কিছু যায়-আসেনি, হুড়হুড়িয়ে আকাশ ছুঁয়েছেন। গাট্টাগোট্টা চেহারার মিডফিল্ডার মারাদোনা ক্লাব ম্যাচে গোল করেছেন ২৫৯, খেলেছেন ৪৯০ ম্যাচ। স্বদেশ আর্জেন্তিনার হয়ে ৯১ ম্যাচে ৩৪টা গোল। বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ ১৯৮২, ১৯৮৬, ১৯৯০ এবং ১৯৯৪ (এখানে অবশ্য ড্রাগ টেস্টের কবলে দল থেকে ছাঁটাই)। ‘৮৬ মেক্সিকো বিশ্বকাপে কী বিচিত্র ফুটবল চরিত্রের প্রকাশ – ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে বিতর্কিত গোল করে নো লাজলজ্জা, সপাটে নিজেই মন্তব্য করেছেন, “আ লিটিল উইথ দ্য হেড অব মারাদোনা অ্যান্ড আ লিটিল উইথ দ্য হ্যান্ড অব গড”। আরও আছে ওই ইংল্যান্ডের ম্যাচেই কম করে হাফডজনকে ড্রিবল করে ধোঁকা দিয়ে বেরিয়ে গিয়ে জালে বল ঠেলে এমন অনবদ্য গোল করেন যে ফিফা ভোটাভুটিতে ঘোষিত হয় ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’।

ওই বিশ্বকাপেই বেলজিয়াম ম্যাচে ধারাভাষ্যকার ভিক্টর হুগোসাহেব মারাদোনার কাণ্ডকারখানা দেখে বলে ওঠেন, “আকাশ থেকে আচমকা যেন ধুমকেতুর আবির্ভাব’। মানে মারাদোনা বল পেলেই বেলজিয়ানরা থরহরিকম্প! সাধে কী আর সতীর্থ জর্জ ভালদানো বলেছেন, “ওর বাঁ পায়ে বল পড়লে বলের ভিন্ন জাতের অভিজ্ঞতা হয়”।

আনন্দ এবং স্বাধীনতা

মারাদোনার চিরস্মরণীয় মন্তব্যের বহর তাঁর কৃতিত্বের মতোই দীর্ঘ। কোনোটা ফুটবলকেন্দ্রিক তো কোনোটা জীবনভিত্তিক। তিনি বলতে দ্বিধা করেননি – “ফুটবলকে অসংখ্য ধন্যবাদ। এটা একটা এমন খেলা, যা আমাকে শুধু আনন্দ দেয়নি, দিয়েছে অফুরন্ত স্বাধীনতা। অনেকটা ওই হাত দিয়ে আকাশ ছুঁয়ে ফেলার মতো, আবারও বলি – ধন্যবাদ, ধন্যবাদ ফুটবল”।

আরেকটা তাঁর হাতে পাঁচখানা ট্যাটু নিয়ে। পাঁচটা ট্যাটুর মধ্যে একটা বিশেষ ট্যাটু তাঁর ডান হাতে ছিল। যেটা চে গ্যোভেরার, পরম যত্নে ওই ট্যাটুটিকে আজীবন লালনপালন করেছেন মারাদোনা। এবং দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছেন, “আমি শুধু হাতেই ওঁকে বহন করিনি, অন্তরেও বহন করেছি। আমি তাঁর অসংখ্য ঘটনা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল, আমি তাঁকে ভালোবাসতে শিখেছি। হ্যাঁ, আমি দৃঢ় ভাবে বলছি, তাঁর সম্পর্কে যে সত্য আমি জেনেছি, তা শুধু অকাট্য নয়, সম্পূর্ণ নিখাদ”।

তবে ফুটবলের পাশাপাশি জীবনদর্শনেও নিজেকে অন্য মাত্রায় নিয়ে গিয়েছিলেন ফুটবলের যুবরাজ। তাঁর কালজয়ী মন্তব্যের ঝাঁপিও যে কারণে কানায় কানায় পরিপূর্ণ। এক সময় তিনি যখন বলেন, “আমি কালো হই বা ফরসা, জীবনে কখনও ধূসর হয়নি” তখন তাঁর ব্যক্তিত্ব ধুয়েমুছে সাফ করে দেয় তাঁকে ঘিরে তৈরি হওয়া অনেক বিতর্ককেই।

গড়পড়তা ১০ নম্বর জার্সির মালিকরা যে রকম ভাবেন, তেমনই ভেবেছেন মারাদোনা। তবে ভালো-মন্দ মেশানো চরিত্রে চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ছিল, কোনো রকম ঢাকঢাক গুড় গুড় নেই। একেবারে সোজাসাপটা। কী অদ্ভুত ফুটবলার! বুক চিতিয়ে বলে দিলেন, “ওরে ভাই, শুনে রাখো, আমি হলাম মারাদোনা। সে যেমন গোল করে আবার ভুল-ও করে। আমার কাছে দু’টোই সমান। কোনো বাছবিচার নেই। আরও মনে রেখো, আমার কাঁধ যথেষ্ট চওড়া, তাই যে কোনো প্রতিঘাতে আমি সমানে লড়তে পারি”।

তিনি যে আসছেন, সেটা স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন ১৭ বছর বয়সে একটি টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে। বলেছিলেন, “আমার দু’টো স্বপ্ন রয়েছে। প্রথম, বিশ্বকাপে খেলা। আর দ্বিতীয় সেটা জয় করা”। দু’টো স্বপ্নই সফল। সেই স্বপ্নই যুগের পর যুগ জাগিয়ে রাখবে শুধু ফুটবল খেলোয়াড় আর ফুটবলপ্রেমীদের নয়, বিপ্লবে বিশ্বাসীদেরও!

(দিয়েগো আরমান্দো মারাদোনা সম্পর্কিত অন্যান্য প্রতিবেদন পড়তে পারেন এখানে ক্লিক করে: মারাদোনা)

Continue Reading

প্রবন্ধ

সামনে ভোট, বরাদ্দ-ব্যবসা তো জমবেই!

কেন্দ্রীয় বরাদ্দের তালিকায় এক নম্বরে পশ্চিমবঙ্গ! তা না হলে ভোটপ্রচারে এসে প্রধানমন্ত্রী রাজ্য সরকারের কাছে ‘হিসেব’ চাইবেন কী ভাবে?

Published

on

নরেন্দ্র মোদী এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি
Jayanta Mondal
জয়ন্ত মণ্ডল

গরিবের হয়ে গলা ফাটাচ্ছে সরকার! গরিবের ঘরে ঢুকে হাঁড়ির খবর নিচ্ছে সরকার! একের পর এক প্রকল্প-তহবিলের খবর দিচ্ছে সরকার! তা হলে কি ভোট এসে গেল?

করোনা-কোভিড করে চিৎকার চলুক, তারই মাঝে কড়া নেড়ে দিয়েছে ২০২১-এর বিধানসভা ভোট। সংবাদ মাধ্যমের ভাষায় ‘একুশের মহারণ’। মহারথীরা ময়দানে নেমে পড়েছেন। রঙ-বেরঙের পতাকা, সারি সারি মাথা আর সময়-সুযোগ পেলেই গরিবের জন্য দু’-চার কথা। এখন অবশ্য শুধু কথায় চিঁড়ে ভেজে না। ‘মাল’ খসাতে হয়। সেটা মোক্ষম বোঝেন প্রধানমন্ত্রী মোদী। বিজেপি-বিরোধী রাজ্য সরকার সাড়ে চার বছর কেন্দ্রীয় বঞ্চনার অভিযোগ তুলে আসবে, আর তার পর ভোটের মুখে কেন্দ্রের হাত উপুড়। কেন্দ্রীয় সরকারের সাম্প্রতিক একটি পরিসংখ্যান তো তেমনটাই বলছে।

১-এ পশ্চিমবঙ্গ!

করোনাভাইরাস মহামারি রুখতে ২০২০-র মার্চে দেশব্যাপী লকডাউন জারি করেছিল কেন্দ্র। ওই লকডাউন কার্যকর হওয়ার পর থেকে গ্রামোন্নয়নের জন্য কেন্দ্রীয় বরাদ্দের তালিকায় এক নম্বরে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ। গ্রামীণ পরিকাঠামো এবং কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্যে এই মেয়াদে কেন্দ্রীয় সরকার রাজ্য এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলিকে যে তহবিল বরাদ্দ করেছে, তা থেকে সব থেকে বেশি বরাদ্দ করা হয়েছে পশ্চিমবঙ্গের জন্য। ভালো কথা! কিন্তু করোনা প্রভাবিত রাজ্যগুলির মধ্যে সব থেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত রাজ্যগুলির তালিকায় পশ্চিমবঙ্গ তো প্রথম স্থানে নেই! তা হলে বরাদ্দের তালিকায় কেন পশ্চিমবঙ্গ?

Loading videos...

আবার এমনও নয়, দেশের অন্য রাজ্যগুলির তুলনায় সব থেকে পিছিয়ে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ। তা হলে কেন?

প্রথমত, বছর ঘুরলেই পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা ভোট। এবং দ্বিতীয় ও শেষ কারণ, সারা দেশ জুড়ে অশ্বমেধের ঘোড়া ছোটালেও এখনও রাজ্যটিতে ক্ষমতা কায়েম করতে পারেনি কেন্দ্রের শাসক দল। হিসেবটা কী করে এতটা সহজ হল?

কারণ, এই মেয়াদে রাজ্যগুলির জন্য কেন্দ্রীয় বরাদ্দের তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে বিহার। যেখানে অক্টোবর-নভেম্বর (২০২০)-এর বিধানসভা ভোট হয়ে গেল। ১০ নভেম্বর এগিয়ে যাওয়া আর পিছিয়ে থাকার টানটান উত্তেজনা শেষে কুর্সি দখলে রেখেছে বিজেপি এবং মিত্রশক্তি।

কে কত পেল?

গ্রামোন্নয়নমন্ত্রকের পরিসংখ্যান বলছে, মার্চ-নভেম্বর (২০২০) মেয়াদে সব মিলিয়ে ছ’টি প্রকল্পে ৪৯ হাজার ২৭০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। যেখান থেকে পশ্চিমবঙ্গের ভাগ্যে জুটেছে ৫ হাজার ৯২৬ কোটি টাকা। বিহারের জন্য বরাদ্দ ৫ হাজার ২৬৫ কোটি টাকা। এর পরে যথাক্রমে রয়েছে মধ্যপ্রদেশ (৪ হাজার ৯৭৪ কোটি), উত্তরপ্রদেশ (৪ হাজার ৬৩৬ কোটি) এবং ওড়িশা (৪ হাজার ৫৩৫ কোটি)।

বিহার ভোটের পাট চুকেছে। মধ্যপ্রদেশেও বিজেপি সরকারের ভাগ্য নির্ধারণে ২৫টি আসনে উপ-নির্বাচনে বিজেপি সরকারের স্থায়িত্ব মজবুত হয়েছে। অন্য রাজ্যগুলির বরাদ্দ-বণ্টনে ভৌগোলিক এবং রাজনৈতিক কারণও হেলাফেলার নয়। তবে এই বরাদ্দের তালিকায় একেবারে শেষ জায়গায় রয়েছে গোয়া। তাদের জন্য এই মেয়াদে বরাদ্দ হয়েছে মাত্র ২.১ কোটি টাকা। এখানেও যেমন কাজ করেছে জনসংখ্যার অঙ্ক।

খাতের পরিচয়

মূলত ছ’টি খাতেই এই তহবিল বরাদ্দ করেছে কেন্দ্রীয় সরকার। যেগুলির মধ্যে রয়েছে মহাত্মা গান্ধী ন্যাশনাল রুরাল এমপ্লয়মেন্ট গ্যারান্টি অ্যাসিস্ট্যান্টস (এমএনআরইজিএ), প্রধানমন্ত্রী গ্রাম সড়ক যোজনা (পিএমজিএসওয়াই), শ্যামা প্রসাদ মুখার্জি রুর্বন মিশন, ন্যাশনাল সোশ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স প্রোগ্রাম, ন্যাশনাল রুরাল লাইভলিহুড মিশন (এনআরএলএম) এবং প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা (পিএমএওয়াই)।

পশ্চিমবঙ্গের মতোই বছর ঘুরলেই ভোট অসমেও। পিএমজিএসওয়াই প্রকল্পে সেখানে বরাদ্দের পরিমাণ সব থেকে বেশি (১ হাজার ২৮৫ কোটি)। আবার পিএমএওয়াই প্রকল্পে সব থেকে বেশি বরাদ্দ পেয়েছে পশ্চিমবঙ্গ (৩ হাজার ৭৫১ কোটি)। ছিটেফোঁটা ব্যতিক্রম যে নেই, তাও নয়। ২০২১-এ বিধানসভা ভোট তামিলনাড়ুতেও। কিন্তু পিএমএওয়াই প্রকল্পে কোনো বরাদ্দ মেলেনি এই মেয়াদে। আবার গোয়া, গুজরাত, হরিয়ানা অথবা তেলঙ্গনাও এই প্রকল্পে কোনো তহবিল পায়নি।

অন্য দিকে ন্যাশনাল সোশ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স প্রোগ্রাম-এর অধীনে সব থেকে বেশি বরাদ্দ জুটেছে বিহারের ভাগ্যে। উত্তরপ্রদেশ পেয়েছে ১ হাজার ২১৮ কোটি, কিন্তু জনসংখ্যা অনেক কম হলেও বিহার পেয়েছে ১ হাজার ২৫০ কোটি টাকা। উত্তরপ্রদেশের পরে তৃতীয় স্থানেই পশ্চিমবঙ্গ (৬৫৩ কোটি)।

আরও যে ভাবে

ঘূর্ণিঝড়, বন্য, ভূমিধসে ক্ষতিগ্রস্ত পশ্চিমবঙ্গ-সহ ছয় রাজ্যের জন্য জাতীয় দুর্যোগ মোকাবিলা তহবিল থেকে মোট ৪ হাজার ৩৩২ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। ঘূর্ণিঝড় উম্পুনের ক্ষতিপূরণবাবদ পশ্চিমবঙ্গকে আরও ২ হাজার ৭০৭ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে ওই খাতে। ঘূর্ণিঝড় বিধ্বস্ত এলাকা পরিদর্শনে এসে ১ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। ফলে সব মিলিয়ে হল ৩ হাজার ৭০৭ কোটি টাকা। কিন্তু এটা কি যথেষ্ট?

রাজ্যের শাসক দল বলছে, মোটেই নয়। গত ১৩ নভেম্বর কেন্দ্রের তরফে এই ঘোষণার পর তৃণমূল সাংসদ সুখেন্দুশেখর রায় স্পষ্টতই জানিয়ে দেন, উম্পুন বিধ্বস্ত অঞ্চল পরিদর্শনে এসে প্রধানমন্ত্রী যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তার ধারেকাছে পৌঁছোয়নি এই বরাদ্দ। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেছিলেন, উম্পুনের তাণ্ডবে রাজ্যে ১ লক্ষ ২ হাজার ৪৪২ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।

বকেয়া এবং বঞ্চনা

লকডাউনের মধ্যেই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, কেন্দ্রের কাছে রাজ্যের ৫৩ হাজার কোটি টাকা পাওনা রয়েছে।

তৃণমূলের জাতীয় মুখপাত্র ডেরেক ও ব্রায়েন জানান, গত এক বছরে কেন্দ্রের সাহায্যে চলা প্রকল্পগুলিতে ৩৬ হাজার কোটি টাকা বকেয়া। রাজ্যের রাজস্ব আদায় বাবদ প্রাপ্য, খাদ্য ভরতুকি এবং জিএসটি বাবদ বকেয়ার তালিকাও দীর্ঘ। যা নিয়েই বঞ্চনার অভিযোগ তুলছে রাজ্য সরকার।

এ দিকে ভোট এসে গেল!

বিহারকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সহযোগিতার মাধ্যমে যে ভাবে বিহারের মানুষ করোনাকে এড়িয়ে ভোট দিয়েছেন (বিজেপিকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে এনেছেন), তাতে তাঁদের ধন্যবাদই প্রাপ্য। পশ্চিমবঙ্গেও ভোট আসছে। মনে হয় না করোনা এখনই ‘টাটা বাইবাই’ করবে। তারই মধ্যে ভোটপ্রচারে নেমে পড়েছে শাসক-বিরোধী সকলেই। বরাদ্দ-ব্যবসাও সমানে চলবে। তা না হলে বাংলায় ভোটপ্রচারে এসে প্রধানমন্ত্রী রাজ্য সরকারের কাছে ‘হিসেব’ চাইবেন কী ভাবে?

আরও পড়তে পারেন: শহর ছেড়ে তুমি কি চলে যেতে পারো তিন ভুবনের পারে

Continue Reading
Advertisement
Advertisement

কেনাকাটা

কেনাকাটা22 hours ago

পোর্টেবল গিজারের ওপর বিশেষ ছাড় বেশ কয়েকটি মডেলে

খবর অনলাইন ডেস্ক: শীতকাল মানেই কনকনে ঠান্ডায় উষ্ণ জলের প্রয়োজন। সেই গরম জলের প্রয়োজন মেটাতে পারে গিজার। অ্যামাজনে কয়েক ধরনের...

কেনাকাটা4 days ago

ব্র্যান্ডেড কোম্পানির ইমারশন রডে ২ বছর পর্যন্ত ওয়ার‍্যান্টি পাওয়া যাচ্ছে

খবর অনলাইন ডেস্ক: শীতকালে গরম জলে স্নান করার মজাই আলাদা। জল গরম করার জন্য কি ওয়াটার হিটার খুঁজছেন? কিনতে পারেন...

কেনাকাটা1 week ago

৫০০ টাকার মধ্যে অত্যাধুনিক হেডফোন

খবর অনলাইন ডেস্ক: হেডফোন খারাপ হয়ে গেছে? সস্তায় নতুন ধরনের হেডফোন খুঁজছেন? হেডফোনের কয়েকটি অত্যাধুনিক কালেকশন রইল অ্যামাজন থেকে। প্রতিবেদন...

কেনাকাটা1 week ago

শীতের নতুন কিছু আইটেম, দাম নাগালের মধ্যে

খবর অনলাইন ডেস্ক: শীত এসে গিয়েছে। সোয়েটার জ্যাকেট কেনার দরকার। কিন্তু বাইরে বেরিয়ে কিনতে যাওয়া মানেই বাড়ি এসে এই ঠান্ডায়...

কেনাকাটা1 week ago

ঘর সাজানোর জন্য সস্তার নজরকাড়া আইটেম

খবর অনলাইন ডেস্ক: ঘরকে একঘেয়ে দেখতে অনেকেরই ভালো লাগে না। তাই আসবারপত্র ঘুরিয়ে ফিরে রেখে ঘরের ভোলবদলের চেষ্টা অনেকেই করেন।...

কেনাকাটা2 weeks ago

লিভিংরুমকে নতুন করে দেবে এই দ্রব্যগুলি

খবর অনলাইন ডেস্ক: ঘরের একঘেয়েমি কাটাতে ও সৌন্দর্য বাড়াতে ডিজাইনার আলোর জুড়ি মেলা ভার। অ্যামাজন থেকে তেমনই কয়েকটি হাল ফ্যাশনের...

কেনাকাটা2 weeks ago

কয়েকটি প্রয়োজনীয় জিনিস, দাম একদম নাগালের মধ্যে

খবর অনলাইন ডেস্ক: কাজের সময় হাতের কাছে এই জিনিসগুলি থাকলে অনেক খাটুনি কমে যায়। কাজও অনেক কম সময়ের মধ্যে করে...

কেনাকাটা4 weeks ago

দীপাবলি-ভাইফোঁটাতে উপহার কী দেবেন? দেখতে পারেন এই নতুন আইটেমগুলি

খবর অনলাইন ডেস্ক : সামনেই কালীপুজো, ভাইফোঁটা। প্রিয় জন বা ভাইবোনকে উপহার দিতে হবে। কিন্তু কী দেবেন তা ভেবে পাচ্ছেন...

কেনাকাটা1 month ago

দীপাবলিতে ঘর সাজাতে লাইট কিনবেন? রইল ১০টি নতুন কালেকশন

খবরঅনলাইন ডেস্ক: আসছে আলোর উৎসব। কালীপুজো। প্রত্যেকেই নিজের বাড়িকে সুন্দর করে সাজায় নানান রকমের আলো দিয়ে। চাহিদার কথা মাথায় রেখে...

কেনাকাটা2 months ago

মেয়েদের কুর্তার নতুন কালেকশন, দাম ২৯৯ থেকে শুরু

খবর অনলাইন ডেস্ক: পুজো উপলক্ষ্যে নতুন নতুন কুর্তির কালেকশন রয়েছে অ্যামাজনে। দাম মোটামুটি নাগালের মধ্যে। তেমনই কয়েকটি রইল এখানে। প্রতিবেদন...

নজরে