অর্থনৈতিক সংকটে মুখোশ চড়ানোই মোদী-শাহের চরম প্রাপ্তি

0
Amit Shah and Narendra Modi
প্রতিনিধিত্বমূলক গ্রাফিক্স ছবি

জয়ন্ত মণ্ডল: বহু বর্ণের পোশাক পরে বহুচর্চিত প্রধানমন্ত্রী বিক্ষোভকারীদের পোশাক দেখছেন। অথচ পোশাকহীন মুখগুলো তাঁর নজরশক্তির সীমা এড়াচ্ছে। কারণ চলমান অর্থনৈতিক সংকটে সিএএ-এনআরসির মুখোশ চড়াতে অনেকটাই সফল মোদী অ্যান্ড কোং!

প্রথম পর্বে ক্ষমতায় আসার পরেই ডিজিটাল ইন্ডিয়ায় জোর দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। ব্যাঙ্কিং লেনদেনের একটা বড়ো অংশ থেকে শুরু করে সরকারি ভরতুকি বা অনুদানের ক্ষেত্রে ডিজিটাল লেনদেন যথেষ্ট বেড়েছে এই সময়কালে। মুদির দোকান থেকে ফুটপাথে বিক্রি হওয়া ফলের রস কিনতে মোবাইলে পেমেন্টের চলও বেড়েছে তাঁরই উৎসাহে। কিন্তু ধীরে হলেও তাতে জোর ঝটকা লেগেছে নাগরিকত্ব (সংশোধনী) আইন (সিএএ) নিয়ে।

সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল করার আগের দিন (৪ আগস্ট) থেকেই জম্মু ও কাশ্মীরে এক নাগাড়ে ১৪৪ ধারা অথবা মোবাইল-ইন্টারনেট পরিষেবা স্থগিত করার পর সম্ভবত ততটা আঁচ লাগেনি গোটা দেশে। কিন্তু সিএএ নিয়ে উত্তাল হয়ে ওঠা দেশের বিভিন্ন রাজ্যে একই পথ অনুসরণ করায় শুধু ডিজিটাল ইন্ডিয়া কেন, হোঁচট খাচ্ছে ছোটো-বড়ো ব্যবসা, যা গোটা অর্থনীতিকে সাময়িক ভাবে পঙ্গু করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

রাজ্যসভায় সিএএ ওঠার দিন থেকেই বিক্ষোভের আগুন জ্বলতে শুরু করে উত্তর-পূর্ব ভারতে। ইন্টারনেট এবং ব্রডব্য়ান্ড পরিষেবা বন্ধ হয়ে যায় ত্রিপুরায়। পর দিন অসমের ১০টি জেলায়। একে একে মেঘালয়, পশ্চিমবঙ্গ হয়ে কর্নাটক, দিল্লি এবং উত্তরপ্রদেশে। এ কথা নতুন করে বলার নয়, আর্থিক লেনদেনের সব থেকে বড়ো ক্ষেত্র ব্যাঙ্কগুলিতে এখন ইন্টারনেট নেই, মানে কোনো কাজই নেই। এমনিতেই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কে গিয়ে লিঙ্ক না থাকার কারণে গ্রাহককে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। তার উপর অনলাইন লেনদেনের ক্ষেত্রেও ইন্টারনেট অতি জরুরি। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে সিএএ-কে কেন্দ্র করে অশান্তির জেরে বিভিন্ন জায়গায় চরম ক্ষতির মুখে পড়েছে আর্থিক লেনদেন। সম্ভবত স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীও সে কথা বেমালুম ভুলে গিয়েছিলেন। তার যথাযোগ্য প্রমাণও মিলেছে।

