হেমন্ত করকারে আর প্রজ্ঞা ঠাকুরের মেরুকরণ চান না মোদী?

0
hemant karkare, sadhvi pragya
হেমন্ত করকারে, সাধ্বী প্রজ্ঞা। ছবি সৌজন্যে দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস।
debarun roy
দেবারুণ রায়

হিন্দি বলয়ে কোনো মতেই রাহুমুক্তি হচ্ছে না মোদীজির। রাহুর গ্রাসে বিজেপির পদ্মশিবির থেকে লাগাতার পলায়নে রাহুলের দুর্বল হাত সবল হচ্ছে তিলে তিলে। আরএসএসের জবরদস্ত সংগঠনের শেকড় মধ‍্যপ্রদেশে ছিল সব চেয়ে বেশি প্রভাবশালী। ‘৭৭-এ জনতা পার্টির অভ‍্যুত্থানের পর রাজস্থান ও মধ‍্যপ্রদেশে প্রাক্তন জনসংঘীরা শাখাপ্রশাখা বিস্তার করেন। কৈলাস জোশী, বীরেন্দ্র সকলেচা, সুন্দরলাল পাটোয়ার মতো পূর্বতন জনসংঘের নেতারা মুখ‍্যমন্ত্রী হন। অক্টোপাসের মতো বিভিন্ন মুখের গেরুয়া শিবির সংগঠন ছড়াতে থাকে। আগাগোড়াই রাজস্থানে ও মধ্যপ্রদেশে বিজেপির ভিত এ ভাবে শুরু থেকেই যতটা স্বনির্ভর ও সুগঠিত ততটা গুজরাত বা উত্তরপ্রদেশেও ছিল না। ২০০২-এর পর থেকে মোদীর হাতে পোক্ত হল গুজরাত।

আর উত্তরপ্রদেশের সঠিক উত্তর মোদীও আদায় করতে পারেননি। ভিটে ছেড়ে ভিন রাজ‍্যে এসে প্রথম দফায় বাজিমাত করলেও সংগঠন, জনসমর্থন, কিছুই পুরো ধরে রাখতে পারেননি। সারা দেশে, অকর্ষিত জমিতে দল‍ ‌যত ছড়িয়েছে, চাষাবাদ বাড়িয়েছে, ততই হিন্দি বলয়কে অচেনা অদ্ভুত মনে হয়েছে। যখন ২২ রাজ্য হাত ছেড়ে বিজেপির করকমলে, তখনই হিন্দি বলয়ে পদ্মের পাপড়ি ঝরা শুরু। এবং এই পাপড়ি ঝরানোর পথ দেখিয়েছে রাজস্থান তো বটেই, আসলে মধ্যপ্রদেশ, আদপে যার অর্ধাঙ্গিনী ছত্তীসগঢ়। তবে রাজস্থানের আদি জনসংঘী নেতা ভৈরোঁ সিং শেখাওয়াত জাতীয় স্তরে যে উচ্চতায় গিয়ে প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠেছেন, তেমন উচ্চতা অর্জন করতে পারেননি মধ্যপ্রদেশের নেতারা।  তৎসত্ত্বেও সংঘ পরিবারের সংগঠন রাজস্থানের চেয়ে অনেক  বেশি মজবুত মধ‍্যপ্রদেশে। যার স্পষ্ট প্রতিফলন এ বারের বিধানসভা ভোটের ফলাফলে। কমল ফুল শুকিয়ে গিয়ে কমলনাথ কায়েম হলেন ভোপালে, কিন্তু ভোটের হারে এগিয়ে থাকল বিজেপি।

এই বিচিত্র অঙ্কে ভর করে ১৯-এর ভোটে বিজেপিকে এগিয়ে রেখেছেন বেশ কিছু ভক্তবৎসল মিডিয়া ও মানুষ। তাঁদের যুক্তি, একে তো রাজ‍্যে ভোটের হার কংগ্রেসের চেয়ে বেশি, তার ওপর মোদীভক্তি। রাজ‍্যে রাজ‍্যে নেতারা জনপ্রিয়তা খোয়ালেও মোদীর ‌মাহাত্ম্য  নাকি অটুট।

এই অঙ্কের আর্যভট্টরা ভোটের মুখে ফের বেয়াড়া প্রশ্নের সম্মুখীন। এমন কাণ্ড ঘটালেন সাধ্বী প্রজ্ঞা সিং ঠাকুর, যার কোনো সুস্থ ব‍্যকরণ নেই। যে ব‍্যকরণ ওঁরা মানেন তাতে ভোটের হিসেব গুলিয়ে যেতে বাধ্য। একে মালেগাঁও বিস্ফোরণের গেরুয়া সন্ত্রাসী অভিযোগে অভিযুক্ত, রীতিমতো চার্জশিটের ভিত্তিতে বিচারাধীন। আপাতত জামিনে ছাড়া পেয়েছেন। প্রজ্ঞার এ হেন প্রোফাইল নিয়েই যথেষ্ট বিড়ম্বনায় বিজেপি। তায় মরার ওপর খাঁড়ার ঘা মেরেছেন খোদ প্রার্থীই। সুষমা স্বরাজ এ বার ভোটে না দাঁড়ানোয় ভোপালে কংগ্রেসের দিগ্বিজয় সিংয়ের বিরুদ্ধে সংঘের ইচ্ছায় বিজেপি প্রার্থী করেছে প্রজ্ঞাকে‌। ফৌজদারি মামলার আসামি অন্য দলের প্রার্থীদের বিরুদ্ধে সতত সরব বিজেপির সরষের ভেতর ভূত এল কী ভাবে, এই প্রশ্নে তারা জেরবার।

আরও পড়ুন অচ্ছে দিনে আকলাখ আর দশলাখি স্যুট, পশ্চিমেই মহাজোটের সূর্যোদয়

হেনকালে সাধ্বীর  দৈববাণী। মুম্বই ২৬/১১-র সন্ত্রাসীদের সঙ্গে সম্মুখসমরে প্রাণ দিয়ে অসামরিক অফিসার, হিসেবে বিরল মরণোত্তর সম্মান অশোকচক্রে ভূষিত মুম্বই পুলিশের সন্ত্রাস দমন শাখার প্রধান হেমন্ত করকারে সম্পর্কে চরম হৃদয়হীন উক্তি – করকারের মৃত্যুর একমাস আগে আমি তাকে অভিশাপ দিই। বলি, তোর সর্বনাশ হবে। প্রজ্ঞার এই মন্তব্যের ভিডিওটি আগুন ছড়ানোর মতো ভাইরাল হয়ে যায়। নিন্দা, ধিক্কার, ভর্ৎসনার ঝড় ওঠে। বিজেপি সদরের সাংবাদিক বৈঠকে প্রশ্নবাণের মুখে পড়েন মুখপাত্ররা। ভোপালেও। বিজেপি তৎক্ষণাৎ নিজেকে আলাদা করে নেয়। বলে, এটা ওঁর ব‍্যক্তিগত বক্তব্য, দলের নয়। রীতিমতো তহেলকা। প্রজ্ঞা বক্তব্য ফিরিয়ে নিয়ে দায়সারা ক্ষমা চান। অন্য দিকে ভবি ভোলার নয়, বিজেপি নেতারা কেউ কেউ বলতে থাকেন, জেলে লাগাতার নির্যাতনের মধ্যে থেকে প্রজ্ঞা মনোকষ্টের কথা বলেছেন। এ দিকে কড়া বিবৃতি দেয় আইপিএস সমিতি। এতেই দিল্লির টনক নড়ে। ঝাঁপিয়ে পড়েন বিরোধীরা। কংগ্রেস তুলোধোনা করে প্রজ্ঞাকে। সেই সঙ্গে ওমর ‌আব্দুল্লাহ, আসাদুদ্দিন ওয়েসি। হেমন্ত করকারে প্রজ্ঞাকে গ্রেফতার করে জেরা করার সময় তাকে কতটা নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছিল, সে সব ধারাভাষ্যের মতো শুনিয়েছিলেন প্রজ্ঞা। সেগুলোই স্রোতের মতো চলতে থাকে সোশ্যাল মিডিয়ায়। করকারে তাকে প্রশ্ন করেন, বিস্ফোরণ হল কী করে?

প্রজ্ঞা – ভগবান জানেন।

করকারে – তা হলে সেটা জানতে কি আপনি ভগবানের কাছে যাবেন?

প্রজ্ঞা – আমি না। তুই-ই যাবি। তোর সর্বনাশ হবে।

প্রজ্ঞা বলে যান, মানুষের মৃত্যুর পর পারলৌকিক ক্রিয়া পর্যন্ত একটা পর্ব চিহ্নিত থাকে। সেটা শুরু হয়ে গিয়েছিল হেমন্ত করকারের।

যখন নিয়মরক্ষার ‘ক্ষমা’ চাইলেন তখনও প্রজ্ঞা সিং ঠাকুরের ভাবলেশহীন চোখের শীতল চাহনিতে ক্রোধ আর জিঘাংসা।

এই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে পুলওয়ামা, বালাকোট নিয়ে গলা কখনও উচ্চগ্রামে তুলে, কখনও খাদে নামিয়ে কংগ্রেসকে দায়ী করতে করতে আর নিজের পিঠ চাপড়াতে চাপড়াতে যে ভাবে অচ্ছে দিনের প্রতিশ্রুতি ও প্রতিদিনের সাচ্চা চালচিত্র মোদী ভুলিয়ে দিতে চান, এ বার তার কী হবে?

ভোপাল থেকে কংগ্রেসের দিগ্বিজয় রুখতে হয় দেশপ্রেমের ইস‍্যু ছাড়তে হবে, না হয় দেশদ্রোহীর তকমা দিতে হবে শহিদকে। পাকিস্তানি সন্ত্রাসীর আক্রমণে শহিদ করকারে আর মালেগাঁও সন্ত্রাসের আসামী ঠাকুরকে এক মেরুতে রাখবেন কী ভাবে মহামহিম শাসকগণ? এখানে মেরুকরণ চাইবেন না?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.