IAF strike
মিরাজ ২০০০। ছবি সৌজন্যে দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস।
দেবারুণ রায়

এ বার কি বালাকোটেই বাজিমাত? বলছেন শাসকদলের উচ্ছ্বসিত সূত্র। যাঁরা জ্ঞানে-অজ্ঞানে নামপ্রকাশে নাচার। আর আচারবিচার যাঁদের হাতে বাঁধা, তাঁরা সেই “নাচায় পুতুল যথা দক্ষ বাজিকরে/নাচাও তেমনি তুমি অর্বাচীন…” বলে বাজিকরের তারিফ করছেন অষ্টপ্রহর‌। তিনি কিন্তু অন্তর্যামী। একেবারে নিউক্লিয়ার বাটনের মতো সব প্রোগ্রামিং করা আছে। প্রতিটি পদক্ষেপ ছকে নেওয়া রাম জন্মানোর আগেই। তাই তো এমন সপাটে ছক্কা হাঁকিয়েছেন যে বাইশ গজের বাজিকররাও বাহবা দিচ্ছেন। স্বয়ং মহারাজ সৌরভ থেকে কুম্বলে অনিল, এমনকি সানিয়ামুলুক থেকে মহারথী আজহারও মাঠে নেমেছেন। একদা মরাঠা টাইগারের হুংকারই এখন রয়‍্যাল বেঙ্গলের গর্জন। টিম ইমরানের সঙ্গে এক পিচে কখনোই নয়। ঢের হয়েছে ব‍্যাটে-বলে। এ বার এসপার ওসপার।

মনে পড়ে মাননীয় অটলবিহারী বাজপেয়ীর কথা। লাহোর সনদে স্বাক্ষরের পরই তাঁর “আর পার কি লড়াই” কানে লেগে আছে। কিন্তু আমরা আরেও নহি পারেও নহি। সে দিনের মতো আজও আছি মাঝখানে। কারগিলে আমরা গিলে বসেছিলাম শ’ দুয়েক পাকসেনা। তারা কঠিন শীতে অরক্ষিত সীমান্তের নিয়ন্ত্রণরেখা পার হয়ে ভারতের মাটিতে ঘাঁটি গেড়েছিল। মাথার পেছনে চোখ যাঁদের, তাঁদেরও ঢোখে ধুলো দিয়ে। দুর্দান্ত ডিফেন্স মিনিস্টার ফার্নান্ডেজও তখন ডিফেন্সিভ। তবু এনডিএর পয়লা কারিগর তিনিই। সুতরাং লাহোরি প্রেম বিসর্জন দিয়ে সিয়াচেনের চেনা পথ থেকে বাটালিকের বাঁকে নেমে এলেন। প্রেমে-রণে নীতির বালাই নেই। ভাগ‍্যিস প্রেমরস আর রণরসে রসিকরাই এমন রসের ভাব জানে এবং শাস্ত্র মেনে শস্ত্র হাতে নেয়। যে জন রণের ভাব জানে না/তার সঙ্গে নাই লেনাদেনা।

আরও পড়ুন চুরাশির ছায়া, জিম করবেটে নৌকাবিহার ও দেশপ্রেমের ভোট ২০১৯

কারগিল, বাটালিক, দ্রাসের যুদ্ধ ছিল প্রকৃতই ত্রাস। সীমান্তবর্তী বসতি ও হিন্দ-সেনার প্রিয়জনের কাছে। উপত্যকায় ছায়াযুদ্ধ আর সীমানাপারের সন্ত্রাস ভারতপ্রেমী কাশ্মীরীদের রমণীয় জীবনে বিভীষিকা এনে দিয়েছে। দিন দিন সন্ত্রাসের নিত‍্যনতুন আগ্রাসন ভূস্বর্গকে নরক করে তুলেছে। সব শেষে উপত্যকায় ভাগ‍্যাণ্বেষী বিজেপির সরকার গড়ার কৌশল বুড়ো আঙুল দেখিয়েছে বাস্তবতাকে,  সেই একই সূত্র অনুযায়ী – রণে ও প্রেমে সবই অভ্র্রান্ত ও নৈতিক। ফলে শুধু কাশ্মীরের শাসকদল হওয়ার নেশায় ১৮০ ডিগ্রি বিপরীতমুখী চাল-চরিত্র-চেহারার দলকে আলিঙ্গন করে। যদিও স্বভাবতই দু’ পক্ষের কেউই কারও ছোঁয়ায় সোনা হয়নি। প্রমাণ হয়েছে, এই দুয়ের কারও হাত ধরেই কাশ্মীরে শান্তি ফিরবে না। রাজনীতির পরশপাথর নয় কেউই। ধাপে ধাপে কাশ্মীরে ঢিলের জবাবে পাটকেল নীতি নিশিডাক হয়ে পথ দেখিয়েছে। যে পথ গিয়ে মিশেছে জমাট শীতের মৃত্যুশীতল গুহায়। মোদী জমানাতেই কাশ্মীরে শান্তিদূত নিযুক্ত হয়েও, শান্তির প্রক্রিয়া শুরু করেও সহযোগিতার প্রশ্নে এবং প্রশাসনিক বজ্রআঁটুনির দাপটে বিদায় নিয়েছেন। অবশেষে ভোট বৈতরণী পেরোনোর কালে উত্তরপ্রদেশে যেমন ইস‍্যু ছিল উরি, তেমননই লোকসভা ভোটের ঘনঘটায় পুলওয়ামার রক্তস্রোত। “বীরের এ রক্তস্রোত, মাতার এ অশ্রুধারা, সে কি ধরার ধূলায় হবে হারা?” দেশ কি শুধবেনা এই রক্তের ঋণ? কিন্তু কে শুধবে? এই বলিদানে শত্রুও আখের গুছোবে। না হলে এখনও সীমাপারের লম্ফঝম্ফ শোনা যাচ্ছে কী করে? কারণ এই ভারত-বিরোধিতা তাদের জননায়ক করবে। বিনা খাদ্যে, বিনা কাজে, বিনা চিকিৎসায়। শুধু জিগিরেই পেট ভরাবে হাভাতে যত ভোটার।এ-পার ও-পার পাঞ্জা কষায় ভরে উঠবে ইভিএম। কিন্তু সাঁতরা বাড়ির বাবলু তো আর ছ’মাস পরে, ছ’বছর কিংবা, ছ’যুগ পরেও ঘরে ফিরবে না। পুলওয়ামার কনভয়ই ছিল ওর মৃত্যুকূপ, জীবনের শেষ ঠিকানা।

হাওড়ার বাউড়িয়ায় রাজবংশী পাড়ার বাড়িতে বাবলুর শোকে অধীর স্ত্রী মিতা কিন্তু পাকিস্তানের সীমা পেরিয়ে বায়ুসেনার বোমাবর্ষণেও নিরুত্তাপ। তাঁর হাহাকার থামেনি। মিতার শুধুই মনে হচ্ছে, আজ সেনাদের বিমানে করে নিয়ে যাওয়া হল। সে দিন তো ওদের জন্যে ছিল লজঝড়ে গাড়ি। আমার স্বামীর জন্যে তো কোনো সুরক্ষা ছিল না?  কেন?

আরও পড়ুন হামলার পরই পালা জোট ঘোষণার!

শহিদবাড়িতে শ্রাদ্ধের দিনে বুকের জ্বালা কিছুটা হলেও জুড়োনোর কথা বলেছেন তাঁদের প্রিয়জন, ৩০০ জঙ্গি নিধনের কথা শুনে। কিন্তু মিতা প্রথম দিনেই বলেছিলেন, যুদ্ধ চাই না। যুদ্ধ মানেই তো আবার অনেক স্বামী বাবা সন্তানহারা স্ত্রী, শিশু ও জননী। হ‍্যাঁ, এই ধ্রুব সত্যকে পাশ না কাটালে চলে না রাজনীতির। কিন্তু তাতে মানুষের ক্ষোভের প্রকাশ থাকে ভোটে। নিজের অতি প্রিয় মানুষের কফিন দেখতে কে চায়? যে বলে ছোটো ছেলেটাকেও ফ্রন্টে পাঠাব, অথবা শহিদের বাবা হয়ে আমি গর্বিত, সে জানে পতাকায় মোড়া সন্তানের মুখ দেখার অব‍্যক্ত যন্ত্রণা! ইতিহাস তঞ্চকতা করে না কখনও। তাই কারগিলে ভারতের সীমার ভেতরে সেনা অভিযান চলা ও অপারেশন বিজয়সংকল্পকে কখনও সরকারি ভাবে ‘যুদ্ধ’ বলা না হলেও ক্ষয়ক্ষতির কথা স্মরণীয়। পাহাড়ের ওপর থেকে আক্রমণ করছিল পাকিরা। আমাদের ফৌজ ওপরে উঠতে উঠতে তার মোকাবিলা করছিল। স্বভাবতই সহজ লক্ষ্য ছিল তারা। সেই কঠিন অসম লড়াইয়ে পরাক্রমশালী ভারতমায়ের সন্তানদের মূল্য দিতে হয়েছে প্রাণ দিয়ে। ৫৩০ জন ভারতীয় সেনা শহিদ হন। পাক ফৌজের মৃত্যু ছিল ৩৫৭ থেকে ৪৫৩। সঠিক তথ্য ওরা দেয়নি, দেয় না। উত্তরাখণ্ডের অনেকেই ছিলেন শহিদের তালিকায়। তার পরই সন্নিহিত উত্তরপ্রদেশ। তখনও সে রাজ‍্য ভাঙেনি। জন্ম হয়নি উত্তরাখণ্ডের।

এ বার সাড়া জাগানোর মতো স্মৃতি। স্মৃতি শুধু বেদনার নয়, স্মৃতি সততই সত্তা ও ভবিষ্যতের ধোঁয়াশা কাটিয়ে স্বচ্ছ আলোয় উদ্ভাসিত পথ দেখায়। এমন কোনো দূরের অতীত নয়। মাত্র ১৯৯৯। কারগিলে পাকিস্তানের অনুপ্রবেশ হয়েছিল। সেই অশান্তিতে কূটনীতি ছেড়ে রণনীতির রং লাগে। জনস্মৃতি সদাই দুর্বল। অল্প দিনের চাঞ্চল্যও মুছে যায় পরের কোনো চমকে। তাই লোকে কিছু না ভেবেই বলে থাকে, কারগিলই বিজেপিকে গরিষ্ঠতা দিয়েছে। কিন্তু তা তো সত্য নয়। ১৯৯৮-তে বিজেপির সাংসদসংখ্যা ছিল ১৮৩। শেষ পর্যন্ত ছিল ১৭৯। কারগিলে যুদ্ধের দামামা বাজিয়েও বিজেপি কিন্তু যে তিমিরে ছিল সেই তিমিরেই থাকে। বরং ১ কম হয়। মোট কথা সেই ১৮২-ই জোটে, ‘৯৯-এর ভোটে।

শুধু কি কারগিল? সেখানে তো বাধ্য হয়ে যুদ্ধ। কিন্তু তার আগে ছিল অটলের ‘জয় জওয়ান, জয় কিষাণ, জয় বিজ্ঞান’! অর্থাৎ পোখরান টু। পরমাণু পরীক্ষা! ভারতের পরমাণু ক্লাবের সদস্য হওয়া নিয়ে বিশ্ব তোলপাড়। তবুও এক বছরে ভোটের সংখ্যার হেরফের হয় না সাধারণত। পোখরান ও কারগিলে সত্ত্বেও সেই হেরফের হয়নি। হ‍্যাঁ, হেলদোল ছিল না অবিভক্ত উত্তরপ্রদেশের, এ কথা কে বলবে? কারগিলের কফিন কিন্তু কথা বলেছিল জীবন্ত দেশপ্রেমিক ভারতবাসীর মাধ্যমে। ইউপির মোট ৮৫ আসনের মধ্যে ১৯৯৮-তে বিজেপি পেয়েছিল ৫৭টি আসন। ‘৯৯-এর ভোটে কমে দাঁড়ায় ২৯। উলটে আগের শূন্য থেকে ১০-এ ওঠে কংগ্রেস। সমাজবাদী পার্টিও আগের বারের খারাপ ফলের কলঙ্ক মুছে ২৬টি আসন পায়। আসলে হিন্দি বলয়ে ভোটের সময় ক্ষমতাসীন দলের ভোট যেমন কমে থাকে মূলত প্রত‍্যাশাপূরণ না হওয়ার হতাশায়, ‘৯৯-তেও ইউপি সেই রায় দিয়েছিল। জয়ললিতা সমর্থন তুলে নেওয়ার পর আস্থা ভোটে মাত্র ১ ভোটে হেরেছিলেন অটল। মায়াবতীর দল প্রথমে সম দূরত্বের নীতিতে ভোটদানে বিরত থাকার কথা ঘোষণা করলেও ভোটের সময় মায়া অটল সরকারের বিরুদ্ধে ভোট দেন। এতেই মেরুকরণ সম্পূর্ণ হয়। ১৩ মাসের সরকার চালানোর পরই ছিল ওই শক্তিপরীক্ষা।

আরও পড়ুন পুলওয়ামা হামলা কী দিল মোদীকে?
তবুও ১৯৯৯-এ কী ভাবে থেকে গেল অটল সরকার? তার কারণ, কংগ্রেস-টিডিপি সংঘাতের আবহ অবিভক্ত অন্ধ্রপ্রদেশে।যুক্তফ্রন্ট ছেড়ে রাতারাতি বিজেপির বন্ধু হন চন্দ্রবাবু। উত্তরপ্রদেশে বিজেপি যে ২৮ আসন কম পায় তা পূর্ণ করে দেন তিনি। তাঁর আসন ছিল ২৯। তিনি বাইরে থেকে সমর্থন দেন এনডিএ-কে। স্পিকারপদ পান তাঁর দলের বালযোগী। এ দিকে কংগ্রেসে তখন সবে কেশরীর জমানার শেষে হাল ধরেছেন সনিয়া। ভোটে তার প্রভাবও পড়েছিল।

সাম্প্রতিক ইতিহাসের আরেকটি ঝলক মনে করানো যাক। যুদ্ধ করলেই যে ভোট বাড়ে, বা মানুষের সব অভাব অভিযোগ দেনা পাওনা কেলেঙ্কারি, দুর্নীতির অভিযোগ ধামাচাপা পড়ে যায়, তার কিন্তু ঐতিহাসিক ভিত্তি তেমন নেই। কারগিলের জোরালো জাতীয়তা আসন বাড়াতে পারেনি। কিন্তু ২০০৮-এর ২৬/১১-র মতো জঙ্গি হামলার জবাবে দুর্বল প্রধানমন্ত্রী মনমোহন ‘চোখের বদলে চোখের নীতি নেননি’ কেন এ জন্য তাঁকে কাঠগড়ায় তুলেছিল বিজেপি। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর সে বারের পদপ্রার্থী আডবাণী থেকে গুজরাতের মুখ‍্যমন্ত্রী মোদী তুলোধোনা করলেও মনমোহন দ্বিতীয় বার ক্ষমতায় বসেন ৬১টি আসন বেশি পেয়ে। উল্লেখ্য, সে বার কিন্তু বামেরাও ছিল কংগ্রেসের বিরুদ্ধশিবিরে। আসলে আর্থিক অগ্রগতি, ১০০ দিনের কাজ, গ্রাম-গরিব, শ্রেণি আর জাতির মন পেয়েছিলেন মনমোহন। ফলে বেকারির সমাধান যুদ্ধের দামামার চেয়ে যে বেশি কার্যকর তার প্রমাণ ২০০৯-এর লোকসভা।

ইতিহাসে আরও পিছিয়ে ১৯৭১। নির্বাচনে জেতার পর যুদ্ধে ভুট্টোর পাকিস্তানকে ভেঙে শায়েস্তা করেছিলেন ইন্দিরা। সিমলা চুক্তির মতো কূটনৈতিক সাফল্য তার পর। পাকিস্তানের হাজার বছরের যুদ্ধের সাধ মিটিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু কী হয়েছিল তার পর? অটল বললেন, ইন্দিরা সাক্ষাৎ দুর্গা। জ‍্যোতিবাবু সমর্থন করলেন ইন্দিরার যুদ্ধ। কিন্তু পরের বছরই, ‘৭২-এ বাংলায় জেতার দশায় ছিল না কংগ্রেস। সিদ্ধার্থের নির্বাচনেই প্রথম ব‍্যাপক রিগিংয়ের প্রচলন হল। বিহার থেকে গুজরাত, উত্তাল হল জয়প্রকাশের আন্দোলনে। ‘৭৪-এ রেল ধর্মঘট নাড়িয়ে দিল ইন্দিরার গদি। ‘৭৫-এ জরুরি অবস্থা। স্বৈরতন্ত্রের অভ‍্যুত্থানে ভোট পিছল। জেলবন্দি বিরোধীরা। এবং ভোট হতেই ‘৭৭-এ ইন্দিরার পতনে দ্বিতীয় স্বাধীনতা।

শেষ সাক্ষী হিসেবে হাজির স্যার উইনস্টন চার্চিল। ১৯৪৫-এ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্রশক্তির জয়, হিটলারের পতন। অত বড়ো দুনিয়া কাঁপানো জয়ের পরও নির্বাচনে হারলেন চার্চিল। এটাই গণতন্ত্র। যুদ্ধ তার নিয়ন্তা নয়।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here