Cutmoney
Jayanta Mondal
জয়ন্ত মণ্ডল

গত মঙ্গলবার, ১৮ জুনের ঘটনা। পুরসভার দলীয় কাউন্সিলারদের নিয়ে বৈঠকে বসেছিলেন তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। লোকসভা ভোটে দলের বিপর্যয়ের জন্য কড়া ধমক দেন কাউন্সিলারদের। বলেও দেন, “কাউন্সিলারদের জন্যই আমার বদনাম হচ্ছে”। কী এমন করছেন কাউন্সিলাররা?

ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করা জন্য তিনি নিদেন দেন, কাউন্সিলাররা যেন কাটমানির টাকা ফেরত দেন। কীসের কাটমানি?

সাধারণ মানুষের জন্য বরাদ্দ সরকারি প্রকল্পের টাকায় থাবা বসাচ্ছেন কাউন্সিলাররা। এমন পাকা খবরই তাঁর কাছে রয়েছে। পরিসংখ্যান-সহ তুলে ধরেন সেই তথ্য। বলেন, “সাধারণ মানুষের টাকা নিয়ে খাকলে এখনই ফেরত দিন”। তিনি দাবি করেন, তাঁর কাছে খবর রয়েছে, “কোনো কোনো কাউন্সিলার সরকারি প্রকল্পের টাকাতেও ভাগ বসাচ্ছেন”।

হাতে আসা পরিসংখ্যান থেকেই তিনি বলেন, “সমব্যথী প্রকল্পে দু’হাজার টাকা করে দেন কাউন্সিলাররা। কিন্তু সেখান থেকে দু’শো টাকা নিয়ে নেওয়া হচ্ছে কোথাও কোথাও। আবার বাংলার বাড়ি প্রকল্প থেকেও ২০ শতাংশ টাকা সরিয়ে ফেলা হচ্ছে। কোথাও কোথাও কাউন্সিলাররা সরকারি জমি নিজের পরিবারের নামে করিয়ে নিচ্ছেন। এ রকম চলতে পারে না। কাটমানি নিয়ে থাকলে ফেরত দিন”।

ফেরত দিন, হয়ে গেল ফেরত চাই

সামনে রাজ্যের পুরসভাগুলির নির্বাচন। লোকসভা ভোটের ফল প্রকাশের পর থেকেই পুরসভা কাঁপাচ্ছে বিজেপি। ছ’টি পুরসভার দখল ইতিমধ্যেই নেওয়া হয়ে গিয়েছে বলে দাবি করেছেন তৃণমূলের এক সময়ের ‘নম্বর-টু’ বর্তমানে বিজেপি নেতা মুকুল রায়। আস্তিনে যে অসংখ্য রয়েছে, সে কথাও সদর্পে ঘোষণা করেছেন তিনি। ফলে আশঙ্কা তো থেকেই যায়।

ভাটপাড়া, কাঁচরাপাড়া, হালিশহর, বনগাঁ, গাড়ুলিয়া বা দার্জিলিংয়ের পরিণতিতে বাঁধ দিতে হলে শক্তপোক্ত টোটকা চাই। বিজেপি কী বলছে তাতে আমল না-দিলেও সাধারণ মানুষের মনজয়ের রাজনীতি যেন ঘেঁটে ঘ’ করে দিল। নেহাত মুখ ফসকে নয়, সুদূরপ্রসারী ফলের আশাতেই মমতা সে দিন কাউন্সিলারদের বলেছিলেন, “টাকা নিয়ে থাকলে ফেরত দিন”। এতে দলের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে, ঘরে ফিরবে লোকসভায় বিমুখ ভোটার।

নিজেদের মতো করে ব্যাখ্যা করে নিয়েছেন বীরভূমের সাঁইথিয়া, পূর্ব বর্ধমানের গলসি, হুগলি চন্দননগর পুরসভা অথবা খানাকুল, ঝাড়গ্রামের চিল্কিগড়, নদিয়ার শান্তিপুরের ফুলিয়া পঞ্চায়েতের মানুষজন। মমতা কাউন্সিলারদের বলেছিলেন টাকা ফেরত দিতে, তাঁরা সদলবলে আসরে নেমে পড়েছেন টাকা ফেরত চাইতে। টাকা ফেরত চাইবার পদ্ধতিও আধুনিক। জাপটে ধরা হচ্ছে কাউন্সিলারকে, পঞ্চায়েত সদস্যকে। টাকা চাইতে গিয়ে হাতে উঠছে বাঁশ, আবার বন্দুকের গুলি চলার শব্দও শোনা যাচ্ছে। কে চালাচ্ছে, তার তদন্ত করবে পুলিশ, কিন্তু টাকা ফেরত চাই। মমতা কিন্তু টাকা ফেরত চাইতে যাওয়ার জন্য প্রত্যক্ষ ভাবে সাধারণ মানুষকে নির্দেশ দেননি। তিনি টাকা ফেরত দেওয়ার কথা বলেছিলেন কাউন্সিলারদের!

পাখি উড়ে যেতে পারে অন্য খাঁচায়

টিভির পর্দায় ভাসছে জনপ্রতিনিধিদের মুখ। তাঁদের কেউ কেউ ঘরে-বাইরে বিপদে পড়ে টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য খাতা-কলম নিয়ে বসছেন। কার কত টাকা খেয়েছেন, তা জনে জনে জিজ্ঞাসা করছেন। সঙ্গে বলতে ছাড়ছেন না বিজেপির চক্রান্তের কথাও।

বিজেপির মদতে কিছু মানুষ তাঁদের এবং তৃণমূলের ভাবমূর্তিতে কালি লেপতে এ সব কাণ্ড ঘটাচ্ছেন বলে দাবি করছেন তাঁরা। তবে দলনেত্রীর নির্দেশ নিয়ে টুঁ শব্দটি করেননি। কারণ, সেটা ঘরেলু মামলা। সাধারণ মানুষ সেই ব্যাপারকেই রাস্তায় নামিয়ে নিয়ে আসছেন। মমতা বলেছিলেন, দুর্নীতি দমনে রাজ্য বিশেষ পরিকাঠামো গড়ছে। ফলে কেউ রেহাই পাবেন না। অভিযোগ উঠলে তদন্তের মুখোমুখি হতে হবে।

এখনও পর্যন্ত খবর, হলদিয়া, রতুয়া এবং রিষড়ার তিন দাপুটে নেতাকে গ্রেফতার করা হয়েছে দুর্নীতিতে জড়িত থাকার অভিয়োগে। অর্থাৎ, মমতা যে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, সেটাও চলছে। কিন্তু জলের কল এনে দেওয়ার জন্য ৪০ হাজার টাকা দেওয়া সাইথিঁয়া পুরসভার মানুষের মতো কেউ কেউ ধৈর্য্য ধরতে পারছেন না। কারণ, পাখি উড়ে যেতে পারে। অন্য খাঁচার দরজা হাট করে খোলা। পাখি যদি এক বার উড়ে সেই খাঁচায় ঢুকে পড়ে আবার পাঁচটা বছর।

চন্দননগর পুরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডে এমন পোস্টার পড়েছে। মেয়াদ শেষ হওয়ায় বোর্ড ভেঙে দিয়ে প্রশাসক বসিয়েছে রাজ্য সরকার। সেই কারণে চন্দননগর পুরসভায় এখন কোনো কাউন্সিলর নেই। সবাই প্রাক্তন।

টাকা ফেরত দিলেই সাত ‘খুন’ মাফ

টাকা ফেরত দিলে কী হবে? যে লোকগুলো সরকারি পরিষেবা পাওয়ার জন্য জনপ্রতিনিধির পকেটে টাকা গুঁজে দিয়েছিলেন, পরের ভোটেও একই জায়গায় দেখতে চাইবেন তাঁদের? যে কোনো রাজনৈতিক দলের কাছেই ভোটের নাম বাবাজি। ফলে ঠেলায় পড়ে অনেক রকমের স্লোগান ওঠে। মমতা অবশ্য বলেছেন, দুর্নীতির দায় থেকে বাঁচতে অন্য দলে ভিড়লেও রেহাই পাবেন না। কিন্তু দুর্নীতিতে অভিযুক্তকে তিনি কি ফের টিকিট দিতে চাইবেন?

বিকল্প মুখের অভাব নেই। কিন্তু তাঁর প্রতিও সেই বিশ্বাস অটুট থাকাটাও একটা বড়ো প্রশ্ন। রাস্তা-ঘাটে, চায়ের দোকানে লোকে বলছে, বড্ড দেরি করে ফেললেন মমতা। মাত্র আট বছরের সরকার। এরই মধ্যে কী ভাবে দলীয় নেতাদের দুর্নীতি এ ভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলল, সে খবর কেন আগাম নেননি তিনি? তেমনই কথা ক্যামেরার সামনে বলছেন বীরভূমের তৃণমূল সাংসদ শতাব্দী রায়ও। রীতিমতো পরামর্শ দিচ্ছেন শতাব্দী- “কাটমানি দিদির আরও আগেই বন্ধ করা উচিত ছিল”।

এখন দেখার, কাটমানি-হয়রানি থেকে নিস্তারে কোন উদ্ভাবনী শক্তি কাজে লাগান ‘দিদি’!

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here