বাংলা যদি গুজরাত হয়ে যায়, সব থেকে ক্ষতি কার?

0
Mamata-Banerjee
বিদ্যাসাগরের মূর্তির আবরণ উন্মোচনে মমতা। ছবি: রাজীব বসু
Jayanta Mondal
জয়ন্ত মণ্ডল

“বাংলাকে গুজরাত হতে দেব না”। লোকসভা ভোটের পর থেকে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিয়ম করে এমন হুঁশিয়ারিই দিয়ে আসছেন। গত সোমবারও নবান্নে দাঁড়িয়ে তিনি সাংবাদিকদের সামনে বলেন, “কেন্দ্রীয় সরকার এবং বিজেপি রাজ্যে হিংসা ছড়ানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু আমরা বাংলাকে আর একটা গুজরাতে পরিণত হতে দেব না”

মঙ্গলবারও হেয়ার স্কুলে বিদ্যাসাগরের মূর্তির আবরণ উন্মোচন অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে মমতা বলেন, “আমরা গুজরাতের মানুষকে ভালোবাসি, কিন্তু দাঙ্গাবাজদের নয়। বাংলা গুজরাত নয়, করতেও দেব না। এর জন্য আমাদের জেলে যেতে হলে যাব। বাংলার সংবাদ মাধ্যম মানুষের পাশে থাকে না। বিজেপি সমস্ত সংবাদ মাধ্যম কিনে নিয়েছি। বাংলাকে গুজরাত বানানোর চেষ্টা হচ্ছে”

স্বাভাবিক ভাবেই লাগাতার বাংলার গুজরাত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা ঝরে পড়ছে মমতার বক্তব্যে। বাংলার গুজরাত হয়ে যাওয়া নিয়ে তিনি ঠিক কী বলতে চাইছেন, সেটা কোনো ক্ষেত্রেই তিনি স্পষ্ট করেননি। কিন্তু তাঁর বক্তব্য থেকে একটা বিষয় স্পষ্ট, গুজরাতের দাঙ্গাবাজদের কথা বলে তিনি গুজরাতের দাঙ্গার দিকেই ইঙ্গিত করতে চাইছেন। গুজরাতে দাঙ্গা হয়েছিল প্রায় দু’ দশক আগে। প্রতিবাদে গর্জে উঠেছিল দেশ। তবে সে সময় পশ্চিমবঙ্গের বামপন্থীরা প্রতিবাদের মাত্রাকে যে জায়গায় উন্নীত করেছিল, তা অন্য যে কোনো রাজ্যের তুলনায় যে বেশ উপরে ছিল, তা সমসাময়িক ব্যক্তিমাত্রেরই স্মরণে রয়েছে। কিন্তু ঠিক সে সময় মমতার অবস্থানটা কী রকম ছিল?

২০০২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি গোধরা স্টেশনের কাছে সবরমতী এক্সপ্রেসে আগুন ধরানো হয়েছিল বলে অভিযোগ। সেখান অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা গিয়েছিলেন ৫৯ জন। ধর্মীয় পরিচয় যা-ই হোক না কেন, অগ্নিকাণ্ডের আগে পর্যন্ত তাঁরা ছিলেন জীবিত মানুষ। যদিও ঘটনাটা মোটেই এতটাই সংক্ষিপ্ত নয়। তার আগে-পরের ঘটনাসমূহ বহুধাবিস্তৃত। কিন্তু একটা তথ্যও ফেলে দেওয়ার নয়, ১৯৯৯ সালে কেন্দ্রের অটলবিহারী বাজপেয়ীর সরকারের অ্ন্যতম শরিক ছিল তৃণমূল কংগ্রেস। সে বারের মন্ত্রিসভায় রেলমন্ত্রী হন মমতা।

২০০১ সালে তহেলকা কাণ্ডের প্রতিবাদ জানিয়ে কেন্দ্রের এনডিএ ত্যাগ করে তৃণমূল। কিন্তু ২০০৪ সালের জানুয়ারিতে বাজপেয়ী সরকারে ফিরে গিয়ে কেন্দ্রীয় কয়লামন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন মমতা। অর্থাৎ, মাঝে ঘটে গিয়েছে গুজরাতের দাঙ্গা। যে ‘দাঙ্গাবাজ গুজরাতি’দের হাত থেকে বাংলাকে বাঁচানোর শপথ নিচ্ছেন মমতা, তখন সেই তাঁরাই ছিলেন গুজরাত রাজ্য মন্ত্রিসভার মধ্যমণি।

২০০২-এ কনিষ্ঠতম মন্ত্রী হিসাবে গুজরাতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক ছিল অমিত শাহের হাতে। অন্য দিকে বছরখানেক আগেই মুখ্যমন্ত্রী কেশুভাই পটেলকে সরিয়ে তাঁর জায়গায় নিয়ে আসা হয়েছে নরেন্দ্র মোদীকে। সেই মোদীই এখন ভারতের প্রধানমন্ত্রীপদে বসেছেন দ্বিতীয় বার, আর সে দিন গুজরাতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক হাতে থাকা অমিতের হাতে এখন দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক।

তৃণমূলের কথায়, গুজরাতই এখন পরিচালনা করছে দেশ। কেন্দ্রের সর্বোত্তম দুই মন্ত্রক এখন হাতে রয়েছে দুই গুজরাতির হাতেই। তাঁদের নামের সঙ্গে আবার জুড়ে রয়েছে দাঙ্গা। ফলে ঘুরেফিরে আসছে বাংলাকে গুজরাত করে দেওয়ার চক্রান্তের কথা। কিন্তু এত দিন আসেনি। কেন?

২০০২ সালের পরে অথবা আগে, বাংলায় বিজেপি কোনো ভোটেই ৪০ শতাংশ ভোট পায়নি। যা পেয়েছে এ বারের লোকসভা ভোটে। বাংলায় বিজেপি কোনো দিনই দুই অঙ্কের আসন সংখ্যায় পৌঁছোতে পারেনি, এ বারে পেয়েছে ১৮টি। ছোবল পড়েছে সিপিএমের ঘাড়ে। সিপিএমের ভোট এক ধাক্কায় নেমে এসেছে ৮ শতাংশে। তবে বিজেপির কাছে তারা আসন হারিয়েছে মাত্র একটি। ছিল তো মোটে দুই। কিন্তু অধিকাংশ আসন খোয়াতে হয়েছে তৃণমূলকে। হারতে হয়েছে হেভিওয়েট বলে পরিচিত তৃণমূল সাংসদ, মন্ত্রী, প্রার্থীদের। ক্ষতির বহর যে অনেকটাই বেশি!

সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের মতো রক্তক্ষয়ী আন্দোলন এক দিন রাজ্যের ক্ষমতায় নিয়ে এসেছিল তৃণমূলকে। এখন সিঙ্গুর নিয়ে বইছে চোরাস্রোত। তৃণমূলত্যাগী বর্তমানে বিজেপি নেতা মুকুল রায় নতুন দলের প্রচারে সিঙ্গুর নিয়ে ব্যাঁকাট্যারা মন্তব্য করবেন, সেটা বলাই বাহুল্য। কিন্তু সিঙ্গুরের দীর্ঘ আন্দোলনের ফলে কৃষকের হাতে ফিরে যাওয়া জমিতে, ফের কৃষকের সম্মতি থাকলে শিল্প গড়ার প্রস্তাব দিতে হচ্ছে খোদ তৃণমূল বিধায়ক রবীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যকে। ফলে সিঙ্গুর নিয়ে এই চোরাস্রোত, সিঙ্গুরকে আর খুব বেশি দিন ইস্যুর জায়গায় রাখছে না তৃণমূল। তা হলে কি নতুন ইস্যু হয়ে উঠছে সেই গুজরাত, অনেক দিন আগেই যে অন্ধকার দিনগুলোর কালো স্মৃতি রীতিমতো ঝেড়ে ফেলতে শুরু করে দিয়েছেন গুজরাতিরাই?

উল্টো দিকে বিজেপি আওয়াজ দিয়ে চলেছে, যে কোনো মুহূর্তে সন্দেশখালি হয়ে যেতে পারে নন্দীগ্রাম, নৈহাটি হয়ে যেতে পারে নন্দীগ্রাম। গত ৯-১০ বছরে সাধারণ মানুষ অবশ্য হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছেন, ক্ষমতা দখলের জন্যেই রাজনৈতিক দলগুলির এই ধরনের হুঁশিয়ারি। কারণ, মানুষের থেকেও লাভ-ক্ষতির বহরটা তাদেরই বেশি!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here