রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায়কে আপাতত ভুল বোঝানোর নেই কেউ

0

জয়ন্ত মণ্ডল

অনেক ঘাম ঝরিয়েছেন। কাঠখড় পোড়াতেও হয়েছে অনেক নিশ্চয়। বাংলায় না হলেও ত্রিপুরায় গিয়ে তৃণমূলে ফিরেছেন অনুতপ্ত রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায়। অভিমান আর জেদের বশেই ভোটের আগে তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে ভিড়েছিলেন বলেও জানিয়েছেন। পুরো দোষ ঠেলেছেন গেরুয়া ঘরে। বলেছেন, “ভুল বুঝিয়ে ছিল বিজেপি”। তবে রাজ্য-রাজনীতির গতিবিধি দেখে ঠাওর করাই যায়, আপাতত রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায়কে ভুল বোঝানোর নেই কেউ।

বিধানসভা ভোটের আগে থেকেই তৃণমূলের একাংশের বিরুদ্ধে ক্ষোভটোভ উগরে দিচ্ছিলেন তৎকালীন মন্ত্রী এবং তৃণমূল নেতা হিসেবে পরিচিত শুভেন্দু অধিকারী। অনেক জল্পনা-কল্পনা-আলোচনার পর গত বছরের ১৯ ডিসেম্বর কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের উপস্থিতিতে বিজেপিতে যোগ দেন নন্দীগ্রামের বিধায়ক। সম্ভবত, এই ঘটনাই আপাদমস্তক নাড়িয়ে দেয় রাজীবকেও। তিনিও শিবির বদলের সিদ্ধান্ত পাকা করে ফেললেন। এবং ঘটনাপ্রবাহ দেখে ধরে নেওয়া যায়, শুভেন্দুর মতোই তিনিও হয়তো অমিত শাহের হাত থেকেই পদ্ম-পতাকা তুলে নেওয়ার প্রতিজ্ঞা করেছিলেন। বিশেষ কারণে শাহ কলকাতায় আসতে না পারায় তিনিই দৌড় লাগালেন। দিল্লিতে বিস্ফোরণের জন্য অমিতের সফর বাতিল হয়। চার্টার্ড বিমানে দিল্লি গিয়ে শাহী দরবারে হাজির হয়ে দলবদল তো করলেনই, সঙ্গে দুম করে বলে বসলেন, “এ বার বিজেপির পাখির চোখ বাংলা”।

কিন্তু বিজেপির পাখির চোখ বাংলায় হলেও রাজীবের চোখ পড়ে রইল হাওড়ার ডোমজুড়ে। ‘ডিল’ অনুযায়ী প্রার্থীও হলেন ওই কেন্দ্রেই। কিন্তু হতাশা ছাড়া আর কিছুই মিলল না। হতাশা ঝেড়ে ফেলতে সময় লাগল বই-কি। হেরে যাওয়ার পর তৃণমূলের নেতাদের দোরে দোরে হত্যে দিলেন। ডোমজুড়ের তৃণমূল নেতৃত্ব (শোনা যায় সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের গোষ্ঠী) রাজীবের তৃণমূলে প্রত্যাবর্তনে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। যে কারণে মুকুল রায়ের মতো ভোটে জেতা থেকে হেরে যাওয়া সব্যসাচী দত্তরা ঘরে ফিরলেও বিলম্ব ঘটে গেল রাজীবের বেলায়।

মানতেই হবে রাজীব এখন নিজের ভুল বুঝতে পেরেছেন। বলছেন, “আমি এবং আমরা যে ভুল ছিলাম, তাও প্রমাণ হয়ে গিয়েছে। বাংলার মানুষ প্রমাণ করে দিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই ঠিক’’। রাজীবের এই কারুকার্যময় ভুলস্বীকারকে ত্রিপুরায় ‘ক্যাশ’ করতে পারে তৃণমূল। মানে, বিজেপিতে গিয়ে ঠিক যেমনটা ভুল করেছিলেন রাজীব, ত্রিপুরার মানুষও যে ২০১৮-য় বিজেপিকে রাজ্যের ক্ষমতায় এনে কতটা ভুল করেছিলেন, তার একটা টেকসই উদাহরণ হয়ে উঠতে পারেন রাজীব।

তেমনই ইঙ্গিত দিয়েছেন স্বয়ং রাজীব। আগরতলার মঞ্চে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত থেকে তৃণমূলের পতাকা আবার এক বার তুলে নিয়ে তিনি বললেন, ‘‘বিজেপিকে বিশ্বাস করে আমার যেমন বিশ্বাসভঙ্গ হয়েছে, তাই আপনাদেরও বলব বিজেপিকে বিশ্বাস করবেন না’’। ত্রিপুরার আগামী পুরভোট, তার পরে বিধানসভা ভোটে বিজেপির বিরুদ্ধে বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগ শানাতে তৃণমূলের ‘পোস্টার বয়’ হয়ে ওঠার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে রাজীবের।

বরাবরই তৃণমূলের মৃদুভাষী এবং কাজের নেতা হিসেবেই পরিচিত ছিলেন রাজীব। তৃণমূল ছাড়ার পরেও তাঁর মধ্যে সৌজন্যতা বোধ বা শিষ্টাচারের ঘাটতি চোখে পড়েনি। তবে ‘ঘর ওয়াপসি’র পর এখন তাঁকে আগের থেকে অনেকটাই সাহসী দেখাচ্ছে। আগরতলায় নিজের বক্তব্যের শেষে রাজীব যখন বলেন, “অভিষেক আসছে, বিপ্লব দেব কাঁপছে”, তখন তো তেমনটাই মনে হয়। উলটো দিকে ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রীর মধ্যে কতটা ভয় কাজ করছে, সেটাও তিনি অনুভব করতে পারছেন। বলেন, “এত ভয় কীসের? ভয় কখন হয়, যখন গদি টলমল হয়। আজ গদি টলমল হয়ে গিয়েছে। তাই এত ভয় পাচ্ছেন”। ঠিকই ধরেছেন রাজীব, গদি টলমল করলে ভয় হয়। ৩০ জানুয়ারির আগে কতকটা এমনই কোনো ভয় জাপটে ধরেছিল তাঁকেও। তা না হলে ৯ মাসের ব্যবধানে তিনি ভুল স্বীকার করতে যাবেন কোন দু:খে!

বিধানসভা ভোটে বাংলায় বিজেপির ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকারের প্রচারক বুঝতে পারছেন, এখন দুয়ারে সরকার আছে, সেই ভয় গায়েব। সিঙ্গল ইঞ্জিনে রাজ্য চালানো তৃণমূল এখন দেশ চালানোর পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। সেটা কতটা বাস্তবায়িত হবে, তা সময়ই বলবে। কিন্তু ইঞ্জিনের সংখ্যা বড়ো কথা নয়, ইঞ্জিনের ক্ষমতা কতটা, সেটাই বিচার্য। সেই অঙ্ক মাথায় ঢোকাতে না পেরেই মাঝখান থেকে কয়েক মাসের জন্য তৃণমূলের চোখে ‘গদ্দার’ হয়ে গেলেন রাজীব! অবশ্য, তৃণমূলের গদ্দার-এর তালিকায় অনেক নাম। যে তালিকা ক্রমশ ছোটো হচ্ছে। এখন প্রশ্ন একটাই, ওই তালিকার সংখ্যা একে গিয়ে ঠেকলে যে নামটা পড়ে থাকবে, তিনিই কী ভুল বুঝিয়েছিলেন রাজীবকে?

এত তাড়াহুড়োর দরকার হয়তো নেই। সবে তো ঘরে ফিরলেন, সেটাও না হয় জানা যাবে কয়েক দিনের মধ্যেই। তাড়াহুড়ো নাই-বা থাকুক বন-সহায়ক নিয়োগে দুর্নীতির অভিযোগ খতিয়ে দেখার তদন্ত নিয়েও। যে অভিযোগ তুলেছিলেন স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী। কারণ এখন আগের থেকে অনেক বেশি সাহসী প্রাক্তন বনমন্ত্রী আর আপাতত তাঁকে ভুল বোঝানোর নেই কেউ!

আরও পড়তে পারেন: বিজেপি স্বপ্ন দেখিয়েছিল, তৃণমূলে ফিরে বললেন রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায়

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন