বিজেপির বাজপেয়ীযুগ শেষ, মমতার কাছে অটলের দূত ছিলেন অরুণ

0
arun jaitely
ছবি সৌজন্যে দ্য হিন্দু।
debarun roy
দেবারুণ রায়

অটলবিহারী বাজপেয়ীজির ঘরানার রাজনীতিবিদ হলেও রাজনাথ সিং রাজধানী দিল্লির দিলওয়ালা নন। দিল্লির তখত্ তাউস আর মসনদের মানচিত্র তাঁর হাতের তালুতে আঁকা নয়, যা ছিল জেটলি ও সুষমার। বাজপেয়ীজি শয‍্যাগত হওয়ার পর আরেক জন মহীরুহ ছায়া দিতে পারতেন উচ্চাভিলাষী দলকে। কিন্তু মার্গদর্শক মণ্ডল যে বিজেপির আখরি গ‍্যারেজ তা বোঝানো হল। লালকৃষ্ণ আডবাণীর মতো চাণক্য তাঁর জীবদ্দশাতেই দেখলেন, বিজেপিতে তিনি মূল‍্যহীন। শিষ‍্যকুলে যাঁকে শীর্ষে রেখে প্রখর প্রচ্ছায়ায় ঘিরে ফেলা হল আডবাণীর অবয়ব, তিনি ২০১৪-র প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী মোদী। এবং একে একে একদা লৌহপুরুষের হাতে গড়া যে ক’ জন জুনিয়রকে নিয়ে সাজানো হল নয়া জমানার দরবারি চালচিত্র তাঁদের মধ্যে থাকলেন বেঙ্কাইয়া নাইডু, সুষমা স্বরাজ, অরুণ জেটলি, অনন্তকুমার, রবিশঙ্কর প্রসাদ।

আরও পড়ুন সে দিনের স্মৃতি: ফিল গুডে হাজারিকার হাহাকারের গান, হাসিমুখে সহনশীল সুষমার প্রস্থান

বেঙ্কাইয়াকে  দেওয়া হল সাংবিধানিক দায়িত্ব। দৈনন্দিন পলিটিকিংয়ের বাইরে পড়ল বেঙ্কাইয়ার লক্ষ্মণরেখা। অনন্তকুমারের মৃত্যু মারাত্মক ক্ষতির সূচনা করল বিজেপির দ্বিতীয় প্রজন্মের নেতাদের সারিতে। প্রমোদ মহাজনের অকাল মৃত্যু যে গোষ্ঠীকে কার্যত অকেজো ও সম্পূর্ণ আডবাণীনির্ভর করে তোলে তাদের মধ্যে একমাত্র সুষমা স্বরাজ ছাড়া প্রত‍্যেকই চশমার কাচের রং বদলে নেন। এবং অরুণ জেটলি আগাগোড়া সঙ্গী থেকেও শেষরক্ষা করতে পারেননি। শরীর প্রচণ্ড খারাপ, তৎসত্ত্বেও সরকারের সিদ্ধান্ত ও বিতর্কিত অবস্থানের স্বপক্ষে ব্লগ লিখেছেন। এই শেষের ক’টা দিন শুধু  ব্লগে তাঁর উত্তর মেলেনি।

সুষমা ও অরুণ অনেক দিক থেকেই সতীর্থ ছিলেন বলে খুব ভালো সমীকরণ ছিল দু’জনের। কিন্তু একটি প্রশ্নে দু’ জনের মত কখনও মেলেনি। সেই প্রশ্নটি আডবাণী। অখিল ভারতীয় বিদ‍্যার্থী পরিষদের কাল থেকেই আডবাণীর সঙ্গে সঙ্গত অরুণের। সংঘের নীলনয়ন বালক বরাবরই। আডবাণীর সংস্পর্শে জীবন আরও উজ্জ্বল। শেষ পর্যন্ত হাওয়ালা মামলায় দিল্লি হাইকোর্ট থেকে আডবাণীকে বেকসুর করে আনা তাঁর কৌঁসুলি জীবন ও সক্রিয় রাজনৈতিক কার্যকলাপের সন্ধিস্থলে একটা মাইলফলক।

তার পর প্রায় এক দশক আডবাণীর শিবিরে নিজেকে চোস্ত করেছেন রাজনীতি ও কূটনীতিতে। বিচারধারা আগেই তীব্র ছিল। তাতে শাণ দিয়েছেন দক্ষ গুরুর সান্নিধ্যে। যে কারণে, বাহ‍্যত নরমপন্থী বলে মনে হলেও তিনি হিন্দুত্বের বিচারধারার মূল্যে কখনও সমঝোতা করেননি। এবং মিষ্টভাষী হয়েও কখনও কঠোর কথা বলতে পিছপা হননি। আডবাণীর ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যই তাঁকে দলের স্ট্র‍্যাটেজিস্ট হিসেবে তৈরি ও সফল করে। সংগঠনে বড়ো দায়িত্ব দেয়। তবে শারীরিক সমস্যা অনেক দিন ধরেই জেটলির রাজনৈতিক কেরিয়ারের কাঁটা হয়েছে। ডায়াবেটিস, হৃদযন্ত্রের সমস্যা ও শেষে কিডনির গোলযোগ তাঁর অকালে চলে যাওয়ার কারণ। ওকালতিতে বিরাট সাফল্য তাঁকে বিপুল বিত্তবান করে তুলেছিল। সেই সঙ্গে অর্থনৈতিক পরিচালনার ‍খুঁটিনাটি।

বাজপেয়ীজির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ে ১৯৯৮ নাগাদ। ধীরে ধীরে ধীরে বাজপেয়ীজির মন্ত্রমুগ্ধকর ব‍্যাক্তিত্ব, প্রমোদ মহাজন, যশবন্ত সিংয়ের সান্নিধ্য তাঁকে অটলবিহারীর আরও বেশি কাছাকাছি নিয়ে যায়। ক্রমশ দূরত্ব বাড়তে থাকে আডবাণীর সঙ্গে। রাজনীতির রংও বদলাতে থাকে। এনডিএ গড়া ও সরকার টিকিয়ে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় লজিস্টিক্স জোটানো ও জোগানোর অন‍্যতম মূল দায়িত্ব ছিল জেটলির। ষ্ট্র‍্যাটেজি কাম পাবলিক রিলেশনস – এই দ্বিমুখী কুশলতায় কুশলী জেটলি মমতা বন্দ‍্যোপাধ‍্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস গড়ে তোলা ও তাকে বড়ো করার ক্ষেত্রে বিরাট অণুঘটক ছিলেন। তৃণমূলের জন্মের কার্যকারণে বাজপেয়ী, আডবাণী-সহ বিজেপির নেতৃত্ব ও এনডিএ-র আহ্বায়ক জর্জ ফার্নান্ডেজ‍ সম্পূর্ণ ভাবে জড়িত ছিলেন বলেই তাঁদের নির্দেশে মমতার সঙ্গে লিয়াজঁ করতেন অরুণ। নির্বাচনের আগে ও নির্বাচন চলাকালীন চার্টার্ড বিমানে চেপে আসতেন অরুণ যাবতীয় লজিস্টিক্স জোগাতে। তখন সদ‍্য বঙ্গ কংগ্রেসের বিভাজনের বীজ থেকে জন্মানো তৃণমূলের অত বড়ো সংসদীয় নির্বাচনে লড়ার সঙ্গতি ছিল না। সে কথা মনে রেখেই অটলজি পাঠাতেন অরুণকে। মমতার দলের নাম্বার টু হিসেবে মুকুল রায়ের সঙ্গে স্বভাবতই পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন নেত্রী। সেই পরিচয় ঘনিষ্ঠতায় পৌঁছেছিল। পরে আবার যখন তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে গেলেন মুকুল তখনও তিনি প্রথম অরুণ জেটলিরই দ্বারস্থ হন দিল্লিতে নর্থ ব্লকের অর্থ মন্ত্রকে।

অরুণ জেটলি, লালকৃষ্ণ আডবাণী ও সুষমা স্বরাজ। ছবি সৌজন্যে ডেইলি মেল।

তৃণমূল গড়ে ওঠার সময় বিজেপির দ্বিতীয় প্রজন্মের নেতারা প্রত‍্যেকেই মমতার ঘনিষ্ঠ হন। বিভিন্ন রাজ‍্যের বিজেপি মুখ‍্যমন্ত্রীরাও ছিলেন তাঁদের মধ্যে। ছিলেন মোদীও। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যাঁদের সঙ্গে সম্পর্কে কোনো ফাটল ধরেনি তাঁরা হলেন সুষমা ও জেটলি। এ ছাড়া রাজনাথ, বেঙ্কাইয়া, উমা প্রমুখের সঙ্গে আজও সুসম্পর্ক ও সৌজন্য অবিকৃত বাংলার মুখ‍্যমন্ত্রীর সঙ্গে। এটা অবশ্যই বাজপেয়ীজির ঘরানা, যাকে উজ্জ্বল করেছেন জেটলি ও সুষমার মতো নক্ষত্র।

কিন্তু বুদ্ধিজীবী ও তাত্ত্বিক নেতাদের যা হয়, জেটলির বরাতেও তা-ই জুটেছিল। দল ও সরকার পরিচালনায় যথযোগ‍্য অবদান রেখেও কখনও জননেতা হতে পারেননি জেটলি। চিরকাল গুজরাত, মধ্যপ্রদেশের মতো বিজেপি রাজ‍্য থেকে রাজ‍্যসভায় নির্বাচিত হয়ে এসেছেন। লোকসভায় জেতার স্বপ্ন অধরাই থেকে গিয়েছে। ২০১৪-র তথাকথিত মোদীলহরও অমৃতসর থেকে জেটলিকে জেতাতে পারেনি। পাটিয়ালার মহারাজা, পঞ্জাবের মুখ‍্যমন্ত্রী ক্যাপ্টেন অমরিন্দর সিংয়ের কাছে হেরেছেন। কিন্তু সেই নির্বাচনে মোদী অমৃতসরে প্রচারে গিয়ে প্রাণপণে চেষ্টা করেও কিছু করতে পারেননি। মোদীলহর বলে সারা দেশে যে কোনো হাওয়াবাতাস ছিল না, জেটলির হারই তার প্রমাণ।

ইতিহাস মিথ্যে বলে না। বরং সত‍্যের খেই ধরিয়ে দেয়। নরমপন্থী বলে পরিচিত জেটলি দলের কর্মসূচি ও বিচারধারায় নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন বলেই, ব‍্যক্তিতন্ত্রের পূজারি কদাচ ছিলেন না। সে জন্যই সমস্ত নতুন মুখ‍্যমন্ত্রীর নির্বাচন থেকে রাজ‍্য পরিচালনা, সব ক্ষেত্রেই জেটলি পথপ্রদর্শক। গুজরাত গড়ে মোদীর প্রতিষ্ঠা, ২০০২-এর গণহত্যা-উত্তর আইনি কাঠগড়া থেকে বিজেপি নেতাদের রেহাই, মধ্যপ্রদেশে উমা ভারতী, ছত্তীসগঢ়ে রমন সিংয়ের অভিষেক ও প্রতিষ্ঠা, সবেতেই ছিলেন অরুণ।

দ্বিতীয় প্রজন্মের স্টলওয়ার্ট এবং দিল্লির ক্ষমতার অলিন্দের নাটবল্টু চেনা আইনজীবী অরুণকে হেরে যাওয়া সত্ত্বেও মন্ত্রিসভায় নিয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্বের দু’টি পদ দিয়েছিলেন মোদী। কিন্তু সার্বিক ভাবে যোগ্যতা, দক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতায় এগিয়ে থাকা অরুণ কোনো কারণে কি অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠেছিলেন? যদিও জনমোহিনী ভাবমূর্তিতে মোদী এগিয়ে ছিলেন বরবরই। নানা ইস‍্যুতে বিতর্ক অনিবার্য হলেও তা বাধেনি। কারণ অরুণ বলতেন, সরকার চালানোর ব‍্যাপারে শেষ কথা বলার অধিকার প্রধানমন্ত্রীরই থাকবে। তবুও শহুরে সম্ভ্রম, আভিজাত্য ও ঝকঝকে ব‍্যক্তিত্বের সুষমা, অরুণকে বিরোধীদের কাছেও প্রিয় করে তুলেছিল। এই সর্বজনীন গ্রহহণযোগ‍্যতাই তাঁকে দলে ও সরকারে ঈর্ষণীয় করেছিল।

সমঝোতা পন্থী ও আগাগোড়া সংঘাত এড়িয়ে চলা অরুণকেও শেষ পর্যন্ত স্বেচ্ছায় সরে যেতে হল কি শুধুই স্বাস্থ্যের কারণে? এ প্রশ্নটা পরিশীলিত ও সহনশীল রাজনীতিবিদদের সঙ্গে জড়িত হয়েই থাকে সব সময়। বিশেষ করে সংযত ও মিতভাষণ এবং অনাটকীয়তা যাঁদের বৈশিষ্ট্য। স্বাভিমান তবুও জাগ্রত হয়। সেটা এক এক জনের ক্ষেত্রে এক এক রকম। সুষমা যেমন আগাম বলে দেন আর ভোটে নেই তিনি, তেমনি আরেকটু অন‍্য ভাবে অরুণ মোদীকে লেখেন, নরেন্দ্র ভাই, আমাকে এ বার বাদ দিন। মোদী ছুটে যান, যদিও তাঁর লিস্টে দেখা যায় নির্মলার নাম। রাজনাথ সুস্থ ও সক্ষম। বিগত সরকারের স্বরাষ্ট্রে কোনো পদস্খলনও নেই। কাশ্মীর? পুলওয়ামা? সে তো পিএমও-এর, এনএসএ-র চারণভূমি। কিন্তু অমিত এলেন। ইদানীং সংকেত পাচ্ছিলেন অনেকেই, যে তাঁদের প্রয়োজন ফুরিয়েছে। মন্ত্রণাও এখন মন কি বাত। ঠিক এই সময়ে কিছুটা কাকতলীয় ভাবেই সুষমার পরে অরুণের শান্ত ধীর পায়ে প্রস্থান রঙ্গমঞ্চ থেকে। অনেক কথা যাও যে বলি কোনও কথা না বলি…।

ওঁরা শুধু প্রস্থানটাই ভেবেছিলেন। মহাপ্রস্থান নয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here