Connect with us

প্রবন্ধ

সোমেন মিত্রের ‘অনুভব’, ব্যক্তিগত এবং রাজনৈতিক জীবনের অকপট স্বীকারোক্তির কয়েকটা পাতা

মাঝে কংগ্রেস ছেড়ে নিজের দল গঠন এবং তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দিলেও শেষ দিন পর্যন্ত তিনি কংগ্রেসের প্রদেশ সভাপতি।

Published

on

জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত গর্বিত কংগ্রেসি সোমেন মিত্র। ছবি: রাজীব বসু

অরুণাভ গুপ্ত, প্রবীণ সাংবাদিক

কোনো রাজনীতির নামগন্ধ নেই। কেন না কস্মিনকালেও হাতে-কলমে রাজনীতি করিনি। আমি, না আমার বাড়ির কেউ। সে ক্ষেত্রে ‘চ্যারিটি বিগিনস অ্যাট হোম’ আমার বেলায় খাটে না। ঘটনাপ্রবাহ বা কাকতালীয় যেটাই হোক না, আদ্যোপান্ত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব সমূহের সংস্পর্শে আসার সুযোগ ঘটে যায়। যেমন সোমেন মিত্র মিত্র মহাশয় – সকলের সোমেনদা, আমারও সোমেনদা।

শুরুর শুরু

একটা কথা পরিস্কার করে রাখি – কখনোই এমন দাবি করার দু:সাহস বা এলেম আমার নেই যে গলা ছেড়ে হাঁকব, সোমেনদার সঙ্গে আমার দারুণ হৃদ্যতা ছিল। বন্ধুদের সৌজন্যে পরিচয় ও আলাপ ঘটেছিল এবং ডাকাবুকো, স্পষ্ট বক্তা মানুষটার প্রতি শ্রদ্ধা-ভালোবসা জন্মেছিল। ১৯৬৩ সালে সেন্ট পলস কলেজে ঢোকা, অসংখ্য বন্ধু, অসংখ্য আড্ডা এবং পড়াশোনা। বন্ধুদের মধ্যে কিছু আবার প্রিয়বন্ধু থাকে। যেমন এদের মধ্যে অধীপ চট্টোপাধ্যায়, মিহিরকিরণ ভট্টাচার্য আরও অনেকে। কলেজ লাইফে অধীপ ওরফে বুবু আমহার্স্ট স্ট্রিটের ছেলে এবং সেন্ট পলস কলেজ লাগোয়া ওর বাড়ি। ফলে ওর বাড়িতেও যাতায়াত ছিল। অনেককে মাসিমা ডেকেছি, কিন্তু অধীপের মা ছিলেন সেরার সেরা মাসিমা। এ হেন অধীপের সৌজন্যে সোমেনদার সঙ্গে পরিচয় এবং তাঁর সম্পর্কে মোটামুটি ওয়াকিবহাল হওয়া এবং তিন বছর কলেজপড়ুয়া থাকাকালীন উপলব্ধি করা – সোমেন মিত্র শুধুমাত্র রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব নন, এলাকার প্রতিটা মানুষের কাছে অত্যন্ত প্রিয় ও আপনজন, এমন ভালোবাসা আদায় করার মতো বিশেষ বৈশিষ্ট্য ওঁর ছিল বলেই পরিচিতি সীমানা ছাড়িয়ে ব্যাপকতর হয়েছে। ছাত্রাবস্থায় এটা বুঝতে অসুবিধা হয়নি।

Loading videos...

কলেজ ইউনিভার্সিটির পাট চুকিয়ে যে যার মতো বন্ধুরা সেটেলড। বিশাল গ্যাপ- এর পর হঠাৎ একদিন মিহিরকিরণ ভট্টাচার্য এসে হাজির আমার অফিসে। ওর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল-ই। বলল, চল সোমেনদার ওখানে যাব। ‌‌

আকাশ থেকে পড়লাম, কেন?

বইমেলায় ‘পুনশ্চ’ সোমেনদার বই প্রকাশ করবে। তো?-

সোমেনদার ‘অনুভব’

বইমেলা ২০০১-এ প্রথম প্রকাশিত হয় সোমেনদার ‘অনুভব’। কংগ্রেস রাজনীতিতে সোমেন মিত্র (Somen Mitra) একটি বিতর্কিত চরিত্র। কখনও তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কংগ্রেস থেকে সরিয়েছেন, আবার কখনও অভিযোগ ওঠে, তিনি প্রতিক্রিয়াশীলদের দালাল আবার গোপনে বামপন্থীদের সঙ্গে যথেষ্ট আঁতাঁত রেখে চলেছেন। পাঠকদের মনে তাঁকে নিয়ে তৈরি হওয়া যাবতীয় প্রশ্নের উত্তর দিতে নিজেই হাতে কলম তুলে নিয়েছিলেন। ব্যক্তিগত এবং রাজনৈতিক জীবনের অকপট স্বীকারোক্তিতে ভরপুর সেই বইয়ের প্রতিটা পৃষ্ঠা।

‘অনুভব’-এর ভূমিকায় সোমেনদা লিখেছিলেন, “আমার বহুদিনের বন্ধু মিহিরকিরণ ভট্টাচার্য ও তাঁর সহযোগী অরুণাভ গুপ্ত এই বই লেখার ক্ষেত্রে অকৃপণ সহযোগিতা করেছেন”। আসলে সোমেনদা ভালো করেই জানতেন, তাঁকে নিয়ে সাধারণ মানুষের কৌতূহলের অন্ত ছিল না। সেই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর নিজের মুখে দিতেই কলম তুলে নিয়েছিলেন। আমরা যতটা সম্ভব তাঁকে সহযোগিতা করেছিলাম। মিহির আমাদের ছেড়ে গিয়েছে আগেই, এ বার চলে গেলেন সোমেনদা।

আরও পড়ুন: প্রয়াত প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি সোমেন মিত্র, বয়স হয়েছিল ৭৮ বছর

খোলা মনেই কলম চালিয়েছিলেন সোমেনদা। কোনো রকম রাখঢাক না করেই নিজের রাজনৈতিক জীবনের নানান ঘাত-প্রতিঘাতের কথা ব্যক্ত করেছিলেন। আনন্দ-যন্ত্রণার মোড়কে মোড়া। সবই লিখেছেন। বলেছেন, “এমনিতেই হাতে মাত্র চব্বিশ ঘণ্টা। কৃপণের মতো খরচ করতে হয়। তার উপর জাবর কেটে সময় অপচয় করার মতো মানসিকতা নেই। তবে মাঝেমধ্যে হিসেবি মন বেহিসেবি হতে চায়। কত আর শাসন করব, কিছুক্ষণের জন্য মন উড়ুক”।

রাজনীতির আকর্ষণ

সোমেন মিত্রের জন্ম ১৯৪৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর। এখনকার বাংলাদেশের যশোরের কলোরা গ্রামে। বাবা ধীরেন্দ্রনাথ মিত্র, মা মায়ারানি। দেশভাগের কবলে পড়ে কলকাতায় আগমন। সেন্ট পলস স্কুলের গণ্ডি ডিঙিয়ে সিটি কলেজে ভরতি হন। সেন্ট পলসে বন্ধুত্ব ভাস্কর সেনের সঙ্গে। তাঁর বাবা বীজেশ সেন ছিলেন কংগ্রেসের একজন নামকরা নেতা। তাঁর কাছেই সোমেনদার রাজনীতির হাতেখড়ি।

গোটা একটা অধ্যায়। ছবি: রাজীব বসু

তাঁর কথায়, “বীজেশ সেনই আমাকে রাজনৈতিক অঙ্গনে টেনে আনলেন।। তাঁর কাছেই আমার রাজনীতির হাতেখড়ি। অবশ্য কংগ্রেসের মত-আদর্শ এবং নীতিতে আমি বরাবরই অন্ধভক্ত ছিলাম। আমার বাড়ির প্রতিটি সদস্য কংগ্রেসে অনুরক্ত থাকায় আমি সেই ভাবাদর্শেই নিজেকে তৈরি করেছিলাম। আগুন বুকের নিভৃতে ধিকিধিক জ্বলছিল। আর ঠিক সেই মাহেন্দ্রক্ষণেই বীজেশ সেন মহাশয়ের উপস্থিতি আগুনে ঘি ঢেলে দিল। আমি দপ করে জ্বলে উঠলাম। শুরু হল আমার সক্রিয় রাজনীতি। তৈরি আগেই ছিলাম, এ বার ঘষামাজা শুরু হল”।

স্মৃতিকোঠায় সযত্নে রাখা একটি দিন

লম্বা রাজনৈতিক জীবনে ঘটনার ঘনঘটার শেষ নেই। প্রতিবাদ, আন্দোলন, মুষড়ে পড়া আবার উঠে দাঁড়ানো অথবা বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসা – ঘড়ির কাঁটার মতোই অবিরাম ঘুরে চলে সোমেনদার জীবনে। তবে নিজের জীবনের বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ দিন হিসাবে তিনি চিহ্নিত করেছিলেন ১৯৬৯ সালের ১৫ আগস্টকে। ওই দিনটিতে বরাবরের মতোই মহম্মদ আলি পার্কে সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। উপস্থিত ছিলেন সিদ্ধার্থশংকর রায়, বিজয়সিং নাহার প্রমুখ। সেই সভায় বিমাতৃসুলভ আচরণের প্রতিবাদ করায় গন্ডগোল বাঁধে। যা-ই হোক, সন্ধ্যায় সকলে বাড়ি ফিরে গেলেন। এলাকায় ফিরে কর্মীদের সঙ্গে গল্পগুজব করার সময় হঠাৎ দেখেন অদূরে খ্রিস্টান কমপাউন্ডে দাউদাউ করে আগুন জ্বলছে। পরপর বোমার আওয়াজ। গতিক ভালো নয় বুঝে যে যাঁর বাড়ি ফিরে গেলেন।

সোমেনদা লিখেছেন, “রাতে যথারীতি খেতে বসেছি সকলের সঙ্গে। এমন সময় এক ভ্যান পুলিশ দোরগড়ায় এসে উপস্থিত। কোলাপসিবল গেট ঝাঁকানি শুনতে পেলাম। শুনলাম পুলিশ পুরো বাড়ি ঘিরে ফেলেছে। আমার খোঁজ করছে।…সামনাসামনি হতেই কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়েই আমাকে সোজা ভ্যানে চালান করে দেওয়া হল”।

আরও পড়ুন: যৌবনের প্রতীক ছিলেন সোমেন মিত্র, লিখলেন অরুণাভ ঘোষ

সেই প্রথম কলকাতা পুলিশের দুঁদে অফিসার দেবী রায়কে দেখলেন সোমেনদা। তিনি জানালেন, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে খুনের অভিযোগ আছে। পর দিন আদালতে গিয়ে জানা গেল, ওই ১৫ আগস্ট রাতে স্ট্রিট কর্নার চলাকালীন সিপিআইয়ের বিজয় রায় খুন হয়েছেন। সেই দোষ বা অপরাধই সোমেনদা এবং অন্য অভিযুক্তদের ঘাড়ে এসে পড়েছে। ১৪ দিন জেল খাটতে হল। হেবিয়াস কর্পাস করে সোমেনদাকে ছাড়ালেন অজিত পাঁজা। জেল থেকে বেরিয়ে সামনে দেখলেন তখনকার প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি প্রতাপচন্দ্র চন্দ্র, প্রফুল্ল সেন প্রমুখ বিশিষ্ট কংগ্রেস নেতৃত্বকে। ফুলের তোড়া দিয়ে অভিনন্দনও জানানো হল।

এক গর্বিত কংগ্রেস কর্মী

১৯৬৯ সালেই শুরু নকশাল আন্দোলনের। সোমেনদার অনেক ঘনিষ্ঠ বন্ধুও নকশাল রাজনীতিতে সক্রিয় ভাবে জড়িত ছিলেন। রাজনৈতিক মতাদর্শগত ভাবে আকাশ-পাতাল ফারাক থাকলেও তাঁদের শ্রদ্ধা করতেন সোমেনদা। তবে একটা সামাজিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে সংঘাতও শুরু হয়ে যায়। এমন আবহে সিপিআই নেতার খুন হওয়ার ঘটনা নতুন মোড় নিয়ে এল। সোমেনদা বলেছিলেন, “নকশালরা সিপিআই নেতা বিজয় রায়কে খুন করেছে”। যা হোক জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর ডা. হারাধন সরকার পিঠ চাপড়ে বলেছিলেন, “সোমেন তুমি ভাগ্যবান”।

আর সোমেনদার কথায়, “সত্যি বলতে কি আমি এই প্রথম নিজেকে গর্বিত কংগ্রেস কর্মী বলে মনে করলাম”।

[সাংবাদিক সম্মেলনে সোমেন। পাশে অজিতকুমার পাঁজা। সংগৃহীত ছবি]

সেই গর্ব বজায় রইল জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। মাঝে কংগ্রেস ছেড়ে নিজের দল গঠন এবং তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দিলেও শেষ দিন পর্যন্ত তিনি কংগ্রেসের প্রদেশ সভাপতি। প্রথম জীবনে পাওয়া সেই অকৃত্রিম সম্মানের ধারাবাহিকতাকে সঙ্গী করেই বিদায় নিলেন সোমেনদা। এই অনুভূতিটাই বা কম কীসে?

