নয় নয় করে বারো বছর, আর্তজনের সেবাকাজে এগিয়ে চলেছে ‘গড়িয়া সহমর্মী’

0
গড়িয়া সহমর্মী।
'ইয়াস'-এর পরে সুন্দরবনে ত্রাণ বিতরণ।

সুব্রত গোস্বামী

দেখতে দেখতে বারোটা বছর পেরিয়ে এলাম। বারো বছর মানে এক যুগ। তা এক যুগই বটে। পিছন ফিরে তাকালে মনে হয় কত পথ পেরিয়ে এসেছি। নিজেদের উদ্দেশ্য, নিজেদের লক্ষ্য স্থির রেখে পথ হাঁটছি। আরও অনেক অনেক পথ আমরা হাঁটব, এই প্রত্যয় আমাদের আছে, কারণ এ পথের তো কোনো অন্তিম বিন্দু নেই।

Shyamsundar

আর্তজনের সেবার উদ্দেশ্য নিয়ে ঠিক বারো বছর আগে গড়ে তোলা হয়েছিল ‘গড়িয়া সহমর্মী সোসাইটি’। নামে ‘সহমর্মী’, কাজেও ‘সহমর্মী’। সহমর্মী আমরা দু’ ভাবে – যাঁদের সেবা করার উদ্দেশ্যে এই সংগঠন গঠিত, তাঁদের প্রতি আমরা সব সময়েই সহমর্মী, আর আমরা যারা ‘সহমর্মী’র সদস্য, তারা একে অপরের সঙ্গে এক গভীর সহমর্মিতার সূত্রে বাঁধা। তা না হলে, একটা সংগঠনের পক্ষে অবিচ্ছেদ্য ভাবে এক যুগ পথ চলা, খুব সহজ কথা নয়।

চক্ষু অস্ত্রোপচার শিবির ও স্বাস্থ্যশিবির

চক্ষু অস্ত্রোপচারের পরে।

শোষিত, নিপীড়িত, দুর্দশাগ্রস্ত, বিপন্ন, দুস্থ মানুষের দিকে নানা ভাবে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় ‘সহমর্মী’। প্রতি বছর নিয়ম করে আয়োজন করে বিনা ব্যয়ে চক্ষু অস্ত্রোপচারের ব্যবস্থা করা হয়। প্রতিষ্ঠিত ডাক্তারদের দিয়ে চোখ পরীক্ষা করানো, তার পর অস্থায়ী হাসপাতাল গড়ে চোখ অপারেশন করানো এবং সব শেষে চশমা বিতরণ – প্রতি বছর শীতের সময় মাস দুয়েক ধরে এই কর্মকাণ্ড চলে। চক্ষু অস্ত্রোপচার হয় শংকর নেত্রালয়ে।   

‘সহমর্মী’র পাশে ভাঙ্গড় কলেজের এনসিসি ক্যাডেটরা।

সুন্দরবনের প্রত্যন্ত প্রান্তে বছরের বিভিন্ন সময়ে নিয়মিত ভাবে স্বাস্থ্যশিবির চালায় ‘সহমর্মী’। সেই শিবিরে থাকেন ডাক্তাররা, তাঁরা রোগীদের দেখে রোগ নির্ণয় করে ওষুধ প্রেসকাইব করেন এবং ‘সহমর্মী’র তরফে বিনামূল্যে সেই ওষুধ সরবরাহ করা হয় আর্তজনকে। ওই শিবিরে নিখরচায় রক্তপরীক্ষা এবং ইসিজি করানোরও ব্যবস্থা থাকে। শুধু তা-ই নয়, ‘সহমর্মী’ দলগত ভাবে এবং তার সদস্যরা ব্যক্তিগত ভাবে বিপন্ন মানুষদের জন্য রক্তদানেরও ব্যবস্থা করে। ক্যানসার আক্রান্ত রোগীদের আর্থিক সহায়তাও দেয় ‘সহমর্মী’।

শারদীয়া দুর্গাপুজোয়  

ঠাকুর দেখতে যাওয়া।

প্রতি বছর শারদীয়া দুর্গাপুজোর সময় আমরা সবাই আনন্দ-উৎসবে মেতে উঠি। কিন্তু ভুলে যাই সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষদের কথা, যাঁরা অর্থের অভাবে তাঁদের সন্তানদের ওই আনন্দ-উৎসব থেকে বঞ্চিত রাখতে বাধ্য হন। অর্থের অভাবে যাঁরা নিজেদের জন্য তো দূরের কথা, তাঁদের শিশুসন্তানদের জন্যও একটা নতুন পোশাকের ব্যবস্থা করতে পারেন না। ‘সহমর্মী’ কিন্তু তাঁদের কথা ভোলে না। প্রতি বছর শারদীয়ায় এঁদের হাতে নতুন পোশাক তুলে দেয় ‘সহমর্মী’।