গত ১২ ডিসেম্বর সকাল সকাল অগ্নিগর্ভ অসমের মানুষকে আশ্বাস দিয়েছিলেন মোদী। প্রধানমন্ত্রী টুইট করে আশ্বাস দেন, “অসমের ভাই ও বোনেদের আমি আশ্বাস দিচ্ছি, সিএবির জন্য আপনারা আশঙ্কিত হবেন না। আপনাদের অধিকার, পরিচয় ও সংস্কৃতির উপরে কোনো প্রভাব পড়বে না। বরং তা আরও শ্রীবৃদ্ধি লাভ করবে”। কিন্তু যাঁদের উদ্দেশে তিনি ওই আশ্বাস দিয়েছিলেন, তাঁরা তা পড়বেন কী করে। তাঁর ওই আশ্বাস পড়তে পারেননি। অসমে তাঁর ভাই-বোনরা মোদীর ‘আশ্বাস’ বার্তাটি পড়তে পারবেন না, সে কথা হয়তো তিনি ভুলে গিয়েছিলেন, কারণ সেখানে ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছিল।

তবে এ সব ঘটনাকে সামান্যই মনে হতে পারে সিএএ-র কট্টর সমর্থকদের। কিন্তু যে দেশ ৫ ট্রিলিয়ন ডলার তথা ৫ লক্ষ কোটি ডলারের অর্থনীতির জন্য উচ্চাভিলাষী, সে দেশে এই ধরনের নিরবচ্ছিন্ন ঘটনা ওই স্বপ্নকে আরও অবাস্তব করে তোলার জন্য যথেষ্ট। ভারতের বৃহত্তম ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্র প্রশ্নের মুখে, বিদেশ থেকেও এ ব্যাপারে কড়া পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। প্রথম উত্তর-পূর্বে নিজের দেশের নাগরিকদের ভ্রমণের উপর নির্দেশিকা জারি করেছিল আমেরিকা, কানাডা, ব্রিটেনের মতো দেশগুলো। এখন তো গোটা ভারতেই বিভিন্ন অংশেই সেই নির্দেশিকা জারি করেছে ওই দেশগুলি। রাশিয়াও একই পথ ধরেছে। ভারতের পর্যটন ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলার পাশাপাশি বিভিন্ন উন্নত দেশগুলির এই পদক্ষেপ বিনিয়োগের পথে কাঁটা বিছিয়ে দিতে উদ্যত।

তবে বিদেশিদের ভ্রমণই শুধু নয়, এখন নেট-নির্ভরতার যুগে অ্যাপ-ক্যাবে চড়তে গেলেও ইন্টারনেট প্রয়োজন। গন্তব্য যিনি যাবেন, তাঁর পাশাপাশি যিনি নিয়ে যাবেন, উভয়েই স্থবির ইন্টারনেট না থাকলে। পাড়ার মোড়ে ঘুপচি দোকানে নামমাত্র কমিশনের বিনিময়ে যিনি মোবাইল রিচার্জ করান, তাঁর জীবিকাও সংকটে পড়লেও অবাক হওয়ার কোনো কারণ নেই।

সময়ে সংস্কার প্রয়োজন। কিন্তু তা যদি অগ্রগতির বিপরীতমুখী হয়ে পড়ে, তা হলে তাগা বাঁধার জায়গা খুঁজে পাওয়া যাবে না। নোট বাতিল অথবা জিএসটির ফলে এমনিতেই ঝাঁপ বন্ধ করেছে অসংখ্য ছোটো ব্যবসা। নোট বাতিলে কার লাভ হয়েছে, সেটা এখনও গবেষণার বিষয় হতে পারত। কিন্তু বিশ্বপথিক মোদী এ ব্যাপারে খুব একটা শব্দ খরচ করেন না। সম্ভবত জোগান নেই। তবে জিএসটিতে যে সরকারি ভাঁড়ারে জোগান বেড়েছে, তা সর্বশেষ পরিসংখ্যানেই স্পষ্ট।

মোদী চাইতে পারেন, কিন্তু কোনো দেশেরই সমস্ত নাগরিকের কাছে পর্যাপ্ত নথিপত্র রয়েছে বলে মনে করে না বিশ্বের কোনো দেশ। ভারতে আবার গরিব মানুষের সমাবেশ। যেখানে উন্নত বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কাছে বিষয়টি স্পষ্ট নয়, সেখানে সমস্ত ভারতীয় নাগরিকের নাগরিকত্বের কাগজপত্র এবং বাসস্থানের প্রমাণ থাকবে, এমন দাবি করছেন কী করে মোদী। বিশেষ করে অসমের এনআরসি নিয়ে ব্যর্থ অভিজ্ঞতার পরেও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের দেশ জুড়ে জাতীয় নাগরিকপঞ্জী (এনআরসি) করার প্রতিশ্রুতিই যে সিএএ নিয়ে এমন পরিস্থিতি তৈরি করেছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। যেখানে ভারতের গরিবতর মানুষরা তাদের নাগরিকত্ব হারাতে পারে, এমন আশঙ্কাই বদ্ধমূল হয়েছে।

