মন্দার সঙ্গে পাঙ্গা নিয়ে অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে ভরসা সেই আরবিআই!

0
economy
ছবি: রেভোলিউশন ইন সাউথ এশিয়া থেকে

কেন্দ্রীয় কোষাগারের ঘাটতি মেটাতে বিপুল অঙ্কের আর্থিক সহায়তা বরাদ্দ করেছে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক। অনেকের মতে যা নজিরবিহীন। রুগ্‌ণ অর্থনীতির স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারে কতটা অক্সিজেন জোগাবে এই আর্থিক সহায়তা? তা নিয়েই রাজনীতি-অর্থনীতির পরিমণ্ডলে চলছে ব্যাপক মত চালাচালি। যতটা পারলেন ছেঁকে তুললেন আরাত্রিকা রায়।

ভারতের অর্থনীতিতে মন্দা অব্যাহত। জিডিপি নিয়ে যতই গলা ফাটাক কেন্দ্রীয় সরকার, অটোমোবাইল, রিয়েল এস্টেট থেকে শুরু করে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার ক্রমে ভেঙে পড়া পরিকাঠামো বা নিত্যনতুন সমীক্ষায় প্রকাশিত ক্ষুদ্র-ছোটো-মাঝারি শিল্পের নাভিশ্বাসের গল্প তেমন ছবিই স্পষ্ট করছে। সঙ্গে নগ্ন হয়েছে রাজকোষ ঘাটতি প্রসঙ্গটিও। যা মেটাতে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়া (আরবিআই‌)-র ভাঁড়ারে হাত রাখতে হয়েছে কেন্দ্রকে। পরিস্থিতি কী আদৌ বদলাবে?

কেন্দ্রের দাবি, শিল্প মহলের প্রত্যাশা পূরণই এখন অন্যতম একটি লক্ষ্য। মন্দা কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে তারা ত্রাণের জন্য হাহাকার করছে। তাদের চাহিদা পূরণ করতে পারলেই চাঙ্গা হবে অর্থনীতি। কিন্তু রাজকোষ তো ভাঁড়ে মা ভবানী। অগত্যা, গন্তব্য আরবিআই।

চলতি সপ্তাহের সোমবারের বৈঠকে কেন্দ্রকে ১,৭৬,০৫১ কোটি টাকা অর্থ সাহায্য করার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেছে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়া (আরবিআই)। ওই দিন আরবিআইয়ের কেন্দ্রীয় পর্ষদের বৈঠকে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

আগেই জানা গিয়েছিল, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ইতিমধ্যেই ২৮,০০০ কোটি সরকারকে হস্তান্তর করেছে আরবিআই। এর পর ইকনোমিক ক্যাপিটাল ফ্রেমওয়ার্ক (ইসিএফ) পর্যালোচনার পর ২০১৮-১৯ অর্থবছরে উদ্বৃত্ত ১ লক্ষ ২৩ হাজার ৪১৪ কোটি টাকা বরাদ্ধ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক। একই সঙ্গে কেন্দ্রকে অতিরিক্ত ৫২ হাজার ৬৩৭ কোটি টাকা দিতে চলেছে আরবিআই। কী হবে এই টাকায়?

জানা গিয়েছে, আগামী ৩-৫ বছর এই অর্থ দফায় দফায় কেন্দ্রকে দেবে আরবিআই। এই টাকায় বাজারে টাকার জোগান বাড়ানো হবে। আগস্ট মাসে গত আর্থিক বছরের সামগ্রিক চিত্র সামনে আসার পর ব্যাঙ্কগুলির মাধ্যমে বাজারে নগদ জোগান বাড়াতে চাইছে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক।

কিন্তু বিরোধী রাজনৈতিক দলের সঙ্গেই অর্থনীতিবিদদের একাংশ সরকারের এই পরিকল্পনার মধ্যে খুঁত খুঁজে পাচ্ছেন। তাঁদের যুক্তি, সরকারি ভাবে দেশের নবরত্ন সংস্থাগুলির ঘাড়ে বোঝা চাপিয়ে দেওয়া এবং চাহিদা হ্রাস পাওয়ায় সেগুলি এখন ধুঁকছে। সেগুলির উদ্দেশেই এই অর্থ ছড়ানো হবে। যার জেরে দেশের কৃষক, শ্রমিক, মহিলা, যুব, ক্ষুদ্র, ছোটো এবং মাঝারি শিল্প আরও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

আরবিআইয়ের প্রাক্তন গভর্নর রঘুরাম রাজনও সম্প্রতি দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক চিত্র নিয়ে উদ্বেগজনক মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ভারতের অর্থনৈতিক মন্দা “অত্যন্ত উদ্বেগজনক” এবং জিডিপি কী ভাবে গণনা করা হচ্ছে, তা নতুন করে দেখার সময় এসেছে।

রাজন সিএনবিসি টিভি ১৮-কে বলেন, বেসরকারি ক্ষেত্রগুলির বিশ্লেষকদের কাছ থেকে বিভিন্ন প্রবৃদ্ধির ভবিষ্যদ্বাণী রয়েছে, যার মধ্যে বেশ কয়েকটি সম্ভবত সরকারের অনুমানের তুলনায় অনেকটাই নীচে এবং তিনি মনে করেন অবশ্যই অর্থনীতিতে মন্দা এমন একটি বিষয় যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। গত জুন মাসে ৭ শতাংশ থাকলেও মুদ্রা নীতি কমিটির সাম্প্রতিক অনুমানে ২০২০ সালের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ৬.৯ শতাংশে টেনে নামানো হয়েছে।

