২০২৪-এ বিজেপি বিরোধী মুখ চাই, তবে কি সেটা মমতাই?

0

বিশেষ প্রতিবেদন: শেষ সাত বছরে বিজেপি-বিরোধী জোট গঠন নিয়ে তোড়জোড় দেখা গিয়েছে বেশ কয়েক বার। কিন্তু ঐকমত্য না থাকায় শুধুমাত্র আলোচনাতেই সীমাবদ্ধ রয়ে গিয়েছে তা। তৎপরতা তুঙ্গে উঠলেও বিরোধী জোট বাস্তবায়িত না হওয়ার কারণ অনেক। তার মধ্যে প্রধান মুখ হিসেবে কাউকে সহমতের ভিত্তিতে বেছে নিতে না পারার ব্যর্থতাও একটি মুখ্য বিষয়। এ বার কি সেই বাধা অতিক্রম করতে পারবে বিরোধীরা?

২০১৮ সাল। অ-বিজেপি এবং অ-কংগ্রেসি একটি বিকল্প জোটের চিন্তাভাবনার কথা ভাসিয়ে দিয়েছিলেন তেলঙ্গানার মুখ্যমন্ত্রী কে চন্দ্রশেখর রাও। যা নিয়ে বিশেষ উদ্যোগী হতে দেখা গিয়েছিল পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেও। তার পর কেটে গিয়েছে প্রায় তিন বছর। গতি হারিয়ে সেই ভাবনাও ক্রমশ ফিকে হয়ে যায়। মাঝে মিটেছে লোকসভা এবং বেশ কিছু রাজ্যের বিধানসভা ভোট। সেই বিকল্প জোট-পরিকল্পনা যে চিন্তার মোড়কেই রয়ে গিয়েছে, সেটাও কারও অজানা নয়। ফের একই ধরনের জোট নিয়ে জল্পনা-কল্পনা চলছে। বিশেষ করে গত সপ্তাহে তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী এমকে স্টালিনের সঙ্গে রাও-এর বৈঠকের পর ফের আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে ফেডারেল ফ্রন্ট।

Chandra Sekhar Rao and Mamata Banerjee

অনেকেরই মনে থাকার কথা, ফেডারেল ফ্রন্ট নিয়ে স্টালিনের সঙ্গে রাও-এর একাধিক বৈঠক হয়েছিল অতীতে। এ ছাড়াও ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী নবীন পট্টনায়েক, কেরলের মুখ্যমন্ত্রী পিনারই বিজয়ন এবং মিম প্রধান আসাদউদ্দিন ওয়েইসির সঙ্গেও এ বিষয়েই বৈঠক করেন তিনি। ২০১৮-তেই তিনি নবান্নে এসে একাধিক বার সাক্ষাৎ করেছিলেন মমতার সঙ্গেও। ফেডারেল ফ্রন্ট গঠন নিয়ে আলোচনা হয়েছিল তাঁদের। ২০১৯ লোকসভা ভোটের বছরখানেক আগে ফেডারেল ফ্রন্ট গঠন নিয়ে বিজেপি-বিরোধী নেতাদের ওই ঘনঘন বৈঠক এবং ফোনালাপের খবর প্রায়শই জায়গা করে নিয়েছিল মিডিয়ার বড়ো অংশ জুড়ে। বিশেষ করে বাংলার মুখ্যমন্ত্রীর অগ্রণী ভূমিকা নজর কেড়েছিল গোটা দেশের।

২০১৯-এর ১৯ জানুয়ারি তৃণমূলের ডাকে বিজেপি-বিরোধীদের নিয়ে এক মহাসমাবেশ আয়োজিত হয় কলকাতায়। ব্রিগেডের ওই সমাবেশ উপলক্ষ্যে শহরের হাজির হয়েছিলেন দেশের তাবড় তাবড় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। ছিলেন তিন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী, কর্নাটকের কুমারস্বামী, দিল্লির কেজরিওয়াল এবং অন্ধ্রপ্রদেশের চন্দ্রবাবু নায়ডু। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী এইচডি দেবেগৌড়াও উপস্থিত ছিলেন ওই সভামঞ্চে। পাশাপাশি প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে উপস্থিত ছিলেন উত্তরপ্রদেশের অখিলেশ যাদব, অরুণাচলের গেগং আপং। বাজপেয়ী জমানার মন্ত্রী যশবন্ত সিন্‌হা এবং অরুণ শৌরিও উপস্থিত ছিলেন ওই সভায়। মঞ্চে ছিলেন তৎকালীন বিক্ষুব্ধ বিজেপি সাংসদ শত্রুঘ্ন সিন্‌হাও।

mamata banerjee brigade rally

ও দিকে রাও-স্টালিনের একের পর এক বৈঠক, এ দিকে কলকাতার মেগা শো-য়ে দেশের তাবড় রাজনীতিকদের উপস্থিতি, অন্য দিকে দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালের একযোগে বিজেপি-কংগ্রেসকে নিশানা- সব মিলিয়ে মনে হচ্ছিল এই বুঝি বেঁধে গেলে মহাজোট। কিন্তু সে সময়কার রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল এখনকার থেকে অনেকটাই আলাদা। বিজেপি-র বিরুদ্ধে সরাসরি জোট গড়তে যেমন আগ্রহ জন্মেছিল, তেমনই কংগ্রেসকে বাদ দেওয়া, না-দেওয়া নিয়ে দোটানায় ভুগছিলেন কেউ কেউ। ওই টানাপোড়েন তখন ততটা স্পষ্ট না হলেও এখন কংগ্রেস নিয়ে বিরোধীদলের স্পষ্ট একটা মেরুকরণ ঘটে গিয়েছে বেশ কিছু বিরোধীদলের মধ্যে।

