পদ্ম-র মুকুলও ফুল হলে যে ঝরার দিকেই এগোয়

0
Mukul Roy
মুকুল রায়
jayanta mondal
জয়ন্ত মণ্ডল

দলবদল করলেও দাদার ‘হাতযশ’ সমানে বহাল। এমনই বলছেন তাঁর অনুগামীরা। বাংলার দিকে-দিকে, কোনায়-কোনায় দলবদলুদের খুঁজে বের করাই তাঁর প্রথম এবং প্রধান কাজ। সেটা তিনি নিজেও বলে থাকেন। কিন্তু বঙ্গ-বিজেপিতে মুকুল রায়ের মহিমা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই উঠে এসেছে সেই পুরোনো প্রশ্ন। ঘাসফুল থেকে যে ভাবে ঝরে গিয়েছিলেন তিনি, পদ্ম থেকেও সে ভাবেই সরতে হবে না তো?

২০১৭-র নভেম্বরে তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন মুকুলবাবু। কিন্তু তাঁর ক্রিয়াকলাপের উপর নজরদারি চালানোর কাজ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শুরু করে দিয়েছিলেন শেষ লোকসভা ভোটের পর থেকেই। শোনা যায়, গত বিধানসভা ভোটের সময় মুকুল রায়ের গতিবিধির উপর যতটা না নজর ছিল বিরোধী রাজনৈতিক দল থেকে শুরু করে নির্বাচন কমিশনের, তার থেকেও কড়া নজরদারি চলছিল তাঁর তৎকালীন আপন দল তৃণমূলের তরফে। কেন? ওই যে, মুকুল তখন ফুল-এ পরিণত হয়েছেন। তখন শুধুই তাঁর ঝরব ঝরব দশা!

বিজেপিতে গিয়েও দলবদলের ম্যাচে একের পর হ্যাটট্রিক করে চলেছেন মুকুল। সিপিএম-কংগ্রেস তো আছেই, বর্তমানে রাজ্যের শাসকদলের দাপুটে নেতাদেরও টেনে নিচ্ছেন পদ্মবনে। দলের জাতীয় কর্মসমিতির সম্মানজনক মঞ্চে সবাইকে টপকে তাঁকেই বেছে নেওয়া হয় বক্তা হিসাবে। আর সমস্যাটা এখানেই। পুকুরের পুরোনো বাসিন্দারা বেজায় ক্ষিপ্ত।

Mukul Roy and Mamata Banerjee
তখন তিনি নম্বর-টু। ছবি: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের সৌজন্যে

শুধু মাত্র বেআইনি আর্থিক লগ্নি সংস্থার কেচ্ছা নয়, গত লোকসভা ভোটের পর থেকে তণমূলের নম্বর-টু নেতা মুকুল রায়কে নিয়ে দলের অন্দরে কানাঘুষো শুরু ব্যাপক আকার নেওয়ার আরও একটি কারণ ছিল তাঁর ফুল হয়ে ওঠা। তখন থেকেই নিজের ঘর গুছোনোর কাজ শুরু করেছিলেন মুকুলবাবু। রাজনৈতিক মহলকে এমনও বলতে শোনা যায়, মুকুল নন, মুকুলের ভূত তাড়া করছিল তৃণমূলের একাংশকে। আছে, অথচ খালি চোখে তা দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না। নেই, তবুও চোখ খুললেই যেন তা অনেক দেখতে পাচ্ছেন – এমনই একটা অবস্থা তখন সেই ভূতকে নিয়ে। এক দিকে ডানা ছাঁটার তুমুল প্রস্তুতি, অন্য দিকে দলের ‘জেনারেল’-এর অবর্তমানে পার্থ চট্টোপাধ্যায়, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় অথবা ফিরহাদ হাকিমকে সেনাপতিপদে তৈরি করার কাজ চালিয়েছে তৃণমূল। মুকুল দল ছাড়লে যাতে তার আঁচ কোনো ভাবেই দলে না পড়ে, সেই চেষ্টাই চালিয়ে গিয়েছিলেন মমতা, তফাতটা শুধু এখানেই, সে দিনের ‘মিরজাফর’ আজকের ‘গদ্দার’।

সর্বোপরি তৃণমূলে মমতার অপরিহার্যতাই যেখানে শেষ কথা, সেখানে মুকুল-বিসর্জন কোনো ফ্যাক্টর হয়ে ওঠেনি। কিন্তু বিজেপিতে গিয়ে ঘাসের ফুল ফের পদ্মের মুকুলে পরিণত হওয়াতেই রি-অ্যাক্টর হিসাবে প্রাক্তনীদের চিন্তার মূলে সেই নম্বর-টু। বিপরীত প্রতিক্রিয়া হিসাবে গেরুয়া শিবিরে তাঁর ঝড়ের গতিতে বাড়বাড়ন্ত বঙ্গ-বিজেপির পুরোনো নেতাদের মনে চাপা ক্ষোভের সষ্টি করছে। বস্তুত অন্য দল থেকে আসা নেতাদের জায়গা দিতে গিয়ে তাঁদের অস্তিত্ব সংকটের মুখে পড়ে যাওয়ার শামিল।

Mukul Roy
সতীর্থ তৃণমূল সাংসদদের সঙ্গে

৬, নম্বর মুরলীধর সেন লেনে বঙ্গ-বিজেপির সদর দফতরে আসা নেতা-কর্মীদের কাছে সংগঠনের নির্দিষ্ট তিনটি স্তরই বিপাকে ফেলেছে ওই পুরোনো নেতাদের। একেবারে শীর্ষে, দলের সর্বভারতীয় সভাপতি অমিত শাহ, তাঁর পরেই কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষক কৈলাস বিজয়বর্গীয় এবং তৃতীয় স্তরে মুকুল রায়। এই ত্রিস্তরীয় নেতৃত্ব-বলয়কে সামনে রেখেই আবর্তিত হচ্ছে বঙ্গ-বিজেপির যাবতীয় কর্মকাণ্ড। এ বারের লোকসভা ভোটে প্রার্থী মনোনয়নেও তারই প্রভাব জোরালো। মাসখানেক ধরে প্রার্থী মনোনয়নে আগ্রহীদের দফায় দফায় ইন্টারভিউ চলেছে। মুকুলের ‘উদ্ভট’ প্রশ্নের মুখে পড়ে কোনো কোনো টিকিট-প্রার্থী না কি ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি’ দশায় পালিয়েওছেন। উলটো দিকে ভোটের মুখে ভিন দলের দাপুটেদের পদ্ম-প্রতীক দেওয়ার আকর্ষণীয় অফারে গেরুয়া শিবিরে টেনে নিয়ে পুরোনো বিজেপি নেতাদের ‘অচ্ছে দিনের’ ক্ষীর থেকে বঞ্চিত হওয়ার দরজা প্রশস্ত করে দিয়েছেন।

এখন তো নিত্যনতুন অঙ্কে রাজনীতির বাজার গরম করে রাখছেন মুকুল। তিনি জানেন এ মুহূর্তে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অ্যান্ড কোং-এর আক্রমণ সামাল দেওয়ার একটাই অস্ত্র – টি-টুয়েন্টির মতোই দলবদলের ম্যাচ জেতা। যা দিয়ে রাজ্যের শাসকদলে যেমন অপ্রকাশিত আতঙ্ক ছড়ানো যায়, তেমনই উলটো দিকে ১০ থেকে শুরু করা বিজেপির দুর্বল সংগঠনকে ১০০-য় পৌঁছে দেওয়া যায়।

Mukul Roy and Amit Shah
তাঁর প্রতি এখন অনেকটাই আশ্বস্ত অমিত শাহ

মুরলীধরে কান পাতলে এমনটাও শোনা যাচ্ছে, রাজ্য বিজেপির বেশ কিছু ‘প্রাচীন’ নেতা বর্তমান পরিস্থিতিতে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে নাক-কান মুলে মুকুল-পন্থীও হয়ে যাচ্ছেন। এ সবই শোনা কথা, তবে এটাও দেখা যাচ্ছে, দিল্লিতে যখন মুকুলকে দলবদলের মঞ্চে বাজিমাত করতে দেখা যাচ্ছে, তখন কলকাতায় টিভির পর্দা থেকে মাঝেমধ্যেই উধাও হয়ে যাচ্ছেন রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ। যা দেখে হয়তো বিজেপি নেতা-কর্মীদের একাংশ বুঝে গিয়েছেন, দলের রাশ আর বেশি দিন পুরোনো নেতাদের হাতে থাকার নয়। তাই দলে থাকতে হলে সময় থাকতেই নেতা-বদল প্রয়োজন।

কিন্তু দলের উচ্চ নেতৃত্বের এই অস্বস্তি এবং নিচু তলার আশঙ্কা-ক্ষোভ সামলে কি অদূর ভবিষ্যতে বঙ্গ-বিজেপির নম্বর-ওয়ান হয়ে উঠতে পারবেন মুকুল? তিনি সকাল-সন্ধে বলে চলেছেন, অনেক তৃণমূল নেতা এখনও লাইনে আছেন। কিন্তু তাঁর নতুন ঘরেও তৃণমূলিদের সংখ্যাধিক্য ফের তাঁকে বেলাইন করে দেবে না তো?

আরও পড়ুন যুদ্ধ হলেও সংখ্যা জুটছে না, উনিশে কুর্নিশের চৌকিদারি?

দলবদলের রাজনৈতিক ইতিহাস অবশ্য বলে, ক্ষমতার মধুভাণ্ড যখন হাতের মুঠোয় থাকে তখন ইন্দ্রিয় শক্তিকে অগ্রাহ্য করার প্রবণতা স্বাভাবিক ভাবেই বাড়ে। তবে পুরোনো দলে কোণঠাসা হওয়ার পরেও তাঁর ‘নির্বিকার’ ভাবভঙ্গিই হয়তো নিজেকে ফুটন্ত রাখার ইন্ধন জুগিয়েছিল। কিন্তু সে সময় তাঁর নিজে হাতে গড়া (তিনি নিজেই দাবি করেন) সংগঠনেই ‘বধ’ হওয়া এবং তা দেখে তাঁর হাতে গড়া নেতাদের উল্লাস তো এত তাড়াতাড়ি ঝাপসা হয়ে যাওয়ার নয়! সেই দলে আদর্শের চেয়েও বেশি ছিল আবেগের ঠাঁই, এখানে কিন্তু দু’টোই পুরো মাত্রায় মজুত!

সামনে লোকসভা ভোট। কেন্দ্রে বিজেপির থাকা, না-থাকার লড়াই। তাই ‘সবে মিলি করি কাজ, তাতে নেই কোনো লাজ’ ফরমুলা চললেও ভোটের পর ‘কাঁটা’ সাফাই অভিযান শুরু হলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।

উত্তর দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here