করোনায় কেমন আছে রাজধানী দিল্লি

0

হরপ্রসাদ সেন

তৃতীয় দফার লকডাউন (lockdown) চলছে। চতুর্থ দফাও যে শুরু হতে চলেছে, তার ইঙ্গিত প্রধানমন্ত্রী দিয়ে দিয়েছেন। তবে তা কত দিনের তা এখনও ঘোষণা হয়নি। রাজধানীর পরিস্থিতি যা ভয়ংকর, তাতে দিল্লিবাসীও চায় এই লকডাউন আরও কিছু দিন চলুক, অন্যথা এই করোনা অতিমারি (coronavirus pandemic) নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে না কোনো ভাবেই।

অন্যান্য শহরের মতো রাজধানী শহর দিল্লিও মৌনব্রত অবলম্বন করে করোনা মোকাবিলা করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। চারিদিক স্তব্ধ। সর্বত্র যেমন, এখানেও আশ্চর্য নীরবতা। এই দীর্ঘ নীরবতা অতীতে কোনো দিনও হয়েছিল কি না, জানা নেই।

কেমন রয়েছে দিল্লি (delhi)? কেমন রয়েছে দিল্লিবাসী? এ সবের উত্তর এই মুহূর্তে কাউকে আলাদা করে খোঁজার দরকার নেই। যে শহরকে বিগত ৩৫ বছর ধরে দেখে আসছি, তার বর্তমান রূপ, রাজধানীবাসীর বর্তমান পরিস্থিতি খুব নিকট থেকে একবার দেখার ইচ্ছা। একমাত্র মিডিয়ার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরাই তাঁদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সমগ্র রাজধানীকে দেখার চেষ্টা করতে পারেন। আমাদের মতো সাধারণ মানুষদের পক্ষে সেটা একেবারেই সম্ভব নয়। এই নীরবতার রাজধানীকে তাই বাড়ির বারান্দা থেকেই দেখার চেষ্টা করি।

Shyamsundar

প্রাচীরের ও পারে সামনেই বড়ো রাস্তা। তার উপরেই অবস্থিত বিশাল মল, এখন সম্পূর্ণ শান্ত। কিছু দিন আগেও যেখানে নিরাপত্তারক্ষীরা লোকজন আর গাড়ি সামলাতে ব্যস্ত থাকত, এখন সেই কর্মহীন রক্ষীরা নিঝুম দুপুরে গাছতলায় বসে বসে ক্লান্ত হয়ে পড়ছে। রাস্তায় নেই কোনো হর্নের আওয়াজ, মাঝে মাঝে কানে আসছে পুলিশের হুটারের শব্দ। প্রাচীরের ও ধারে দাঁড়িয়ে উচ্চ স্বরে মনোযোগ আকর্ষণ করার নিষ্ফল চেষ্টা করছে কিছু দরিদ্র বেরোজগরে শ্রমিক আর ভবঘুরে। তারা অবশ্যই ভিখারি নয়, বর্তমান পরিস্থিতির শিকার। তাদের আকুল আবেদনে মন ব্যাকুল হয়ে উঠলেও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার উপায় আমাদের নেই। আমরা যে বন্দি। সেই হতভাগ্য মজদুরদের দৃষ্টি এড়াতে নিঃশব্দে ঘরের মধ্যে চুপিসারে ঢুকে পড়ি।

কেমন আছে দিল্লি? সে তো আমরা দূরদর্শনের চ্যানেলে দেখেই চলেছি। সমগ্র দিল্লিই লাল জোন। ঘিঞ্জি কলোনিগুলো স্তব্ধ হয়ে আছে। পুলিশ ব্যারিকেড করেই আছে। দেখতে পাচ্ছি হাজার হাজার মজদুরের দীর্ঘ পথ বেয়ে স্বভূমিতে ফেরার তাড়না। দেখতে পাচ্ছি তাদের যন্ত্রণা, পথে মৃত্যু বা দুর্ঘটনা।

এ সব সত্ত্বেও মনে হয় এই সময়টা স্বচক্ষে যদি এক বার দেখতে পেতাম। সুযোগ এসে গেল। অত্যন্ত জরুরি এক কাজে হঠাৎ একদিন অফিসে হাজিরা দিতে হল। আমার যাতায়াতের রাস্তার মধ্যে পড়ে দিল্লি বিমানবন্দরের টার্মিনাল ১, কিছু দূরে টার্মিনাল ২ ও ৩। বিমানবন্দর ছাড়িয়ে একটু গেলেই আট নম্বর জাতীয় সড়ক যা গুরুগ্রাম হয়ে চলে যাচ্ছে জয়পুর। তিন দিক থেকে আসা সড়ক এসে মিলেছে এই জাতীয় সড়কে। অন্য সময়ে এখানে ট্রাফিক জ্যাম ছাড়া আর কিছু ভাবা যায় না। এই সব প্রাণচঞ্চল প্রধান প্রধান সড়ক আজ একদম প্রাণহীন, নিশ্চল। একটা-দু’টো গাড়ি হুসহুস করে ছুটে চলেছে। দু’-এক জন সাইকেলচালকও অনেক দিন পর নিশ্চিন্তে গন্তব্যস্থানে পৌঁছোনোর চেষ্টা করছে। কী ভাবে আগের সেই অবস্থা ফিরে আসবে জানি না। মেট্রো বন্ধ, বাস বন্ধ, বন্ধ সব রকমের যানবাহন।

বন্ধ হাসপাতাল। দু’-একটা প্রাইভেট হাসপাতাল তাদের আউটডোর সেবা চালু রাখলেও দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও ডাক্তারবাবুর কাছে পৌঁছোনো অসম্ভব হয়ে পড়ছে। প্রয়োজনীয় নিত্যসামগ্রী যদিও কিছু মিলছে প্রয়োজনের তুলনায় তা অপ্রতুল। বড়ো বড়ো স্টোরগুলোতেও দীর্ঘ লাইন।

করোনার  ভয়ে মানুষই আরেক মানুষকে দেখে ভয় পাচ্ছে। দেশের সর্বত্র হয়তো এমনই চিত্র। রাজধানীবাসীর মনও এখন শঙ্কিত। এ ভাবেও তৈরি হচ্ছে এক অবিশ্বাস, আতংক বা ভয়। হয়তো এতে ঘৃণা নেই, কিন্তু আছে এক উদ্বেগ, মানসিক যন্ত্রণা। কাছে থেকেও পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ নেই। এক সহকর্মীর ছেলে সামান্য দূরে গুরুগ্রামে আজ প্রায় দু’ মাস সেই লকডাউনের শুরু থেকেই আটকে পড়ে আছে। আর এক সহকর্মী শোনাল তার অভিজ্ঞতার কথা। আই এন এ মার্কেটের সামনে এক মৃগী রোগী অচেতন হয়ে পড়ে গেলে কোনো লোক করোনার ভয়ে এগিয়েই গেল না তার কাছে। কোনো রকম বিচলিত না হয়ে কী ভাবে সে এগিয়ে গিয়ে মৃগীরোগীকে সুস্থ হতে সাহায্য করেছিল, শোনাল সে কথা।

সুব্রত পার্ক, বসন্ত বিহার, আর কে পুরমের রাস্তাগুলো বা তার চার পাশের সৌন্দর্য এত দিন চোখে পড়ত না। জাতীয় সড়কের দু’ দিক যে এত বর্ণময় হতে পারে তা দেখার সুযোগ আগে কোনো দিন হয়নি। বিশাল চওড়া রাস্তায় নিজের মতো হাঁটতে থাকো, দু’ দিকের সৌন্দর্য উপভোগ করো। এই সব সড়ক এখন দৃষ্টিনন্দন হলেও এর মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে বিষাদের ছায়া। মুনিরকার সদাব্যস্ত বাজার এখন শান্ত। অল্পস্বল্প লোকজন এখন ঘোরাঘুরি করছে। আনন্দে খেলে বেড়াচ্ছে ফ্লাইওভারের নীচে বসবাসকারী ছেলেমেয়েগুলো। কোথায় তাদের মাস্ক, কোথায় তাদের স্যানিটাইজার। জানেও না ওরা, কেন সব গাড়িঘোড়া বন্ধ।

রাজধানীর বিপর্যয় একটার পর একটা লেগেই আছে – সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা স্তিমিত হতেই আবির্ভাব হল এই করোনা অতিমারি। এ ছাড়া আছে ডেঙ্গু, গত কয়েক দিন ধরে আবার মাঝেমাঝেই কেঁপে উঠছে শহরটা আর সারা বছরের সাথি দূষণ তো আছেই, যা করোনার চেয়ে কোনো অংশে কম বিনাশকারী নয়।

আরও পড়ুন: করোনা-পরিস্থিতিতে একটি প্রাথমিক প্রস্তাবনা

দিল্লির চতুর্দিক দেখার সৌভাগ্য হল না। দেখা হল না ঘিঞ্জি কলোনির এক কামরা বা দু’ কামরার ঘরে এক রকম অন্ধকারের মধ্যে থাকা সেই সব মানুষজনকে। দেখা হয়নি মার্চ-এপ্রিলের ফুলে ভরতি পার্ক। রাস্তার ধারে লাল শিমূল ফুলের রূপ কিংবা হলুদ বর্ণের ‘আলতামাস’ রাস্তার দু’ দিক জুড়ে। তবে দেখতে পাচ্ছি আকাশভরা রাতের তারা আর অনুভব করছি নির্মল বাতাস যেটা রাজধানীবাসীরা কোনো দিন কল্পনা করেনি।

আশায় আছি মেট্রোর ঝনঝনানি, বাসের গোঙানি বা আকাশ ভেদকারী কয়েকশো বিমানের আওয়াজ শোনার। আবার দেখার আশায় আছি মানুষে পরিপূর্ণ রাস্তাঘাট, বাজার, স্টেশন, বাস আড্ডা। রাজধানীবাসীরা বড়ো আশায় আছে অন্যান্য শহরের সাথে সাথে তাদের শহরও করোনামুক্ত হবে, হবে বিপন্মুক্ত।

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন