ছালের রাজনীতি আর কত দিন

0
রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায়, সব্যসাচী দত্ত, মুকুল রায়, সোনালি গুহ এবং শুভেন্দু অধিকারী। প্রতাকী ছবি

জয়ন্ত মণ্ডল

এক গাছের ছাল কি অন্য গাছে লাগে! বিজ্ঞান যা-ই বলুক, প্রচলিত প্রবাদের উত্তর ‘না’। তবুও এক গাছের ছাল অন্য গাছে লাগানোর খেলা চলছে নিরন্তর। বিশেষ করে এখনকার বঙ্গ-রাজনীতিতে।

Loading videos...

উলটো দিকে আরও একটি প্রচলিত কথা রয়েছে, উপকারী গাছের ছাল থাকে না। সেটা এখানে-ওখানে অর্জুন গাছের দিকে তাকালেই স্পষ্ট হয়ে যায়। কার্যকারিতাও আছে নিশ্চয়। তবে আপাত ভাবে কোনো গাছকে উপকারী ধরে নিয়ে ছালেরা যদি লেপটে যাওয়ার প্রতিযোগিতায় নামে, তা হলেও প্রথমের প্রবাদটা আবার এক বার গুরুত্ব পায়।

এক গাছের ছাল অন্য গাছে লাগানোর দু’টো পরিপূরক কারণ রয়েছে। কোনো গাছের মালিক গাছকে আরও মোটাসোটা দেখাতে অন্য গাছের ছাল লাগাতে চায়, যেমনটা করেছে বিজেপি। আবার কোনো ছাল উপকারী ধরে নিয়ে অন্য গাছে লেপটে যেতে চায়, যেটা করেছিলেন তৃণমূলের কয়েক জন ‘দমবন্ধ’ হয়ে যাওয়া নেতা। অন্তত বিজেপির রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষের মন্তব্যে তেমনটাই অনুমান করা যাচ্ছে।

বিজেপি যে বড়োসড়ো গাছ, সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। শুধু কেন্দ্রের শাসক দল নয়, তারা বিশ্বের বৃহত্তম রাজনৈতিক পার্টি (বিজেপি নেতারা বলেন)। দিল্লিতে তাদের সদর দফতর তৈরিতে খরচ হয়েছিল ৭০০ কোটি টাকা (বিরোধীরা বলে)। ১৯৫১-তে ভারতীয় জনসঙ্ঘ ধরে ১৯৮০-তে জন্ম বিজেপি-গাছের। ফলে বয়স বাড়ছে বলেই যে নিজের ছাল খসে পড়ায় অন্যের ছাল গায়ে লাগাচ্ছে তেমনটা নয়। উদ্দেশ্য, আরও বেশি মোটাসোটা দেখানো। আর উপকারী ভেবে হুমড়ি খেয়ে পড়া ছালেদের জায়গা করে দেওয়া। বিশেষ করে ২০২১-এ যখন নরেন্দ্র মোদী, অমিত শাহের মতো বাংলা দখলের দিবাস্বপ্নে বিভোর।

এক গাছের ছাল অন্য গাছে লাগানোর প্রক্রিয়ায় শুধু বিজেপিকে টানলে ব্যাপারটা নিতান্তই এক পেশে হয়ে যায়। ছালের রাজনীতির শুরু কবে, সঠিক ভাবে জানা যায় না। কিন্তু এর প্রকট হওয়ার শুরু ২০১১-য় রাজ্যের পালাবদলের পরই। হেরো বাম অথবা জোট বেঁধে জয়ী কংগ্রেস থেকে একে একে নেতা তৃণমূলের ছাতার তলায় এমন ভাবে আসতে শুরু করল যেন একটু দেরি করলেই মিস হয়ে যাবে। তবে তাঁরা এলেন ‘উন্নয়নের শরিক’ হতে। আবার দুলাল বর, হুমায়ুন কবিররাও রীতিমতো রেকর্ড গড়ে ফেলেছেন দলবদলে। তবে এ সবে কিছু যায়-আসেনি তৃণমূলের। বিরোধী দলের একের পর এক উইকেট ফেলেছে তৃণমূল। কংগ্রেস তো কোন ছার, বাম-আন্দোলনের ঐতিহ্যবাহী পরিবারের নেতারাও ভিড় জমিয়েছেন তৃণমূলে। তখন থেকেই বিরোধী দলের অতি ক্ষুদ্র, ছোটো, মাঝারি, বড়ো – সব রকমের নেতারা যে ভাবে দলবদলে মাতছেন, তাতে প্রায় বছর দশেক ধরে উত্তাল বাংলার রাজনীতি।

দলবদলের উৎস সন্ধানে

বেশির ভাগের কাছেই নির্দিষ্ট কোনো পার্টির মতাদর্শের প্রতি বিশ্বাসই শেষ কথা নয়। তাই ক্ষমতার অলিন্দে অতৃপ্ত আত্মাদের আনাগোনা বরাবরই। এখন ফুটবলারদের দলবদলকে হার মানাচ্ছেন তাঁরাই। এক দল ছেড়ে অন্য দলে গেলে পারিশ্রমিক অথবা সুযোগ-সুবিধার বহর বাড়তে পারে ফুটবলারদের। রাজনীতির ক্ষেত্রেও তেমন ঘটছে। তার অসংখ্য প্রমাণও রয়েছে। নৈতিকতা নিয়ে যে যা-ই বলুন, সাধারণ মানুষ যতই মাথা ঘামাক না কেন, নেতারা জানেন, রংবদলের ব্যাখ্যা তাঁদের পকেটে মজুত।

ব্রিটিশ যুগেও ভারতে দলবদলের একাধিক নজির পাওয়া যায়, আবার এক দল ছেড়ে নতুন দল গড়ার তালিকায় রয়েছে তালেবরদের নাম। কিন্তু লড়াইটা যে হেতু অত্যাচারী ইংরেজ শাসকের বিরুদ্ধে তাই সে সব নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করলে ইতিহাসের সাক্ষী মিলবে বিভিন্ন সুরে। তবে স্বাধীন ভারতে আমাদের জনপ্রতিনিধিদের দলবদলের নেপথ্যে শুধুই ক্ষমতাশালী পার্টির প্রতি আনুগত্য ছাড়া আর অন্য কিছুই চোখে পড়ে না।

আয়া রাম গয়া রাম বলে একটা কথা রয়েছে রাজনীতিতে। ১৯৬৭ সালের একটি ঘটনা থেকে এই শব্দবন্ধের উৎপত্তি। আবার ধরে নেওয়া হয় সেটাই ছিল জনপ্রতিনিধিদের দলবদল নিয়ে স্বাধীন ভারতের প্রথম কোনো সাড়া ফেলে দেওয়া ঘটনা। হরিয়ানা বিধানসভার কংগ্রেস সদস্য ছিলেন গয়া লাল। অনেকেই তাঁকে ভারতীয় রাজনীতিতে দলবদলের জনক বলে থাকেন। নির্দল প্রার্থী হিসেবে জিতে কংগ্রেসে যোগ দেন তিনি। মাত্র এক পক্ষকালের মধ্যে তিন বার দলবদল করেছিলেন গয়া। কংগ্রেস থেকে জনতা পার্টিতে গিয়েছিলেন তিনি। এর পর কংগ্রেসে ফিরে এসে ন’ ঘণ্টার মধ্যে আবার জনতা পার্টিতে যোগ দেন তিনি। তৎকালীন কংগ্রেস নেতা রাও বীরেন্দ্র সিং চণ্ডীগড়ে সাংবাদিক বৈঠক করে জানিয়ে দেন, আয়া রাম গয়া রাম। এই ঘটনা এমন পর্বের সূচনা করে যে শেষ পর্যন্ত হরিয়ানা বিধানসভা ভেঙে রাষ্ট্রপতি শাসন পর্যন্ত জারি করা হয়েছিল।

পশ্চিমবঙ্গেও দলবদলের রাজনীতি আজকের নয়। ছয়ের দশকে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায়ের সঙ্গে মতবিরোধের জেরে দল ছেড়ে দেন সিদ্ধার্থশংকর রায়। তবে বিধায়কপদে ইস্তফা দিয়ে নিজের ছেড়ে দেওয়া আসন থেকেই উপনির্বাচনে জয়ী হয়েছিলেন তিনি। তাঁকে সমর্থন করেছিল বামেরা। কিন্তু এখনকার ঘটনার সঙ্গে তার অমিল অনেক। এক দলের টিকিটে জিতে অন্য দলের অনুগ্রহে বিধায়কপদ টিকিয়ে রাখার প্রবণতা এখন শিল্পের পর্যায়ে চলে গিয়েছে।

এখন রীতিমতো বঙ্গজীবনের অঙ্গ হয়ে উঠেছে এই দলবদল। দলীয় নীতি, আদর্শ, অনুশাসনকে উপেক্ষা করে বেশ কিছু নেতা দলবদল করে নিজেরাই নিজেদের রাজনৈতিক অস্তিত্বকে বিপন্ন করে তুলছেন। সংবিধানে দলবদল রুখতে বিধি রয়েছে, শুধু সেই সব নেতা নন, রাজনৈতিক দলগুলোও উচ্চাশা পূরণে সে সবের ফাঁকফোঁকর খুঁছে নিচ্ছে। সংবিধান সংশোধন করেও তাদের আটকানো যে সম্ভব নয়, সে কথা স্বীকার না করলেও সত্য।

দিলীপ ঘোষের ছাল-তত্ত্ব

‘বেসুরো’দের নিয়ে বেজায় চটেছেন বিজেপি রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ। তাঁর মতে, গেরুয়া শিবির থেকে যাঁরা এখন বেসুরো গাইছেন, তাঁরা আর অন্য কেউ নন, সবাই এসেছিলেন তৃণমূল থেকে। নিজের যুক্তিকে প্রতিষ্ঠা করতেই তিনি টেনে এনেছেন এই ছাল-তত্ত্ব।

দলের বিরুদ্ধে মুখ খুলেছেন তৃণমূল থেকে বিজেপিতে যাওয়া সব্যসাচী দত্ত, রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো নেতারা। আবার ব্যক্তি ধরে আক্রমণ শানিয়েছেন বিজেপি সাংসদ সৌমিত্র খাঁ। মুকুল রায় এবং তাঁর পুত্র শুভ্রাংশু সে সবের ধার ধারেননি। সটান ফিরেছেন পুরোনো ঘরে। ছোটো-মাঝারি অনেক নেতা আবার দলের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে ফের পাড়ি দিয়েছেন ঘাসফুলে। সব মিলিয়ে ভোটের আগে ক্ষমতায় আসার মন্ত্র আউড়ানো বিজেপি এখন সংগঠনকে কী ভাবে ধরে রাখবে, সেটাই রাজ্যনেতাদের মাথাব্যথার কারণ। ও দিকে কেন্দ্রীয় নেতারাও যে যাঁর বাড়ি ফিরে গিয়েছেন। মোদী-শাহ এখন মাথার পুরোটা গলিয়ে দিয়েছেন উত্তরপ্রদেশ-সহ পাঁচ রাজ্যের বিধানসভা ভোটে। ফলে দিলীপদের মতো রাজ্য নেতারাই আবার বঙ্গ-বিজেপির চালকের আসনে।

দিলীপ স্পষ্টতই বলছেন, বিজেপিতে নতুন আসা নেতারা দলের রীতিনীতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারছেন না। যেটা পুরোনো নেতাদের কাছে সমস্যাই নয়। তাঁর কথায়, “বিজেপি ভাঙেনি। অন্য গাছের ছাল লাগিয়েছিলাম, সেই ছাল খুলে পড়ে গেছে”। তা হলে কি দলের সঙ্গে মানিয়ে নিতে না পারা নেতারা ফের তৃণমূলে ফিরে যাবেন? এমন প্রশ্নের জবাবে দিলীপ বলেন, “আমরা অনেক লোককে নিয়েছিলাম এবং তাঁদেরকে সুযোগও দিয়েছিলাম, এখন তাঁরা কী করবেন, সে সিদ্ধান্ত নেওয়া তাঁদের উপরই নির্ভর করছে”।

অর্থাৎ, মুকুল রায়, শুভ্রাংশু রায়, তপন সিনহাদের মতো নেতাদের যদি অন্য গাছের ছাল ধরে নেওয়া যায়, তা হলে মানতেই এক গাছের ছাল অন্য গাছে লাগে না। কিন্তু এ মুহূর্তে দিল্লির নেতারা বঙ্গ-বিজেপির মুখ হিসেবে যাঁর উপর সব চেয়ে বেশি নির্ভরশীল সেই শুভেন্দু অধিকারী কি একই গোত্রে পড়ছেন না? এই ছাল খসলে বাংলায় নিজের ফেলে আসা অতীত আবার এক বার বিজেপি ফিরে পায় কি না, সেটাই দেখার!

আরও পড়তে পারেন: ছাল ঠিক খাপ খায়নি, তাই বিজেপি থেকে খসে পড়ছে, কড়া প্রতিক্রিয়া জানালেন দিলীপ ঘোষ

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন