বিজেপির ছিপে ‘মাছ’ উঠছে, তবে জল বড্ড বেশি ঘুলিয়ে যাচ্ছে

প্রতীকী ছবি
Jayanta Mondal
জয়ন্ত মণ্ডল

লোকসভা ভোট শুরু হওয়ার আগে থেকেই দলবদলের হিড়িক অব্যাহত বাংলায়। ছিপে ‘মাছ’ তোলার মূল কারিগর এখন বিজেপি। ভোটের নির্ঘণ্ট প্রকাশ হতেই দিল্লি গিয়ে বিজেপিতে নাম লিখিয়েছেন রাজ্য-রাজনীতির রাঘববোয়ালরা। তবে ভোট মিটে যাওয়ার পর বিজেপির শেষ তিনটি জমকালো ‘দলবদল’ ঘিরে প্রশ্নের অবকাশ থেকেই গিয়েছে।

জেলায় জেলায়, ব্লকে ব্লকে স্থানীয় বিজেপি নেতৃত্বের উপস্থিতিতে বিজেপি শিবিরে নাম লেখানোর খবরও এখন ঢাউস আকারে প্রকাশিত হচ্ছে। তবে দিল্লি অথবা কলকাতায় বিজেপি কার্যালয়ে শেষ তিনটি বড়োসড়ো দলবদলকে তিরবিদ্ধ করেছে বিতর্ক।

প্রথমত, দিল্লিতে গিয়ে বিজেপিতে নাম লেখান বীরভূমের লাভপুরের তৃণমূল বিধায়ক মনিরুল ইসলাম। উপস্থিত ছিলেন দলের কেন্দ্রীয় নেতা কৈলাস বিজয়বর্গীয় এবং রাজ্য বিজেপির ‘তুবড়ি’ নেতা মুকুল রায়। সেটা ছিল ২৯ মে-র ঘটনা। কিন্তু পদ্মপতাকা হাতে তুলে নেওয়ার দিন তিনেকের মাথাতেই প্রস্থানের কথা জানান মনিরুল। মাঝের দিনগুলিতে তাঁকে নিয়ে উত্তাল রাজ্য বিজেপির নিচু তলার কর্মী-সমর্থকদের ফেসবুক। সোশ্যাল মিডিয়ার সেই আঁচ এড়িয়ে মুকুলবাবু দাবি করেছিলেন, বীরভূমে শাসক দলের সঙ্গে লড়তে মনিরুলের মতো নেতাকেই প্রয়োজন।

আগল দেওয়া যায়নি এমন মন্তব্যে। উঠে আসে বীরভূমের স্থানীয় নেতৃত্বের গণইস্তফার হুমকি। পিছু হঠলেন মুকুল, পিছু হঠলেন গোটা পদ্মশিবিরের কর্তারা। সরগরম রাজনীতিতে ঘর পুড়ে ছাই হওয়ার আগেই ঘটে গেল মনিরুল-বিদায়। আড়ালে-আবডালে শোনা যায়, বিজেপির শুভাকাঙ্ক্ষী বেশ কিছু হিন্দু সংগঠনের মনিরুলে চরম অ্যালার্জির কথাও।

এর পরই চলে আসেন ‘বেদের মেয়ে জ্যোৎস্না’। সদ্য বিজেপিতে নাম লিখিয়েছেন অঞ্জু ঘোষ। বিজেপি রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষের কথা যিনি ‘আসল বেদের মেয়ে জ্যোৎস্না’। কিন্তু আসলকে দলে নেওয়ার পরই প্রকাশ্যে আসতে শুরু করে বেশ কিছু ‘নকল’ তথ্য। বাংলাদেশি অভিনেত্রী হিসাবে পরিচিত অঞ্জুর নাগরিকত্ব প্রশ্ন বড়ো হয়ে দেখা দেয়।

মিডিয়া আর তারই সঙ্গে তৃণমূলকে এক হাত নিতে বিজেপি নেতা জয়প্রকাশ মজুমদার অত্যাধুনিক সাংবাদিক বৈঠকে বসেন। বিজেপির রাজ্য কার্যালয়ে প্রজেক্টরের মাধ্যমে তুলে ধরা হয় অঞ্জুর জন্ম শংসাপত্র, ভোটার কার্ড, প্যান কার্ড এবং পাসপোর্ট। পর্দায় দেখান এ সবের ছবি, সাংবাদিকদের হাতে তুলেও দেন সে সবের প্রতিলিপি। কিন্তু তার পরেও পিছু ছাড়েনি বিতর্ক।

মাস দশেক আগে বাংলাদেশ গিয়েছিলেন অঞ্জু। সেখানে গিয়ে প্রথম শ্রেণির একটি দৈনিকের কাছে সাক্ষাৎকারে তিনি সাংবাদিকের ভুল শুধরে দিয়ে বলেন, “আমার জন্ম কিন্তু চট্টগ্রামে নয়, ফরিদপুরে”। তা হলে তিনি কী ভাবে কলকাতার নার্সিংহোমে জন্মগ্রহণ করলেন, তেমন প্রশ্ন ফের উঠে আসে জয়প্রকাশের পেশ করা কলকাতা পুরসভার জন্ম শংসাপ্রত্রের প্রতিলিপির পরিপ্রেক্ষিতেই।

তার উপর বিতর্কের পুরু আস্তরণ তাঁর পাসপোর্টেও। অঞ্জু এত দিন বাংলাদেশের পাসপোর্ট ব্যবহার করতেন। গত ২০১৮-য় তিনি ভারতীয় পাসপোর্ট করান। জন্ম-প্রসঙ্গ বাদ দিলেও তাঁর হিসাবে ১৯৮৯ সালে তিনি পাকাপাকি ভাবে কলকাতায় চলে আসেন, তা হলে প্রায় তিরিশ বছর পর একজন স্বনামধন্য অভিনেত্রী ভারতের পাসপোর্ট কেন করালেন, প্রশ্ন সেখানেও।

তিন নম্বরটা একেবারে টাটকা। গত মঙ্গলবারের। ঘটনাস্থল বিজেপির রাজ্য কার্যালয়। দলবদলের পৌরোহিত্যে সেই মুকুলবাবু। তিনি কয়েক জন ব্যক্তিকে পিছনে দাঁড় করিয়ে দাবি করলেন, তারকেশ্বর বিধানসভার অন্তর্গত তালপুর এবং চাঁপাডাঙা গ্রাম পঞ্চায়েতের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য বিজেপিতে যোগ দিলেন। ফলে ওই গ্রাম পঞ্চায়েত দু’টি এ বার বিজেপির দখলে।

সম্ভবত ২৪ ঘণ্টার ব্যবধান। তৃণমূল ভবনে পালটা সাংবাদিক বৈঠক করলেন তৃণমূল সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর দাবি, নতুন করে দলবদলের বিষয় আসে না, ওই দুই গ্রাম পঞ্চায়েতের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য তাঁর পিছনেই দাঁড়িয়ে। তাঁরা জানাচ্ছেন, “তৃণমূলে ছিলাম, তৃণমূলেই আছি”।

অভিষেকের পালটা দাবি, “মিথ্যে বলেছেন মুকুল রায়। ওই দুই পঞ্চায়েত তৃণমূলের ছিল, তৃণমূলের আছে, তৃণমূলেরই থাকবে”।

অভিষেকের সাংবাদিক বৈঠকের পর বেশ কয়েক ঘণ্টা কেটে গেলেও জবাবি সাংবাদিক বৈঠক করতে দেখা যায়নি মুকুলবাবুকে। তবে হাতে সময় আছে। প্রায় দু’ বছর। ২০২১-এ রাজ্য বিধানসভা নির্বাচন পর্যন্ত!

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*


This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.