কেজরিওয়ালের প্রত্যাবর্তন! শুধু দিল্লিবাসীর পক্ষে স্বস্তিদায়ক নয়, আপামর ভারতবাসীর পক্ষে অত্যন্ত শক্তিদায়ক

0

গৌতম রায়

দিল্লি বিধানসভার নির্বাচনে আম আদমি পার্টি (আপ)-র ক্ষমতায় ফিরে আসাটা ছিল শুধু সময়ের অপেক্ষা। কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন বিজেপি যে কোনো অবস্থাতেই দিল্লি বিধানসভা দখল করতে পারবে না, এই সহজ সত্যটা সব ধরনের সমীক্ষাতেই ভোটের আগে উঠে এসেছিল। তবুও দলটার নাম বিজেপি। দলটা একক ঘনিষ্ঠতা নিয়ে কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন রয়েছে। দিল্লি দেশের রাজধানী। সেখানকার পুলিশ দিল্লির সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন নয়। নিয়ন্ত্রণাধীন কেন্দ্রীয় সরকারের।

তাই সাধারণ মানুষের ভেতর একটা প্রশ্নচিহ্ন নয়, আশঙ্কা ছিল। এই আশঙ্কাটি তীব্র হয়ে উঠছিল, যখন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার প্রায় ২৪ ঘন্টা পরও কত শতাংশ ভোট পড়েছে, তার হিসেব সঠিক ভাবে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে উঠে আসছিল না, তা দেখে। সমস্ত জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে, দিল্লির মানুষ যে বিভাজনের রাজনীতির বিরুদ্ধে মত দিয়েছেন, ভারতীয় পরম্পরার বহুত্ববাদী সংস্কৃতির প্রতি তাঁদের আস্থা জ্ঞাপন করেছেন, মধ্যকালীন ভারতের সমন্বয়ী চেতনার প্রতি তাঁদের সমর্থন জ্ঞাপন করেছেন, এটা শুধু দিল্লিবাসীর পক্ষে স্বস্তিদায়ক খবর নয়, আপামর ভারতবাসীর পক্ষে অত্যন্ত শক্তিদায়ক খবর।

বিজেপি একক ভাবে ক্ষমতায় আসার পর প্রথম পর্বের শাসনকালে চিরন্তন ভারতবর্ষকে ভেঙে, একটি রাজনৈতিক হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা অভিমুখী ভারতবর্ষ প্রস্তুতের জন্য যতখানি আগ্রাসী ছিল, তার থেকে সহস্রগুণ আগ্রাসী হয়েছে দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় এসে। আরএসএস যাবতীয় গোপন কর্মসূচিগুলিকে প্রকাশ্যে নিয়েছে । সেই কর্মসূচিগুলি তাদের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপি নিয়ন্ত্রণাধীন কেন্দ্রীয় সরকারের মাধ্যমে সফল করার লক্ষ্যে গোটা হিন্দুত্ববাদী শক্তি এখন দেশের রাষ্ট্রযন্ত্রকে সরাসরি ব্যবহার করছে।

এই লক্ষ্যে নরেন্দ্র মোদী সরকারের প্রথম দফায় ক্ষমতায় থাকাকালীন তাৎক্ষণিক তিন তালাক বিল সম্পর্কে সুপ্রিম কোর্টের আদেশকে কার্যত বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে, মুসলমান সমাজের ভেতরে বিভাজনের প্রক্রিয়াকে তীব্র করে, নিজেরা প্রগতিশীল সাজার একটি অভিনয় তারা করেছিল।

দ্বিতীয় দফা ক্ষমতায় আসার পর সংবিধানের ৩৭০ ধারা ও ৩৫-এর এ ধারার অবলুপ্তি, নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন, জাতীয় নাগরিকপঞ্জী প্রণয়নের প্রচেষ্টা ইত্যাদির ভেতর দিয়ে ভারতবর্ষকে সরাসরি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শক্তির কায়দায় , সরাসরি বিভাজিত করে, শাসনকার্য পরিচালনা করার উপক্রম করেছে তারা। ধর্মের নামে, জাতপাতের নামে ,ভাষা- লিঙ্গ- সংস্কৃতি- খাদ্যাভ্যাস- পোশাক, প্রতিটি বিষয়কে কেন্দ্র করে মানুষে মানুষে বিভাজন তৈরি করে, মানুষে মানুষে বিভেদ তৈরি করে, অর্থনীতি- রাজনীতি- সমাজনীতির সাধারণ ,স্বাভাবিক, আঙ্গিক থেকে মানুষের দৃষ্টিতে ঘুরিয়ে দিতে চেয়েছে রাজনৈতিক হিন্দু সম্প্রদায়িকরা।

এই প্রেক্ষিতে দাঁড়িয়ে দিল্লির নির্বাচন শুধু সেখানকার মানুষদের ক্ষেত্রেই নয়, গোটা ভারতবর্ষের আগামী দিনের রাজনীতির গতি-প্রকৃতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে ও একটি নির্ণায়ক ধারা হিসেবে উঠে এসেছে। জনপ্রিয় রাজনীতির পাশাপাশি, রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে স্বচ্ছতা বজায় রেখে, আপাত ভাবে একটি দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন উপহার দিয়ে, অরবিন্দ কেজরিওয়াল সাম্প্রতিক ভারতের সংসদীয় রাজনীতির ক্ষেত্রে যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, সেই দৃষ্টান্ত বামপন্থীরা পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরায় ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর একমাত্র রাজ্য কেরলে আছে ।

রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তীসগঢ়- যে রাজ্যগুলিতে কংগ্রেস বা অন্যান্য দলগুলি আবার ক্ষমতায় ফিরে এসেছে ,সেই রাজ্য সরকারগুলি সততার প্রশ্নে কতখানি উত্তীর্ণ, তা বলার মতো সময় কিন্তু এখনো আসেনি ।এইরকম একটি পরিস্থিতিতে, নিছক জনমোহিনী কিছু সিদ্ধান্তই নয়, ঘাড়ের উপর নিঃশ্বাস ফেলতে থাকা বিজেপির সঙ্গে সেয়ানে-সেয়ানে টক্কর দিয়ে, নিজেদের জয়কে যে ভাবে আপ ধরে রাখতে পেরেছে, তা নিঃসন্দেহে শিক্ষণীয় বিষয়।

এখানে কিন্তু উঠে আসে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল সরকারের কথা। সেই সরকার নানা ধরনের জনমোহিনী সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করেন ,কিন্তু সেইসব সিদ্ধান্তগুলি কেবলমাত্র নীল-সাদা রং, আর নীল-সাদা টুনি বাল্বের সাপের মতো ফেনিল মধ্যেই আবদ্ধ থাকে।

১০ বছর ক্ষমতায় থাকার পরও, অরবিন্দ কেজরিওয়াল বা তাঁর ঘনিষ্ঠতম মন্ত্রিসভার সহকর্মী, কিংবা ভূমি স্তরের রাজনৈতিক কর্মী – কারো সম্বন্ধে নারদা-সারদার মতো ভয়ঙ্কর রকমের আর্থিক দুর্নীতি আমরা দেখতে পাই না। বামপন্থী রাজনীতির পরিমণ্ডলের বাইরে বুর্জোয়া রাজনীতির অভ্যন্তরে থেকেও এ বিষয়ে অরবিন্দ কেজরিওয়াল যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পেরেছেন ,সেটা কেবল দিল্লির প্রেক্ষিতেই নয়, গোটা ভারতবর্ষের প্রেক্ষিতে ,স্বাধীনতার পরবর্তী কালের সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে একটি অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য বিষয়।

বামপন্থীরা ছাড়া সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে অরবিন্দ কেজরিওয়ালের মতো আর্থিক প্রশ্নে স্বচ্ছতার মুখে দাঁড়িয়ে, পরপর তিনবার দিল্লির মতো একটি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী আসন অধিকার করা ,আদৌ তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করার মতো কোনো বিষয় নয় । গোটা দেশে সাম্প্রদায়িক বিজেপির বিরুদ্ধে, প্রকৃত ধর্ম নিরপেক্ষ একটি বিকল্প , যেখানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িকতা ও ভাষাভিত্তিক সাম্প্রদায়িকদের ছদ্মবেশী অবস্থান থাকবে না, সেই রকম একটি প্রেক্ষিত তৈরি করবার ক্ষেত্রে, অরবিন্দ কেজরিওয়ালকে নিয়ে নতুন ভাবে চিন্তাভাবনা করা বামপন্থী এবং কংগ্রেসের কাছে একটি জরুরি রাজনৈতিক কর্তব্য হিসেবে উঠে আসছে ।

বিজেপি বিরোধী রাজনীতিকে সংহত করার ক্ষেত্রে, অরবিন্দ কেজরিওয়াল যে ভূমিকা পালন করেছেন দিল্লি বিধানসভার সদ্যসমাপ্ত নির্বাচনে, তাকে উপেক্ষা করা রাজনৈতিক ভাবে কংগ্রেস বা বামপন্থীদের কাছে আদৌ বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। রাজনৈতিক হিন্দু সাম্প্রদায়িক শক্তি বিজেপিকে প্রতিহত করার জন্য, শ্রেণি প্রশ্নকে আপাত ভাবে অতিক্রম করে, বামপন্থীদের পক্ষে যদি কংগ্রেসের সঙ্গে রাজনৈতিক সংগ্রাম করা এবং নির্বাচনী সংগ্রাম করা সম্ভবপর হয় ,তা হলে অরবিন্দ কেজরিওয়ালের সঙ্গে বিজেপিকে প্রতিহত করার প্রশ্নে, রাজনৈতিক বোঝাপড়া কেন সম্ভবপর হবে না ?

আরও পড়ুন দিল্লির রায় লাইভ

বিজেপি বিরোধী রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি করার প্রশ্নে অরবিন্দ কেজরিওয়ালের মতো গ্রহণযোগ্য নেতাকে ঘিরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো রাজনীতিক, নবীন পট্টনায়কের মতো রাজনীতি, চন্দ্রবাবু নাইডুর মতো রাজনীতিক, যাঁরা বিজেপি বিরোধিতার নাম করে বিজেপিকে সুবিধে করে দেওয়ার জন্য সব রকম ভাবে তৎপর, তাঁরা যেন কোনো অবস্থাতেই, কোনো রকম সুবিধা করে উঠতে না পারে, কেজরিওয়ালকে ব্যবহার করতে না পারে, এটা দেখাও কিন্তু বামপন্থী এবং কংগ্রেসের রাজনৈতিক দায়িত্বের একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবেই এখন উঠে আসছে।

* লেখক ইতিহাসবিদ। মতামত লেখকের নিজস্ব

------------------------------------------------
সুস্থ, নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার স্বার্থে খবর অনলাইনের পাশে থাকুন।সাবস্ক্রাইব করুন।
সুস্থ, নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার স্বার্থে খবর অনলাইনের পাশে থাকুন।সাবস্ক্রাইব করুন।
সুস্থ, নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার স্বার্থে খবর অনলাইনের পাশে থাকুন।সাবস্ক্রাইব করুন।
সুস্থ, নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার স্বার্থে খবর অনলাইনের পাশে থাকুন।সাবস্ক্রাইব করুন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.