দিন এনে দিন খাওয়া মানুষ রুটিরুজির জন্য ব্যয় করে দিনের অধিকাংশ সময়। সে সবের বালাই লাটে উঠেছে। দিকে দিকে ১৪৪ ধারা। বিপর্যস্ত জনজীবন, ব্যবসা-বাণিজ্য। সরকারি বাসে অথবা কেন্দ্রীয় সরকারি ট্রেনে আগুন লাগালে বিজেপি অঙ্ক কষতে বসে যাচ্ছে, কত টাকার লোকসান হল। কিন্তু একক মানুষের যে আর্থিক লোকসান নিত্যদিন হয়ে চলেছে, সে হিসেব কষবে কে?

তবে ভারত বর্তমানে যে আর্থিক সংকটের মধ্যে দিয়ে চলেছে, সিএএ নিয়ে আবেগময় উৎসাহ সে ভাবনায় একটা মুখোশ পরাতে সফল হয়েছে, এটাই হয়তো মোদী-শাহের বড়ো প্রাপ্তি।

জিডিপি বৃদ্ধির হার গত ছ-বছরের তলানিতে। অর্থনীতি যে সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছে, তার সমস্ত লক্ষণ সমানে অব্যাহত রয়েছে। অর্থনীতির সমস্ত কল্পনাযোগ্য খাতে চাহিদা বাষ্পীভূত হয়েছে, যা বড়ো শিল্পগুলিকে উৎপাদনে কাটছাঁট করতে বাধ্য করেছে। কাজ হারাতে হচ্ছে কয়েক লক্ষ মানুষকে। পাশাপাশি পাহাড় ছুঁয়েছে বেকারত্বের হার। ব্যাঙ্কিং সেক্টর গ্রাহক ঋণ, কর্পোরেট ঋণ বৃদ্ধি, ব্যাঙ্কগুলির একত্রীকরণ, আরবিআইয়ের ঢালাও রেপো রেট হ্রাস, গ্রামীণ চাহিদা পূরণে ভরতুকি-অনুদান বাড়িয়েও সমস্যার নিরসন হচ্ছে না।

খেলা-সিনেমা নিয়ে চায়ের দোকানে আড্ডা দেওয়া লোকগুলোও চর্চায় টেনে আসছে জিডিপি-আরবিআই-মুদ্রাস্ফীতি। চাই, হাতিয়ার চাই। রাষ্ট্রনায়ক, সহ-নায়কদের হাতে মিলে গিয়েছে সিএএ-এনআরসি। মানুষ আইন প্রত্যাহারের দাবিতে আইন হাতে তুলে নিচ্ছে। মরছেও। যদিও কে মারছে, তাতে সন্দেহ রয়েছে। কিন্তু ভাতে মারছে কি না, সে প্রশ্ন তোলার তো কোনো অবকাশই নেই!

------------------------------------------------
কোভিড১৯ বিরুদ্ধে লড়াইকে শক্তিশালী করুনপশ্চিমবঙ্গ সরকারের জরুরি ত্রাণ তহবিলে দান করুন।।
কোভিড১৯ বিরুদ্ধে লড়াইকে শক্তিশালী করুনপশ্চিমবঙ্গ সরকারের জরুরি ত্রাণ তহবিলে দান করুন।।
কোভিড১৯ বিরুদ্ধে লড়াইকে শক্তিশালী করুনপশ্চিমবঙ্গ সরকারের জরুরি ত্রাণ তহবিলে দান করুন।।
কোভিড১৯ বিরুদ্ধে লড়াইকে শক্তিশালী করুনপশ্চিমবঙ্গ সরকারের জরুরি ত্রাণ তহবিলে দান করুন।।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.