ঋণস্বীকার: অনুভব/ সোমেন মিত্র/ পুনশ্চ

প্রবন্ধ

সামনে ভোট, বরাদ্দ-ব্যবসা তো জমবেই!

কেন্দ্রীয় বরাদ্দের তালিকায় এক নম্বরে পশ্চিমবঙ্গ! তা না হলে ভোটপ্রচারে এসে প্রধানমন্ত্রী রাজ্য সরকারের কাছে ‘হিসেব’ চাইবেন কী ভাবে?

Published

on

নরেন্দ্র মোদী এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি
Jayanta Mondal
জয়ন্ত মণ্ডল

গরিবের হয়ে গলা ফাটাচ্ছে সরকার! গরিবের ঘরে ঢুকে হাঁড়ির খবর নিচ্ছে সরকার! একের পর এক প্রকল্প-তহবিলের খবর দিচ্ছে সরকার! তা হলে কি ভোট এসে গেল?

করোনা-কোভিড করে চিৎকার চলুক, তারই মাঝে কড়া নেড়ে দিয়েছে ২০২১-এর বিধানসভা ভোট। সংবাদ মাধ্যমের ভাষায় ‘একুশের মহারণ’। মহারথীরা ময়দানে নেমে পড়েছেন। রঙ-বেরঙের পতাকা, সারি সারি মাথা আর সময়-সুযোগ পেলেই গরিবের জন্য দু’-চার কথা। এখন অবশ্য শুধু কথায় চিঁড়ে ভেজে না। ‘মাল’ খসাতে হয়। সেটা মোক্ষম বোঝেন প্রধানমন্ত্রী মোদী। বিজেপি-বিরোধী রাজ্য সরকার সাড়ে চার বছর কেন্দ্রীয় বঞ্চনার অভিযোগ তুলে আসবে, আর তার পর ভোটের মুখে কেন্দ্রের হাত উপুড়। কেন্দ্রীয় সরকারের সাম্প্রতিক একটি পরিসংখ্যান তো তেমনটাই বলছে।

১-এ পশ্চিমবঙ্গ!

করোনাভাইরাস মহামারি রুখতে ২০২০-র মার্চে দেশব্যাপী লকডাউন জারি করেছিল কেন্দ্র। ওই লকডাউন কার্যকর হওয়ার পর থেকে গ্রামোন্নয়নের জন্য কেন্দ্রীয় বরাদ্দের তালিকায় এক নম্বরে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ। গ্রামীণ পরিকাঠামো এবং কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্যে এই মেয়াদে কেন্দ্রীয় সরকার রাজ্য এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলিকে যে তহবিল বরাদ্দ করেছে, তা থেকে সব থেকে বেশি বরাদ্দ করা হয়েছে পশ্চিমবঙ্গের জন্য। ভালো কথা! কিন্তু করোনা প্রভাবিত রাজ্যগুলির মধ্যে সব থেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত রাজ্যগুলির তালিকায় পশ্চিমবঙ্গ তো প্রথম স্থানে নেই! তা হলে বরাদ্দের তালিকায় কেন পশ্চিমবঙ্গ?

Loading videos...

আবার এমনও নয়, দেশের অন্য রাজ্যগুলির তুলনায় সব থেকে পিছিয়ে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ। তা হলে কেন?

প্রথমত, বছর ঘুরলেই পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা ভোট। এবং দ্বিতীয় ও শেষ কারণ, সারা দেশ জুড়ে অশ্বমেধের ঘোড়া ছোটালেও এখনও রাজ্যটিতে ক্ষমতা কায়েম করতে পারেনি কেন্দ্রের শাসক দল। হিসেবটা কী করে এতটা সহজ হল?

কারণ, এই মেয়াদে রাজ্যগুলির জন্য কেন্দ্রীয় বরাদ্দের তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে বিহার। যেখানে অক্টোবর-নভেম্বর (২০২০)-এর বিধানসভা ভোট হয়ে গেল। ১০ নভেম্বর এগিয়ে যাওয়া আর পিছিয়ে থাকার টানটান উত্তেজনা শেষে কুর্সি দখলে রেখেছে বিজেপি এবং মিত্রশক্তি।

কে কত পেল?

গ্রামোন্নয়নমন্ত্রকের পরিসংখ্যান বলছে, মার্চ-নভেম্বর (২০২০) মেয়াদে সব মিলিয়ে ছ’টি প্রকল্পে ৪৯ হাজার ২৭০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। যেখান থেকে পশ্চিমবঙ্গের ভাগ্যে জুটেছে ৫ হাজার ৯২৬ কোটি টাকা। বিহারের জন্য বরাদ্দ ৫ হাজার ২৬৫ কোটি টাকা। এর পরে যথাক্রমে রয়েছে মধ্যপ্রদেশ (৪ হাজার ৯৭৪ কোটি), উত্তরপ্রদেশ (৪ হাজার ৬৩৬ কোটি) এবং ওড়িশা (৪ হাজার ৫৩৫ কোটি)।

বিহার ভোটের পাট চুকেছে। মধ্যপ্রদেশেও বিজেপি সরকারের ভাগ্য নির্ধারণে ২৫টি আসনে উপ-নির্বাচনে বিজেপি সরকারের স্থায়িত্ব মজবুত হয়েছে। অন্য রাজ্যগুলির বরাদ্দ-বণ্টনে ভৌগোলিক এবং রাজনৈতিক কারণও হেলাফেলার নয়। তবে এই বরাদ্দের তালিকায় একেবারে শেষ জায়গায় রয়েছে গোয়া। তাদের জন্য এই মেয়াদে বরাদ্দ হয়েছে মাত্র ২.১ কোটি টাকা। এখানেও যেমন কাজ করেছে জনসংখ্যার অঙ্ক।

খাতের পরিচয়

মূলত ছ’টি খাতেই এই তহবিল বরাদ্দ করেছে কেন্দ্রীয় সরকার। যেগুলির মধ্যে রয়েছে মহাত্মা গান্ধী ন্যাশনাল রুরাল এমপ্লয়মেন্ট গ্যারান্টি অ্যাসিস্ট্যান্টস (এমএনআরইজিএ), প্রধানমন্ত্রী গ্রাম সড়ক যোজনা (পিএমজিএসওয়াই), শ্যামা প্রসাদ মুখার্জি রুর্বন মিশন, ন্যাশনাল সোশ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স প্রোগ্রাম, ন্যাশনাল রুরাল লাইভলিহুড মিশন (এনআরএলএম) এবং প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা (পিএমএওয়াই)।

পশ্চিমবঙ্গের মতোই বছর ঘুরলেই ভোট অসমেও। পিএমজিএসওয়াই প্রকল্পে সেখানে বরাদ্দের পরিমাণ সব থেকে বেশি (১ হাজার ২৮৫ কোটি)। আবার পিএমএওয়াই প্রকল্পে সব থেকে বেশি বরাদ্দ পেয়েছে পশ্চিমবঙ্গ (৩ হাজার ৭৫১ কোটি)। ছিটেফোঁটা ব্যতিক্রম যে নেই, তাও নয়। ২০২১-এ বিধানসভা ভোট তামিলনাড়ুতেও। কিন্তু পিএমএওয়াই প্রকল্পে কোনো বরাদ্দ মেলেনি এই মেয়াদে। আবার গোয়া, গুজরাত, হরিয়ানা অথবা তেলঙ্গনাও এই প্রকল্পে কোনো তহবিল পায়নি।

অন্য দিকে ন্যাশনাল সোশ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স প্রোগ্রাম-এর অধীনে সব থেকে বেশি বরাদ্দ জুটেছে বিহারের ভাগ্যে। উত্তরপ্রদেশ পেয়েছে ১ হাজার ২১৮ কোটি, কিন্তু জনসংখ্যা অনেক কম হলেও বিহার পেয়েছে ১ হাজার ২৫০ কোটি টাকা। উত্তরপ্রদেশের পরে তৃতীয় স্থানেই পশ্চিমবঙ্গ (৬৫৩ কোটি)।

আরও যে ভাবে

ঘূর্ণিঝড়, বন্য, ভূমিধসে ক্ষতিগ্রস্ত পশ্চিমবঙ্গ-সহ ছয় রাজ্যের জন্য জাতীয় দুর্যোগ মোকাবিলা তহবিল থেকে মোট ৪ হাজার ৩৩২ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। ঘূর্ণিঝড় উম্পুনের ক্ষতিপূরণবাবদ পশ্চিমবঙ্গকে আরও ২ হাজার ৭০৭ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে ওই খাতে। ঘূর্ণিঝড় বিধ্বস্ত এলাকা পরিদর্শনে এসে ১ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। ফলে সব মিলিয়ে হল ৩ হাজার ৭০৭ কোটি টাকা। কিন্তু এটা কি যথেষ্ট?

রাজ্যের শাসক দল বলছে, মোটেই নয়। গত ১৩ নভেম্বর কেন্দ্রের তরফে এই ঘোষণার পর তৃণমূল সাংসদ সুখেন্দুশেখর রায় স্পষ্টতই জানিয়ে দেন, উম্পুন বিধ্বস্ত অঞ্চল পরিদর্শনে এসে প্রধানমন্ত্রী যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তার ধারেকাছে পৌঁছোয়নি এই বরাদ্দ। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেছিলেন, উম্পুনের তাণ্ডবে রাজ্যে ১ লক্ষ ২ হাজার ৪৪২ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।

বকেয়া এবং বঞ্চনা

লকডাউনের মধ্যেই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, কেন্দ্রের কাছে রাজ্যের ৫৩ হাজার কোটি টাকা পাওনা রয়েছে।

তৃণমূলের জাতীয় মুখপাত্র ডেরেক ও ব্রায়েন জানান, গত এক বছরে কেন্দ্রের সাহায্যে চলা প্রকল্পগুলিতে ৩৬ হাজার কোটি টাকা বকেয়া। রাজ্যের রাজস্ব আদায় বাবদ প্রাপ্য, খাদ্য ভরতুকি এবং জিএসটি বাবদ বকেয়ার তালিকাও দীর্ঘ। যা নিয়েই বঞ্চনার অভিযোগ তুলছে রাজ্য সরকার।

এ দিকে ভোট এসে গেল!

বিহারকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সহযোগিতার মাধ্যমে যে ভাবে বিহারের মানুষ করোনাকে এড়িয়ে ভোট দিয়েছেন (বিজেপিকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে এনেছেন), তাতে তাঁদের ধন্যবাদই প্রাপ্য। পশ্চিমবঙ্গেও ভোট আসছে। মনে হয় না করোনা এখনই ‘টাটা বাইবাই’ করবে। তারই মধ্যে ভোটপ্রচারে নেমে পড়েছে শাসক-বিরোধী সকলেই। বরাদ্দ-ব্যবসাও সমানে চলবে। তা না হলে বাংলায় ভোটপ্রচারে এসে প্রধানমন্ত্রী রাজ্য সরকারের কাছে ‘হিসেব’ চাইবেন কী ভাবে?

আরও পড়তে পারেন: শহর ছেড়ে তুমি কি চলে যেতে পারো তিন ভুবনের পারে

Continue Reading

প্রবন্ধ

সৌমিত্র, কবে যে চলে এলে গৃহস্থের রান্নাঘর থেকে বৈঠকখানা হয়ে শীতের ছাদে আলোচনায়

সবাই চাইছিল, তুমি এক টানে সব খুলে বেরিয়ে আসবে, যেমন করে টান দিয়েছিলে হীরকরাজার মূর্তিতে। কিন্তু না, সব মায়া কাটিয়ে চলে গেলে তুমি।

Published

on

পাপিয়া মিত্র

ক্লাসের প্রথম হওয়া ছাত্রীটিকে ঘিরে সহপাঠীদের জটলা। কী হল… তার পরে… বল বল। মানে ওই যে দেবদাস যখন গাছের তলায় শুয়ে রয়েছে আর ওই যে পাতাগুলো, মানে গায়ে কাঁটা দিচ্ছে… পাশ থেকে একজন বলল, ঝুরঝুর করে। হ‍্যাঁরে, গাছতলায় শুয়ে রয়েছে পারুর দেবদা। উফ্ জাস্ট ভাবতে পারছি না। হয়তো অষ্টম শ্রেণি। ও দেখে ফেলেছে আর…।

অনেকেই শুরু করে দিয়েছে শরৎচন্দ্র পড়তে। যাদের উপায় আছে তারা লুকিয়ে পড়ছে আর যাদের সেটুকু নেই তাদের থেকে জেনে নেওয়ার জন্য স্কুল কামাই নেই।

Loading videos...
‘দেবদাস’।

সাধারণ প্রেক্ষাগৃহে রমরমিয়ে চলছে দেবদাস। সৌমিত্র-উত্তম অভিনীত। সুপ্রিয়া-সুমিত্রা অভিনীত। কেমন হল রে? কেউ বলছে, আহা উত্তমের কী গাওয়া – শাওন রাতে যদি…। তখন পাড়ার জলসা থেকে মঞ্চের অনুষ্ঠানেও। আর প্রেমে ব‍্যর্থ হওয়া ছেলের দল তো চিহ্নিত হয়ে গিয়েছিল, মদ খাই সব ভুলতে। কী নিরহঙ্কার সরল প্রেমে আপ্লুত দুই যুবক-যুবতী, যেন আমার আপনার ঘরের দেওর ননদটি। সেই কিশোরীবেলার প্রেমিকটিকে অজান্তেই নিজের করে নেওয়া। নানা হলের সিনেমার বিজ্ঞাপন দেখা খবরের কাগজে, সেটাও খানিক লুকিয়েচুরিয়ে।

একটা বুদ্ধিদীপ্ত, ছিপছিপে, লম্বা, মাথাভর্তি চুল আর সব আভিজাত‍্য এসে শেষ হয়েছে খোদাই করা নাসিকায়। এমন এক নায়কের কী কী সিনেমা চলছে, কোন কোন হলে, কান খাড়া থাকত বাড়ির বড়োদের কথায়। সেটা তো মোবাইলের যুগ নয় যে গুগল আন্টিকে জিজ্ঞেস করে নেওয়া যাবে। জানার ইচ্ছে, দেখার তাগিদ, শোনার আগ্রহ, খবর পেলেই হল, বই খাতা নোটস আনার অছিলায় গল্প গিলে আসা।

‘তিন ভুবনের পারে’।

আসলে সব সংসার তখন খুব একটা স্বাধীনচেতা ছিল না। সৌমিত্র চট্টোপধ‍্যায়ের বই দেখার থেকে গৃহস্থ বেশি পছন্দ করত উত্তমকুমারের সিনেমা দেখতে। কিন্তু এ-ও ঠিক কলেজ-ইউনিভার্সিটির ছাত্রছাত্রী আর এক শ্রেণির মানুষের কাছে সৌমিত্র হয়ে উঠেছিলেন এক আদর্শ নাগরিক।

কিন্তু রোগের কাছে কেন হারিয়ে গেল খিদদার ‘ফাইট কোনি, ফাইট’ চিৎকার? কেন বসন্তবিলাপের শ‍্যামের আগুন লাগার উত্তপ্ত গান নিভে গেল? ওই তো যেন শোনা যাচ্ছে চারুবৌঠানকে নিয়ে গাইছে ‘আমি চিনিগো চিনি তোমারে’। ওই তো দেখছি, উদ্ধত সন্দীপ দাঁড়িয়ে আছে বিমলার কাছে। ময়ূরবাহন আর সাড়া দেবে না। তোমার ঘোড়া যে ছটফট করছিল ঝিন্দের পাহাড়িপথে তোমাকে নিয়ে ঘুরবে বলে। তোমার কাজল, তোমার মুকুল, তোমার ক‍্যাপটেন স্পার্ক, তোমার পোস্ত, তোমার তোপসে আর তোমার ফেলুদার কাহিনি লেখার অপেক্ষায় ছিলেন লালমোহনবাবু কিন্তু তুমি চলে গেলে। তোমার মাথার কাছে শ্বাস ফেলছিল হীরকরাজা। তুমি তো তাকে ছেড়ে দাওনি।

‘চারুলতা’।

‘তিন ভুবনের পারে’, ‘জীবন সৈকতে’, ‘স্ত্রী’, ‘প্রথম কদম ফুল’, ‘পরিণীতা’, ‘বাঘিনী’, ‘বাক্স বদল’, ‘মাল‍্যদান’, ‘মণিহার’-সহ অনেক ছবি একে একে গৃহস্থের রান্নাঘর থেকে বৈঠকখানা হয়ে শীতের ছাদে আলোচনায় চলে এল। কোথাও মনকাড়া গান, কোথাও টানটান গল্প। কোথাও তুমি অধ‍্যাপক, কোথাও তুমি গাড়ির ড্রাইভার। কোথাও তুমি বেকার ইঞ্জিনিয়ার, কোথাও তুমি ডাক্তার। গৃহস্থের কাছে তুমি বোকা বোকা হাসির নায়ক হলেও তোমাকে কেউ কোনো দিন গাছের ডালপালা ধরে নাচতে দেখেনি। এখানেই তোমার চরিত্রের বিশেষত্ব। তোমার বুদ্ধিদীপ্ত মুখের অভিব‍্যক্তি সামনে এনে দিল অন্য ধরনের চলচ্চিত্র। ভেঙে মুচকে দিল ‘অশনি সংকেত’, ‘গণদেবতা’, ‘গণশত্রু’, ‘অরণ‍্যের দিনরাত্রি’, ‘শাখাপ্রশাখা’, ‘হুইল চেয়ার’, ‘মহাপৃথিবী’, ‘একটি জীবন’, ‘আবার অরণ্যে’, ‘পাতালঘর’, ‘সংসার সীমান্তে’র মতো কিছু উদাহরণ। গৃহস্থের অন্য নায়কের সঙ্গে তুলনা টানায় ছেদ পড়ল। তুলনাহীন ফেলুদাকে চিনতে শুরু করে দিল ‘সোনার কেল্লা’ আর ‘জয়বাবা ফেলুনাথ’ দিয়ে। প্রদোষ মিত্র, তুমি অবশেষে চির ঘুমের দেশে চলে গেলে।

তোমাকে দেখে শিখতে হয়েছে নিজের জন্য জায়গা রাখা। তুমি বুঝতে শিখিয়েছ পূর্ণ সংসার করেও একা থাকার দরকার, অন্তত নিজেকে বিশ্রাম দেওয়ার জন্য। শব্দহীন চোরা স্রোতে ভেসে ওঠে ফেলে আসা প্রেমবেলা। ‘বেলাশেষে’ দেখে অনেকেই ভেবেছে এ-ও হয়। হয়তো হতে পারে ভেবে অনেকের কপালে ভাঁজ পড়েছে। কেননা সেখানে জীবনের প্রান্তে এসে স্ত্রীর কাছ থেকে আলাদা হয়ে যাওয়ার বাসনা। এক ছেলে চার কন‍্যা নাতি-নাতনির ভরা সংসারে অনাবিল আনন্দের পাশাপাশি পেয়েছি ‘পোস্ত’কে। যেখানে একা দাদুঠাকুমা থাকতে চাইছে পোস্তকে নিয়ে।

তুমি যত এগিয়ে এসেছ, তুমি ততটাই গৃহস্থের ঘরের বাবা, জেঠু, শ্বশুর, দাদু, ঠাকুরদা হয়ে উঠেছ। এই করোনা-আবহে এখনকার প্রযুক্তির দৌলতে তোমার কত সিনেমা দেখেছি জান? তোমার ফিরে আসার পথের বাঁকে নন্দিনীরা অপেক্ষা করছিল। তুমি ফিরলে না।

‘জয় বাবা ফেলুনাথ’।

তোমার প্রতিদিন পড়ার অভ্যাস যে গীতবিতান, তার পাতা উড়ছে হেমন্তের মৃদু হাওয়ায়। তোমার সঞ্চয়িতা অপেক্ষা করছিল কোন কবিতা আবার রেলগাড়ির কামরায় আবৃত্তি করতে করতে যাবে। সকলের আকুল প্রার্থনা ছিল, উঠে পড় উদয়ন পণ্ডিত। তুমি যে মুক্তির স্বাদ দিয়েছিলে পাঠশালার ছেলেদের। ওরা তোমার জন্য বই খুলে বসেছিল। সবাই চাইছিল, তুমি এক টানে সব খুলে বেরিয়ে আসবে, যেমন করে টান দিয়েছিলে হীরকরাজার মূর্তিতে। কিন্তু না, সব মায়া কাটিয়ে চলে গেলে তুমি।

খবরঅনলাইনে আরও পড়ুন

প্রয়াত সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, থামল ৪০ দিনের ‘ফাইট’!

Continue Reading

প্রবন্ধ

পরমাণু চুক্তি, মনমোহন সরকারের উপর থেকে বামেদের সমর্থন প্রত্যাহার এবং জো বাইডেন

২০০৮ সালে মার্কিন সেনেটের মার্কিন-ভারত অসামরিক পরমাণু চুক্তির অনুমোদনের পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন জো বাইডেন!

Published

on

২০১৩-য় ভারত সফরে বাইডেন। ফাইল ছবি
Jayanta Mondal
জয়ন্ত মণ্ডল

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হোক বা বিহারের বিধানসভা ভোট, অন্তর্জালের বিশ্বে সব কিছু নিয়েই আগ্রহ তুঙ্গে! তবে আমেরিকার সদ্য প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত জো বাইডেনকে (Joe Biden) নিয়ে বাঙালির মাত্রাহীন উৎসাহে (অথবা আদিখ্যেতায়) আবার চোখ টাটাচ্ছে একাংশের। ব্যঙ্গ করে কেউ তাঁকে বলছেন ‘যতীন বৈদ্য’, কেউ আবার নাম দিয়েছেন ‘জয় ব্যানার্জি’। কিন্তু ভারতের সঙ্গে মার্কিন রাজনীতির তুখোড় ব্যক্তিত্ব বাইডেনের সম্পর্কও খুব একটা খাটো নয়।

১৯৭৩ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত সেনেটর ছিলেন বাইডেন। তার পর থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেছেন দেশের ৪৭তম ভাইস-প্রেসিডেন্টের। অর্থাৎ, ভুঁইফোঁড় রাজনীতিক তিনি নন। তার উপর সেনেটর থাকাকালীন তিনি ছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক সম্পর্ক কমিটির চেয়ারম্যান। এই সময়ে মার্কিন-ভারত আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ এবং সিদ্ধান্তের অংশীদার বাইডেন। বিশেষত, ২০০৮ সালে মার্কিন-ভারত অসামারিক পরমাণু চুক্তির প্রসঙ্গ না টানলেই নয়!

সেনেটের বৈদেশিক সম্পর্ক কমিটির চেয়ারম্যান হিসাবে বাইডেন ২০০৮ সালে মার্কিন সেনেটে মার্কিন-ভারত অসামরিক পরমাণু চুক্তি (US-India Civil Nuclear Agreement) অনুমোদনের পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন এবং সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় বেশ কয়েকটি আইন প্রণয়নের ব্যাপারেও তিনি ছিলেন প্রথম সারির প্রবক্তা।

Loading videos...

ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন এই পরমাণু চুক্তি সম্পাদনের জন্য তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ (George W. Bush) এবং ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের (Manmohan Singh) অধীনে আলোচনা শুরু করেছিল, তখন সেনেটে বাইডেন ছিলেন ভারতের পক্ষে সমালোচক।

২০০৮-এর প্রথম দিকে মার্কিন কংগ্রেস ভারতের সঙ্গে এই চুক্তি অনুমোদনের আগে বাইডেন আরও দুই সেনেটর চক হেগেল এবং জন কেরির সঙ্গে ভারত সফরে এসেছিলেন। বাইডেন ছিলেন এই চুক্তির ধারাবাহিক প্রবক্তা এবং অবশ্যই এটির সাফল্যের নেপথ্যেও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।

একই সঙ্গে তৎকালীন ভারতীয় রাজনীতিতে রীতিমতো ঝড় তুলেছিল এই ভারত-মার্কিন পরমাণু চুক্তি। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছোয় যেন, কেন্দ্রের সরকার হুড়মুড়িয়ে পড়ে যায়। ২০০৪ সালের লোকসভা ভোটে ক্ষমতায় আসে ইউপিএ। ন্যূনতম অভিন্ন কর্মসূচি নিয়ে বামপন্থীদের সমর্থনে প্রধানমন্ত্রী হন ডা. মনমোহন সিং। কিন্তু বছর চারেক নরমে-গরমে কাটলেও আমেরিকার সঙ্গে পরমাণু চুক্তিকে কেন্দ্র করে ‘বিদ্রোহ’ ঘোষণা করে বামপন্থী দলগুলি। চুক্তি থেকে পিছু না হঠলে তাঁরা সরকার থেকে সমর্থন তুলে নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন।

রাজ্য, শহর-গ্রামে বামপন্থীরা ভারত-মার্কিন পরমাণু চুক্তির কুফল তুলে ধরে ব্যাপক প্রচারে নামেন। কিন্তু কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকার নিজের অবস্থানে অনড়। এর পর ২০০৮ সালের ৯ জুলাই, চার বাম নেতা প্রকাশ কারাত, এবি বর্ধন, দেবব্রত বিশ্বাস এবং চন্দ্রচূড়নের স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিবৃতিতে ভারত-মার্কিন পরমাণু চুক্তি সম্পাদনের প্রতিবাদে ইউপিএ সরকার থেকে সমর্থন প্রত্যাহারের কথা ঘোষণা করা হয়।

তা হলে কি সরকার পড়ে গেল? না! সে যাত্রায় সরকার শুধু টিকে গেল তেমনটা নয়, ২০০৯ সালে ফের লোকসভা ভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে প্রধানমন্ত্রী হলেন মনমোহন। আর পশ্চিমবঙ্গের মতো আঁতুড়ঘরে ক্ষয় শুরু হল বামপন্থীদের। ২০০৯-এর সেমিফাইনালে গুটিয়ে অর্ধেক হয়ে যাওয়া বামফ্রন্ট ২০১১-র বিধানসভায় রাইটার্স বিল্ডিং থেকেই ‘ভ্যানিশ’!

হয়তো একেই বলে, ধান ভানতে শিবের গীত! তবে ভারত-আমেরিকা কূটনৈতিক সম্পর্কে বাইডেনের ভূমিকা মোটেই ফেলনার নয়। আন্তর্জাতিক মহলে ভারতের আকাঙ্ক্ষার ঘোর সমর্থক বাইডেন। এশিয়ার সমস্ত বড়ো অর্থনীতির দেশগুলিকে নিয়ে নতুন একটি কাঠামো গড়ে তোলার আহ্বান আগেই জানিয়েছিলেন বাইডেন। যেখানে ভারতের জন্যও নির্দিষ্ট আসনের দাবি ছিল তাঁর।

ভাইস-প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ২০১৩ সালের ২২ জুলাই আবার এক বার ভারত সফরে আসেন স্ত্রী জিল বাইডেনকে নিয়ে। চার দিনের ওই সফরে একাধিক কর্মসূচিতে যোগ দেন। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়, উপ-রাষ্ট্রপতি হামিদ আনসারির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। দিল্লিতে গান্ধী স্মৃতি মিউজিয়াম ঘুরে দেখেন। শুধু তা-ই নয়, মুম্বইয়ে দেশের প্রতিষ্ঠিত শিল্পপতিদের সঙ্গে একটি গোলটেবিল বৈঠকে যোগ দেন। উল্লেখযোগ্য ভাবে, বম্বে স্টক এক্সচেঞ্জের একটি অনুষ্ঠানে সে বার তিনি ভাষণও দেন।

আমেরিকার ডেমোক্র্যাট এবং রিপাবলিকান – উভয়ের সঙ্গেই সুসম্পর্ক বজায় রাখার নজির রয়েছে ভারতীয় রাষ্ট্রনেতাদের। রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের (Donald Trump) সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর (Narendra Modi) গভীর বন্ধুত্ব প্রায়শই আলোচনায় জায়গা করে নিয়েছে। তবে বাইডেনের সঙ্গেও প্রধানমন্ত্রীর সম্পর্ক মোটের উপর মন্দ নয়।

২০১৪ সালে আমেরিকা সফরে গেলে মোদীর জন্য মধাহ্নভোজনের আয়োজন করেন বাইডেন। বছর দুয়েক বাদে ফের সফরে মার্কিন কংগ্রেসের যৌথ অধিবেশনে ভাষণ দেন মোদী, নেতৃত্ব দেন বাইডেন। আসলে ওবামা-বাইডেন প্রশাসনের হাত ধরে ভারতের সঙ্গে মার্কিন সম্পর্ক মসৃণ পথে এগিয়ে যাওয়ার যে অভীপ্সা, সেটাই ট্রাম্পের লম্বা ছায়ার নীচেই লালিত-পালিত হচ্ছে বাইডেনকে আঁকড়ে ধরে।

নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণার আগে থেকেই শোনা যাচ্ছিল, বাইডেন হোয়াইট হাউসের দখল নেওয়ার পর এইচ-১বি সহ সমস্ত উচ্চ দক্ষতাযুক্ত ভিসায় রাষ্ট্র অনুমোদনের সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনা নিতে চলেছেন। আবার এমনটাও শোনা গিয়েছে, অন্তত পাঁচ লক্ষ প্রবাসী ভারতীয়কে স্থায়ী ভাবে মার্কিন নাগরিকত্ব দিতে পারেন নতুন প্রেসিডেন্ট বাইডেন। ভারতের জন্য সুখকর হতে পারে এমনই কিছু খবর উড়ে বেড়াচ্ছে। তবে বাপু, না আঁচালে বিশ্বাস নেই!

আরও পড়তে পারেন: ‘এক সঙ্গে কাজের অপেক্ষায়’, জো বাইডেনকে অভিনন্দন জানিয়ে বললেন নরেন্দ্র মোদী

Continue Reading
Advertisement
দেশ27 mins ago

দিল্লি এবং আরও ৩ রাজ্য থেকে মহারাষ্ট্রে ঢুকতে গেলে লাগবে কোভিড নেগেটিভ রিপোর্ট

Donald Trump
বিদেশ47 mins ago

‘যা করতে হয় করুন’, পরাজয় প্রায় স্বীকারই করে ফেললেন ডোনাল্ড ট্রাম্প

মালদা7 hours ago

মালদহের মানিকচকে ভেসেল উলটে ৮টি ট্রাক পড়ল গঙ্গায়, বেশ কিছু মানুষ নিখোঁজ

ফুটবল8 hours ago

পেনাল্টি কাজে লাগিয়ে প্রথম ম্যাচে ৩ পয়েন্ট ঘরে তুলল হায়দরাবাদ

রাজ্য12 hours ago

রাজ্যের নতুন সংক্রমণ নেমে এল সাড়ে তিন হাজারের ঘরে, কমল দৈনিক মৃত্যুও

বন্ধন ব্যাঙ্ক
শিল্প-বাণিজ্য12 hours ago

এবার কলকাতা মেট্রোর স্মার্ট কার্ডে থাকবে বন্ধন ব্যাঙ্কের লোগো

বিদেশ15 hours ago

যুদ্ধ বাধাতে পারেন ‘দুর্বল’ জো বাইডেন, আশঙ্কা করছে চিন

দেশ15 hours ago

অসমের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তরুণ গগৈ প্রয়াত

দেশ24 hours ago

কোভিড আপডেট: নতুন করে আক্রান্ত ৪৪০৫৯, সুস্থ ৪১০২৪

শিক্ষা ও কেরিয়ার3 days ago

কোন রাজ্য ফের স্কুল খুলেছে, কোথায় এখনও বন্ধ? জেনে নিন বিস্তারিত

ভ্রমণ কথা2 days ago

রূপসী বাংলার সন্ধানে ১/ অবাক করল তাজপুর

বিনোদন2 days ago

রবিবারের পড়া: শহর ছেড়ে তুমি কি চলে যেতে পারো তিন ভুবনের পারে

ফুটবল3 days ago

প্রথম বিদেশি হিসেবে আইএসএলে অনন্য রেকর্ড করলেন সবুজ মেরুনের তিরি

শরীরস্বাস্থ্য3 days ago

কেন খাবেন কামরাঙা? ১৩টি কারণ জেনে নিন

ঘরদোর3 days ago

ওয়াশিং মেশিন ব্যবহারের আগে ৫টি জরুরি তথ্য, যা আপনার অবশ্যই জানা উচিত

বিনোদন3 days ago

সন্ত্রাসবাদ থেকে শিশুদের উদ্ধার করতে শরণার্থী শিবিরে সঞ্জয় দত্ত, দেখুন ‘তোরবাজ’-এর ট্রেলার

কেনাকাটা

কেনাকাটা3 days ago

লিভিংরুমকে নতুন করে দেবে এই দ্রব্যগুলি

খবর অনলাইন ডেস্ক: ঘরের একঘেয়েমি কাটাতে ও সৌন্দর্য বাড়াতে ডিজাইনার আলোর জুড়ি মেলা ভার। অ্যামাজন থেকে তেমনই কয়েকটি হাল ফ্যাশনের...

কেনাকাটা6 days ago

কয়েকটি প্রয়োজনীয় জিনিস, দাম একদম নাগালের মধ্যে

খবর অনলাইন ডেস্ক: কাজের সময় হাতের কাছে এই জিনিসগুলি থাকলে অনেক খাটুনি কমে যায়। কাজও অনেক কম সময়ের মধ্যে করে...

কেনাকাটা3 weeks ago

দীপাবলি-ভাইফোঁটাতে উপহার কী দেবেন? দেখতে পারেন এই নতুন আইটেমগুলি

খবর অনলাইন ডেস্ক : সামনেই কালীপুজো, ভাইফোঁটা। প্রিয় জন বা ভাইবোনকে উপহার দিতে হবে। কিন্তু কী দেবেন তা ভেবে পাচ্ছেন...

কেনাকাটা4 weeks ago

দীপাবলিতে ঘর সাজাতে লাইট কিনবেন? রইল ১০টি নতুন কালেকশন

খবরঅনলাইন ডেস্ক: আসছে আলোর উৎসব। কালীপুজো। প্রত্যেকেই নিজের বাড়িকে সুন্দর করে সাজায় নানান রকমের আলো দিয়ে। চাহিদার কথা মাথায় রেখে...

কেনাকাটা2 months ago

মেয়েদের কুর্তার নতুন কালেকশন, দাম ২৯৯ থেকে শুরু

খবর অনলাইন ডেস্ক: পুজো উপলক্ষ্যে নতুন নতুন কুর্তির কালেকশন রয়েছে অ্যামাজনে। দাম মোটামুটি নাগালের মধ্যে। তেমনই কয়েকটি রইল এখানে। প্রতিবেদন...

কেনাকাটা2 months ago

‘এরশা’-র আরও ১০টি শাড়ি, পুজো কালেকশন

খবর অনলাইন ডেস্ক : সামনেই পুজো আর পুজোর জন্য নতুন নতুন শাড়ির সম্ভার নিয়ে হাজর রয়েছে এরশা। এরসার শাড়ি পাওয়া...

কেনাকাটা2 months ago

‘এরশা’-র পুজো কালেকশনের ১০টি সেরা শাড়ি

খবর অনলাইন ডেস্ক : পুজো কালেকশনে হ্যান্ডলুম শাড়ির সম্ভার রয়েছে ‘এরশা’-র। রইল তাদের বেশ কয়েকটি শাড়ির কালেকশন অ্যামাজন থেকে। প্রতিবেদন...

কেনাকাটা2 months ago

পুজো কালেকশনের ৮টি ব্যাগ, দাম ২১৯ টাকা থেকে শুরু

খবর অনলাইন ডেস্ক : এই বছরের পুজো মানে শুধুই পুজো নয়। এ হল নিউ নর্মাল পুজো। অর্থাৎ খালি আনন্দ করলে...

কেনাকাটা2 months ago

পছন্দসই নতুন ধরনের গয়নার কালেকশন, দাম ১৪৯ টাকা থেকে শুরু

খবর অনলাইন ডেস্ক : পুজোর সময় পোশাকের সঙ্গে মানানসই গয়না পরতে কার না মন চায়। তার জন্য নতুন গয়না কেনার...

কেনাকাটা2 months ago

নতুন কালেকশনের ১০টি জুতো, ১৯৯ টাকা থেকে শুরু

খবর অনলাইন ডেস্ক : পুজো এসে গিয়েছে। কেনাকাটি করে ফেলার এটিই সঠিক সময়। সে জামা হোক বা জুতো। তাই দেরি...

নজরে