jayanta mondal
জয়ন্ত মণ্ডল

শহিদ স্মরণের কর্মসূচি ফিকে হতে শুরু করেছে সপ্তাহের শুরু থেকেই। লোকসভা ভোটই এখন এক মাত্র লক্ষ্য। স্বাভাবিক ভাবে প্রচারে-আলোচনায় ঘুরেফিরে এলেও পুলওয়ামায় জঙ্গি হামলায় রং লেগেছে রাজনীতির। ৪০ জওয়ানের আত্মবলিদানও বাদ পড়ছে না দেশের ছোটো-বড়ো-মাঝারি রাজনৈতিক দলের তর্ক-তরজা থেকে। তবে যে যা-ই করুক, পুলওয়ামা-আবেগ সব থেকে যে বেশি কদর বাড়াচ্ছে বিজেপি এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর, সে কথা এক বাক্যে স্বীকার করছে বিরোধী দল থেকে শুরু করে বহুজাতিক সংস্থার বিশ্লেষণও!

সীমান্ত সমস্যা, পাকিস্তান আর যুদ্ধ-যুদ্ধ আবহ – বহু দশকের পুরোনো রাজনৈতিক টোটকা। ভোটের সময় এ সবের কার্যকারিতা অনেক গুণ বেশি। পুলওয়ামায় আত্মঘাতী জঙ্গি হামলা এবং ৪০ জন সিআরপিএফ জওয়ানের শহিদ হওয়ার ঘটনা ঠিক যতটা মর্মন্তুদ, ক্রমশ যেন ততটাই বেদনাদায়ক হয়ে উঠছে তা নিয়ে রাজনৈতিক দলের কচকচানি। ঘটনার পর পরই সারা দেশ যখন শোকস্তব্ধ তখন একটা ‘আপাত-সত্যি’ কথা বলে ফেলেছিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বলেছিলেন, কোনো রকম তদন্ত না করেই কেন এই ঘটনার দোষী সাব্যস্ত করে ফেলা হল?

মমতার সেই বক্তব্য নিয়ে সারা দেশেই তোলপাড় শুরু হয়ে যায়। তাঁর মন্তব্যে কোনো রকমের যুক্তি নেই প্রমাণ করতে উঠেপড়ে লাগে বিজেপিও। পাশে পাওয়া যায় শোকাহত দেশবাসীকে। পাকিস্তানে ঘাঁটি গেড়ে বসা জইশ-ই-মহম্মদ যখন হামলার দায় স্বীকার করে নিল, তখন মমতার কথা তো যুক্তিহীনই ঠেকে! তার উপর যখন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের বিবৃতিতেও পুনরুচ্চারিত হয় মমতার বক্তব্য। তিনি দাবি করেন, “পুলওয়ামা হামলার নেপথ্যে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে এলেই চলবে না, প্রমাণ দিতে হবে”। স্বাভাবিক ভাবেই আসন্ন ভোটে বিজেপিকে টক্কর দিতে প্রস্তুত তৃণমূলনেত্রীকেও কিছুটা হলেও হেয় করা গেল দেশভক্তদের চোখে।

রাজনীতিতে সবই সম্ভব। এখানে একে আর একে সব সময় যে দুই হবে, তার কোনো গ্যারান্টি নেই। এই যেমন বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ কটাক্ষের সুরে বলেছেন, “পুলওয়ামা হামলা কখন হবে, সেটা কংগ্রেস জানত”। আন্তর্জাতিক সীমানা সুরক্ষা নিয়ে কে কতটা ভাবিত, তা প্রমাণ করতে পারলেই দেশভক্তদের সমর্থন মিলবে, সেই প্রতিযোগিতায় বিজেপি নিজে থেকেই নেমে পড়েছে, সেটা তাঁর কথাতেই স্পষ্ট। সেখানে ঘুরেফিরে এসে যেতে পারে ৪০ শহিদের আত্মবলিদান। কারণ, সেটাও তো ভোটের প্রচারে মাইলেজ দেবে নির্লজ্জ রাজনীতিকে। তা কী ভাবে?

পুলওয়ামা হামলার পর মোদী-শাহের মতো বিজেপির প্রথম সারির নেতারা যে কোনো সভাতেই অভয়বাণী প্রচার করছেন। পাকিস্তানের মতো নগণ্য শক্তির কাছে ভারতের যে মাথা নোয়ানোর কোনো প্রশ্নই নেই, সে কথাটাই ঢুকিয়ে দিচ্ছেন দেশবাসীর মগজে। এত বড়ো একটা হামলায় সমস্ত রকমের ব্যর্থতাকে ফুঁয়ে উড়িয়ে দিতে ওই অভয়বাণীই অব্যর্থ। মোদীই বরাভয়, তেমন গ্যারান্টি সঙ্গে নিয়ে আগামী ভোটে এমন একটা মজবুত সরকারকে স্থায়িত্ব দেওয়ার তাগিদে ইভিএমে পদ্ম-ছুঁতে উৎসাহিত করা। সেনা করে সেনার কাজ, কিন্তু ভোটের মুখে সেনাকে সামনে রেখেই সন্ত্রাসদমনে পাকিস্তানকে জব্দ করার চিরকালীন খিদে মেটানোর আশ্বাস মোটেই চাট্টিখানি কথা নয়।

অন্য দিকে বিজেপি-বিরোধী দলগুলি নিজেদের অজান্তেই পুলওয়ামাকে সামনে রেখে মোদী-বিরোধী প্রচারে নেমেছে। তাদের তরফে বলা হচ্ছে, পুলওয়ামা হামলাকে বিজেপি নিজেদের ভোট প্রচারে ব্যবহার করছে। অন্য দিকে ঢেকে ফেলা হচ্ছে গোয়েন্দা ব্যর্থতা। আরও নির্দিষ্ট করে খোদ জম্মু-কাশ্মীরের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লা বলেছেন, “প্রধানমন্ত্রীর ও তাঁর দলের লোকেরা পুলওয়ামার মর্মান্তিক ঘটনাকে ব্যবহার করছেন, ৪০ জনের বেশি সিআরপিএফ জওয়ানকে নিজস্ব রাজনৈতিক প্রচারের উদ্দেশে হত্যা করা হয়েছে। এটা জাতির কাছে সব চেয়ে বড় অসহায়তা। ”

অতি বড়ো বিজেপি বা মোদী-বিরোধীর কাছেও এক জন ভারতীয় পক্ষে এমন ধরনের অভিযোগ হজম করা খুব একটা সহজ কথা নয়। যে কারণে সেই অতর্কিত হামলার সঙ্গে বিজেপির এজেন্ডা মিশিয়ে দিয়ে আদতে দেশপ্রেমের কাছে আত্মসমর্পণ করার নামান্তর হয়ে দাঁড়াচ্ছে। কিন্তু চলমান রাজনীতি বিস্মৃতির অতলে পাঠিয়ে দিতে পারে হাড়হিম করা আত্মত্যাগকেও। সেটাই ঘটে চলেছে পুলওয়ামা নিয়ে। সাড়ে চার বছর নিশ্চুপ থাকার পর আচমকা কেন ভোটের মুখে পুলওয়ামা? সে প্রশ্নের উত্তরও কি খুঁজবে না দেশপ্রেম?

অন্য দিকে কংগ্রেস আবার স্ট্রিং করে বের করেছে, পুলওয়ামায় হামলা চলার পরেও জিম করবেট জাতীয় উদ্যানে ডকুমেন্টারি ছবির শুটিংয়ে ব্যস্ত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী। অর্থাৎ, এক দিকে সেনাকে লক্ষ করে জঙ্গিদের শুটিং, অন্য দিকে ভোটের প্রচারে মোদীর শুটিং। এমনকি হামলার খবর পাওয়ার পরেও শ্যুটিং বন্ধ হয়নি। আরও ঘণ্টাখানেক ধরে চলে সেই শুটিং। দুই শুটিংয়ের উত্তাপ ক্রমশ বাড়তে থাকলে বিজেপি তো আর চুপ করে বসে থাকবে না।

জবাব দিয়েছে বিজেপি। দাবি করা হয়েছে, ঘটনার কথা জানার পর এক মুহূর্তের জন্যও প্রধানমন্ত্রীকে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় বসে থাকতে দেখা যায়নি। তিনি কোনো খাবারও মুখে তোলেননি।

এর পর আর কী বলার থাকতে পারে? কংগ্রেস বলেছিল, ১৪ ফেব্রুয়ারি দুপুর ৩:১০টায় পুলওয়ামায় হামলার ঘটনা ঘটলেও, সন্ধ্যা ৬:৪০টা পর্যন্ত শুটিং করেছেন মোদী। তার পর ৭:০৭ মিনিটে একটি সরকারি অতিথিনিবাসে চা-জলখাবার খেয়েছিলেন তিনি। বিজেপি বলছে, খাবারই খাননি মোদী। তবে ‘চায়ে পে চর্চা’র মোদী চা যদি পান করেই থাকেন, তাতে অপরাধটা কোথায়?

সেন্টু কোন উচ্চতায় পৌঁছোতে পারে, আন্দাজ করার অবকাশ রাখছে না আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ফিচ সলিউশনস ম্যাক্রো রিসার্চ। পুলওয়ামা হামলার পর তাদের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে আরও এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। ওই আন্তর্জাতিক সংস্থা বলছে, সাম্প্রতিক পুলওয়ামা হামলার পর জাতীয়তাবাদী চিন্তাভাবনার বিস্ফোরণ বিজেপির পালে হাওয়া জোগাচ্ছে। পুলওয়ামা হামলার পর যে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধজিগির জোরালো হচ্ছে, সেটা মোদীর হাত শক্ত করতে যথেষ্ট সহায়ক।

আচমকা সোশ্যাল মিডিয়ায় দেশাত্মবোধক গান, ভিডিও, ছবি, বাণী ইত্যাদির আদানপ্রদান ব্যাপক হারে বেড়ে গিয়েছে। এ সব কিছুর নেপথ্যেই পুলওয়ামা হামলার সেই ৪০ জওয়ানের আত্মত্যাগ। এ সবের কাছে শান্তির বাণী নিয়ে যাঁরা ঘুরে বেড়াচ্ছেন, তাঁদেরও আক্রান্ত হতে হচ্ছে। খোদ কলকাতাতেও এর নমুনা মিলেছে। আর সেখান থেকে কয়েক হাজার কিমি দূরে সিওল শান্তি পুরস্কার নিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। গণতন্ত্রের ভিত আরও গভীর করা এবং বিশ্ব শান্তিতে অবদানের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে এই পুরস্কার দেওয়া হল বলেই জানা গিয়েছে। মোদীর পরিপাটি করে ছাঁটা দাড়ির উপর থেকে উঁকি মারা চকচকে গালে ক্যামেরার ঝলসানি ঠিকরে পড়ছে।

পুরস্কার হাতে নিয়ে তিনি বলছেন, “এই পুরস্কার গোটা দেশের, শুধু আমার নয়। গোটা দেশের হয়ে আজ আমি এই পুরস্কার গ্রহণ করছি।” গোটা দেশ যে পুলওয়ামায় বিধ্বস্ত। এই পুরস্কারটা পাওয়া খুবই জরুরি ছিল তাঁর জন্য। শোকস্তব্ধ দেশবাসীর জন্য, আগামী লোকসভা ভোটের জন্যও!

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here