narendra modi, eahul gandhi
দেবারুণ রায়

দু’হাজার উনিশের ভোটে বিরোধীদের এন্তার অভিযোগের ফর্দ দেখে শাসকদলে রীতিমতো সিদ্ধান্তহীনতার ছবি। অন‍্য দিকে অবশ্য শরিকদের সঙ্গে নিয়ে চলার ক্ষেত্রে তারা এগিয়ে আছে অনেকটাই। ২০১৪-র ‘হর হর মোদী’তে যদিও কাজ হচ্ছে না উত্তরপ্রদেশে। নতুন স্লোগান তো বটেই, এখনও নতুন ইস‍্যু বাছাই করতে হিমশিম খাচ্ছেন। আইনমন্ত্রী রবিশংকরের মতো তুখোড় তার্কিকও মেজাজ হারিয়ে ফাউল করে ফেলছেন। দলের মুখপাত্রদের তো কথাই নেই। রাহুল গান্ধীকে একক ভাবে আক্রমণের লক্ষ্য করার চাপে তাঁকেই বিরোধীদের প্রধানমন্ত্রীর মুখ হিসেবে তুলে ধরেছেন। জোটের প্রধানমন্ত্রী বাছাইয়ের গুরু দায়িত্ব যেন তাঁদেরই কাঁধে।

এবং এই কঠিন ভোট মহাযুদ্ধে মোদীকে কার্যত একা করে দিয়েছে বিরোধী শিবিরের রণনীতি। ‘চৌকিদার চোর’ স্লোগান হয়ে উঠেছে উনিশের নির্বাচনী লোগো। দেশে কেন্দ্রবিরোধী ভোটের হাওয়া কখনোই ‘৮৯-এর ‘অলি গলিমে শোর হ‍্যায়’-এর মতো আগুন-ছড়ানো স্লোগাননির্ভর না হলেও এক কথায় আম আদমির কাছে ক্লিক করে গেছে। বিষয়টি বিজেপির পোড় খাওয়া নেতা ও গোয়েন্দাদের নজর এড়ায়নি। তাই  প্রধানমন্ত্রীর মতো সর্বোচ্চ আসন থেকেও পালটা আক্রমণের তীব্রতা ক্রমেই বাড়ছে। কিন্তু ফেসবুক-সহ সোশ্যাল মিডিয়ায় নেতার অঙ্গুলীহেলনে ফ‍্যানকুল তেতে উঠলেও ময়দানের চেহারা তা নয়। মাটিতে তার ছায়া পড়ছে কোথায়? ভার্চুয়াল ওয়ার্ল্ড বা কাল্পনিক দুনিয়ার সঙ্গে বাস্তবের‍ তেমন মিল নেই।

আরও পড়ুন পুলওয়ামার ফুল তুলবে বিজেপি, পাকিস্তানে ধামাচাপা ‘অচ্ছে দিন’

বেগতিক ব‍্যাপারটা সর্বাগ্রে বুঝেছেন তীক্ষ্ণধী মোদী। রাহুল যে জনসভাতেই হাজির হোন না কেন, মাইকের সামনে দাঁড়ালেই জনতার আবাহন তাঁরই তৈরি স্লোগানের ধরতাই দিয়ে। ‘চৌকিদার…’। উচ্ছ্বসিত রাহুল এ বার যে-ই বলছেন ‘চৌকিদার’, অমনি পরেরটুকু ভারতবাসীর মুখে বজ্রনির্ঘোষ, ‘…চোর হ‍্যায়।’ এর পর এই রকম করেই পর পর কয়েক বার বলিয়ে নিচ্ছেন রাহুল। জিজ্ঞেস করছেন, “যিনি পাঁচ বছর আগে এসে বললেন, ‘আমি চৌকিদার’, তিনি হঠাৎ ‘চোর’ হয়ে গেলেন কী করে?” বলেই চলে যাচ্ছেন রাফাল কেনা ও অনিল আম্বানি সুসমাচার প্রসঙ্গে। এ হেন আক্রমণাত্মক ‘চৌকিদার চোর হ‍্যায়’ থেকে বাঁচতেই মোদী নিলেন চমৎকার কৌশল। বললেন, তোমাদের চৌকিদার সব সময় ‘চৌকন্না’। সজাগ। তার নজর এড়ানো যাবে না। আর যারাই দেশের স্বার্থের পক্ষে আর দৃর্নীতির বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলেন তারা সবাই এক এক জন চৌকিদার। দেশভক্ত সবাইকে চৌকিদার আখ্যায়িত করে এ ভাবেই রাহুল গান্ধীকে চুপ করাতে চাইলেন প্রধানমন্ত্রী। এর পরও যদি রাহুল না থামেন তা হলে বিজেপি বলবে, “দেখ, দেশের সবাইকে চোর বলছেন রাহুল।”

আরও পড়ুন প্রধানমন্ত্রীর পাইলট প্রজেক্টের পর উলুখাগড়াদের কী হবে? হাল্লা চলেছে যুদ্ধে!

আক্রমণের বর্ষাফলক কোন দিকে তাক করা বুঝে বিজেপির সর্ব স্তরের নেতারাই তাঁদের আখের ভেবে কিছু কু কথা বলছেন রাহুলের উদ্দেশে। নিচু তলায় তো অপশব্দের প্রতিযোগিতা চলছে। সনিয়া আগাগোড়াই মোদী থেকে শুরু করে বিজেপির তাবৎ যদু-মধুর ফেভারিট টার্গেট। সুতরাং রাহুলের নিন্দামন্দের ফাঁকে এসেই পড়েন তিনি। সব তাবড় নেতা এক বার করে বুড়ি ছুঁয়ে যান। এ ব‍্যাপারে সতত এগিয়ে থাকেন অরুণ জেটলি। গয়াল বা স্মৃতির মতো উৎসাহীরাও পেরে ওঠেন না। এমনকি রবিশংকর প্রসাদও ফেল পড়ে যান। শরীর বা ব‍্যস্ততা, হাসপাতাল বা অফিস, দেশ বা বিদেশ যেখানেই থাকুন জেটলি, মূল মহন্তের কাজে কামাই নেই। ব্লগ নিরন্তর। লম্বা নিবন্ধও। নিদেনপক্ষে বিবৃতি। এবং মোদীর পরে সব চেয়ে বেশি আক্রমণাত্মক জেটলিই। এর কারণ হল, দ্বিতীয় প্রজন্মের নেতাদের মধ্যে সব মহলেই সব চেয়ে বেশি সুসম্পর্ক ও সমাদর বজায় রেখে চলা। এ জন্যই, অমৃতসরে অমরিন্দরের কাছে মোদীমাহাত্ম‍্যের হাওয়াতেও হেরে যাওয়া জেটলিকে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার দু’ দুটি সর্বোচ্চ গুরুত্বের পদে বসানো। এবং আরও কত ঘোষিত দায়িত্ব। সুতরাং চৌকিদার চোর বা রাফাল বা দেশপ্রেম, পুলওয়ামা, উরি সব প্রসঙ্গেই জেটলির সপ্রসঙ্গ ব‍্যাখ‍্যা রাহুল গান্ধীর পূর্বপুরুষদেরও‍ ছুঁয়ে গেছে।

অবশ্য উচ্চাভিলাষী হয়েও কু কথা এড়াতে চান নিতিন গডকড়ি। অনেক ওপরের স্তরে ভেসে থাকলেও ইঁদুরদৌড়ে থাকেন না। আর ভাবমূর্তিপ্রিয় রাজনাথ সাদা ধুতির ভাঁজের মতোই নিষ্কলুষ কথা বলতে চান। সংঘের চাপ ছাড়া কঠিন কথা বলেন না। কাশ্মীরে স্থায়ী সমাধানের কথা বলেছেন। কিন্তু বনেটে কাশ্মীরি যুবককে বেঁধে নিয়ে যাওয়ার পক্ষে থাকেননি। সেনাধ‍্যক্ষের সব দাওয়াই তাঁর মনঃপুত হয়নি। এ হেন রাজনাথ উত্তরপ্রদেশের মুখ‍্যমন্ত্রী বা দলের সর্বোচ্চ পদে থেকেও উত্তরপ্রদেশ সম্পর্কে মতামত জাহির করেন না। বৌদ্ধিক দূরত্ব বজায় রাখেন। অযাচিত পরামর্শ দেন না।