তবে পোশাক দিয়েই ক্ষান্ত থাকে না ‘সহমর্মী’, পুজোর একটি দিন কলকাতা শহরে বাসে করে ঠাকুর দেখানোরও ব্যবস্থা করে এবং সেই সঙ্গে দুপুরে থাকে জিভে জল আনা ভোজের ব্যবস্থা। এ ছাড়া পুজোভ্রমণে টুকটাক মুখ চালানোর ব্যবস্থা তো থাকেই।

ঠাকুর দেখার পর পেট পুরে খাওয়া।

পুজোয় পোশাক দেওয়া আর দুর্গাপুজোয় কলকাতা শহরে ঠাকুর দেখানো ছাড়াও অভাবী ছাত্রছাত্রীদের প্রতি আরও দায়িত্ব পালন করে ‘সহমর্মী’। তাদের মাসিক অনুদানের ব্যবস্থা করা হয়, কিনে দেওয়া হয় বইখাতা।

সুন্দরবনে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ত্রাণ

আর প্রাকৃতিক দুর্যোগে ত্রাণ? সে তো নিত্যবছরের সেবাকাজ। সুন্দরবনে নিয়মিত ছুটে যাই আমরা। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়-সহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগে ত্রাণের ব্যবস্থা করে ‘সহমর্মী’। গত বছর ঘূর্ণিঝড় ‘উম্পুন’ এবং এ বছর ‘ইয়াস’-এর পরে ‘সহমর্মী’ কত বার যে ত্রাণ নিয়ে ছুটে গিয়েছে সুন্দরবনে, তার হিসেব রাখা কঠিন। দুর্দশাগ্রস্ত মানুষদের মাঝে যেমন বিতরণ করেছে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য, তেমনই করোনা-কালের কথা মনে রেখে বিতরণ করেছে এ সময়ের সব চেয়ে প্রয়োজনীয় উপকরণ মাস্ক আর স্যানিটাইজার। গত বছর পুজোর আগে সুন্দরবনে বাঘের আক্রমণে নিহত ৫০০ পরিবারের বিধবা স্ত্রীদের মধ্যে নতুন কাপড় বিতরণ করেছিল ‘সহমর্মী’।

বারো বছর আগে জুনের একটি দিনে যাত্রা শুরু করেছিল ‘সহমর্মী’। দিনটা ছিল ২৬ জুন। জন্মদিনে আনুষ্ঠানিক কিছু করার চেয়ে সেবাকাজে নিজেদের ব্যস্ত রেখে নিজেদের সংগঠনের জন্মদিন পালন করাতেই আমরা বেশি আনন্দ পাই। এ বছর বারো বছর পূর্তির ঠিক তিন দিন আগে আমরা যাই সুন্দরবনের তারানগর দ্বীপে।

‘ইয়াস’ ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের পর এক মাস কেটে গেছে। তখনও সুন্দরবনের মানুষ বাঁধের উপর দিন কাটাচ্ছেন। তারানগর কলোনিপাড়া অঞ্চল তখনও জলের তলায়। কেউ আছেন ফ্লাড সেন্টারে, কেউ বা কোনো স্কুলবাড়িতে। প্রবল বৃষ্টি উপেক্ষা করে, গ্রামের মা-বোনেরা নদীর পাড়ে ভিড় করেছেন ত্রাণ নেওয়ার জন্য। এ রকম দুর্দশাগ্রস্ত ৪৫০টি পরিবারের হাতে মশারি, গামছা-সহ নানা নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য আমরা ধন্য হলাম। এরাই তো আমাদের কাছে ঈশ্বর।

ত্রাণ দিয়ে যখন বোটে উঠতে যাব, দেখি অশীতিপর পাঁচ বৃদ্ধা মা নদীর তীরে বসে আছেন। ওঁরা কিছুই পাননি। এঁদের দেখে আমার চোখের জল চিবুক স্পর্শ করল। খোঁজ করলাম বোটের ভিতরে। দেখি পাঁচটি খাবারের প্যাকেট রয়ে গেছে। ঈশ্বরই জুগিয়ে দিলেন।

নিরন্ন মানুষদের জন্য খাদ্য।

ত্রাণ বিতরণ করে ফিরে আসার সময় উপনিষদের এক অমোঘ বাণী ‘আত্মনাং বিদ্ধি’ ভীষণ মনে পড়ছিল। মনে পড়ছিল কবি শঙ্খ ঘোষের লেখা – “আমার জন্য একটুখানি কবর খোঁড়ো সর্বংসহা,/গোপন রক্ত যা কিছুটুকু আছে/আমার শরীরে, তার/সবটুকুতে শস্য যেন ফলে”।

‘ডক্টর্স ডে’ পালন

১ জুলাই পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ডা. বিধানচন্দ্র রায়ের জন্ম-মৃত্যুর দিনটি পালন করা হয় ‘ডক্টর্স ডে’ হিসাবে। গড়িয়া সহমর্মী সোসাইটি ও রোটারি ক্লাব অফ ক্যালকাটা, ঢাকুরিয়ার যৌথ উদ্যোগে ওই দিন আট জন মানবপ্রেমী ঈশ্বররূপী মহানুভব ডাক্তারকে সম্মাননা জানিয়ে আমরা নিজেরাই ধন্য ও ঋদ্ধ হলাম। এই অতিমারির দিনে নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তার কথা চিন্তা না করে, তাঁরা যে ভাবে আর্ত মানবতার সেবায় আত্মনিয়োগ করেছেন, মানবসভ্যতার ইতিহাসে তা অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

ডক্টর্স ডে-তে সম্মাননা প্রদান।

যাঁদের সম্মাননা জানানো হল তাঁরা হলেন ডা. ভাস্বতী আচার্য, ডা. মধুমিতা রায়, ডা. ভারতী রায়, ডা. রাই দাস, ডা. সৌম্যব্রত আচার্য, ডা. সুরজিৎ সেন, ডা. নিবিড় চক্রবর্তী ও ডা. প্রসেনজিৎ পাল মহোদয়।

স্বামী বিবেকানন্দের ভাবাদর্শে অনুপ্রাণিত আমাদের এই সামাজিক সংগঠন। ৪ জুলাই ছিল স্বামীজির প্রয়াণ দিবস। ‘শিবজ্ঞানে জীবসেবা’-য় ব্রতী হয়ে ওই দিনে ‘সহমর্মী’র কার্যালয় থেকে গড়িয়া গড়াগাছা অঞ্চলের ১০০ জন নিরন্ন শিশুর মুখে দুপুরের খাবার তুলে দেওয়া হল।

আবার সুন্দরবনে

জুলাইয়ের ৭ তারিখে আমরা আবার ছুটে গেলাম ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত সুন্দরবনে। এ বার আমাদের গন্তব্য ছিল সোনাগাঁ’। ঘূর্ণিঝড়ের পর দীর্ঘ দেড় মাস অতিবাহিত, তবু অবস্থা অপরিবর্তিত। অসহায় মানুষ বাঁধের উপর দিন কাটাচ্ছেন। সন্তান কোলে নিয়ে এক ঘণ্টা হেঁটে মায়েরা এসেছেন একটু ত্রাণের আশায়। আশি বছরের এক বৃদ্ধ আমার হাত ধরে কেঁদে ফেললেন। তিনি এখনও খোলা আকাশের নীচে প্লাস্টিক খাটিয়ে দিন যাপন করছেন। সুন্দরবনের মানুষের দুর্দশার কাহিনির যেন অন্ত নেই। এই নিয়ে চার বার এখানে আসা হল। কিন্তু মানুষ সেই তিমিরেই।

বার বার সুন্দরবনে।

এ বার ৩০০ জন নিরন্ন আত্মজনের সেবায় সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির পাশাপাশি পোশাকআশাকও তুলে দিলাম। মনে পড়ে গেল স্বামী সারদানন্দ-এর কথা। তিনি বলেছিলেন, “পরের টাকা পরকে দিবি; তুই কি দিবি? তুই দিবি তোর হৃদয়, প্রাণ-মন, তোর ভালোবাসা।”

