বাংলায় মুসলমান ভোটের বিকল্প পেয়ে গেল বিজেপি!

BJP Muslim
প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি

জয়ন্ত মণ্ডল: সংখ্যালঘু বা আরও স্পষ্ট করে বললে মুসলমান ভোট নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর বাড়তি চাওয়া-পাওয়ার গল্প থেকেই যায়। প্রকাশ্যে ধর্মনিরপেক্ষতার ধ্বজা উঁচিয়ে ধরলেও পিছনে মুসলমান ভোটব্যাঙ্ক নিয়ে কাটাকুটির হিসাবে কষা বর্তমানের ব্যবহারিক রাজনীতির একটা অঙ্গ। এ রাজ্যে অবশ্য মুসলমান ভোটের একচেটিয়া অধিকার ধীরে ধীরে বামফ্রন্টের কাছ থেকে হস্তান্তর হয়ে গিয়েছে তৃণমূলের কবজায়। তা হলে বিজেপি?

সাত দফার লোকসভার ভোটের ছয়টি দফার ভোটগ্রহণ চুকে গিয়েছে। ভোট উত্তরবঙ্গ থেকে যত নেমেছে দক্ষিণে, সংঘর্ষের পরিমাণ ততই যেন বাড়ছে। আর তারই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে জাহির হচ্ছে বিজেপির সাংগঠনিক শক্তির। হিংসার ঘটনা হোক বা হুমকি – তৃণমূলের সঙ্গে সমানে টক্কর দেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে বিজেপিও। গেরুয়া শিবিরের ভোট বাড়ছে কোন অঙ্কে তার চুলচেরা বিশ্লেষণের আগে এই সাংগঠনিক উত্তরণকে মান্যতা দেওয়া জরুরি। কী ভাবেই এই উত্তরণ?

বিজেপির কর্মী-সমর্থক বাড়ার দু’টি ভিন্নধর্মী কৌশল কাজ করছে এ রাজ্যে। একটি ধর্ম, অন্যটি শ্রেণি। একটির প্রয়োগস্থল শহর, অন্যটির গ্রাম। প্রথমত, শহরাঞ্চলে মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়ের মধ্যে হিন্দুত্বের পুনর্জাগরণ, অন্য দিকে গ্রামাঞ্চলে তফশিলি জাতি/উপজাতি মানুষের একটা বড়ো অংশের সমর্থন। শহুরে এলাকায় ‘জয় শ্রীরাম ধ্বনি’ যদি শুভেচ্ছা বিনিময়ের মাধ্যম হয়ে যায়, গ্রামে রাজ্য সরকারি বঞ্চনার প্রতিবাদে বিজেপির দিকেই ঢলছে মানুষ। যে কারণে আলাদা করে মুসলমান ভোটারদের কৃপাপ্রাপ্তির কথা ভাবতে হচ্ছে না বিজেপিকে। অনগ্রসর শ্রেণির বড়ো একটা অংশ যে বিজেপির সঙ্গেই রয়েছে, তার প্রমাণ মিলেছে গত ২০১৮-র পঞ্চায়েত ভোটেও। জঙ্গলমহলের জেলা হোক বা উত্তরবঙ্গের তফশিলি জাতি, উপজাতি অধ্যুষিত এলাকাগুলিতে বিজেপির ফল চোখ ধাঁধানো সে কারণেই।

২০১১ সালের বিধানসভা ভোটে বিজেপির ভোট ছিল মাত্র ৪ শতাংশ, তা সাম্প্রতিক কালে পোঁছে গিয়েছে ১৬ শতাংশে, পঞ্চায়েত ভোটের পর তো খাতায়-কলমে বিজেপিই রাজ্যের প্রধান বিরোধী দলে পরিণত হয়েছে সম্ভবত এই অঙ্কেই। অন্য দিকে ২০১১-র বিধানসভায় যেখানে বামেদের ভোট ছিল ৪০ শতাংশ, তা এসে ঠেকেছে ২৫ শতাংশে। প্রথম পর্বে বামেদের সাংগঠনিক ধসে রাজ্যের শাসক দল লাভবান হলেও এখন অভিমুখ বদল করে পকেট ভরাচ্ছে বিজেপির। যে ভোটে আবার প্রায় ৫৪ শতাংশ জুড়ে রয়েছে মুসলমান এবং তফশিলি জাতি/উপজাতি ভোট।

রাজ্যের মোট ভোটারের ৩০ শতাংশ মুসলমান, একই সঙ্গে ২৪ শতাংশ তফশিলি জাতি/উপজাতি। সারা ভারতবর্ষের প্রবণতার সঙ্গে ততটা মিল নেই এ রাজ্যে। মুসলমান ভোটারদের কাছে সিপিএম এবং তৃণমূল পরীক্ষিত। বিশেষ কিছু কারণে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি মুসলমান ভোটারদের সমর্থন অটুট থাকলেও অথবা বাড়তে থাকলেও অনগ্রসর শ্রেণির ব্রাত্য ভোটাররা একটু বেশি করেই যেন নির্ভরশীলতা দেখাচ্ছে বিজেপির উপর। ঝাড়গ্রাম, পুরুলিয়া হোক বা কোচবিহার, আলিপুরদুয়ার – ওই ২৪ শতাংশ ভোটের বেশির ভাগটাই স্থানান্তরিত হয়ে যাচ্ছে বিজেপির দিকে। একই সঙ্গে মুসলিম ভোটারদের একাংশের তথাকথিত বিজেপি-ভীতির মানসিকতা ত্যাগ করে গেরুয়াশিবিরে ঢলে পড়ার নজিরও রয়েছে।

[ ষষ্ঠ দফা ভোটের মুখে মোদীর মোচড়, গরিষ্ঠতার অঙ্ক নিয়ে ‍ভক্তের সংশয় ]

গত ২০১৪-র লোকসভা ভোটে রাজ্যে মাত্র দু’টি আসনেই আটকে পড়তে হয়েছিল, সে সারা দেশে যতই ‘মোদী-ঝড়’ উঠুক না কেন। ছয় দফার ভোটের পর অতি বাম-সমর্থকদেরও বলতে শোনা যাচ্ছে, এ বার কমপক্ষে ৫-৬টি আসন পেয়ে যেতে পারে বিজেপি, যখন ঘাঁটি হিসাবে পরিচিত রাজ্যগুলিতে প্রবল বিজেপি বিরোধিতার হাওয়া বইছে। একই সঙ্গে পঞ্চায়েত ভোটের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে আগামী ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটেও বিজেপির বাজিমাত করার চিহ্ন ফুটে উঠছে। পঞ্চায়েত ভোটের পর সাম্প্রতিক অতীতের মহেশতলা বিধানসভার উপনির্বাচনে বামপ্রার্থীকে পিছনে ফেলে দু’নম্বরে উঠে এসেছিল বিজেপি। কংগ্রেসের সমর্থন পেয়েও পরিচিত মুখ সিপিএম প্রার্থী প্রভাত চৌধুরীর থেকে প্রায় ১২ হাজার ভোটে এগিয়ে ছিলেন বিজেপি প্রার্থী সুজিতকুমার ঘোষ। এমনকি সংখ্যালঘু ভোট ওই কেন্দ্রে বড়ো ফ্যাক্টর হওয়া সত্ত্বেও। এ ভাবেই ত্রিপুরার আড়াই দশকের বাম সাম্রাজ্যের পতনের পর বিজেপি বাংলা-জয়ের লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে সন্তর্পণে।

তবে ত্রিপুরার পুনরাবৃত্তি বিজেপি বাংলায় ঘটাতে পারবে কি না, সে ভবিষ্যদ্বাণী করা সম্ভব না হলেও এটা তো মানতেই হবে, সে রাজ্যেও বিজেপির ‘কমল’ ফোটাতে আদিবাসী সমাজের সমর্থনই ছিল মূল অনুঘটক।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*


This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.