মহারাষ্ট্রে শিব্রাম-রাজ: ফলাফল অভূতপূর্ব বলার পর মোদীর মুখে কুলুপ

0
fadnavis and amit
এক দিনের জন্য মুখ্যমন্ত্রী হয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হল দেবেন্দ্রকে, অমিতের চাল খাটল না।

দেবারুণ রায়

জীবদ্দশায় রামনাম নেওয়াটা নিশ্চয়ই অপছন্দ করতেন মুক্ত আরামের মানুষটা। তাই ওই বিচিত্র বানানে শিবরাম থেকে রামকে গুছিয়ে সরিয়েছিলেন। এত কাল পরে ভারতের রাজনীতি সেই লাইনেই রামবাণ মারল বিজেপিকে। ফডণবীস নিজের ঘাড়েই গোটা দায় নিয়ে প্রমাণ করলেন রাজনীতিতে ও ক্ষমতার ব্যাকরণে তিনি কতটা নবিশ। এবং তিনিই প্রমাণ করলেন শিবের শিবিরই পাওয়ারফুল। সৌজন্যে, মরাঠাসিংহ শরদরাও পওয়ার। তিনি ছাড়া বাকি কোনো সিংহই যে পাওয়ারফুল নয়, তা-ও প্রমাণ করল বিজেপির ‘অভূতপূর্ব’ মহারাষ্ট্র-বিজয় ও মহানায়কদের মহান মহিমা। অজিত যে জেতার যোগ্য নন মাঝরাতে মোবাইল বন্ধ করিয়েও তা মালুম হল না মহাচাণক্য অমিত পরাক্রমশালী শাহের। ‘বস’ কি তাঁর উপর পুরোপুরি নির্ভর করেছিলেন? না হলে এতটা ঝুঁকি নেওয়া অসম্ভব। যিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাথা এবং যিনি আসমুদ্রহিমাচলের ত্রাতা, গোয়েন্দা বিভাগের হোতা, তাঁদের কাছে আসল খবর ছিল না?

আর দেশপ্রেমের অগ্নিশিখা ভগৎ সিংয়ের পুণ্য নাম মলিন হল রাজ্যপাল কোশিয়ারির কোর্টে কাকভোরের কূটকচালিতে। তাঁর অতি উৎসাহে অথবা তাঁর ‘বস’ শাহের নির্দেশ পালনের তৎপরতায়। আর নেপথ্যে ঈশ্বরের ইচ্ছায় একক রায় রূপান্তরিত হয়ে হল মন্ত্রিসভার যৌথ দায়, এক লহমায়। এই প্রথম রাষ্ট্রপতি শাসন প্রত্যাহার করা হল মন্ত্রিসভার বৈঠক না ডেকে। বিজেপির পূর্বসুরি কংগ্রেস ৬০ বছরের সত্তায় রাষ্ট্রপতি শাসন চাপাতে গিয়ে এমন নিপাতনে সিদ্ধ পদক্ষেপে সংবিধানের আত্মাকে আহত করেছে। একই ভাবে রাষ্ট্রপতি শাসন প্রত্যাহার করার ক্ষেত্রে কংগ্রেসের পদাঙ্ক অনুসরণ করল বিজেপি। এই সূত্রেই কর্নাটকে, গোয়ায়, মণিপুরে ও আরও কোথাও মসনদমোহ বিজেপিকে বিপথের পথিক করেছে। কংগ্রেসের বিকল্প হতে গিয়ে সর্ব অর্থেই নকল করার বদলে, শর্টকাট বা মেড ইজির অপশনে শুধু ক্লিক করেছে। কিন্তু সুশাসনের বা কল্যাণ রাষ্ট্রের প্রশ্নে অন্য পথ ধরেছে।

আরও পড়ুন: রায়ে রাম, তবু বিধি বাম, রামরথ আর আডবাণীকে ঢেকে রাখলেন মোদী

স্বভাবতই জিজ্ঞাসা জাগে, কংগ্রেস-জমানার সব মরচে পড়া লোহাই কি বিজেপির পরশপাথরে সোনা হয়ে যাবে? রূপান্তরের এই তত্ত্ব খারিজ করেছে মহারাষ্ট্র, মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপে। অজিত পওয়ারের রূপান্তরও ধোপে টেকেনি। নীলবর্ণ শৃগালের রং রাতারাতি ধুয়ে গিয়ে আসল রূপ বেরিয়েছে। আর সব চেয়ে কম দিনের প্রধানমন্ত্রী যেমন বিজেপির ঝুলিতে, তেমনি সব চেয়ে কম দিনের মুখ্যমন্ত্রীদের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে বিজেপি, এনডিএ-র জিম্মায়। তালিকায় নবীনতম ফডণবীস। এর আগে ছিলেন বিহারের নীতীশ। আর সব চেয়ে কম দিন, মানে এক দিন বা কার্যত এক রাতের মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন উত্তরপ্রদেশের জগদম্বিকা পাল। তিনি পাশা পালটে বিজেপিতে। সুতরাং সব দিকেই গৌরবে বহুবচন বিজেপি। আপাতত কৌরবপক্ষ। মারাঠারা গর্বিত জাতি হিসেবে চিহ্নিত। সুতরাং উদ্ধব-সন্দেশ এ বার মোর্চার নয়া সমীকরণের পক্ষে।

কংগ্রেস অতীতে কখনও শিবসেনার সঙ্গে সুসম্পর্কে থাকলেও বাল ঠাকরের দল তখন স্বয়ম্ভর হয়নি। পুরসভায় ছিল তাদের পরাক্রম। বিধানসভাতেই তেমন গুনতি ছিল না, লোকসভা তো দূর অস্ত। বিজেপির জন্মের পরও মহারাষ্ট্রে তাদের দাদা ছিল শিবসেনা। সে জন্যই  মনোহর যোশী ও নারায়ণ রাণের সরকারে কনিষ্ঠ শরিক বিজেপি। কালক্রমে লোকসভায় স্পিকারপদ সব চাইতে বিশ্বস্ত শরিককে দিলেন বাজপেয়ী। এনডিএ র প্রথম পার্টনার। স্পিকারের আসনে বসে জোট সরকার সামলালেন মনোহর যোশী। তখন বালাসাহেবের সঙ্গে ডিল করতেন বাজপেয়ীর মানসপুত্র ও ঠাকরের স্নেহাস্পদ মারাঠি ব্রাহ্মণ মহাজন প্রমোদ। কোনো শরিকি সম্বাদে, তেমন প্রয়োজন হলে মাতোশ্রীতে যেতেন আডবাণী। কদাচিৎ বাজপেয়ী। বাপদাদার তেজারতি ছিল না ওঁদের রাজনীতি। বিচারধারা যা-ই হোক, নিজেদের হাতে গড়া দল ও সংগঠনকে তিলে তিলে তিলোত্তমা করার স্বপ্ন সফল করেছিলেন। শরিকদের সম্মান করার গণতান্ত্রিকতা ছিল। মমতার মতো, করুণানিধি, জয়ললিতার মতো, জর্জ ফার্নান্ডেজ, শরদ যাদব, নীতীশের মতো, নবীন বা ফারুকের মতো দামি শরিকদের এক ছাতার তলায় এনেছিলেন বিনয়ী, উদার, মর্যাদামণ্ডিত কুশলতায়। মমতা যখন বাংলার সব চেয়ে শক্তিশালী বিরোধী নেত্রী, বাজপেয়ী-আডবাণীর আহ্বানে সাড়া দিচ্ছেন, প্রকাশ্যে তুলে ধরতেন কংগ্রেস-বিজেপির রাজনৈতিক সংস্কৃতির তুলনা। যেখানে ১০ জনপথে জরুরি আলোচনার জন্য ছিল অনন্ত অপেক্ষা, সেখানে প্রধানমন্ত্রী পদমর্যাদার নেতা বাজপেয়ীর বাড়িতে অবারিত দ্বার। এবং বৈঠক শেষে গাড়িতে তুলে দিতে আসতেন অটল-আডবাণী কিংবা প্রমোদ-যশবন্ত। এই সমান্তরাল আচরণই বিজেপির পায়ের নীচে মাটি জুগিয়েছে অনেকটা। বাদবাকি রাজনীতি ও ব্যক্তিগত লাভালাভের সমীকরণ।

আরও পড়ুন: নোটবন্দির তৃতীয় বর্ষপূর্তি: মনে পড়ে কি ‘মোদী’ময় সেই ডাক?

এখন কিন্তু ওঁদের আহরিত মধুভাণ্ডে মৌমাছির ভিড়। যারা সুদিনে সুদ আর আসলের হিসেবে মগ্ন। এই হিসেবে ঔদার্য একেবারে বেমানান। এখানে কৌরব-কাল্ট…নাহি দিব সূচ্যগ্র মেদিনী। অযোধ্যার সে রাম বনবাসে। তাই মহারাষ্ট্রের জোট অনায়াসে ভেঙে যায়। ভাঙনের পদধ্বনি শোনা গিয়েছিল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের উষাকালে। মন্ত্রক বণ্টনের সময়ই সংকেত ছিল, বিজেপি একাই একশো। সুতরাং কোনো চাপ ছাপ ফেলবে না সরকার বা মূল দলের কাজে। বিহারে তো এক দফা ভেঙেই বেরিয়েছিলেন নীতীশ। ওড়িশার নবীন শুরু করলেন অন্য রাজনীতি। মান ও রাজ বাঁচানোর কৌশল। মমতা, ফারুক, করুণানিধিরা আগেই সরেছেন মোদী-মার্কা মেরুকরণের কল্যাণে। পরে ছিলেন চন্দ্রবাবুও। বিপাকে পড়ে যখন জলপাইগুচ্ছ দেখাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রীকে, তখন কাবেরীর তিরে বাঁশি বাজাচ্ছেন জগনমোহন। বাঁশির সুর না চন্দ্রবিন্দু কোন দিকে যাবেন মোদী, তা অনায়াসে আঁচ করা যায়।

এর পর কর্নাটক। যত না বিজেপির রমরমা, তার চেয়ে বেশি ইয়েদিউরাপ্পার ক্যারিশমা। ও দিকে কুমারের উঁকিঝুঁকি বাড়ছে। অজিত পওয়ারের মতো টোপ ঝোলানোই আছে কুমারস্বামীর সামনে। যদি তিনি টোপ গেলেন তবে ইয়েদির উলটোরথ চলবে। কুমার তো রাজ্যের স্বামীই ছিলেন। নতুন করে কুমারসম্ভব হবেন কী। তা হলে জাতে জয়ী ইয়েদিউরাপ্পার উলটোরথে কে বা কারা শরিক হবে ধরেই নেওয়া যায়। আরেকটা মুম্বই মার্কা মরুদ্যান হবে বেঙ্গালুরু।

শেষ প্রশ্নে নিজেকে আরও দগ্ধ করেছে বিদগ্ধ বিজেপি। বলা হচ্ছে, বিচারধারা বা মতাদর্শের ফারাক যেখানে আসমান জমিন, সেখানে শুধু সত্তার লোভে শিবসেনা-কংগ্রেস জোট বেঁধেছে। সনিয়ার পায়ে সমর্পিত শিবসেনার হিন্দুত্ব। উত্তরে শুধু একটি আয়নায় মুখ দেখতে বলাই যথেষ্ট। বিজেপির জন্মের আগে পরে এমন কাণ্ড ভুরিভুরি। ‘৬৭-তে বিহারে কমিউনিস্টদের সঙ্গে জনসংঘের হাত ধরাধরি, ‘৭৭-য়ের ইন্দিরা হঠাওয়ে এবং ‘৮৯-র রাজীব হঠাওয়ে ভিপি-কে মধ্যমণি করে রাম ও বামের পরোক্ষ মঞ্চ। আবার মন্দির-মুদ্রায় কংগ্রেসের হাতে হাত রেখে সেই সরকারকেই ফেলে দেওয়া কোনো তাৎক্ষণিক লাভের ইস্যুই ছাড়েনি বিজেপি। সংসদে মনমোহনের বাজেট থেকে কংগ্রেস-বিজেপি হাত ধরাধরি করে সংখ্যালঘু রাও সরকার চালানো। অর্থনৈতিক ইস্যুতে সেই থেকে আজও সংসদে সমঝোতা। এবং তীব্র মেরুকরণের জমানায় মোদী-শাহীর সিদ্ধান্তে বিজেপির মতেই জেহাদি ছোঁয়াচের দল মেহবুবার পিডিপির সঙ্গে কাশ্মীরের জোট সরকার। সর্বশক্তিমান কিন্তু মুখ খোলেননি।

মহারাষ্ট্রের নবিশ নেতা নীতিকথা শুনিয়েছেন শিবসেনাকে। কারণ বিজেপিরই তৈরি রামবাণে শিবসৈনিকরা বিদ্ধ করেছে বিজেপিকে। বলেছে, এনডিএর জন্ম হয়েছিল রাম, তালাক আর ৩৭০-কে শিকেয় তুলে রেখে। যেখানে যখন জোটে গিয়েছে বিজেপি, কোর ইস্যুগুলোকে জলাঞ্জলি দিয়ে। মমতা, মায়াবতী আর মেহবুবার পায়ে ওরা যুগে যুগে হিন্দুত্বকে বন্ধক রেখেছে। এমনকি মোদীত্বও মুলতবি ছিল কাশ্মীরের সরকারে। তা হলে কোন মুখে কার মায়ের বড়ো গলা?

আপাতত ভারতের কর্পোরেট ক্যাপিটালের ল্যাবে মুখবদলের মাতব্বর শিব-শিবির। কোর্টের রায়ে রামলালার মন্দির সুনিশ্চিত হলেও রাজসুখে কাঁটা। হয়তো মর্যাদার নামে অমর্যাদা সইল না রামের। হয়তো গুজরাতি মার্কেটিং এ যাত্রায় রুচল না কর্পোরেট কুবেরদের। তেনারা আছেন তাই চাণক্যের চহলপহল। এখনও তার বছরের বেশি বাকি দিল্লির ভোটের। সুতরাং সময় থাকতে ঋষিবেশী কর্পোরেট কহিলেন, “বৎস, পুনর্মুষিক ভব।” আপাতত আগে শিব পরে রাম। এই শিব্রাম মতে লুপ্ত না হলেও সুপ্ত থাকবে রাম। সত্যিই লা জবাব মোদী মহাশয়। মহারাষ্ট্রের ফলাফলকে অভূতপূর্ব আখ্যা দিয়েছিলেন। কেন, তা কি বোঝা যাচ্ছে?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.