এক সপ্তাহ পরে আবার যাত্রা সুন্দরবনে, এ বার বড়ো মোল্লাখালি ও মালসাখালি গ্রামে। ঘূর্ণিঝড়ে বিধস্ত মানুষগুলোর অবস্থার কোনো পরিবর্তন নেই। এখনও অসহায় আত্মজনদের একটু খাবারের জন্য তীব্র হাহাকার প্রত্যক্ষ করলাম। কবে মিটবে এই হাহাকার? ‘ইয়াস’-এর পর এই নিয়ে পাঁচ বার আমরা গেলাম। প্রতি বারই আশা নিয়ে যাই, ভাবি এ বার বোধহয় কিছু পরিবর্তন দেখব। কিন্তু ফিরে আসি একরাশ হতাশা নিয়ে।

বালিতে ত্রাণ।

বালিতে ‘সহমর্মী’-র কাজ

বালিতে রয়েছে ‘সহমর্মী’-র দ্বিতীয় শাখা। তারা সেখানে নানা সেবামূলক কাজ করে থাকে। বেলানগরের ইটভাটার শিশু ও মহিলা শ্রমিকদের মধ্যে বছরে চার বার করে খাদ্যশস্য, জামাকাপড়, কম্বল বিতরণ করে।  

করোনা-আক্রান্তদের সেবায় ‘সহমর্মী’র হয়ে ডা. প্রসেনজিৎ পাল।

গত দেড় বছর ধরে গোটা বিশ্ব এক দুর্যোগের মধ্য দিয়ে চলেছে – করোনা-দুর্যোগ। সাধারণ মানুষের জীবন এক সংক্রামক ভাইরাসের আক্রমণে বিধ্বস্ত। বহু মানুষ রুজি-রোজগার হারিয়েছেন। ভাইরাসের আক্রমণ থেকে বাঁচতে মানুষ ঘরবন্দি থাকতে বাধ্য হচ্ছেন দীর্ঘদিন ধরে। এই সময় রুজি-হারানো মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে গড়িয়া সহমর্মী। ঘরবন্দি মানুষের কাছে খাবারও পৌঁছে দিচ্ছে তারা।

করোনা আক্রান্ত পরিবারে খাদ্য বিতরণ।

‘শিবজ্ঞানে জীবসেবা’ 

ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছিলেন ‘শিবজ্ঞানে জীবসেবা’-র কথা। যা শুনে স্বামীজি এর মধ্যে দেখতে পেয়েছিলেন ‘বহুজনসুখায় বহুজনহিতায়’ বেদান্তের প্রয়োগ দিকটি। এই বাণীকে সামনে রেখেই আমাদের প্রাণের প্রিয় ‘গড়িয়া সহমর্মী’ তার পথ চলা শুরু করেছিল। জনস্বাস্থ্য, প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে ত্রাণ বিতরণ, আদিবাসী কল্যাণ ও সংস্কৃতি ক্ষেত্রে সেবামূলক কাজ করে থাকি আমরা।

‘সহমর্মী’ ঝাঁপিয়ে পড়ে স্বচ্ছতা অভিযানে। সমাজের বঞ্চিত মহিলাদের স্বনির্ভর করে তোলার জন্য নানা ধরনের বৃত্তিগত কোর্সের মাধ্যমে তাঁদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে ‘সহমর্মী’। এই সব কোর্সের মধ্যে রয়েছে কাটিং-টেলারিং, বিউটিসিয়ান, ফুড প্রসেসিং, ইলেক্ট্রিক্যাল ইত্যাদি। ‘সহমর্মী’ এই কোর্স পরিচালনা করে নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশনের জন শিক্ষণ সংস্থানের (জেএসএস) সহযোগিতায়।     

বিউটিসিয়ান কোর্সের সার্টিফিকেট প্রদান।

এই বিশাল কর্মকাণ্ড সম্পাদিত হয় শতাধিক শুভানুধ্যায়ী ও সদস্যদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায়। আমাদের একটাই  লক্ষ্য – আত্মার মুক্তি ও জগতের কল্যাণসাধন। আমাদের এই সেবাকাজে যারা আমাদের সাথী থাকে, যাদের ছাড়া আমরা এই কাজ করতে পারতাম না, সেই কে কে দাস কলেজ, বিজয়গড় জ্যোতিষ রায় কলেজ ও ভাঙ্গড় কলেজের এনসিসি ইউনিটের কাছে আমরা চিরকৃতজ্ঞ।

আরও পড়ুন: জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত সুন্দরবনের অসহায় আত্মজনের পাশে ‘গড়িযা সহমর্মী’

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন