jayanta mondal
জয়ন্ত মণ্ডল

চেনা ছবি বদলে দিতে শুধু সময়ই পর্যাপ্ত নয়, দরকার থাকে আনুষঙ্গিক উপকরণেরও।

গত ১৪ ফেব্রুয়ারি জম্মু-কাশ্মীরের পুলওয়ামায় আত্মঘাতী জঙ্গি হামলা এবং ৪০ সিআরপিএফ জওয়ানের মৃত্যুর হওয়ার ঘটনায় গোটা দেশ শোকে মুহ্যমান। শোকাতুর ভারতের মন ভুলতে বসেছিল নিত্যরাজনীতির চলতা-ফিরতা আলোচনা-সমালোচনা। কিন্তু বৃহত্তম গণতন্ত্রের দেশে সেটাও আর সম্ভব হচ্ছে কোথায়? যুদ্ধের পক্ষে-বিপক্ষে রাজনৈতিক চাপানউতোর সমানে জারি। একই সঙ্গে দেখা গেল, সীমান্তে যুদ্ধের হালকা আবেশের মাঝেই এনডিএ-র অন্দরে ‘যুদ্ধবিরতি’!

Narendra Modi
সারিবদ্ধ শহিদ জওয়ানের উদ্দেশে নরেন্দ্র মোদীর শেষশদ্ধা

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক বিশ্লেষক সংস্থা সিএলএসএ-র সমীক্ষায় উঠে এসেছে পুলওয়ামা হামলার পর পরই দেশের রাজনৈতিক চালচিত্রে তার প্রভাবের স্পষ্ট ব্যাখ্যা। সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, দেশের প্রত্যন্ত এলাকার মোবাইলে পুলওয়ামা হামলার পর দেশাত্মবোধক গান, ভিডিও এবং ছবির আদানপ্রদান অভাবনীয় ভাবে বেড়ে গিয়েছিল। সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমেই এই বিস্তার। তবে সেই অবস্থার সামান্য হলেও বদল ঘটতে চলেছে।

গত বৃহস্পতিবার পুলওয়ামা হামলার দিনই, উত্তরপ্রদেশে বিজেপি ছেড়ে কংগ্রেসে যোগ দেওয়ার নির্ধারিত সূচি ছিল প্রিয়ঙ্কা গান্ধীর উপস্থিতিতে। সে দিন সকালে স্থির হয়েছিল, সন্ধ্যা ৭টা আনুষ্ঠানিক ভাবে কংগ্রেসে যোগ দেবেন বিজেপির বিধায়ক অবতার সিং ভাদনা। কিন্তু পুলওয়ামা হামলার পর সাংবাদিকদেক মুখোমুখি হলেও অন্য কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন দূরে থাক, বক্তব্যও রাখেননি প্রিয়ঙ্কা। একই ভাবে দিল্লিতে রাহুল গান্ধীর নির্ধারিত সাংবাদিক বৈঠকও শেষ হয়ে যায় শহিদ জওয়ানদের উদ্দেশে শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের মাধ্যমে।

উলটো দিকে বিজেপিও দলীয় কর্মসূচি বাতিল করেছিল। তবে পর দিনই বেশ খুশি খুশি মুখেই বন্দে ভারত এক্সপ্রেসের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। আরও বেশ কয়েকটি সরকারি প্রকল্পের শিল্যাসাস করেছেন বিহারে। সেখান থেকে কংগ্রেসকে নাম ধরে কোনো আক্রমণ না করলেও তাঁর সরকার যে সন্ত্রাসবাদ দমনে এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্র পাকিস্তানকে সবক শেখাতে কতটা দড়, সে কথা তুলে ধরতে ভুলে যাননি।

Rajnath Singh
শহিদ জওয়ানের কফিন কাঁধে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী রাজনাথ সিং

বৃহস্পতি থেকে সপ্তাহ শেষ হয়ে হয়ে সোমবারই বিজেপি ক্রমশ লাটাইয়ের সুতো ছাড়তে শুরু করেছে। দলের সর্বভারতীয় সভাপতি অমিত শাহ সোমবার দৌড়োলেন মহারাষ্ট্রে, সেখানে ‘নাটুকে বিপ্লবী’ এনডিএ শরিক শিবসেনার সঙ্গে লোকসভার জোট ঘোষিত হল। আবার তামিলনাড়ুতেও এআইএডিএমকের সঙ্গে জোটের কথা ঘোষণা করলেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী পীযূষ গয়াল রাত ঘুরতেই। সেখানে ৩৯টার মধ্যে বিজেপি লড়তে চলেছে মাত্র ৫টি আসনে। তবে এ কথাও অস্বীকার করার নয়, সঙ্গে সমানে চলছে, পাকিস্তানকে সবক শেখানোর হুঁশিয়ারিও।

এটা নতুন কথা নয়, দল আর সরকারের মিক্সচার করে ফেলা কাম্য নয় ভারতের মতো গণতন্ত্রপ্রিয় দেশে। ফলে সরকার করছে সরকারের কাজ, আর দল এগোচ্ছে দলের মতোই। মাঝখানে পড়ে গত বৃহস্পতিবার প্রিয়জনদের হারানো ভারতবাসী এখনও সরব সোশ্যাল মিডিয়ায়। বৃহস্পতিবার দুপুর সাড়ে তিনটের আগের ভারতবাসী আর পুলওয়ামায় প্রিয়জনদের হারানো ভারতবাসীর মনের ফারাক রয়েই গিয়েছে। সে ক্ষত কোনো মতেই শুকানোর নয়। কিন্তু বিকল্প-মলম তো পড়ছেই। দিচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলি। সামনে যে লোকসভা ভোট!

Babul Supriya
শহিদ জওয়ানের মরদেহ কাঁধে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বাবুল সুপ্রিয়

বৃহস্পতিবার দুপুর সাড়ে তিনটের আগেও ভাবনা ছিল বহুবিধ। সাম্প্রতিক পাঁচ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির ভরাডুবি, উত্তরপ্রদেশে রাজীব-সনিয়া গান্ধী তনয়া প্রিয়ঙ্কার সক্রিয় রাজনীতিতে পা দিয়েই একের পর এক সাফল্য অথবা নিদেনপক্ষে মোদী সরকারের শেষ সংসদ অধিবেশনকে সামনে রেখে দেশজোড়া বিরোধী দলগুলির ক্রমবর্ধমান আস্ফালন। সংসদে যখন সাড়ে চার বছরে মোদী সরকারের ভালো কাজের খতিয়ান তুলে ধরার আপ্রাণ প্রয়াস, তখন দিল্লি জুড়ে একাধিক মঞ্চে বিরোধী দলগুলির পেশিশক্তির প্রদর্শন। কোথাও গণতন্ত্র হরণের অভিযোগ, কোথাও রাফালে দুর্নীতির অভিযোগ, নিশানায় সেই বিজেপিই! এমনটাই ছিল গত বুধবার দিল্লির ছবি।

এক ঝটকায় যা বদলে দিয়েছিল পুলওয়ামার নির্মম ঘটনা। একে একে শহিদের মরদেহ ফিরছে তাঁর বাড়িতে, সে দৃশ্য দেখে চোখের জলে আগল দেওয়া সম্ভব হয়নি। কিন্তু সপ্তাহ ঘুরতেই ‘অনাকাঙ্ক্ষিত’ জোট গড়ার ছবি দৃষ্টি ঘোরাচ্ছে অন্যত্র। এনডিএ শরিক হিসাবে সরকারে আসার বছর না ঘুরতেই শিবসেনা উঠতে-বসতে নাস্তানাবুদ করছে বিজেপিকে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছোয় যে সংসদে ভোটাভুটি থেকেও নিজেদের বিরত রেখেছে তারা। ক’ দিন আগে পর্যন্ত অযোধ্যা থেকে কানহাইয়া কুমার ইস্যুতে তারা তোপ দেগেছে বিজেপির বিরুদ্ধে।

গত ২৩ জানুয়ারি আসন্ন লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির সঙ্গে জোটের কোনো সম্ভাবনা নেই বলে জানিয়ে দিয়েছিলেন শিবসেনা নেতা সঞ্জয় রাউত। তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য, “বিজেপি শুধুমাত্র নিজের স্বার্থের কথা ভাবছে, তাই এ বার শিবসেনাও নিজের কথাই ভাববে”। ওই বক্তব্যের পর এক মাস সময়ও অতিক্রান্ত হল না!

তা হলে এমন কি হল, উপনির্বাচনে আলাদা প্রার্থী দেওয়ার পর লোকসভায় তারা বিজেপির সঙ্গে জোট বাঁধতে উদ্যত হল? মহারাষ্ট্রের ৪৮টি লোকসভা কেন্দ্রের মধ্যে বিজেপিকে ২৫টি ছেড়ে ২৩টিতে লড়তে রাজি হয়েছে শিবসেনা। অথচ আসন সংখ্যা নিয়ে নিমরাজি থাকলেও মাত্র একটি বাড়তি আসন এ বার জুটেছে শিবসেনার ভাগ্যে।

pulawama attack usa
হামলার পর পুলওয়ামার ঘটনাস্থল।

কী ভাবে পুরো ঘটনার মোড় ঘুরে গেল?  মোড় ঘুরিয়ে দিল কি পুলওয়ামা হামলা? দেশের সামনে এমন পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে, যা বিজেপির পক্ষেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব, এটাই কি বুঝল শিবসেনা?  না কি পুলওয়ামা হামলার পর বিজেপির প্রতি তাদের সমর্থন ফিরে আসার নেপথ্যে রয়েছে অন্য কোনো কারণ?

[ আরও পড়ুন: রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতায় ইয়েচুরি ও রাহুল, জল মাপছেন মমতা ]

তবে এ সব প্রশ্নের উত্তর না খুঁজলেও চলবে। কারণ, বিজেপি-শিবসেনার পুনর্মিলনে পেশাদার রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক প্রশান্ত কিশোরই যে ‘লিড রোল’ নিয়েছে, এখন সেটাই উপজীব্য হয়ে উঠেছে সংবাদ মাধ্যমে!

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here