এখন মমতা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ বলে আর কিছু নেই। সমানে কংগ্রেসকে বিঁধে চলেছে তাঁর দল। দলের উচ্চনেতৃত্বও কার্যত বুঝিয়ে দিয়েছেন, ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে তাঁরা প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসেবে মমতাকেই তুলে ধরার কৌশল নিয়ে এগোচ্ছেন। ও দিকে মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী উদ্ধব ঠাকরেও যে প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসেবে পিছিয়ে নেই, সে কথা আগাম দাবি করেছে শিবসেনা। কিন্তু কংগ্রেস প্রশ্নে তৃণমূলের ভিন্ন মেরুতে অবস্থান করছে উদ্ধবের দল। বিশেষ করে, মহারাষ্ট্রের জোট সরকারে যখন এনসিপি-র সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিচ্ছে কংগ্রেস।

সে বারও ফেডারেল ফ্রন্ট গড়ে বিজেপিকে কেন্দ্র থেকে উৎখাতের ডাক দেওয়ার পর থেকে নিজের দলের অনেকেই মমতাকে ২০১৯-এ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। কিন্তু অন্য দলের তরফে সমর্থনসূচক কোনো বার্তাই মেলেনি। এ বারও যে বিরোধী দলগুলো ২০২১-এ পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি-কে আটকে দেওয়ার জন্য মমতার প্রশংসায় দরাজ, তাদের তরফেও তেমন কোনো ইঙ্গিত মিলছে না। শুধু যা এই, কংগ্রেস থেকে তৃণমূলে যোগ দেওয়া কয়েক জন হেভিওয়েট নেতা মমতাকেই প্রধানমন্ত্রী পদে দেখার ইচ্ছে প্রকাশ করেছেন। কিন্তু বিজেপি-বিরোধী লড়াইয়ে মমতার পাশে থাকার আশ্বাস দিলেও অন্য কোনো দল এখনও প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসেবে মমতার নামে সিলমোহর দেয়নি।

তবে জাতীয় রাজনীতিতে মমতা এখন একটি শক্তিশালী বিরোধী মুখ হিসাবে আবির্ভূত হয়েছেন। সেটা অবশ্যই কেন্দ্রের শাসক বিরোধী অবস্থান থেকে। আগের বারের উদ্যোগ থেকে শিক্ষা নিয়ে এ বার বিরোধী জোটের ফাঁকফোঁকরগুলো বোঝাতে চাইছেন বেশ কয়েকজন বিরোধী নেতা। মমতার প্রচেষ্টার ভিত যদি প্রকৃত অর্থে মজবুত হয়, তা হলে সমর্থনের ব্যাপারে এগনোর কথা ভাবতেই পারেন। সে ক্ষেত্রে সমাজবাদী পার্টি নেতা অখিলেশ যাদব অথবা তেলঙ্গনার মুখ্যমন্ত্রী যদি ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেন, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। তেলঙ্গনার শাসক দল টিআরএস জানিয়েছে, পরিস্থিতি চাইলে মমতার নেতৃত্বে তারা সম্মতি দিলেও দিতে পারে। কিন্তু বাকিরা?

শিবসেনা যদি কংগ্রেসের হাত ছাড়তে না চায়, সেটার নেপথ্যে হয়তো রয়েছে রাজ্যের ক্ষমতা বজায় রাখার কৌশল। কিন্তু জাতীয় রাজনীতি থেকে কংগ্রেসকে দূরে রাখা এবং ইউপিএ ছাড়াই একটা বিরোধী জোট তৈরি করা ক্ষমতাসীন বিজেপি এবং “ফ্যাসিবাদী” শক্তিকে শক্তিশালী করার সমান নয় তো? এমন প্রশ্নও ওঠা স্বাভাবিক। কারণ, বিরোধী দলগুলোর মধ্যে ঐক্য না থাকলে বিজেপি-রই লাভ।

জাতীয় রাজনীতিতে বিজেপি-কে সমানে টক্কর দেওয়ার মতো দেশজোড়া সাংগঠনিক শক্তি কোনো একক দলের আয়ত্তের বাইরে এ মুহূর্তে। সে ক্ষেত্রে আঞ্চলিক স্তরে ছোটো দলগুলো সঙ্ঘবদ্ধ হলে কিছুটা সুবিধা মিলতে পারে। এমন চিন্তাভাবনা নিয়েই বিরোধী জোটের গঠনের কথা শেষ সাত বছরে অনেক বারই শোনা গিয়েছে। কিন্তু সেখানেও সবচেয়ে বড়ো প্রশ্ন কংগ্রেসকে রাখা হবে কি হবে না এবং প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসেবে সহমতের ভিত্তিতে কাকে বেছে নেওয়া হবে। রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট যে ভাবে বদলেছে, সেখানে এই দুই বিষয়ের সমাধান সবচেয়ে আগে জরুরি। অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, এখনও যাঁরা বলছেন, ‘আগে লড়াই, পরে প্রধানমন্ত্রী বেছে নেওয়া যাবে’, তাঁরা হয়তো শুধুমাত্র জোটের জন্যই জোট করার কথা বলছেন অথবা বর্তমান রাজনীতিতে বেমানান।

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন