জন্ম থেকেই অটোটিউন-টা কণ্ঠে দিয়েছিলেন ঈশ্বর

0

শিল্প বা শিল্পীর যেমন মৃত্যু হয় না, তবু কোথাও যেন মনে হচ্ছে যে এ শূন্যতা পূরণ হওয়ার নয়। লতা মঙ্গেশকরের প্রয়াণে স্মৃতিমেদুর এ প্রজন্মের সংগীতশিল্পী সংহতি দাস।

আজ সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে সোশ্যাল মিডিয়ায় যে খবরটা দেখলাম, তাতে নি:সন্দেহে শোকাহত। পরে এই কথাটাও মাথায় এসেছে, এত দিন ধরে শারীরিক ভাবে যথেষ্ট লড়াই করে হয়তো তিনি আজকের দিনটার জন্যই অপেক্ষা করেছিলেন। আজ মা স্বরস্বতীর বিসর্জনের দিন, এই দিনটাকেই নিজের চলে যাওয়ার দিন হিসেবে বেছে নিলেন! এটা কোথাও যেন একটা ভীষণ ভাবে মিলে যাচ্ছে।

প্রথমে খবরটা পাই সোশ্যাল মিডিয়ায়। তখনও টিভিতে দেখা বা শোনা হয়ে ওঠেনি। ধাক্কাটা কাটিয়ে উঠতে সময় লেগেছে। পরে নিজের মনকে নিজেই সান্ত্বনা দিয়েছি। এটাও মনে হয়েছে, উনি আমাদের মধ্যে যে রকম ছিলেন, ঠিক তেমনই আছেন, ভবিষ্যতেও থাকবেন। নিয়ম মেনেই এই পৃথিবীর মাটি ছেড়ে সুরলোকে চলে গেলেন শারীরিক ভাবে, কিন্তু ওঁর যে সৃষ্টি সেটা আমাদের হৃদয়ে গেঁথে গিয়েছে, সেটা কোনো ভাবেই যাওয়ার নয়। কথায় রয়েছে, শিল্প বা শিল্পীর মৃত্যু হয় না। তবু কোথাও যেন আবারও মনে হচ্ছে, এ শূন্যতা কখনোই পূরণ হওয়ার নয়।

লতাজি সম্পর্কে বলার মতো বিন্দুমাত্র যোগ্যতা আমার নেই। আমি বা আমার মতো অনেকেই এখনও পর্যন্ত প্রতি মুহূর্তে ওঁর মতো কিংবদন্তির কাছ থেকে শিখে চলেছি সেই ছোটো থেকেই। জন্ম থেকে ওঁর গান শুনে বড়ো হয়েছি, অবশ্যই অনুপ্রাণিত হয়েছি এবং শুধু আমি নয়, আমার মনে হয় সবাই, বিশেষত আমরা যাঁরা গান গাই বা গান গাওয়ার চেষ্টা করি, তাঁরা প্রত্যেকেই ওঁর গান শুনে অনুপ্রাণিত হই, শিক্ষা নিই।

অনেকেই বলেন, এমন শিল্পী বোধহয় আর কখনো সৃষ্টি হবে না। তার সুনির্দিষ্ট কারণও রয়েছে। সমসাময়িক সংগীতচর্চা অন্য মোড় নিয়েছে। আজকাল, আমরা এই প্রজন্মের শিল্পীরা, প্রতি মুহূর্তে অটোটিউন-এর ব্যাপক ভাবে ‘দুর্ব্যবহার’ দেখে আসছি। সেই জায়গায় লতাজির মতো শিল্পীকে বোধহয় জন্ম থেকেই অটোটিউন-টা কণ্ঠে দিয়েছিলেন ঈশ্বর, যা নিজের গানে উজাড় করে দিয়েছেন। ফলত, এ রকম কোকিলকণ্ঠ, এ রকম একজন ব্যক্তিত্বের দ্বিতীয় বার দেখা মেলা দুষ্কর।

তিনি যে এক এবং অনন্য, সেটা একের পর এক প্রজন্ম পার করেও বাস্তবে প্রমাণিত। মাঝে কত কিছু ঘটেছে। এসেছেন কত শিল্পী, কত সংগীতসাধক ইত্যাদি। কিন্তু বলতে দ্বিধা নেই (মঞ্চের অভিজ্ঞতা থেকে) এখনকার প্রজন্মের শিল্পীরা, প্রতি দিন যাঁরা বিভিন্ন অনুষ্ঠানের গান শোনাতে যাই, তাঁদের কাছে লতাজির গানের চাহিদায় কোনো খামতি-ঘাটতি নেই। কে কেমন গাইছে সেটা অন্য কথা। কিন্তু লতাজির গান তো তালিকায় থাকবেই। আর যদি লিস্টে না থাকে, তা হলে সেটা লিখে দেওয়ার জন্য রয়েছেন শ্রোতারা। শ্রোতাদের কাছ থেকে ওঁর গানের অনুরোধ কী ব্যাপক, সেটার জন্য একটা স্ব-অভিজ্ঞতার কথা বলব।

তাঁকে সামনাসামনি দেখার সৌভাগ্য হয়নি আমার। তবে ২০১৮ সালে অসমে একটা রিয়ালিটি শো-এ গিয়ে এক দুর্লভ অভিজ্ঞতা হয়েছিল। ডক্টর ভূপেন হাজারিকাকে নিয়ে ‘আমার ভূপেনদা’ নামে ওই শোয়ে বিচারক হিসেবে ছিলেন উষা মঙ্গেশকর। তাঁর সঙ্গে এবং অনুষ্ঠানে আগত ভূপেন হাজারিকার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে লতাজির প্রতি শ্রদ্ধা আরও বেড়ে যায়। দেখেছি, উষাজি যখনই মঞ্চে উঠছেন, আগে পা থেকে জুতোজোড়া খুলে রাখছেন, তার পর প্রণাম করছেন। গানবাজনার প্রতি কতটা সম্মান-শ্রদ্ধা থাকলে এই নিয়ম প্রত্যেকটা বারের জন্য মেনে চলা যায়, সেটাই দেখেছি উষাজির মধ্যে। ওই অনুষ্ঠানে লতাজির গান গেয়েছি। লক্ষ লক্ষ মানুষ তা দেখেছেন। প্রশংসা করেছেন। ওঁর গান গেয়েই সম্মান পেয়েছি।

ওঁর গান যখন আমরা গাই, তখন একস্ট্রা কোনো ডায়নামিক্স যোগ করার থাকে না। সবটাই উনি আগে থেকেই ঢেলে দিয়েছেন। সেখানে কার জন্যে আর নিজস্বতা দেখানোর কোনো জায়গাই নেই। এ ভাবেই ওঁর গান আর ব্যক্তিত্ব প্রতিটা মহূর্তে অনুপ্রেরণা জুগিয়ে চলেছে, যা সতত বহমান। বইবে এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে। গর্ব এখানেই, আমরা, আমাদের দেশ পেয়েছিল ওঁকে!

আরও পড়তে পারেন

লতার মৃত্যুতে শোককাতর ক্রীড়াঙ্গনও, অমদাবাদের ম্যাচে কালো বাহুবন্ধনী পরে মাঠে নামলেন ভারতের ক্রিকেটাররা 

এক সোনালি যুগের অবসান, প্রয়াত লতা মঙ্গেশকর

সেতু গড়েছিল ‘অ্যায় মেরে ওয়াতান কে লোগো’, কবি প্রদীপের জন্মদিনেই প্রয়াত লতা মঙ্গেশকর

প্রজন্মের পর প্রজন্ম শিখবে, হদয়ে থাকবেন লতা মঙ্গেশকর, করজোড়ে বিদায় জানাচ্ছে বলিউড

সুরলোকে পাড়ি দিলেন বাস্তবের জীবন্ত সরস্বতী, প্রয়াত লতা মঙ্গেশকরের স্মৃতিচারণায় বাংলার সংগীত শিল্পীরা

লতা মঙ্গেশকরের প্রয়াণে দু’দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা কেন্দ্রের, সোমবার রাজ্যে অর্ধ দিবস ছুটি

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন