mayawati akhilesh
debarun roy
দেবারুণ রায়

মুলায়ম-কাঁসিরাম জোটের ইতিহাস রজতজয়ন্তী ছুঁয়েছে সবে ২০১৮-য়। হিন্দুস্তানের হৃদয়ের মূল সুর শোনা গেল ‘১৯-এর একাদশ দিনে। লোকসভার ৮০টি আসনে বৃহত্তম প্রদেশের ৮০ ভাগ মানুষ যাতে দ্ব‍্যর্থহীন অবস্থান নিতে পারে তার জমি তৈরি করলেন মায়াবতী ও অখিলেশ যাদব। এই অবস্থান প্রস্তাবিত ধর্মরাষ্ট্রের (হিন্দুরাষ্ট্র) বিরুদ্ধে, রাষ্ট্রধর্মের পক্ষে। খাওয়া, পরা, কর্মসংস্থান, জীবন ও সম্পত্তির অধিকারকে নস‍্যাৎ করে ধর্মের নামে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ চাপিয়ে দেওয়ার রাজনীতি উত্তরপ্রদেশে সব চেয়ে প্রকট বলেই, সেই রাজ‍্যই নির্বাচনী রণে প্রথম ‘পজিসন’ নিল। পজিসনে গোটা ‘অপোজিশন’।

উল্লেখ্য, নরেন্দ্র মোদী নিজভূমি গুজরাত ত‍্যাগ করে উত্তরপ্রদেশের পরবাসে আসেন ২০১৪-য়, দিল্লির মসনদ দখলের মূল আকর সংগ্রহে। ওই তুরুপের তাস হল ৮০টি আসন, যার সিংহভাগ না পেলে লোকসভার নিরঙ্কুশ গরিষ্ঠতা অধরাই থেকে যায়। অতীতের রেকর্ড তার জ্বলন্ত সাক্ষ‍্য দিচ্ছে। এবং সেই ধারাটি বহমান রেখেই রাজীব গান্ধীর পর মোদীই প্রথম প্রধানমন্ত্রী হন লোকসভায় একক ভাবে নিরঙ্কুশ হয়ে। তিনি পেয়েছিলেন ২৮২টি আসন, যা ছিল ম‍্যাজিক সংখ্যা ২৭৩-এর চেয়ে ৯ বেশি। এবং ২৭৩-এর মধ্যে ৭৩টাই মোদী পান ইউপির কাছ থেকে। কেন উত্তরপ্রদেশের এত কৌলীন? কারণ উত্তরপ্রদেশ উজাড় করে সমর্থন না দিলে লোকসভা ত্রিশঙ্কুই হয়। এমনকি মিলিজুলি সরকারের জন্যও হাত পাততে হয় উত্তরপ্রদেশের কাছেই। অটল জমানার এনডিএ সরকার হয়েছিল উত্তরপ্রদেশের ৫০-এর ঘরে আসনসংখ‍্যা নিয়ে। দ্বিতীয় অ-কংগ্রেসি সরকারের ভিত গড়েছিল জনতা দলের যে ১৪০ আসন, তার সিংহভাগও ছিল বৃহত্তম প্রদেশের।

আরও পড়ুন মেরুকরণে জুড়ল উঁচু জাত, মোদীর পাশা উলটে দিতে পারে নিচুতলার জোট

তা ছাড়া, বহুজন সমাজ পার্টি আর সমাজবাদী পার্টির হাত ধরাধরি ঐতিহাসিক হয়ে উঠতে চলেছে এই কারণেই যে, ব্রাহ্মণ, ঠাকুর, কায়স্থর মতো খুংখার ‘অগড়ে’ বা অগ্রসরদের দাপট এতকাল নির্ণায়ক থেকেছে ভারতের ভাগ‍্যবিধাতা নির্বাচনে। কিন্তু এই প্রথম দলিত, অনগ্রসর, সংখ্যালঘুরাই ঠিক করবে কে হবেন সোয়াশো কোটি মানুষের নিয়ন্তা, কী হবে তাঁর সরকারের কর্মসূচি, অগ্রাধিকার। এক কথায়, যে তারবাদ‍্য বাজবে উনিশের সাড়া জাগানো ভোটে, তার মূল সুরটি বেঁধে দিলেন  ভাতিজা-বুয়া। রাহুলের হাত ছাড়া পরিবর্তন সম্ভব নয় ভেবেই সপা-বসপার জোট বৈরী করেনি কংগ্রেসকে। সভাপতি ও ইউপিএ চেয়ারপারসনকে সম্মান জানাতে অমেঠি ও রায়বরেলিতে প্রার্থী না দেওয়ার ও বিজেপির বিরুদ্ধে কংগ্রেসের দুই নেতাকে সমর্থনের কথা ঘোষণা করেছে। যথেষ্টই পোড় খাওয়া রাজনীতিকের প্রতিক্রিয়া দিয়ে আরব সফররত রাহুল গান্ধী বলেছেন, “ওঁরা ওঁদের পছন্দসই জোট করেছেন। আমরাও  প্রস্তুতি নিচ্ছি। বিজেপি আসন পাচ্ছে না, এটা স্পষ্ট।” এ দিকে শোনা যাচ্ছে, ৩৮টি করে আসনে দু’ দল লড়বে। কিন্তু দু’-একটি আসন নিজের কোটা  থেকে অন্য দলকে দিতে পারেন অখিলেশ। একটি আসন তাঁর কোটা থেকে অজিত সিংকে দেবেন মায়া। প্রসঙ্গত, পশ্চিম উত্তরপ্রদেশের তিনটি আসনে আরএলডি থাকলে বিজেপির লড়াই আরও কঠিন হবে। পূর্ব ও মধ‍্যাঞ্চলে সপা যেমন সব চেয়ে শক্তিশালী তেমনই পশ্চিমাঞ্চলে মায়াবতী। পশ্চিমের ২৫টি আসন সুরক্ষিত হবে অজিত সঙ্গে থাকলে।

’৯৩-তে মুলায়ম-কাঁসিরাম জোট হয়েছিল জনতা দলের নেতাদের মধ্যস্থতায়। এ বারও কর্নাটকের জোটের মূল কারিগর দেবগৌড়া অনুঘটকের কাজ করেন। তবে, অখিলেশের উদ্যোগই জোটের ভিত গড়েছে। দেওয়ালের লিখন পড়তে পেরেছেন প্রথম অখিলেশ। উত্তরপ্রদেশের মানুষই প্রথম অগ্রণী হয় লোকসভার তিনটি উপনির্বাচনে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ রুখতে। তখনও নেতাদের ঘুম ভাঙেনি। সর্বাগ্রে সজাগ হন অখিলেশ, নিচুতলায় সাধারণ মানুষের জোট দেখে। কারণ সাধারণ মানুষ নেতাদের ওপর ভরসা না রেখে নিজেরাই জোট বাঁধে। নিচুতলার অনগ্রসর, দলিত ও সংখ্যালঘু  মানুষ। এবং তার অনিবার্য পরিণতিতে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে গোরখপুরের গেরুয়া দুর্গ। সেই পদাঙ্কই অনুসরণ করে ফুলপুরও। তৃতীয় উপনির্বাচনেও ঘটে একই ঘটনা। ফলে নিচুতলার মানুষের জোটই দলগুলোকে পথ দেখায়।

আরও পড়ুন মোদীর বিকল্প খুঁজতে কর্পোরেটের হাত, সংঘের জলমাপা শুরু গড়কড়ি ঘুঁটিতে

কিন্তু মুলায়ম সম্পর্কে তীব্র অ্যালার্জি মায়ার। ’৯৩-র জোট ভাঙার আড়কাঠি তিনিই, সেই কারণে। তা ছাড়া, কাঁসিরাম ও মায়াবতীর মধ্যে দুস্তর ফারাক। কাঁসিরাম হয়তো মুলায়মকে ক্ষমা করতেন। কিন্তু মায়া তা হতে দেননি। উত্তরপ্রদেশের সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত মায়া কাঁসিরামকে দিয়ে কবুল করিয়েছিলেন যে, এ রাজ‍্যের ব‍্যাপারে মায়াবতীর সিদ্ধান্তে তিনি হস্তক্ষেপ করবেন না। তার পর বিজেপির উত্থানের পাশাপাশি মান্ডার রাজা বিশ্বনাথপ্রতাপ বহু চেষ্টা করেছেন মুলায়ম-মায়াবতীকে জোটে আনার। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভেস্তে গিয়েছে। অবশেষে লোকসভা থেকে মুছে যাওয়ার পর মায়াবতী জোটের অঙ্ক  করতে শুরু করেন। অখিলেশের নেতৃত্বে আসার ঘটনা তাঁকে সুবিধাজনক পরিস্থিতিতে এনে দাঁড় করায়। আর উত্তরপ্রদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সর্বাগ্রে ইগো বিসর্জন দেন অখিলেশ যাদব। যে ভুল মুলায়ম করেছিলেন তার আর পুনরাবৃত্তি না করার প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সঙ্গে বুয়ার কাছ থেকে আদায় করে নেন মিত্রতার সম্মান। দু’জনেই প্রাক্তন মুখ‍্যমন্ত্রী। সিকি শতকের ব‍্যবধানে মায়াবতী হয়েছেন তিন বার এবং মুলায়মও তিন ও তিনি এক বার। আপাতত, অখিলেশের রাজনৈতিক সাফল্য, তিনি মূল শত্রু থেকে মায়াবতীর মূল মিত্র হতে পেরেছেন এবং জোটে না থেকেও  বোঝাপড়ার হাত বাড়িয়ে আছেন রাহুল। মায়াবতী বলছেন, চিন্তা নেই, এই জোট লম্বা রাস্তা চলবে। লোকসভাতেই শেষ নয়, বিধানসভাতেও বহাল থাকবে। আর রাহুল অলিখিত অনাক্রমণ চুক্তিতে শরিক। বলছেন, আমরা বুঝে নেব। বিজেপি তো জিতছে না, তা হলেই হল। যে কারণে এই জোট ও বোঝাপড়া, তার ভেতরে আছে দু’জনেরই পাখির চোখ, জোটের নেতৃত্ব। যে উচ্চাশা থেকে নিরাপদ দূরত্বে আছেন অখিলেশ। মায়ার ভাতিজা হয়ে তিনি চান লখনউয়ের তখ্‌ত।

 

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here