রাজন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রকাশিত প্রাক্তন প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা অরবিন্দ সুব্রহ্মণ্যনের গবেষণামূলক প্রবন্ধের দিকেও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। তিনি দাবি করেছেন, ২০১১ সালের পরবর্তী সময় থেকে ভারতের জিডিপি প্রবৃদ্ধির পরিমাণ প্রতি বছর প্রকৃত অর্থে প্রায় ২.৫ শতাংশ পয়েন্ট কম।

রাজন স্পষ্টতই দাবি করেন, “জিডিপি হার পরিমাপের জন্য বিশেষজ্ঞদের স্বাধীন গোষ্ঠীর প্রয়োজন রয়েছে। যাদের হাতে জিডিপি গণনার দায়িত্ব থাকবে। আমরা এখন যে পদ্ধতিতে জিডিপি গণনা করি, সেটা যে সম্পূর্ণ ভাবে ভুল নয়, সেই বিষয়টিকে নিশ্চিত করতেই ওই বিশেষজ্ঞদের প্রয়োজন।”

ক’ দিন আগেই কেন্দ্রকে বাড়তি টাকার জোগান দেওয়ার সিদ্ধান্তে শিলমোহর মেরেছে আরবিআই। কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেও রাজন বলেন, ‘‘আরবিআইয়ের রেটিং ‘এএএ’ থেকে কমলে তাদের ধার নেওয়ার খরচ বাড়বে। যা পুরো অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব ফেলবে।’’ তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, এই বাড়তি ভাঁড়ার সরকারের হাতে গেলে শীর্ষ ব্যাঙ্কের ক্রেডিট রেটিং বা মূল্যায়ন কমতে পারে।

তবে শুধু রাজন নন, অর্থনীতি-বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করেন, বাণিজ্যিক ব্যাঙ্কে পুঁজি জোগানো ছাড়া এই টাকায় হাত দেওয়া উচিত নয়। কিন্তু সেই সতর্কতা শোনার কোনো সদিচ্ছা প্রকাশ হয়নি কেন্দ্রীয় সরকারের মনোভাবে। কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমন ব্যাঙ্কগুলিকে ৭০,০০০ কোটি টাকা জোগানের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর পরই আরবিআই ১.৭৬ লক্ষ কোটি টাকারও বেশি সরকারকে দিতে সম্মতির কথা জানায়।

রাজনৈতিক মহলের দাবি, কেন্দ্রের ঠিক এমনই দাবি না মানতে পেরে আরবিআইয়ের গভর্নরপদ থেকে ইস্তফা দেন উর্জিত পটেল। কিন্তু তাঁর উত্তরসূরি শক্তিকান্ত দাস নিজের গভর্নরপদের মেয়াদ এক বছর পূরণ হওয়ার আগেই কেন্দ্রের নীতিতে মান্যতা দিলেন। যা নিয়ে রাজনৈতিক তরজাও তুঙ্গে।

প্রশ্ন উঠছে বিবিধ। অর্থনীতি চাঙ্গা করতে বহু বিধ পদক্ষেপের কথা বলছেন এনডিএ সরকারের প্রধানমন্ত্রী থেকে অর্থমন্ত্রী। বিরোধীদের প্রশ্ন, সেই চাঙ্গা হওয়ার রসদ কি আরবিআইয়ের ভাঁড়ারে সিঁদ কেটে?

সেই প্রশ্ন উসকে দিয়ে সিপিএম সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি অভিযোগ করেছেন, “গত ২০১৪ সাল থেকে কেন্দ্র আরবিআইয়ের লভ্যাংশের ৯৯ শতাংশই ছিনিয়ে নিয়েছে। সেই টাকা নিজেদের প্রচারণামূলক উদ্দেশ্য সাধনে প্রতি বছর ব্যবহার করেছে। মোদীর শাসনকালে লুঠ করা ব্যাঙ্কগুলিকে এ বার বেসরকারিকরণের দিকে আরও কয়েক ধাপ ঠেলে দিতে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ কাজে লাগানো হচ্ছে।”

অন্য দিকে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী এই ইস্যুতে সরাসরি রিজার্ভ ব্যাঙ্ক থেকে কেন্দ্রের বিরুদ্ধে সরাসরি ‘চুরি’র অভিযোগ তুলেছেন। যার জবাবে কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী কংগ্রেস নেতাকে রাজনৈতিক ভাবে আক্রমণ করলেও ভবিষ্যৎ আর্থিক দিশা নিয়ে কোনো ব্যাখা দেননি।

অবশ্য আন্তর্জাতিক সমীক্ষক সংস্থার মতে, ২০০৬ সালের পর থেকে এত দীর্ঘাকার মন্দার সম্মুখীন হতে হয়নি দেশকে। যা গত ২০১৮ থেকে টানা ১৮ মাস ধরে চলেছে। স্বাভাবিক ভাবেই অর্থমন্ত্রী ব্যাখ্যা না দলেও আপাতত তা তোলা থাক সময়ের জন্যই!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here