রাজনীতি থাক রাজনীতির জায়গায়, মানুষে মানুষে থাক বন্ধুত্ব।
শ্রয়ণ সেন

ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ মানে এখন খেলাকে ছাপিয়ে আরও অনেক কিছু। আর সেই ম্যাচ যদি বিশ্বকাপের মতো গুরুত্বপূর্ণ টুর্নামেন্টে হয় তা হলে তো কিছু বলারই নেই। বলতে দ্বিধা নেই, ভারত-পাকিস্তান ম্যাচে এখন খেলাকে ছাপিয়ে জাতীয়তাবাদের জিগির তোলা হয়। আর সেটা করছে দুই দেশই।

আগামী রবিবার বিশ্বকাপের ম্যাচে মুখোমুখি হবে ভারত এবং পাকিস্তান। পুলওয়ামা হামলা এবং বালাকোট অভিযানের কয়েক মাস পরেই এই ম্যাচ যে অন্য মাত্রা বহন করছে তা তো আমরা সকলেই জানি। দু’দেশের সমর্থকদের মধ্যে “বিপক্ষকে গুঁড়িয়ে দিতে হবে” মনোভাব। খেলার মধ্যে অতি জাতীয়তাবাদের এই জিগির কতটা স্বাস্থ্যকর সে বিতর্কও শুরু হয়ে গিয়েছে।

যখন সব কিছুকে ছাপিয়ে যায় বন্ধুত্ব। ভারতীয় ভক্ত সুধীর কুমারের সঙ্গে পাকিস্তানি ভক্ত মহম্মদ বশীর।

কিন্তু এই গরম মেজাজা হালকা করার বদলে আরও গরম করে তুলেছে দুই দেশের চ্যানেলগুলো। এক দিকে যখন পাকিস্তানের একটি চ্যানেল বায়ুসেনার উইং কম্যান্ডার অভিনন্দন বর্তমানকে নিয়ে বিজ্ঞাপন চালাচ্ছে, তখন ভারতও পিছিয়ে নেই। ‘পাকিস্তানের বাবা ভারত’ এই আবহে বিজ্ঞাপন চালাচ্ছে তারাও। দুটি বিজ্ঞাপন আগে দেখে নিন।

আরও পড়ুন মায়ের দোহাই দিয়েও পার পাননি ওয়ার্ন

বলতে দ্বিধা নেই অভিনন্দন বর্তমানের মতো সাহসী এবং দক্ষ একজন কম্যান্ডারকে চূড়ান্ত অপমান করেছে পাকিস্তান। পাকিস্তানের হাতে ধরা পড়ার পর যে ভাবে অভিনন্দন বিভিন্ন প্রশ্ন সাবলীলতার সঙ্গে সামলেছেন সেটা নিয়েও তুমুল ব্যঙ্গ করা হয়েছে। কিন্তু অন্য দিকে ভারতের তরফ থেকে একটি চ্যানেল যে বিজ্ঞাপন তৈরি করেছে, সেটাই বা কতটা রুচিশীল?

ভারত থেকে পাকিস্তান তৈরি হয়েছে বলে পাকিস্তানের বাবা ভারত! এই মুড তৈরি করছে ওই চ্যানেল। ভারত-পাকিস্তানের ম্যাচে বাংলাদেশকে ঢুকিয়েই বা কী ধরনের বার্তা তারা দিচ্ছে বোঝা যাচ্ছে না।

মনে পড়ে যায়, ১৯৯৯ সালের বিশ্বকাপে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচের কথা। ম্যাঞ্চেস্টারে যখন পাকিস্তানের মুখোমুখি ভারত, তখন কার্গিল সীমান্তে পাকিস্তানি বাহিনীর মোকাবিলায় ভারতীয় সেনা। চলছে কার্গিল যুদ্ধ। কিন্তু তখনও ম্যাচকে ঘিরে এই পর্যায়ের জাতিয়তাবাদী জিগির তোলা হয়নি। আবার ২০০৩ বিশ্বকাপের ম্যাচের কথা ভাবুন। সেই ম্যাচের আগে ভারত-পাকিস্তানের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এক্কেবারে তলানিতে। মাসুদ আজহারকে কেন্দ্র করে সীমান্তে সেনা বাড়াচ্ছে দুই দেশ। কিন্তু খেলা শুরুর আগেই অদ্ভুত শান্তির বাতাবরণ। ক্রিকেটের ইতিহাসে যেটা সচরাচর হয় না, সেটা হল। ম্যাচ শুরুর আগে একে অপরের সঙ্গে করমর্দন করলেন ভারত-পাকিস্তানের খেলোয়াড়রা। সেখান থেকেই শান্তির পরিবেশ।

২০০৩-এর বিশ্বকাপের ম্যাচের আগে।

২০১১-এর পরিস্থিতি কি খুব ভালো আদৌ ছিল? মুম্বইয়ের ২৬/১১ হামলার পরিপ্রেক্ষিতে পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক নতুন করে জটিল হয়েছে। সীমান্তে উত্তেজনা। কিন্তু তার মধ্যেও ক্রিকেট-কূটনীতি করল ভারত। মোহালিতে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে আমন্ত্রণ জানানো হল তৎকালীন পাক প্রেসিডেন্ট ইউসুফ রাজা গিলানিকে। পাশাপাশি বসে খেলা দেখলেন মনমোহন ও গিলানি। ৫ উইকেট নিয়ে ভারতের মাটিকে চুমু খেলেন পাক বোলার ওয়াহাব রিয়াজ।

সেই সব ম্যাচে কিন্তু অতি জাতীয়তাবাদের জিগিরকে ছাপিয়ে গিয়েছিল খেলার স্পিরিট। গত বিশ্বকাপে ভারত-পাক ম্যাচের আগে ‘মৌকা মৌকা’ বিজ্ঞাপনেও ছিল নিছক বিনোদন এবং খেলা। কিন্তু এ বার যেন সব আলাদা। একটা পুলওয়ামা হামলাই বদলে দিয়েছে গোটা পরিস্থিতি।

পরিস্থিতিতে যখন এ রকম তখন ক্রিকেটভক্ত হিসেবে একটাই কথা বলার। খেলাটা হোক খেলার মতো। ভারতীয় হিসেবে চাইব, শনিবার পাকিস্তানকে গুঁড়িয়ে দিক বিরাটবাহিনী। কিন্তু তা বলে ‘বাবা হারাক ছেলেকে’? না, এ ভাবে দেখা উচিত নয়, কখনোই নয়।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here