দীপিকার ঘাড়ে মাথা একটাই, সেটা আর কতবার কাটা যায়!

Deepika Padukone

জয়ন্ত মণ্ডল: গত রবিবার দিল্লির জেএনইউ-তে পড়ুয়া এবং অধ্যাপকদের উপর হামলা চালায় মুখোশধারী গুন্ডারা। প্রায় ৪৮ ঘণ্টার মাথায় জেএনইউতে আন্দোলনরত পড়ুয়াদের সমর্থনে সশরীরে সেখানে হাজির হন বলিউড অভিনেত্রী দীপিকা পাড়ুকোন। একাধিক সাক্ষাৎকারে “রাজনীতি নিয়ে বিশেষ কিছু বুঝি না” গোছের মন্তব্যকারী অভিনেত্রী নিশ্চয় ৪৮ ঘণ্টায় এটা অন্তত বুঝে গিয়েছিলেন, জেএনইউ-তে হামলার শিকার আর শিকারির অবস্থান। না, এই সরল তথ্য না বোঝার মতো কোনো উপাদানই খুঁজে পাওয়া যায় না ‘ছপাক’ অভিনেত্রীর সামাজিক জ্ঞান গরিমায়। অতএব তাঁর ছবি নিয়ে একে একে আসছে হরেক আপদ!

গত রবিবার ঘটনা ঘটামাত্রই জেএনইউতে হামলার অভিযোগ উঠেছে এবিভিপির বিরুদ্ধে। হামলায় গুরুতর আহত হয়েছেন ছাত্র সংসদের সভানেত্রী ঐশী ঘোষ। এবিভিপি অথবা ঐশী ঘোষের শিকড় সম্পর্কে বিন্দুমাত্র ধারণা নেই দীপিকার, এমন ডাঁহা মিথ্যে কথা মিরজাফরও বলতে পারবেন না। যে বলিউডে ‘রঞ্ঝনা’র মতো বাণিজ্যিক ছাত্র রাজনীতির ছবি তৈরি হয়, সেই ইন্ডাস্ট্রির একজন প্রথমসারির অভিনেত্রী হয়ে দীপিকার এ কথা অজানা, তা বিশ্বাস করা কঠিন। তবে জেএনইউতে গিয়ে তিনি সংবাদ মাধ্যমের কাছে কোনো কথাই বলেননি। তাঁর সহকারী জানিয়েছিলেন, ‘ছপাক’-এর প্রচারে দিল্লিতেই ছিলেন দীপিকা। তাই তিনি আন্দোলনকারীদের পাশে থাকার বার্তা দিতেই জেএনইউ সফর করেন। তিনি আরও বলেন, পড়ুয়ারা যে বিষয়গুলি নিয়ে প্রতিবাদে নেমেছেন, তার মাঝখানে দীপিকা মুখ খুললে সেগুলো উহ্য থেকে তাঁর মন্তব্য নিয়েই কচকচানি শুরু হয়ে যেতে পারে। এতটা ঠিকই আছে, কিন্তু ক’দিন বাদেই মুক্তি পাচ্ছে দীপিকার নতুন ছবি ‘ছপাক’।

জেএনইউ-তে তাঁর সফরের পর পরই বিজেপির নেতা-কর্মীদের একাংশ ওই ছবি বয়কটের পরামর্শ দিয়েছেন। সপ্তাহ কয়েক আগেই রিলিজ হওয়া ‘দাবাং ৩’ বক্স অফিসে আগের মতো সাফল্য পায়নি। সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন (সিএএ) নিয়ে উত্তাল পরিস্থিতি ওই ছবির বক্স অফিস কালেকশন কমার কথা স্বীকার করেছে খোদ প্রযোজক সংস্থাও। সলমন খান নিজেও বলেছিলেন, দর্শকদের সুরক্ষা আগে। স্বাভাবিক ভাবেই, এমন সাময়িক প্রতিকূল বাজারে দীপিকার ছবি মুক্তি পাচ্ছে। তার মধ্যেই তিনি এবিভিপি হয়ে বিজেপিকে দিলেন চটিয়ে। ওই অংশের দর্শকরা তো তাঁর ছবি থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিলেন। প্রযোজক কখনোই এমনটা চান না। বিশেষ করে ‘ছপাক’ যখন একটা আদ্যন্ত সামাজিক বার্তাবাহী ছবি। আসলে দীপিকা ঘরপোড়া ‘গোরু’। যে কথা তিনি বলেছেন নিজেই।

এর আগে ‘পদ্মাবত’ মুক্তির আগেও ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি হয়। কিন্তু সেটা ছিল নিতান্তই ছবি কেন্দ্রিক। তবে দু’টো ঘটনায় মিল একটাই। বক্সিং রিংয়ের এক দিকে দীপিকা, তো অন্য দিকে বিজেপি। সে বার খুঁচিয়ে ঘা করেছিল বিজেপি, এ বার দীপিকা। ‘ছপাক’ প্রতিবাদের গল্প, প্রতিবাদ সর্বত্রই সমান, অবয়ব যতই ভিন্ন হোক না কেন। কিন্তু খালি চোখে ধরা পড়া আপাদমস্তক রাজনৈতিক ঘটনায় দীপিকা এ বার নিজেই এন্ট্রি নিয়েছেন।

‘পদ্মাবত’ নিয়ে ব্যাপক শোরগোল ফেলেও ছবির ব্যবসায়িক সাফল্যকে রোখা যায়নি। পরিসংখ্যান বলছে, ২১৫ কোটি টাকা খরচে তৈরি ওই ছবি ৫৮৫ কোটি টাকার ব্যবসা করেছে। দীপিকা জানেন, ‘ছপাক’ নিয়ে প্রযোজক মেঘনা গুলজার অথবা তাঁর কপাল অন্য কোনো কারণে পুড়লেও পুড়তে পারে, কিন্তু তাঁর জেএনইউ সফর তাতে সামান্য আঁচ লাগাতেও পারবে না।

মেঘনা বলিউডের বর্ষীয়ান গীতিকার এবং কবি গুলজারের মেয়ে। হাতে গোনা ক’দিন আগে সিএএ-এনআরসি বিরোধে নাম জড়িয়েছিল তাঁর। বিক্ষোভের সময়ে ফৈয়াজ আহমেদ ফৈয়াজের কবিতার পঙক্তি ব্যবহার নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্কে মুখ খুলেছিলেন গুলজার।

অন্য দিকে ‘ছপাক’-এর আর এক প্রয়োজক দীপিকা নিজেই। প্রতিবাদের ছবি ফুটিয়ে তুলতে ভাণ্ডার উপুড় করেছেন। ফলে একটা প্রতিবাদে সরব হয়ে অন্য আর একটা অন্যায়ে নীরব থাকেন কী করে!

কারণ, তাঁর ঘাড়ে তো একটাই মাথা। ‘পদ্মাবত’ মুক্তি বিতর্কে হরিয়ানার বিজেপি নেতা সুরজ পাল আমু যেটার দাম দিয়েছিলেন ২৫ কোটি টাকা। সেটা আর কতবার কাটা যায়!

পুনশ্চ: দীপিকাকে বয়কটের পাশাপাশি নতুন সংযোজন, ‘ছপাক’-এর নাম পরিবর্তনের অভিযোগ। তুলেছে বিজেপি। মূল কাহিনি বিকৃতির অভিযোগকে নিশানা করেছেন বিজেপি সাংসদ বাবুল সুপ্রিয়। আসানসোলের সাংসদ একটি টেলিভিশন চ্যানেলে দাবি করেন, মেঘনা গুলজার ‘দায়িত্বজ্ঞাহীন’। পরিচালক ধর্মনিরপেক্ষতা বজায় রাখতে গিয়ে দোষীর নামটাই বদলে দিলে, তিনি ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন ও ভণ্ড’। যদিও ছবিতে সে ধরনের কোনো ঘটনা ঘটেনি বলে জানা গিয়েছে। পুরোটা গুজব। উড়ছে উড়ুক গুজব। এখন দেখার, গুজবের মোড়কে প্রচারের ঠেলায় আনুমানিক ৩৫ কোটি টাকা ঢেলে দীপিকার লক্ষ্মীলাভ হয় কত?

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*


This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.