আরও পড়ুন বালাকোটেই কি হল বাজিমাত? কারগিলের পরে কুপোকাত হয়েছিল বিজেপি

কিন্তু চৌকিদার চোর নিয়ে তাঁকে মুখ খুলতেই হল। কারণ বুঝতে অসুবিধে নেই। তবে ঠান্ডা মাথার সংযত ও সুললিত ঠাকুর রাজনাথ বেঙ্কাইয়া নাইডুর মতো শব্দ নিয়ে মজা করে যা বলেন সেটা এ রকম: চৌকিদার পিওর হ‍্যায়। উনকা পিএম বননা সিওর হ‍্যায়। অর ইয়েহি ইন্ডিয়া কা কিওর হ‍্যায়। স্মিতভাব রেখে একটা বার্তা দিতে চান। নব পর্যায়ে সুষমা স্বরাজের মতো মন্ত্রী ও নেত্রীর কোনো মন্তব্য আসেনি। বোঝা যাচ্ছে যুদ্ধের দামামা শান্ত হয়েছে ভারতীয় গণতন্ত্রের বৃহত্তম উৎসব লোকসভা নির্বাচনের আবহে। রাজনীতিবিদরা যত খারাপই হোন, পাঁচ বছর পর পর এই উপলক্ষ্যে মানুষ তাঁদের হাতে নতুন করে দেশের ভার তুলে দেয়। সুতরাং বেছে নিতে গিয়ে যাতে ভুল বোতামে হাত না পড়ে সে বিষয়ে সতর্ক হয়। পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধের চেয়ে বেকার ছেলেমেয়েদের চাকরি, কিংবা চাষির কাছে তাঁর ফসলের দাম আর আমআদমির কাছে অন্ন-বস্ত্র-স্বাস্থ্য-শিক্ষা অনেক বেশি জরুরি। সে দিকে তাকিয়েই সাম্প্রতিক সমীক্ষায় সমীকরণ যা উঠে এসেছে তাতে বিজেপির কপালে ভাঁজ। সরকার গড়তে সবার আগে চাই উত্তরপ্রদেশ ও বিহার এবং হিন্দি বলয়ের সদ‍্য হারানো মধ্যপ্রদেশ, ছত্তীসগঢ় ও রাজস্থানে লিড। অথচ গত ভোটে এই সব রাজ‍্য বিজেপির ঝুলিতে উজাড় করে দিয়েছে বিপুল আসন। সাধারণ নিয়মে এ বার তার থেকে বাড়ার আর জায়গা তেমন নেই। বরং কমবে। বিজেপি নেতারা এটা বিলক্ষণ জানেন বলেই এমন রাজ‍্য থেকে ঘাটতি মেটাতে চান যেখানে গত ভোটে তেমন কিছুই জোটেনি। তেমন রাজ‍্য অবশ্যই বাংলা, ওডিশা। কিন্তু এই দুই রাজ‍্য থেকে জেতার তেমন শক্তি কোথায় বিজেপির? উলটে এই দুই রাজ‍্যে দুই ক্ষমতাসীন দল গরিষ্ঠ আসন পাবে। যাদের ছাড়া কেন্দ্রে সরকার গড়া সম্ভব হবে না। তা ছাড়া উত্তরপ্রদেশের নয়া জোট এ বার বিজেপিকে ধর্ম সংকটে ফেলেছে। আসন বেশ কিছু কমবে জেনেও অমিত শাহ প্রচারে টিকে থাকতে‌ কোনো যুক্তি ছাড়াই বলছেন, বাড়বে আসন। যদিও সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের পরেও বিজেপি লোকসভায় ম‍্যাজিক সংখ‍্যার নীচে। ২৬৫-র মতো। অন‍্য দিকে কংগ্রেস একা ১৪১। জোটসঙ্গীও সমর্থক-সহ কংগ্রেস যত বন্ধু‌ পেতে পারে, তত দল বিজেপি সঙ্গে পাবে কি? বিজেপি অবশ্য প্রত্যক্ষ শরিক ছাড়া পাবে তিন দলের পরোক্ষ মদত। এই তিন দল‌ হল টিআরএস, বিজু জনতা দল ও ওয়াইএসআর কংগ্রেস। আপাতত সংকটকালে একক গরিষ্ঠতার গুমোর ছেড়ে এই বন্ধুদের কুর্নিশ করছেন বিজেপি নেতৃত্ব।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here