মোদীর রত্নসভায় কোহিনুর শাহ, বাংলার বরাতে শুধুই গাজর

২০২১-এ বিধানসভার ফল দেখে মন্ত্রী বাড়ানোর কৌশল যে গাজর ঝোলানো, তা কিন্তু ধরে ফেলবে বঙ্গবাসী। ‍

0
amit shah
অমিত শাহ। প্রতীকী ছবি সৌজন্যে নিউজ নেশন।
debarun roy
দেবারুণ রায়

মোদী মন্ত্রিসভার নব কলেবরে প্রধানমন্ত্রীর চেয়েও বেশি আলো পেলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। পরাক্রমশালী হতে অমিতের তাঁর শুধু এই তকমাটিই বাকি ছিল। এ বার সর্বশক্তিমান হতে শুধু আর একটি পালক চাই শাহর মুকুটে। গুজরাতের গান্ধীনগরে  ফিরল কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের শ্রেষ্ঠীর শিরোপা।

প্রথম মন্ত্রিসভাতেই এই দ্বিতীয় গুরুত্বের পদটি পেয়েছিল গুজরাত, সর্দার বল্লভভাই পটেলের কল‍্যাণে। অত বড়ো ব‍্যক্তিত্বের মহিমায় মহিমান্বিত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদ হয়ে উঠেছিল প্রধানমন্ত্রীর পদের পরই দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ও ক্ষমতাশালী আসন। নর্থ ব্লকে সর্দার পটেলের এই হট সিটে বসার সুবাদেই আডবাণীকে বলা হত সর্দার, সেই দাপটের দৌলতেই তিনি উপপ্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। ৭২ বছর ধরেই সেই ধারা বহমান। এ বার নর্থ ব্লকের আসনটি অমিত শাহকে সরাসরি জুড়ে দিল সর্দার পটেল ও লালকৃষ্ণ আডবাণীর উজ্জ্বল অতীতের সঙ্গে। পটেলের প্রচ্ছায়া আডবাণীকে তৈরি করেছিল ‘লৌহ পুরুষ’ হিসেবে, আর গুজরাতে গৌরবে বহুবচন হতে পটেলীয় অলংকার-সহ থেকে ‘ছোটে সর্দার হলেন নরেন্দ্র দামোদরদাস মোদী। এ বার অনারেবল অমিত শাহর জন্য রইল এই দুই বিশেষণের বাইরে এক বিরল বিশেষ‍্য। মোদী ২০১৪-য় যা অর্জন করেছিলেন তাই-ই রইলেন ’১৯-এ।

আরও পড়ুন উনিশের বুকে আঠারোর বাংলায়, ফিনিশ নয়, ফিনিক্স হওয়ার সুবর্ণ সুযোগ মোদীর

রাজনাথ সিং মন্ত্রিসভার নাম্বার টু ছিলেন। তাই-ই রইলেন। শুধু মন্ত্রক বদলে গেল। স্বরাষ্ট্র থেকে প্রতিরক্ষায় এলেন। উত্তরণ না অবতরণ, কেউ জানতে চাইল না। তবুও বোঝানো হল, প্রতিরক্ষামন্ত্রীর পদ কি খেলো? এত বড়ো প্রতিরক্ষা বাহিনী, এত বড়ো দেশের এত দীর্ঘ সীমান্ত, সার্বভৌমত্ব রক্ষার দায়িত্ব যাঁর হাতে, তিনি যে বিরাট পদাধিকারী তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু জওহরলাল মন্ত্রিসভায় বল্লভভাই যে দ্বিতীয় স্থানে সে কি বলার দরকার হয়েছিল কখনও? সেই থেকেই তো সাউথ ব্লকের প্রথম ঘরের পরই নর্থ ব্লকের অন্তিম চেম্বারের কৌলীন‍্য !

রাজপথ পেরিয়ে রাইসিনা হিলসের ওপর ডাইনে বাঁয়ে চারটি ফটক পার হয়ে সোজাসুজি লৌহকপাটে ধাক্কা খাওয়ার আগেই বাঁ হাতে পিএমও। এই মুলুকের সর্বোচ্চ আসন ওখানেই। আর ওই বিশাল ব্লকের শেষে রাস্তার অপর পারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের মুখোমুখি ‌গেটটিই প্রতিরক্ষামন্ত্রীর চেম্বারের। প্রধানমন্ত্রীর দফতরের পাশাপাশি বিদেশমন্ত্রীর কক্ষ। আর তার পাশেই রক্ষামন্ত্রীর ঘর। সাউথ ব্লকের এই ক্রম কিন্তু গুরুত্বের সূত্র মেনে নয়। ও পারের নর্থ ব্লকেও তাই। একেবারে শেষে স্বরাষ্ট্র, তার পর ব‍্যাংকিং ও অন‍্যান‍্য এবং ও পারে পিএমও-র প্রায় মুখোমুখি অর্থমন্ত্রক। গুরুত্ব মোটেও সাজিয়ে রাখা নেই।

কিন্তু শুক্রবার, ৩১ মে, ২০১৯ রাষ্ট্রপতি ভবনের ফোরকোর্টের শপথ সমারোহে বোঝানো হল, রাজনাথই নাম্বার টু। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর পরেই রাষ্ট্রপতির সচিব তাঁকে ডাকলেন ক‍্যবিনেট মন্ত্রীদের তালিকার প্রথম হিসেবে। যার অর্থ রাজনাথই দ্বিতীয়। তার পর ডাক পেলেন অমিত। এবং নির্মলা সীতারামনকেও প্রথম ক’ জনার মধ্যেই ডাকা হল। দফতর বণ্টনে বেশ একটু চমক। প্রতিরক্ষার পালা শেষে লন্ডন স্কুল অফ ইকনমিক্সের নির্মলা এলেন অর্থে, অরুণ জেটলির নিরানব্বই আর পীযূষ গোয়েলের এক ভাগের ভাগীদারির পর। গুঞ্জন জোরদার ছিল, জেটলির জায়গা ভরাট করবেন গোয়েল। যাঁকে মোদীভক্ত মন্ত্রীর লিস্টে দু’ নম্বর ধরা হয়। স্মৃতির পরেই সত্তা তিনি। এবং ভবিষ্যৎ হলেন শাহ। এটাই মোটামুটি মোদীত্বের মোদ্দা কথা। অবশ্যই মোদীর রত্নসভার কোহিনুর অমিত। অন্য যে যতই স্নেহাস্পদ, প্রিয়ংবদা হন, বুকের কাছে লুকিয়ে রাখা তাসটি তাঁদের দেখান না। নিজের উচ্চতা অনুযায়ী সঙ্গত ভাবেই। একমাত্র ব‍্যতিক্রম তাঁর গুজরাতের নস্টালজিয়া, মন্ত্রিসভার বিশেষ পিকআপ, রাজ‍্যের ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ স্বরাষ্ট্র দফতরের শাহেনশাহ। তিনি সভাপতি হয়েছেন তাঁরই ইচ্ছায়। রাজ‍্য রাজনীতির পাঠশালা থেকে দিল্লির বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি, তাঁরই ক‍্যারিশমায়। এমন অমিতের সঙ্গেই শুধু অন্তরতর শলাপরামর্শ করে থাকেন। বাকি যে যেখানেই থাকুন, মস্তিষ্ক বা হৃদয়ে, তাঁরা শুধু জানতে পারেন মোদীর সিদ্ধান্ত। মনের নাগাল পান না।

মোদীর মুখ‍্যমন্ত্রিত্বের গোড়া থেকে জেটলি উপদেষ্টা। আইন আদালত থেকে নির্বাচন, কিংবা কেন্দ্রীয় দলের তলব, সবেতেই বন্ধুর হাত বাড়িয়ে অরুণ জেটলি। আর মাথার ওপর আডবাণী। এই ব‍্যবস্থাটিও ছিল আডবাণীর তৈরি। কিন্তু আজ পুরো চালচিত্র বদলে গিয়েছে। আডবাণীর হেনস্তা মেনে নিতে পারেননি সুষমার মতো বিরল কেউ। পছন্দের মন্ত্রকে বসে যোগ্যতা ও পরিশীলনের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেও, কুশলী ও সূক্ষ্ম রাজনৈতিক বিচার সত্ত্বেও হোঁচট খেয়েছেন। পিএমও-র পদাধিকারে তাঁর মন্ত্রকের স্বাতন্ত্র্য আহত হয়েছে। এ সব কারণে আগেই সরতে চেয়েছেন। অবশেষে শরীর ত়ার সহজ সমাধানের পথ করেছে।

জেটলি আর সুষমার মধ্যে অনেকটা অমিল। আডবাণী জেটলির ক্ষেত্রে ইস‍্যু হননি। টিকে থাকার সহজাত ক্ষমতা ও কর্পোরেট রাজনীতি এবং সংঘের পশ্চাদভূমি অনেকটাই জেটলির সহায়ক হয়েছে। মোদী যদিও এঁদের সঙ্গে নিয়েই চলতে চেয়েছেন অবশ্যই নিজস্ব স্টাইলে। কিন্তু জেটলির বেশি অসুস্থতা, বিদেশে যাওয়া ও ফিরে এসে কাজে যোগদানের মধ্যে গোয়েলকে নিয়ে আসা ও পরবর্তী ঘটনায় কিছু রক্তক্ষরণ তো অনিবার্যই ছিল‌। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেন জেটলি। দু’জন নেত্রী ও নেতাই শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে তিক্ততা চাননি। বিজয়ী ক‍্যাপটেনের ভুলও ধরেননি। এবং সরে আসার সিদ্ধান্তে অনমনীয় থেকেছেন। জেটলির বাড়ি গিয়ে তাঁকে মন্ত্রিত্বের বদলে অন্য দায়িত্ব দিয়ে নিরস্ত করতে চেয়েছেন। এমন একটা  দৃশ্যের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু তা ফলপ্রসূ হওয়ার নয়, জানতেন মোদী। ফলে এ বার নিজস্ব শৈলীতে সরকার ও দল চালানোর কাজ দ্রুত এগিয়ে নিতে আর সমস্যা নেই মোদী-শাহর। এবং সব দিক থেকে শাহর সাফল্যই দলে এখন সর্বোচ্চ শিখরে। উত্তর প্রদেশের পরিশীলিত রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচিত, প্রাক্তন সর্বভারতীয় সভাপতি, মুখ‍্যমন্ত্রী ও মন্ত্রিত্বের এবং নির্বাচনী সাফল্যের রেকর্ড নিয়েও রাজনাথ স্বরাষ্ট্র হাতে রাখতে পারলেন না। প্রতিরক্ষা গুরুত্বপূর্ণ দফতর হলেও স্বরাষ্ট্রের মতো রাজনৈতিক কৌলীন‍্য নেই। সর্বোপরি, প্রধানমন্ত্রী সব চেয়ে আস্থাভাজন মন্ত্রীকেই স্বরাষ্ট্রে রাখেন। সুতরাং মন্ত্রীর সংখ্যায় উত্তর প্রদেশ যেখানেই থাক, মূল মন্ত্রকের তালিকায় গুজরাত, মহারাষ্ট্র এবং রাজ‍্যসভার প্রতিনিধিত্ব প্রশ্নসূচক। স্বরাষ্ট্র, অর্থ, রেল, বিদেশ, তথ্য সম্প্রচার, শিল্প-বাণিজ্য, সার-রসায়ন, পেট্রোলিয়াম, ভারী শিল্প, মানবসম্পদ উন্নয়ন – এই সব মন্ত্রকই এ প্রশ্ন তুলছে।

বাংলাকে যথারীতি সঠিক প্রতিনিধিত্বের সুযোগ দেননি প্রধানমন্ত্রী। বাবুল সুপ্রিয় গত বারের মন্ত্রী। এবারও তাঁর পদমর্যাদা বাড়েনি। আলুওয়ালিয়া উপাধ্যক্ষ হতে পারেন। রায়গঞ্জের নতুন সাংসদ দেবশ্রী চৌধুরী মন্ত্রী হয়েছেন। কিন্তু বাংলার বরাতে জোটেনি কোনও পূর্ণ মন্ত্রক। এমনকি স্বাধীন দায়িত্বও। এতটা বৈষম্যেরফল কি মিষ্টি হয়?  বাংলা বিজেপিকে ১৮টি অভাবনীয় আসন দিয়েছে। বিজেপির পূর্বাপর কোনো অবতারই কস্মিনকালেও ২-এর বেশি লোকসভা আসন পায়নি। একক ভাবে তো কখনোই নয়। দুই পেয়েছে তৃণমূলের সঙ্গে বা মোর্চার সঙ্গে আঁতাঁতে। কেউ বলছেন, পরে ফের সংযোজন হবে। ২০২১-এ বিধানসভার ফল দেখে মন্ত্রী বাড়ানোর কৌশল যে গাজর ঝোলানো, তা কিন্তু ধরে ফেলবে বঙ্গবাসী।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here